দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

বনানীর আবাসিক ভবনে স্পা-গেস্ট হাউজ এখন অন্ধকার জগৎ

বনানীর আবাসিক ভবনে স্পা-গেস্ট হাউজ এখন অন্ধকার জগৎ
সেলুন ও স্পা সেন্টারকে ঘিরে অনৈতিক কর্মকাণ্ড, মাদক সরবরাহ

রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানীতে আবাসিক ভবনকে কেন্দ্র করে পরিচালিত বিভিন্ন ব্যবসা ও গেস্ট হাউজের কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বনানীর ২৭ নং রোডের ৬৫ নং বাড়ির ‘করিম ভিলা’ নামের একটি আবাসিক ভবনে পরিচালিত কয়েকটি পার্লার, সেলুন ও স্পা সেন্টারকে ঘিরে অনৈতিক কর্মকাণ্ড, মাদক সরবরাহ এবং কথিত দালালচক্রের তৎপরতার অভিযোগের পাশাপাশি ডেল্টা ডালিয়া নামের একটি বহুতল ভবনের ষষ্ঠ তলায় পরিচালিত ‘লাক্সারি’ গেস্ট হাউজ নিয়েও উঠেছে গুরুতর অভিযোগ।

আরও পড়ুন: গুলশান ২৬-এ কথিত গেস্ট হাউস সিন্ডিকেটের রহস্য

স্থানীয় বাসিন্দা, অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং সাংবাদিকদের মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে এসব অভিযোগের বিভিন্ন দিক সামনে এসেছে। তবে অনুসন্ধানে পাওয়া প্রতিটি অভিযোগ স্বাধীনভাবে এবং আইনগতভাবে চূড়ান্তভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে না দেখে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং দায়িত্বশীল নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বের করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

সাংবাদিকদের অনুসন্ধানে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে দুটি বিষয় আবাসিক ভবনে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার বৈধতা এবং এসব প্রতিষ্ঠানে আগত ব্যক্তিদের পরিচয় ও কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা। স্থানীয়দের প্রশ্ন, আবাসিক ভবনে যদি বৈধ ব্যবসা পরিচালিত হয়ে থাকে, তাহলে তার ট্রেড লাইসেন্স, ভবনের ব্যবহার অনুমোদন, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, কর্মী গ্রাহকের নিরাপত্তা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অনুমোদন কতটা সঠিকভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে?

আরও পড়ুন: বনানীতে শৈশবের স্পা সেন্টার ঘিরে নারী ও দালাল সিন্ডিকেট

বনানীর ‘করিম ভিলা’ নামের আবাসিক ভবনের কয়েকটি ফ্ল্যাটে দীর্ঘদিন ধরে বিউটি পার্লার, সেলুন ও স্পা-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন না থাকলেও অভিযোগ উঠেছে, কিছু প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের আড়ালে ভিন্ন ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতে পারে।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, দিনের তুলনায় সন্ধ্যার পর ভবনটিতে অপরিচিত নারী-পুরুষের চলাচল বেড়ে যায়। গভীর রাত পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যক্তির যাতায়াত নিয়ে তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি, কোনো ব্যক্তিগত ব্যবসা পরিচালনায় আপত্তি না থাকলেও আবাসিক ভবনের পরিবেশ, নিরাপত্তা এবং অন্য বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা যাতে ব্যাহত না হয়, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।

অভিযোগ রয়েছে, কথিত কিছু মধ্যস্থতাকারী বা দালালের মাধ্যমে নির্দিষ্ট গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। পরে তাদের বিভিন্ন পার্লার, সেলুন কিংবা নির্দিষ্ট ফ্ল্যাটে নেওয়া হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মোবাইল ফোন ব্যবহার করে যোগাযোগ করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল নথি বা আইনগতভাবে যাচাইকৃত তথ্য প্রতিবেদকের হাতে পাওয়া যায়নি।

আরও পড়ুন: চট্রগ্রাম গোয়ালপাড়ায় মাদক সম্রাজ্ঞী "আকলিমার" মাদকের হাট

মাদকদ্রব্য সরবরাহের অভিযোগও উঠেছে করিম ভিলাকে ঘিরে। অভিযোগকারীদের কেউ কেউ দাবি করেছেন, ইয়াবা ও ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য সরবরাহের সঙ্গে কথিত একটি চক্র জড়িত থাকতে পারে। ফলে এ অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

অভিযোগ সূত্রে করিম ভিলাকে ঘিরে কথিত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সোলেমান ওরফে সাকিব এবং মাসুদ নামের দুই ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ করা হলেও স্বাধীনভাবে সেসব অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ প্রকাশের আগে তার বক্তব্য নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এ প্রতিবেদনের সময় পর্যন্ত সোলেমান ওরফে সাকিব এবং মাসুদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য বা অভিযোগের বিষয়ে কোনো নথি পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে যথাযথভাবে তুলে ধরা হবে।

আরও পড়ুন: https://www.youtube.com/watch?v=p5fy5JPIYPU

অভিযোগ সূত্রে তাদের রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগাযোগ থাকার কথাও বলা হয়েছে। তবে এ ধরনের দাবিরও স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবের বিষয়টি অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে, প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে নয়।

অভিযোগের বিভিন্ন দিক যাচাই করতে প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধান চালানো হয়। অনুসন্ধানের সময় কথিত মাদকদ্রব্যের মূল্য নিয়ে এক ব্যক্তির সঙ্গে কথোপকথন রেকর্ড করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। কথোপকথনের প্রেক্ষাপট, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয়, আর্থিক লেনদেন এবং কথিত মাদকদ্রব্যের অস্তিত্ব আইনগতভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। তাই অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে উপস্থাপন করে প্রয়োজনীয় তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।

আরও পড়ুন: https://www.youtube.com/shorts/_rE9ZWrEISU

করিম ভিলার ব্যবস্থাপকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি বলে জানা গেছে। ফলে ভবন কর্তৃপক্ষের অবস্থান এই প্রতিবেদনে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা সম্ভব হয়নি। তবে ভবন কর্তৃপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিক-কর্তৃপক্ষ পরবর্তীতে কোনো বক্তব্য, নথি বা ব্যাখ্যা দিলে তা গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।

এদিকে করিম ভিলাকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের পাশাপাশি বনানীর ডেল্টা ডালিয়া নামের একটি বহুতল ভবনের ষষ্ঠ তলায় পরিচালিত ‘লাক্সারি’ গেস্ট হাউজ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সাংবাদিকদের অনুসন্ধানে গেস্ট হাউজটির কার্যক্রম, অতিথি নিবন্ধন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ব্যবসায়িক বৈধতা নিয়ে একাধিক বিষয় সামনে আসে। সরেজমিনে গেস্ট হাউজটির বাইরে উল্লেখযোগ্য কোনো স্পষ্ট সাইনবোর্ড চোখে পড়েনি বলে প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। ষষ্ঠ তলায় গেস্ট হাউজ পরিচালনার কিছু নির্দেশনা দেখা গেলেও অতিথিদের পরিচয় যাচাই ও নিবন্ধন সংক্রান্ত নথি সাংবাদিকদের সামনে উপস্থাপন করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানের সময় কয়েকজন অবস্থানরত অতিথির সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হয়। তাদের কয়েকজন দাবি করেন, কক্ষ নেওয়ার সময় জাতীয় পরিচয়পত্র জমা বা পরিচয় নিবন্ধনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। তবে এটি গেস্ট হাউজটির নিয়মিত নীতি কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ কারণে গেস্ট হাউজটির অতিথি নিবন্ধন খাতা, পরিচয়পত্র সংরক্ষণের তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ এবং ব্যবসা পরিচালনার বৈধ কাগজপত্র যাচাই করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আরও পড়ুন: প্রভার পোস্টে আলোড়ন

অনুসন্ধানের সময় একটি কক্ষে এক তরুণী নারী ও চল্লিশোর্ধ্ব এক ব্যক্তিকে মাদক সেবনের সরঞ্জামসহ দেখা গেছে বলে প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। ওই কক্ষে কিছু ট্যাবলেট সদৃশ বস্তু দেখা যায় বলেও জানানো হয়েছে। তবে সেগুলো আদৌ মাদকদ্রব্য কি না, ঘটনাস্থলে বৈজ্ঞানিকভাবে নিশ্চিত করার সুযোগ ছিল না। 

অন্য একটি কক্ষে একজন নারী ও এনামুল হক নামে পরিচয় দেওয়া এক পুরুষকে অবস্থান করতে দেখা যায়। তারা স্বামী-স্ত্রী নন বলে স্বীকার করেছেন এমন দাবি প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে করা হয়েছে। তবে প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ একই গেস্ট হাউজের কক্ষে অবস্থান করলেই তা কোনো অপরাধের প্রমাণ নয়। এখানে মূল প্রশ্ন হলো গেস্ট হাউজ কর্তৃপক্ষ অতিথিদের পরিচয় যাচাই করেছে কি না এবং আইন ও ব্যবসায়িক বিধিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করছে কি না।

সাংবাদিকরা গেস্ট হাউজটির অন্যান্য কক্ষ ও কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করলে আল-আমিন নামের এক ব্যক্তি নিজেকে প্রতিষ্ঠানের মালিক হিসেবে পরিচয় দিয়ে অনুসন্ধানে বাধা দেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় করেন এবং সংবাদ প্রকাশ নিয়ে আপত্তি জানান। অনুসন্ধানের সময় তিনি স্থানীয় বিএনপি নেতা আনোয়ার হোসেন, সুজন ও শুভসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে তাদের কথিত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার দাবি করেন।

ডেল্টা ডালিয়া ভবনের কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, গত কয়েক বছর ধরে ভবনে অপরিচিত মানুষের যাতায়াত বেড়েছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় বিভিন্ন ব্যক্তির চলাচল নিয়ে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে বলে তারা দাবি করেন। আবার একজন বাসিন্দার ভাষ্য, “আমরা কারও বৈধ ব্যবসার বিরুদ্ধে নই। কিন্তু আবাসিক ভবনে এমন কোনো কর্মকাণ্ড চললে, যার কারণে বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়, তাহলে প্রশাসনের বিষয়টি দেখা উচিত। গেস্ট হাউজ এবং করিম ভিলাকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষ তদন্তই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগটি খতিয়ে দেখে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন বলে প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তবে পুলিশ চাইলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স, ব্যবসার অনুমোদন, অতিথি নিবন্ধন খাতা, সিসিটিভি ফুটেজ, কর্মচারীদের পরিচয় এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য নথি যাচাই করতে পারে। শুধু তাই নয় এসব আপরাধীদের যেকোন মুহুর্তে দমন করতে পারে। 

আরও পড়ুন: দারুসসালামে অনুমোদনহীন অনৈতিক কর্মকান্ডে জসিম ও হারুনের দাপট

কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শুধু অভিযোগ উঠলেই সেটিকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা সাংবাদিকতার নীতি নয়। একইভাবে ব্যবসার আড়ালে যদি সত্যিই মাদক সরবরাহ, মানবপাচার, প্রতারণা কিংবা অন্য কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়, তাহলে সেটিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এ কারণে করিম ভিলা ও লাক্সারি গেস্ট হাউজ দুই ক্ষেত্রেই প্রয়োজন নথি ও প্রমাণভিত্তিক তদন্ত। প্রতিষ্ঠানগুলোর লাইসেন্স বৈধ কি না, ভবনের ব্যবহার অনুমোদিত কি না, অতিথিদের পরিচয় সংরক্ষণ করা হচ্ছে কি না, সিসিটিভি সচল আছে কি না এবং কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রমাণ রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাই এখন মূল বিষয়।

সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আবাসিক ভবনে বেআইনি কোনো কার্যক্রমের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। করিম ভিলা এবং লাক্সারি গেস্ট হাউজকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের মধ্যে কিছু অভিযোগ গুরুতর হলেও এখন পর্যন্ত সবকটির আইনগত সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কোথাও মাদক পাওয়া গেছে কি না, কথিত দালালচক্র সত্যিই সক্রিয় কি না, কোনো ব্যবসা অনুমোদনহীন কি না কিংবা কোনো ব্যক্তি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত কি না এসব প্রশ্নের উত্তর নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

আরও পড়ুন: বনানীতে শহিদের অবৈধ স্পা সেন্টার ঘিরে অন্ধকার জগৎ

অন্যদিকে কোনো অভিযোগ সত্য হলে শুধু তদন্তের আশ্বাসে বিষয়টি থেমে থাকা উচিত নয়। প্রমাণের ভিত্তিতে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি। কারণ বনানীর মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ দীর্ঘদিন অনিষ্পন্ন থাকলে তার প্রভাব আশপাশের বাসিন্দাদের ওপর পড়তে পারে। সবশেষে, করিম ভিলা ও ডেল্টা ডালিয়ার ‘লাক্সারি’ গেস্ট হাউজকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ এখন তদন্তের দাবি রাখে। সাংবাদিকদের অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যকে চূড়ান্ত রায় হিসেবে নয়, বরং তদন্তের সূত্র হিসেবে দেখা প্রয়োজন। অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনা যেমন জরুরি, তেমনি অভিযোগ অসত্য হলে অভিযুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানেরও দায়মুক্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বিষয় : স্পা রাজধানী অপরাধ বনানী গেস্ট হাউজ

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬


বনানীর আবাসিক ভবনে স্পা-গেস্ট হাউজ এখন অন্ধকার জগৎ

প্রকাশের তারিখ : ১৫ আগস্ট ২০২৬

featured Image

রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানীতে আবাসিক ভবনকে কেন্দ্র করে পরিচালিত বিভিন্ন ব্যবসা ও গেস্ট হাউজের কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বনানীর ২৭ নং রোডের ৬৫ নং বাড়ির ‘করিম ভিলা’ নামের একটি আবাসিক ভবনে পরিচালিত কয়েকটি পার্লার, সেলুন ও স্পা সেন্টারকে ঘিরে অনৈতিক কর্মকাণ্ড, মাদক সরবরাহ এবং কথিত দালালচক্রের তৎপরতার অভিযোগের পাশাপাশি ডেল্টা ডালিয়া নামের একটি বহুতল ভবনের ষষ্ঠ তলায় পরিচালিত ‘লাক্সারি’ গেস্ট হাউজ নিয়েও উঠেছে গুরুতর অভিযোগ।

আরও পড়ুন: গুলশান ২৬-এ কথিত গেস্ট হাউস সিন্ডিকেটের রহস্য

স্থানীয় বাসিন্দা, অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং সাংবাদিকদের মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে এসব অভিযোগের বিভিন্ন দিক সামনে এসেছে। তবে অনুসন্ধানে পাওয়া প্রতিটি অভিযোগ স্বাধীনভাবে এবং আইনগতভাবে চূড়ান্তভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে না দেখে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং দায়িত্বশীল নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বের করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

সাংবাদিকদের অনুসন্ধানে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে দুটি বিষয় আবাসিক ভবনে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার বৈধতা এবং এসব প্রতিষ্ঠানে আগত ব্যক্তিদের পরিচয় ও কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা। স্থানীয়দের প্রশ্ন, আবাসিক ভবনে যদি বৈধ ব্যবসা পরিচালিত হয়ে থাকে, তাহলে তার ট্রেড লাইসেন্স, ভবনের ব্যবহার অনুমোদন, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, কর্মী গ্রাহকের নিরাপত্তা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অনুমোদন কতটা সঠিকভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে?

আরও পড়ুন: বনানীতে শৈশবের স্পা সেন্টার ঘিরে নারী ও দালাল সিন্ডিকেট

বনানীর ‘করিম ভিলা’ নামের আবাসিক ভবনের কয়েকটি ফ্ল্যাটে দীর্ঘদিন ধরে বিউটি পার্লার, সেলুন ও স্পা-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন না থাকলেও অভিযোগ উঠেছে, কিছু প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের আড়ালে ভিন্ন ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতে পারে।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, দিনের তুলনায় সন্ধ্যার পর ভবনটিতে অপরিচিত নারী-পুরুষের চলাচল বেড়ে যায়। গভীর রাত পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যক্তির যাতায়াত নিয়ে তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি, কোনো ব্যক্তিগত ব্যবসা পরিচালনায় আপত্তি না থাকলেও আবাসিক ভবনের পরিবেশ, নিরাপত্তা এবং অন্য বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা যাতে ব্যাহত না হয়, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।

অভিযোগ রয়েছে, কথিত কিছু মধ্যস্থতাকারী বা দালালের মাধ্যমে নির্দিষ্ট গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। পরে তাদের বিভিন্ন পার্লার, সেলুন কিংবা নির্দিষ্ট ফ্ল্যাটে নেওয়া হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মোবাইল ফোন ব্যবহার করে যোগাযোগ করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল নথি বা আইনগতভাবে যাচাইকৃত তথ্য প্রতিবেদকের হাতে পাওয়া যায়নি।

আরও পড়ুন: চট্রগ্রাম গোয়ালপাড়ায় মাদক সম্রাজ্ঞী "আকলিমার" মাদকের হাট

মাদকদ্রব্য সরবরাহের অভিযোগও উঠেছে করিম ভিলাকে ঘিরে। অভিযোগকারীদের কেউ কেউ দাবি করেছেন, ইয়াবা ও ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য সরবরাহের সঙ্গে কথিত একটি চক্র জড়িত থাকতে পারে। ফলে এ অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

অভিযোগ সূত্রে করিম ভিলাকে ঘিরে কথিত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সোলেমান ওরফে সাকিব এবং মাসুদ নামের দুই ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ করা হলেও স্বাধীনভাবে সেসব অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ প্রকাশের আগে তার বক্তব্য নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এ প্রতিবেদনের সময় পর্যন্ত সোলেমান ওরফে সাকিব এবং মাসুদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য বা অভিযোগের বিষয়ে কোনো নথি পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে যথাযথভাবে তুলে ধরা হবে।

আরও পড়ুন: https://www.youtube.com/watch?v=p5fy5JPIYPU

অভিযোগ সূত্রে তাদের রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগাযোগ থাকার কথাও বলা হয়েছে। তবে এ ধরনের দাবিরও স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবের বিষয়টি অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে, প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে নয়।

অভিযোগের বিভিন্ন দিক যাচাই করতে প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধান চালানো হয়। অনুসন্ধানের সময় কথিত মাদকদ্রব্যের মূল্য নিয়ে এক ব্যক্তির সঙ্গে কথোপকথন রেকর্ড করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। কথোপকথনের প্রেক্ষাপট, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয়, আর্থিক লেনদেন এবং কথিত মাদকদ্রব্যের অস্তিত্ব আইনগতভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। তাই অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে উপস্থাপন করে প্রয়োজনীয় তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।

আরও পড়ুন: https://www.youtube.com/shorts/_rE9ZWrEISU

করিম ভিলার ব্যবস্থাপকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি বলে জানা গেছে। ফলে ভবন কর্তৃপক্ষের অবস্থান এই প্রতিবেদনে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা সম্ভব হয়নি। তবে ভবন কর্তৃপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিক-কর্তৃপক্ষ পরবর্তীতে কোনো বক্তব্য, নথি বা ব্যাখ্যা দিলে তা গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।

এদিকে করিম ভিলাকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের পাশাপাশি বনানীর ডেল্টা ডালিয়া নামের একটি বহুতল ভবনের ষষ্ঠ তলায় পরিচালিত ‘লাক্সারি’ গেস্ট হাউজ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সাংবাদিকদের অনুসন্ধানে গেস্ট হাউজটির কার্যক্রম, অতিথি নিবন্ধন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ব্যবসায়িক বৈধতা নিয়ে একাধিক বিষয় সামনে আসে। সরেজমিনে গেস্ট হাউজটির বাইরে উল্লেখযোগ্য কোনো স্পষ্ট সাইনবোর্ড চোখে পড়েনি বলে প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। ষষ্ঠ তলায় গেস্ট হাউজ পরিচালনার কিছু নির্দেশনা দেখা গেলেও অতিথিদের পরিচয় যাচাই ও নিবন্ধন সংক্রান্ত নথি সাংবাদিকদের সামনে উপস্থাপন করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানের সময় কয়েকজন অবস্থানরত অতিথির সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হয়। তাদের কয়েকজন দাবি করেন, কক্ষ নেওয়ার সময় জাতীয় পরিচয়পত্র জমা বা পরিচয় নিবন্ধনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। তবে এটি গেস্ট হাউজটির নিয়মিত নীতি কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ কারণে গেস্ট হাউজটির অতিথি নিবন্ধন খাতা, পরিচয়পত্র সংরক্ষণের তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ এবং ব্যবসা পরিচালনার বৈধ কাগজপত্র যাচাই করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আরও পড়ুন: প্রভার পোস্টে আলোড়ন

অনুসন্ধানের সময় একটি কক্ষে এক তরুণী নারী ও চল্লিশোর্ধ্ব এক ব্যক্তিকে মাদক সেবনের সরঞ্জামসহ দেখা গেছে বলে প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। ওই কক্ষে কিছু ট্যাবলেট সদৃশ বস্তু দেখা যায় বলেও জানানো হয়েছে। তবে সেগুলো আদৌ মাদকদ্রব্য কি না, ঘটনাস্থলে বৈজ্ঞানিকভাবে নিশ্চিত করার সুযোগ ছিল না। 

অন্য একটি কক্ষে একজন নারী ও এনামুল হক নামে পরিচয় দেওয়া এক পুরুষকে অবস্থান করতে দেখা যায়। তারা স্বামী-স্ত্রী নন বলে স্বীকার করেছেন এমন দাবি প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে করা হয়েছে। তবে প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ একই গেস্ট হাউজের কক্ষে অবস্থান করলেই তা কোনো অপরাধের প্রমাণ নয়। এখানে মূল প্রশ্ন হলো গেস্ট হাউজ কর্তৃপক্ষ অতিথিদের পরিচয় যাচাই করেছে কি না এবং আইন ও ব্যবসায়িক বিধিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করছে কি না।

সাংবাদিকরা গেস্ট হাউজটির অন্যান্য কক্ষ ও কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করলে আল-আমিন নামের এক ব্যক্তি নিজেকে প্রতিষ্ঠানের মালিক হিসেবে পরিচয় দিয়ে অনুসন্ধানে বাধা দেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় করেন এবং সংবাদ প্রকাশ নিয়ে আপত্তি জানান। অনুসন্ধানের সময় তিনি স্থানীয় বিএনপি নেতা আনোয়ার হোসেন, সুজন ও শুভসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে তাদের কথিত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার দাবি করেন।

ডেল্টা ডালিয়া ভবনের কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, গত কয়েক বছর ধরে ভবনে অপরিচিত মানুষের যাতায়াত বেড়েছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় বিভিন্ন ব্যক্তির চলাচল নিয়ে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে বলে তারা দাবি করেন। আবার একজন বাসিন্দার ভাষ্য, “আমরা কারও বৈধ ব্যবসার বিরুদ্ধে নই। কিন্তু আবাসিক ভবনে এমন কোনো কর্মকাণ্ড চললে, যার কারণে বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়, তাহলে প্রশাসনের বিষয়টি দেখা উচিত। গেস্ট হাউজ এবং করিম ভিলাকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষ তদন্তই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগটি খতিয়ে দেখে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন বলে প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তবে পুলিশ চাইলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স, ব্যবসার অনুমোদন, অতিথি নিবন্ধন খাতা, সিসিটিভি ফুটেজ, কর্মচারীদের পরিচয় এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য নথি যাচাই করতে পারে। শুধু তাই নয় এসব আপরাধীদের যেকোন মুহুর্তে দমন করতে পারে। 

আরও পড়ুন: দারুসসালামে অনুমোদনহীন অনৈতিক কর্মকান্ডে জসিম ও হারুনের দাপট

কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শুধু অভিযোগ উঠলেই সেটিকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা সাংবাদিকতার নীতি নয়। একইভাবে ব্যবসার আড়ালে যদি সত্যিই মাদক সরবরাহ, মানবপাচার, প্রতারণা কিংবা অন্য কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়, তাহলে সেটিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এ কারণে করিম ভিলা ও লাক্সারি গেস্ট হাউজ দুই ক্ষেত্রেই প্রয়োজন নথি ও প্রমাণভিত্তিক তদন্ত। প্রতিষ্ঠানগুলোর লাইসেন্স বৈধ কি না, ভবনের ব্যবহার অনুমোদিত কি না, অতিথিদের পরিচয় সংরক্ষণ করা হচ্ছে কি না, সিসিটিভি সচল আছে কি না এবং কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রমাণ রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাই এখন মূল বিষয়।

সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আবাসিক ভবনে বেআইনি কোনো কার্যক্রমের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। করিম ভিলা এবং লাক্সারি গেস্ট হাউজকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের মধ্যে কিছু অভিযোগ গুরুতর হলেও এখন পর্যন্ত সবকটির আইনগত সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কোথাও মাদক পাওয়া গেছে কি না, কথিত দালালচক্র সত্যিই সক্রিয় কি না, কোনো ব্যবসা অনুমোদনহীন কি না কিংবা কোনো ব্যক্তি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত কি না এসব প্রশ্নের উত্তর নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

আরও পড়ুন: বনানীতে শহিদের অবৈধ স্পা সেন্টার ঘিরে অন্ধকার জগৎ

অন্যদিকে কোনো অভিযোগ সত্য হলে শুধু তদন্তের আশ্বাসে বিষয়টি থেমে থাকা উচিত নয়। প্রমাণের ভিত্তিতে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি। কারণ বনানীর মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ দীর্ঘদিন অনিষ্পন্ন থাকলে তার প্রভাব আশপাশের বাসিন্দাদের ওপর পড়তে পারে। সবশেষে, করিম ভিলা ও ডেল্টা ডালিয়ার ‘লাক্সারি’ গেস্ট হাউজকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ এখন তদন্তের দাবি রাখে। সাংবাদিকদের অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যকে চূড়ান্ত রায় হিসেবে নয়, বরং তদন্তের সূত্র হিসেবে দেখা প্রয়োজন। অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনা যেমন জরুরি, তেমনি অভিযোগ অসত্য হলে অভিযুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানেরও দায়মুক্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।



দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

সম্পাদক ও প্রকাশক: এ বি এম মনিরুজ্জামান 
নির্বাহী সম্পাদক: রিপন রুদ্র
যুগ্ম সম্পাদক: জাকিয়া সুলতানা (লাভলী)

কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক সংবাদ দিগন্ত । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত