দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার ভিত্তিতে ইন্টারপোলের রেড নোটিশের পর দুবাই ট্রানজিটে গ্রেপ্তার হওয়া সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে তাকে ফেরানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারকে আনুষ্ঠানিক অনুরোধপত্র পাঠানো হবে।আরও পড়ুন,দেশে ভয়াবহ হাম পরিস্থিতি, ২৪ ঘণ্টায় আরও ৪ শিশুর মৃত্যুদুদক সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী প্রত্যর্পণের জন্য প্রয়োজনীয় সব নথিপত্র প্রস্তুত করা হচ্ছে। বিষয়টি কূটনৈতিক ও আইনি কাঠামোর মধ্যে সম্পন্ন হবে।এর আগে সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশকে জানায়, রেড নোটিশের ভিত্তিতে গ্রেপ্তারের পর ৩০ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় নথি পাঠিয়ে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।উল্লেখ্য, গত ১২ জুন দুদকের দায়ের করা মামলার ভিত্তিতে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ অনুসারে তাকে দুবাইয়ে গ্রেপ্তার করা হয়।এ ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা ও দুর্নীতি দমন ব্যবস্থার কার্যক্রম নিয়ে দেশের ভেতরে ও বাইরে আলোচনা চলছে। এখন নজর কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার অগ্রগতির দিকে।
এক্সক্লুসিভ
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর গুলশান থানা| রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান শুধু একটি থানা এলাকা নয়, এটি দেশের অর্থনীতি, কূটনীতি, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং উচ্চপর্যায়ের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের অন্যতম কেন্দ্র| ফলে এই থানার দায়িত্বে কে আসছেন, তা সবসময়ই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে| আর সেই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব এবার কাঁধে তুলে নিয়েছেন যশোরের সন্তান, অপরাধ দমনে আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা মো. দাউদ হোসেন|অরও পড়ুন: ডিএমপির কয়েকটি থানায় দৃশ্যমান পরিবর্তনপুলিশের বিভিন্ন সূত্র বলছে, মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা এবং আইন প্রয়োগে দৃঢ় অবস্থানের কারণেই গুলশানের মতো গুরুত্বপূর্ণ থানার দায়িত্ব তার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে| মো. দাউদ হোসেনের কর্মজীবনের শুরু থেকেই দায়িত্বশীল ও পেশাদার কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিতি রয়েছে| দীর্ঘ চাকরি জীবনে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট ও থানায় দায়িত্ব পালন করে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন| তবে রাজধানীর খিলগাঁও থানা এবং পরবর্তীতে ক্যান্টনমেন্ট থানায় দায়িত্ব পালনকালে তিনি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসেন|সহকর্মীদের মতে, তিনি এমন একজন কর্মকর্তা যিনি অফিসকেন্দ্রিক পুলিশিংয়ের চেয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন| অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর শুধু তদন্ত নয়, অপরাধ প্রতিরোধেও তিনি গুরুত্ব দেন|অরও পড়ুন: প্রশংসা-সমালোচনার কেন্দ্রে থাকা ওসি দাউদখিলগাঁও থানায় দায়িত্ব পালনকালে মাদক, চুরি, ছিনতাই, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের বিরুদ্ধে একাধিক সফল অভিযান পরিচালনা করেন| তার নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে বেশ কয়েকটি অপরাধী নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া হয়| একই সঙ্গে বিট পুলিশিং ও জনবান্ধব পুলিশিং কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করার উদ্যোগ নেন তিনি|খিলগাঁও থেকে ক্যান্টনমেন্ট থানায় দায়িত্ব গ্রহণের পরও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে একই ধরনের সক্রিয়তা বজায় রাখেন তিনি| বিশেষ করে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় যখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে, তখন ক্যান্টনমেন্ট থানার দায়িত্বে থেকে তিনি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মামলার তদন্ত ও অভিযান পরিচালনা করেন| চব্বিশের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে দায়ের হওয়া ˆবষম্যবিরোধী আন্দোলনের বিভিন্ন মামলায় সাবেক সংসদ সদস্যসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তাদের গ্রেপ্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি|অরও পড়ুন: অপরাধ দমনে নতুন ছকে ডিএমপিপুলিশ সূত্র বলছে, এসব মামলার তদন্ত ও অভিযান পরিচালনার সময় ব্যাপক চাপ ও নানা ধরনের সমালোচনার মুখোমুখি হতে হলেও তিনি আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে যাননি| বরং তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করেন| তার কর্মকাণ্ডের কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা ˆতরি হয়| আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধ ঘোষিত বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ও সমর্থক গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে তাকে নিয়ে একাধিক নেতিবাচক প্রচারণা চালানো হয়| এমনকি আওয়ামী লীগের অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজেও তাকে নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সমালোচনামূলক পোস্ট দেওয়া হয়েছে বলে জানা যায়| তবে এসব বিষয়কে গুরুত্ব না দিয়ে নিজের দায়িত্ব পালনেই মনোযোগী ছিলেন তিনি| তার ঘনিষ্ঠরা বলছেন, সমালোচনা কিংবা চাপ নয়, বরং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই ছিল তার মূল লক্ষ্য|একজন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, দাউদ হোসেন দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কখনো ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক বিবেচনাকে প্রাধান্য দেন না| আইন যেদিকে নির্দেশ করে, তিনি সেদিকেই কাজ করার চেষ্টা করেন| ক্যান্টনমেন্ট থানায় দায়িত্ব পালনকালে মাদকবিরোধী অভিযান, চুরি-ডাকাতি প্রতিরোধ, সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্র শনাক্তকরণ এবং ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি গ্রেপ্তারে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেন তিনি|পুলিশের অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, তার নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে বিভিন্ন অপরাধী চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে| ফলে ক্যান্টনমেন্ট এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি| শুধু অপরাধ দমন নয়, জনগণের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক উন্নয়নেও তিনি কাজ করেছেন| স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময়, সচেতনতামূলক সভা এবং বিট পুলিশিং কার্যক্রম জোরদারের মাধ্যমে জনমুখী পুলিশিং নিশ্চিত করার চেষ্টা করেন|অরও পড়ুন: মধ্যরাতে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে, পরে হেলিকপ্টারে ঢাকায় ডিসিরাজধানীর গুলশান এলাকা দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক জোন| এখানে রয়েছে বিভিন্ন দেশের দূতাবাস, আন্তর্জাতিক সংস্থা, বহুজাতিক কোম্পানি, পাঁচতারকা হোটেল এবং দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের আবাসস্থল| ফলে গুলশান থানার দায়িত্ব শুধু সাধারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা নয়, বরং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার সঙ্গেও সংশ্লিষ্ট|সাম্প্রতিক সময়ে এই এলাকায় সাইবার অপরাধ, আর্থিক প্রতারণা, মাদক ব্যবসা, সংঘবদ্ধ অপরাধ এবং বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা রয়েছে| এছাড়া অভিজাত এলাকার আড়ালে সংঘটিত কিছু অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে|অরও পড়ুন: মিরপুরে আলোচিত ওসি হাফিজুর রহমানএই বাস্তবতায় একজন অভিজ্ঞ, দৃঢ়চেতা এবং মাঠপর্যায়ে সক্রিয় কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা ছিল বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা| গণমাধ্যমকর্মীদের কাছেও মো. দাউদ হোসেন পরিচিত একটি নাম| বিভিন্ন অভিযানের বিষয়ে তথ্যভিত্তিক বক্তব্য প্রদান এবং সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে সমš^য় করে কাজ করার কারণে সাংবাদিক মহলেও তার একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি রয়েছে|একাধিক অপরাধবিষয়ক প্রতিবেদক জানান, তিনি তথ্য গোপন না করে আইনি সীমার মধ্যে থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহের চেষ্টা করেন| ফলে সংবাদ সংগ্রহের ক্ষেত্রেও সহযোগিতামূলক মনোভাব দেখা যায় তার মধ্যে| আইনশৃঙ্খলা বিশেষজ্ঞদের মতে, গুলশান থানার দায়িত্ব পাওয়া যেমন সম্মানের, তেমনি এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জও| কারণ রাজধানীর সবচেয়ে সংবেদনশীল ও আলোচিত এলাকাগুলোর একটি হলো গুলশান| এখানে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি কূটনৈতিক নিরাপত্তা, বিদেশি নাগরিকদের সুরক্ষা, করপোরেট নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ মোকাবিলা সমান গুরুত্বপূর্ণ|অরও পড়ুন: পুলিশ হত্যা, সংস্কার ও জননিরাপত্তা: সংকট উত্তরণের পথ কোথায়?বিশেষজ্ঞদের মতে, অতীত অভিজ্ঞতা এবং মাঠপর্যায়ের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে তিনি গুলশান থানার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরও শক্তিশালী করতে সক্ষম হবেন| ডিএমপির অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, নিষ্ঠা, সাহসিকতা, পেশাদারিত্ব এবং দায়িত্ব পালনে দৃঢ়তার কারণেই তাকে এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে|গুলশান থানায় যোগদানের পর তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি জনগণের আস্থা আরও বৃদ্ধি করা| বিশেষ করে আধুনিক নগর অপরাধ, সাইবার জালিয়াতি, মাদক কারবার এবং সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি গুরুত্ব পাবে| সব মিলিয়ে ক্যান্টনমেন্ট থেকে গুলশান এই যাত্রা শুধুমাত্র একজন পুলিশ কর্মকর্তার পদায়ন নয়, বরং এটি তার কর্মদক্ষতা ও পেশাদার নেতৃত্বের প্রতি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আস্থার প্রতিফলন বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা| এখন রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই থানার দায়িত্বে থেকে তিনি কতটা সফলভাবে নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারেন, সেদিকেই নজর থাকবে নগরবাসী, আইনশৃঙ্খলা বিশ্লেষক এবং সংশ্লিষ্ট মহলের|
অনলাইন জরিপ