দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

Divine Group ঘিরে এবার মামলার হিসাব

Divine Group ঘিরে এবার মামলার হিসাব
Divine Group


Divine Group-এর প্রকল্প, জমির মালিকানা, গ্রাহকের অর্থ ব্যবস্থাপনা, রিফান্ড এবং করপোরেট গভর্ন্যান্স নিয়ে প্রশ্নের পর এবার প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে থাকা মামলা ও আদালতের আদেশ নিয়েও অনুসন্ধানের দাবি উঠেছে। বিভিন্ন গ্রাহকের করা মামলার পাশাপাশি একটি ব্যাংক-সংক্রান্ত মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। সেই পরোয়ানা গুলশান থানায় পৌঁছানোর পরও কেন তা কার্যকর হয়নি এ প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে। তবে মামলার সংখ্যা, পরোয়ানার বর্তমান কার্যকারিতা এবং কোনো মামলায় আসামির জামিন বা স্থগিতাদেশ রয়েছে কি না এসব বিষয়ে আদালতের নথি ও সংশ্লিষ্ট থানার রেকর্ড দিয়ে পূর্ণাঙ্গ যাচাই জরুরি। সংবাদ দিগন্তের অনুসন্ধানেও এসব নথির সত্যতা ও বর্তমান অবস্থা যাচাইয়ের চেষ্টা চলছে। গুলশানের মত এমন একটি এলাকায় প্রতারনার ফাঁদ গ্রাহকের টাকা লুটেপুটে খাচ্ছে ডিভাইন গ্রুপ।

আরও পড়ুন: গ্রাহকের অর্থ কোথায়? Divine Group-এর প্রকল্প ও সম্পদ

Divine Group-এর ওপর করা প্রাথমিক ঝুঁকি মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক স্বচ্ছতা, গ্রাহকের রিফান্ড, ব্যাংক দায়, জমির মালিকানা, কর-ভ্যাট ও করপোরেট গভর্ন্যান্স নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তোলা হয়েছে। প্রতিবেদনে SM Habibur Rahman-এর বিরুদ্ধে ব্যাংক ঋণ খেলাপি, আইনগত পদক্ষেপ এবং ব্যাংকগুলোর recovery চেষ্টার অভিযোগের কথাও উল্লেখ রয়েছে। তবে ওই রিপোর্টও এসব অভিযোগকে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে উপস্থাপন না করে ব্যাংক নথি, আদালতের রেকর্ড ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রের মাধ্যমে যাচাইয়ের কথা বলেছে।

আরও পড়ুন: অপসাংবাদিকতার তাণ্ডব: মূলধারা ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বড় সংকট

অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, One Bank-এর একটি মামলায় এস এম হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে এবং ওই পরোয়ানা গুলশান থানায় পাঠানো হয়েছে। কিন্তু পরোয়ানা থানায় পৌঁছানোর পর সেটি কার্যকর হয়েছে কি না, হলে কখন হয়েছে, না হলে তার কারণ কী এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো থানায় আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা পৌঁছালে সেটির কার্যকর করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্ব থাকে। তবে কোনো আসামির বিরুদ্ধে পরোয়ানা থাকলেই তিনি গ্রেপ্তারযোগ্য অবস্থায় আছেন এমন সরল সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে পরোয়ানার সর্বশেষ অবস্থা, জামিন, স্থগিতাদেশ, প্রত্যাহার বা অন্য কোনো আদালতের আদেশ আছে কি না তা যাচাই করা প্রয়োজন। সুতরাং এখানে মূল অনুসন্ধানের বিষয় শুধু ‘ওয়ারেন্ট আছে কি না’ নয়; বরং ওয়ারেন্টটি বর্তমানে কার্যকর কি না এবং থাকলে সেটি বাস্তবায়নে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে

আরও পড়ুন: চোরাচালান-মাদকপাচার ও সীমান্ত হত্যা বন্ধে বিজিবিকে রাষ্ট্রপতির নির্দেশ

এদিকে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, এস এম হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আদালতে মোট ৫৪টি মামলা রয়েছে। তবে সংবাদ দিগন্তের হাতে এই মুহূর্তে ৫৪টি মামলার পূর্ণাঙ্গ মামলানম্বর, আদালতের নাম, মামলার ধারা, বাদীর পরিচয় এবং বর্তমান অবস্থার সমন্বিত তালিকা নেই।

ফলে ৫৪টি মামলাকে নিশ্চিত সংখ্যা হিসেবে প্রকাশের আগে আদালতের নথি দিয়ে তা যাচাই করা জরুরি। কারণ একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিভিন্ন পর্যায়ের মামলা, আপিল, রিভিশন বা আর্থিক বিরোধের মামলা থাকতে পারে; আবার কোনো মামলা নিষ্পত্তি, খারিজ, স্থগিত কিংবা জামিনের আওতায়ও থাকতে পারে।

এ কারণে সংবাদ দিগন্তের অনুসন্ধানের পরবর্তী ধাপে মামলার নম্বর ধরে ধরে যাচাই করার প্রয়োজন রয়েছে। প্রথম পর্বের অনুসন্ধানে যে বিষয়টি সামনে এসেছিল, সেটি হলো Divine Group-এর বিভিন্ন প্রকল্পে দীর্ঘদিন ধরে গ্রাহকের অর্থ, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং রিফান্ড নিয়ে প্রশ্ন। প্রাথমিক প্রতিবেদনে ২০ কোটি টাকার বেশি refund-related issue থাকার দাবি এবং কিছু গ্রাহকের রিফান্ড দীর্ঘ সময় ধরে অনিষ্পন্ন থাকার অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে।

Divine Group-সংক্রান্ত প্রাথমিক রিপোর্টে এস এম হাবিবুর রহমানের বিভিন্ন সম্পত্তির বিপরীতে ব্যাংক ঋণ নেওয়ার তথ্যের সঙ্গে একাধিক ঋণ খেলাপির অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কয়েকটি ক্ষেত্রে ব্যাংক আইনগত ব্যবস্থা নিয়েছে এবং recovery proceedings চলার দাবিও সেখানে রয়েছে। সম্মিলিত ব্যাংক দাবির পরিমাণ ১০ কোটি টাকার বেশি হতে পারে বলে একটি প্রাথমিক অনুমানের কথা বলা হয়েছে।

তবে এটিও মনে রাখা জরুরি ব্যাংক ঋণ, ঋণখেলাপি, দেওয়ানি অর্থঋণ মামলা এবং ফৌজদারি মামলা এক বিষয় নয়। কোন মামলায় কী অভিযোগ রয়েছে এবং আদালত কী সিদ্ধান্ত দিয়েছেন তা নথি দেখে আলাদাভাবে নির্ধারণ করতে হবে।

আরও পড়ুন: ‘সাংবাদিক আবদুস সালাম সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার প্রতীক’: রিজভী

Divine Group-এর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো গ্রাহক বা প্রকল্পের অর্থ অন্যত্র ব্যবহারের অভিযোগ। প্রাথমিক ঝুঁকি মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এ বিষয়টিকে সরাসরি ‘মানি লন্ডারিং’ না বলে Potential Fund Diversion/Misuse of Customer Funds/Related-Party Transaction Risk হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং forensic verification-এর প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।

অর্থাৎ অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য শুধু মুখের কথা বা বাজারের গুঞ্জন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন হবে ব্যাংক স্টেটমেন্ট, গ্রাহকের পেমেন্ট রেকর্ড, প্রকল্পের হিসাব, জমি কেনার দলিল, নির্মাণ ব্যয়, রিফান্ডের হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বা প্রতিষ্ঠানের কাছে অর্থ স্থানান্তরের নথি। প্রতিবেদনটির ভাষায়, গ্রাহকের টাকা থেকে শুরু করে ব্যাংক হিসাব, অর্থ স্থানান্তর, প্রাপক, ব্যয়ের উদ্দেশ্য, ভাউচার এবং শেষ পর্যন্ত প্রকৃত সুবিধাভোগী পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ অনুসরণ করতে হবে।

আরও পড়ুন:আইসিসিবিতে ৩ সেপ্টেম্বর শুরু কসমেটিকা ঢাকা ২০২৬

২০২৫ সাল থেকে Divine Purbachal City এবং Cox Holiday Inn প্রকল্পকে সামনে রেখে নতুন করে বাজারে সক্রিয় হওয়ার তথ্যও প্রাথমিক প্রতিবেদনে রয়েছে। সেখানে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত প্রায় ৫ কোটি টাকার hotel share sale এবং প্রায় ২.৫ কোটি টাকা collection হওয়ার দাবি উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে প্রকল্প উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব তথ্য ব্যাংক স্টেটমেন্ট, শেয়ার রেজিস্টার ও গ্রাহক লেজার দিয়ে যাচাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে।

এখানেই অনুসন্ধানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন পুরোনো প্রকল্পের গ্রাহক, বিনিয়োগকারী ও পাওনাদারদের দায় পরিশোধের আগে নতুন প্রকল্প বা শেয়ারের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছে কি না। এটি কোনো অপরাধের প্রমাণ নয়; তবে একটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা মূল্যায়নে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

আরও পড়ুন: আমিরাতে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি নাকচ

Cox Holiday Inn প্রকল্পটি নিয়েও দীর্ঘদিনের স্থবিরতার অভিযোগ রয়েছে। প্রাথমিক রিপোর্টে বলা হয়েছে, প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হয়ে basement ও একতলা পর্যন্ত নির্মাণের পর কাজ বন্ধ হয়ে যায় এবং প্রায় ২০২১ সাল থেকে আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত প্রকল্পটি কার্যত stalled অবস্থায় রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

যদি এই তথ্য নথিপত্রে সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে বিনিয়োগকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে প্রকল্পের বর্তমান সম্পদ কত, ইতোমধ্যে কত টাকা ব্যয় হয়েছে, বাকি নির্মাণে কত টাকা লাগবে এবং সেই অর্থের উৎস কী। Cox Holiday Inn-এর জমির মালিকানা নিয়েও প্রাথমিক রিপোর্টে প্রশ্ন রয়েছে। সেখানে কিছু জমি Divine Holdings Limited, কিছু Divine Hotel and Resort Limited-এর নামে এবং কিছু জমি খাস হতে পারে বলে তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। কিছু জমি Power of Attorney-ভিত্তিক হওয়ার সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে। প্রাথমিক ঝুঁকি মূল্যায়নে Divine Group-এর corporate governance নিয়ে board oversight, financial control, segregation of duties, project accounting, customer fund segregation, contract management, investor reporting এবং related-party transactionসহ একাধিক ক্ষেত্রে দুর্বলতার আশঙ্কা চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষ করে Managing Director-কেন্দ্রিক অতিরিক্ত আর্থিক ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ থাকায় কোম্পানির সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। একটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক নিয়ন্ত্রণে সাধারণত কে টাকা গ্রহণ করবে, কে অনুমোদন দেবে, কে ব্যয় করবে এবং কে হিসাব নিরীক্ষা করবে—এসব দায়িত্ব আলাদা থাকার কথা। সেখানে একই ব্যক্তির হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হলে governance risk তৈরি হতে পারে।

আরও পড়ুন: লংমার্চ ঘিরে সিএমপির সঙ্গে জামায়াতের মতবিনিময়

এসব অভিযোগ নিয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি মামলা হওয়া মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। আদালতের চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত কোনো ব্যক্তিকে অপরাধী বলা আইনগত ও সাংবাদিকতার দিক থেকে সমীচীন নয়। একইভাবে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকলেও তার বর্তমান অবস্থা জামিন, স্থগিতাদেশ, প্রত্যাহার বা অন্য কোনো আদালতের আদেশ যাচাই করা জরুরি। তাই এস এম হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে ৫৪টি মামলা রয়েছে এই তথ্যটি বর্তমানে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সংবাদ দিগন্ত আদালতের নথির ভিত্তিতে মামলাগুলোর প্রকৃত সংখ্যা ও বর্তমান অবস্থা যাচাই করার চেষ্টা করছে।

Divine Group-এর প্রাথমিক ঝুঁকি মূল্যায়ন প্রতিবেদনের চূড়ান্ত মতামতেও বলা হয়েছে, নতুন বিনিয়োগ বা আর্থিক সম্পর্ক স্থাপনের আগে independent forensic investigation প্রয়োজন। এজন্য forensic financial audit, land audit, legal audit, tax/VAT audit এবং project audit করার সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রাথমিক রিপোর্টে stakeholder-দের জন্যও নতুন আর্থিক সম্পর্ক স্থাপনের আগে জমির বৈধ মালিকানা, প্রকল্পের অনুমোদন, বাস্তব নির্মাণ অবস্থা, audited financial statement, customer/refund liability, ব্যাংক ও creditor position এবং customer fund-এর source ও utilization যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন: জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে সংসদে সরকার-বিরোধী দলের টানাপোড়েন ফের উত্তাপ

Divine Group নিয়ে প্রথম পর্বে উঠে এসেছিল প্রকল্পের অগ্রগতি, জমির মালিকানা, অর্থ ব্যবস্থাপনা ও করপোরেট গভর্ন্যান্সের প্রশ্ন। দ্বিতীয় পর্বে সামনে এসেছে মামলা, ব্যাংক-সংক্রান্ত বিরোধ এবং কথিত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা।


বিষয় : মামলা Divine Group প্রতারনা

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬


Divine Group ঘিরে এবার মামলার হিসাব

প্রকাশের তারিখ : ৩১ আগস্ট ২০২৬

featured Image


Divine Group-এর প্রকল্প, জমির মালিকানা, গ্রাহকের অর্থ ব্যবস্থাপনা, রিফান্ড এবং করপোরেট গভর্ন্যান্স নিয়ে প্রশ্নের পর এবার প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে থাকা মামলা ও আদালতের আদেশ নিয়েও অনুসন্ধানের দাবি উঠেছে। বিভিন্ন গ্রাহকের করা মামলার পাশাপাশি একটি ব্যাংক-সংক্রান্ত মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। সেই পরোয়ানা গুলশান থানায় পৌঁছানোর পরও কেন তা কার্যকর হয়নি এ প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে। তবে মামলার সংখ্যা, পরোয়ানার বর্তমান কার্যকারিতা এবং কোনো মামলায় আসামির জামিন বা স্থগিতাদেশ রয়েছে কি না এসব বিষয়ে আদালতের নথি ও সংশ্লিষ্ট থানার রেকর্ড দিয়ে পূর্ণাঙ্গ যাচাই জরুরি। সংবাদ দিগন্তের অনুসন্ধানেও এসব নথির সত্যতা ও বর্তমান অবস্থা যাচাইয়ের চেষ্টা চলছে। গুলশানের মত এমন একটি এলাকায় প্রতারনার ফাঁদ গ্রাহকের টাকা লুটেপুটে খাচ্ছে ডিভাইন গ্রুপ।

আরও পড়ুন: গ্রাহকের অর্থ কোথায়? Divine Group-এর প্রকল্প ও সম্পদ

Divine Group-এর ওপর করা প্রাথমিক ঝুঁকি মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক স্বচ্ছতা, গ্রাহকের রিফান্ড, ব্যাংক দায়, জমির মালিকানা, কর-ভ্যাট ও করপোরেট গভর্ন্যান্স নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তোলা হয়েছে। প্রতিবেদনে SM Habibur Rahman-এর বিরুদ্ধে ব্যাংক ঋণ খেলাপি, আইনগত পদক্ষেপ এবং ব্যাংকগুলোর recovery চেষ্টার অভিযোগের কথাও উল্লেখ রয়েছে। তবে ওই রিপোর্টও এসব অভিযোগকে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে উপস্থাপন না করে ব্যাংক নথি, আদালতের রেকর্ড ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রের মাধ্যমে যাচাইয়ের কথা বলেছে।

আরও পড়ুন: অপসাংবাদিকতার তাণ্ডব: মূলধারা ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বড় সংকট

অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, One Bank-এর একটি মামলায় এস এম হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে এবং ওই পরোয়ানা গুলশান থানায় পাঠানো হয়েছে। কিন্তু পরোয়ানা থানায় পৌঁছানোর পর সেটি কার্যকর হয়েছে কি না, হলে কখন হয়েছে, না হলে তার কারণ কী এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো থানায় আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা পৌঁছালে সেটির কার্যকর করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্ব থাকে। তবে কোনো আসামির বিরুদ্ধে পরোয়ানা থাকলেই তিনি গ্রেপ্তারযোগ্য অবস্থায় আছেন এমন সরল সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে পরোয়ানার সর্বশেষ অবস্থা, জামিন, স্থগিতাদেশ, প্রত্যাহার বা অন্য কোনো আদালতের আদেশ আছে কি না তা যাচাই করা প্রয়োজন। সুতরাং এখানে মূল অনুসন্ধানের বিষয় শুধু ‘ওয়ারেন্ট আছে কি না’ নয়; বরং ওয়ারেন্টটি বর্তমানে কার্যকর কি না এবং থাকলে সেটি বাস্তবায়নে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে

আরও পড়ুন: চোরাচালান-মাদকপাচার ও সীমান্ত হত্যা বন্ধে বিজিবিকে রাষ্ট্রপতির নির্দেশ

এদিকে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, এস এম হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আদালতে মোট ৫৪টি মামলা রয়েছে। তবে সংবাদ দিগন্তের হাতে এই মুহূর্তে ৫৪টি মামলার পূর্ণাঙ্গ মামলানম্বর, আদালতের নাম, মামলার ধারা, বাদীর পরিচয় এবং বর্তমান অবস্থার সমন্বিত তালিকা নেই।

ফলে ৫৪টি মামলাকে নিশ্চিত সংখ্যা হিসেবে প্রকাশের আগে আদালতের নথি দিয়ে তা যাচাই করা জরুরি। কারণ একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিভিন্ন পর্যায়ের মামলা, আপিল, রিভিশন বা আর্থিক বিরোধের মামলা থাকতে পারে; আবার কোনো মামলা নিষ্পত্তি, খারিজ, স্থগিত কিংবা জামিনের আওতায়ও থাকতে পারে।

এ কারণে সংবাদ দিগন্তের অনুসন্ধানের পরবর্তী ধাপে মামলার নম্বর ধরে ধরে যাচাই করার প্রয়োজন রয়েছে। প্রথম পর্বের অনুসন্ধানে যে বিষয়টি সামনে এসেছিল, সেটি হলো Divine Group-এর বিভিন্ন প্রকল্পে দীর্ঘদিন ধরে গ্রাহকের অর্থ, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং রিফান্ড নিয়ে প্রশ্ন। প্রাথমিক প্রতিবেদনে ২০ কোটি টাকার বেশি refund-related issue থাকার দাবি এবং কিছু গ্রাহকের রিফান্ড দীর্ঘ সময় ধরে অনিষ্পন্ন থাকার অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে।

Divine Group-সংক্রান্ত প্রাথমিক রিপোর্টে এস এম হাবিবুর রহমানের বিভিন্ন সম্পত্তির বিপরীতে ব্যাংক ঋণ নেওয়ার তথ্যের সঙ্গে একাধিক ঋণ খেলাপির অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কয়েকটি ক্ষেত্রে ব্যাংক আইনগত ব্যবস্থা নিয়েছে এবং recovery proceedings চলার দাবিও সেখানে রয়েছে। সম্মিলিত ব্যাংক দাবির পরিমাণ ১০ কোটি টাকার বেশি হতে পারে বলে একটি প্রাথমিক অনুমানের কথা বলা হয়েছে।

তবে এটিও মনে রাখা জরুরি ব্যাংক ঋণ, ঋণখেলাপি, দেওয়ানি অর্থঋণ মামলা এবং ফৌজদারি মামলা এক বিষয় নয়। কোন মামলায় কী অভিযোগ রয়েছে এবং আদালত কী সিদ্ধান্ত দিয়েছেন তা নথি দেখে আলাদাভাবে নির্ধারণ করতে হবে।

আরও পড়ুন: ‘সাংবাদিক আবদুস সালাম সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার প্রতীক’: রিজভী

Divine Group-এর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো গ্রাহক বা প্রকল্পের অর্থ অন্যত্র ব্যবহারের অভিযোগ। প্রাথমিক ঝুঁকি মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এ বিষয়টিকে সরাসরি ‘মানি লন্ডারিং’ না বলে Potential Fund Diversion/Misuse of Customer Funds/Related-Party Transaction Risk হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং forensic verification-এর প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।

অর্থাৎ অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য শুধু মুখের কথা বা বাজারের গুঞ্জন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন হবে ব্যাংক স্টেটমেন্ট, গ্রাহকের পেমেন্ট রেকর্ড, প্রকল্পের হিসাব, জমি কেনার দলিল, নির্মাণ ব্যয়, রিফান্ডের হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বা প্রতিষ্ঠানের কাছে অর্থ স্থানান্তরের নথি। প্রতিবেদনটির ভাষায়, গ্রাহকের টাকা থেকে শুরু করে ব্যাংক হিসাব, অর্থ স্থানান্তর, প্রাপক, ব্যয়ের উদ্দেশ্য, ভাউচার এবং শেষ পর্যন্ত প্রকৃত সুবিধাভোগী পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ অনুসরণ করতে হবে।

আরও পড়ুন:আইসিসিবিতে ৩ সেপ্টেম্বর শুরু কসমেটিকা ঢাকা ২০২৬

২০২৫ সাল থেকে Divine Purbachal City এবং Cox Holiday Inn প্রকল্পকে সামনে রেখে নতুন করে বাজারে সক্রিয় হওয়ার তথ্যও প্রাথমিক প্রতিবেদনে রয়েছে। সেখানে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত প্রায় ৫ কোটি টাকার hotel share sale এবং প্রায় ২.৫ কোটি টাকা collection হওয়ার দাবি উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে প্রকল্প উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব তথ্য ব্যাংক স্টেটমেন্ট, শেয়ার রেজিস্টার ও গ্রাহক লেজার দিয়ে যাচাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে।

এখানেই অনুসন্ধানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন পুরোনো প্রকল্পের গ্রাহক, বিনিয়োগকারী ও পাওনাদারদের দায় পরিশোধের আগে নতুন প্রকল্প বা শেয়ারের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছে কি না। এটি কোনো অপরাধের প্রমাণ নয়; তবে একটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা মূল্যায়নে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

আরও পড়ুন: আমিরাতে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি নাকচ

Cox Holiday Inn প্রকল্পটি নিয়েও দীর্ঘদিনের স্থবিরতার অভিযোগ রয়েছে। প্রাথমিক রিপোর্টে বলা হয়েছে, প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হয়ে basement ও একতলা পর্যন্ত নির্মাণের পর কাজ বন্ধ হয়ে যায় এবং প্রায় ২০২১ সাল থেকে আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত প্রকল্পটি কার্যত stalled অবস্থায় রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

যদি এই তথ্য নথিপত্রে সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে বিনিয়োগকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে প্রকল্পের বর্তমান সম্পদ কত, ইতোমধ্যে কত টাকা ব্যয় হয়েছে, বাকি নির্মাণে কত টাকা লাগবে এবং সেই অর্থের উৎস কী। Cox Holiday Inn-এর জমির মালিকানা নিয়েও প্রাথমিক রিপোর্টে প্রশ্ন রয়েছে। সেখানে কিছু জমি Divine Holdings Limited, কিছু Divine Hotel and Resort Limited-এর নামে এবং কিছু জমি খাস হতে পারে বলে তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। কিছু জমি Power of Attorney-ভিত্তিক হওয়ার সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে। প্রাথমিক ঝুঁকি মূল্যায়নে Divine Group-এর corporate governance নিয়ে board oversight, financial control, segregation of duties, project accounting, customer fund segregation, contract management, investor reporting এবং related-party transactionসহ একাধিক ক্ষেত্রে দুর্বলতার আশঙ্কা চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষ করে Managing Director-কেন্দ্রিক অতিরিক্ত আর্থিক ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ থাকায় কোম্পানির সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। একটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক নিয়ন্ত্রণে সাধারণত কে টাকা গ্রহণ করবে, কে অনুমোদন দেবে, কে ব্যয় করবে এবং কে হিসাব নিরীক্ষা করবে—এসব দায়িত্ব আলাদা থাকার কথা। সেখানে একই ব্যক্তির হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হলে governance risk তৈরি হতে পারে।

আরও পড়ুন: লংমার্চ ঘিরে সিএমপির সঙ্গে জামায়াতের মতবিনিময়

এসব অভিযোগ নিয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি মামলা হওয়া মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। আদালতের চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত কোনো ব্যক্তিকে অপরাধী বলা আইনগত ও সাংবাদিকতার দিক থেকে সমীচীন নয়। একইভাবে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকলেও তার বর্তমান অবস্থা জামিন, স্থগিতাদেশ, প্রত্যাহার বা অন্য কোনো আদালতের আদেশ যাচাই করা জরুরি। তাই এস এম হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে ৫৪টি মামলা রয়েছে এই তথ্যটি বর্তমানে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সংবাদ দিগন্ত আদালতের নথির ভিত্তিতে মামলাগুলোর প্রকৃত সংখ্যা ও বর্তমান অবস্থা যাচাই করার চেষ্টা করছে।

Divine Group-এর প্রাথমিক ঝুঁকি মূল্যায়ন প্রতিবেদনের চূড়ান্ত মতামতেও বলা হয়েছে, নতুন বিনিয়োগ বা আর্থিক সম্পর্ক স্থাপনের আগে independent forensic investigation প্রয়োজন। এজন্য forensic financial audit, land audit, legal audit, tax/VAT audit এবং project audit করার সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রাথমিক রিপোর্টে stakeholder-দের জন্যও নতুন আর্থিক সম্পর্ক স্থাপনের আগে জমির বৈধ মালিকানা, প্রকল্পের অনুমোদন, বাস্তব নির্মাণ অবস্থা, audited financial statement, customer/refund liability, ব্যাংক ও creditor position এবং customer fund-এর source ও utilization যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন: জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে সংসদে সরকার-বিরোধী দলের টানাপোড়েন ফের উত্তাপ

Divine Group নিয়ে প্রথম পর্বে উঠে এসেছিল প্রকল্পের অগ্রগতি, জমির মালিকানা, অর্থ ব্যবস্থাপনা ও করপোরেট গভর্ন্যান্সের প্রশ্ন। দ্বিতীয় পর্বে সামনে এসেছে মামলা, ব্যাংক-সংক্রান্ত বিরোধ এবং কথিত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা।



দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

সম্পাদক ও প্রকাশক: এ বি এম মনিরুজ্জামান 
নির্বাহী সম্পাদক: রিপন রুদ্র
যুগ্ম সম্পাদক: জাকিয়া সুলতানা (লাভলী)

কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক সংবাদ দিগন্ত । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত