রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি বিপণন প্রতিষ্ঠান মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডে (পিএলসি) নিয়োগপ্রক্রিয়া, পদোন্নতি, বদলি, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও সম্পদ অর্জনকে কেন্দ্র করে অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার (এজিএম-এমআই) মো. রাশেদুল হকের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ভুয়া সনদ ব্যবহার করে চাকরি নেওয়া, দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে বহাল থাকা, নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্যের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার এবং কোম্পানির অর্থ আত্মসাতের মতো গুরুতর অভিযোগ সামনে এনেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হলে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ অনিয়মের চিত্র এবং কথিত সিন্ডিকেটের কার্যক্রম সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা নথি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত প্রতিবেদন কিংবা অভিযুক্ত কর্মকর্তার বক্তব্য এখানে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোকে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই এবং অভিযুক্তের বক্তব্য গ্রহণের মাধ্যমে বিষয়গুলোর সত্যতা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
অভিযোগের প্রথম দিকেই রয়েছে মো. রাশেদুল হকের নিয়োগপ্রক্রিয়া ও শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন। অভিযোগকারীদের দাবি, ২০১২ সালের ১ নভেম্বর মেঘনা পেট্রোলিয়ামে যোগদানের সময় তিনি নিয়োগসংক্রান্ত কাগজপত্র ও ছাড়পত্রের ক্ষেত্রে অনিয়মের আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাঁদের অভিযোগ, নিয়োগের জন্য নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ না করেও তিনি জাল বা ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে চাকরি লাভ করেন এবং কারিগরি শাখার পদসংশ্লিষ্ট সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করেন। তথ্য অনুযায়ী, কোম্পানির তৎকালীন সার্ভিস নীতিমালা ও নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে সাধারণ শাখার সপ্তম গ্রেডের অফিসার পদে প্রথম বিভাগে স্নাতকোত্তর ডিগ্রির পাশাপাশি ন্যূনতম তিন বছরের অভিজ্ঞতার শর্ত ছিল। অন্যদিকে, কারিগরি শাখার পঞ্চম গ্রেডের পদের জন্য বিএসসি ডিগ্রির যোগ্যতা নির্ধারিত ছিল বলে দাবি করা হয়েছে। এই দুই পদের নিয়োগযোগ্যতা, গ্রেড ও দায়িত্বের মধ্যে পার্থক্য থাকায় রাশেদুল হকের নিয়োগের সময় কোন পদে কী যোগ্যতা নির্ধারিত ছিল, তিনি কোন সনদ জমা দিয়েছিলেন এবং সেসব সনদ কোন কর্তৃপক্ষ যাচাই করেছিল, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, নিয়োগপত্র, শিক্ষাগত সনদ, অভিজ্ঞতার প্রত্যয়নপত্র এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ছাড়পত্র পরীক্ষা করা প্রয়োজন। যদি নথি যাচাইয়ে সনদ জালিয়াতি বা নিয়োগবিধি লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে তা শুধু একজন কর্মকর্তার নিয়োগসংক্রান্ত অনিয়মের বিষয় থাকবে না; বরং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করবে।
রাশেদুল হকের বিরুদ্ধে ওঠা আরেকটি অভিযোগ হলো, তিনি দীর্ঘ সময় ধরে একই গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রশাসনিক বদলি ও পদায়নের প্রচলিত প্রক্রিয়া কার্যকর থাকা সত্ত্বেও তিনি দীর্ঘদিন একই জায়গায় দায়িত্বে বহাল রয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার মাধ্যমে তিনি নিজের অবস্থান শক্তিশালী করেছেন। তবে তাঁর কর্মজীবনের সুনির্দিষ্ট সময়কাল, দায়িত্ব পরিবর্তনের ইতিহাস এবং সংশ্লিষ্ট পদে থাকার প্রশাসনিক অনুমোদন যাচাই না করে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। বদলি নীতিমালা, পদায়ন আদেশ, দায়িত্ব বণ্টনের নথি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করলে বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার ফলে প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন প্রশাসনিক ও আর্থিক কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়ে থাকতে পারে। তাঁদের দাবি, এই অবস্থানের সঙ্গে অন্য কোনো অনিয়মের যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
মেঘনা পেট্রোলিয়ামের অভ্যন্তরে নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলিকে কেন্দ্র করে একটি অঘোষিত সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে রাশেদুল হকের বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিয়োগপ্রার্থী এবং পদোন্নতি ও বদলিপ্রত্যাশী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর প্রভাব বিস্তার করা হতো। যোগ্যতা ও জ্যেষ্ঠতার পরিবর্তে আর্থিক লেনদেনের ভিত্তিতে নিয়োগ কিংবা পদোন্নতির সুযোগ তৈরি করা হতো। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত কোম্পানির ডিপো থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগও সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কথিত এই অর্থ আদায়ে সম্মত না হলে বদলি বা প্রশাসনিক হয়রানির আশঙ্কা দেখানো হতো। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট লেনদেনের নথি, অর্থ প্রদানের রসিদ, ব্যাংক হিসাব, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের লিখিত অভিযোগ কিংবা প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য এখানে উপস্থাপিত হয়নি। ফলে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগের সত্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন। নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞপ্তি, মূল্যায়নপত্র, বোর্ডের কার্যবিবরণী, জ্যেষ্ঠতার তালিকা এবং অনুমোদনসংক্রান্ত নথি পরীক্ষা করা যেতে পারে। পাশাপাশি ডিপোভিত্তিক আর্থিক লেনদেন ও বদলির আদেশ পর্যালোচনা করলে অভিযোগগুলোর প্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব।
কোম্পানির অর্থ ব্যবস্থাপনাকে ঘিরেও রাশেদুল হকের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, মামলা পরিচালনার ব্যয়, দাপ্তরিক খরচ, আপ্যায়ন এবং রক্ষণাবেক্ষণের নামে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে কোম্পানির অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, কোম্পানির নামে পরিচালিত বিভিন্ন মামলার আইনি ব্যয়ের হিসাবেও অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া হয়ে থাকতে পারে। এ ছাড়া কোম্পানির বরাদ্দ করা গাড়ি ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কাজে ব্যবহার এবং সেই গাড়ির জ্বালানি ব্যয় প্রতিষ্ঠানের তহবিল থেকে পরিশোধের অভিযোগও করা হয়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় এসব অভিযোগের গুরুত্ব রয়েছে। কারণ, প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি ব্যয়ের বিপরীতে যথাযথ অনুমোদন, গ্রহণযোগ্য বিল-ভাউচার এবং নিরীক্ষাযোগ্য হিসাব থাকা প্রয়োজন। কোনো ব্যয় বাস্তবে সংঘটিত হয়েছে কি না, অর্থ নির্ধারিত খাতে ব্যবহার করা হয়েছে কি না এবং অনুমোদিত ব্যক্তিরাই ব্যয়ের সুবিধা পেয়েছেন কি না, তা নথি যাচাইয়ের মাধ্যমে নির্ধারণ করা যায়। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সময়ের হিসাববই, ভাউচার, ব্যাংক লেনদেন, আইনি পরামর্শকের বিল, মামলার নথি, গাড়ির লগবুক এবং জ্বালানি ব্যবহারের হিসাব নিরীক্ষা করা প্রয়োজন। কোনো ব্যয়ে অসংগতি পাওয়া গেলে তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের ভূমিকা আলাদাভাবে পরীক্ষা করা জরুরি।
রাশেদুল হকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো তাঁর কথিত বিপুল সম্পদ অর্জন। অভিযোগকারীদের দাবি, ভোলায় তাঁর গ্রামের বাড়িতে বিপুল অর্থ ব্যয়ে বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া নিজের ও পরিবারের সদস্যদের ব্যবহারের জন্য একাধিক দামি গাড়ি কেনা এবং স্ত্রী-সন্তানদের নামে ব্যাংকে স্থায়ী আমানত বা এফডিআর ও সরকারি সঞ্চয়পত্রে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের একাংশের দাবি, এসব সম্পদের পরিমাণ তাঁর বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা তদন্ত করা প্রয়োজন। তবে বাড়ি, গাড়ি, ব্যাংক আমানত ও সঞ্চয়পত্রের প্রকৃত পরিমাণ, মালিকানা এবং অর্থের উৎস সম্পর্কে যাচাই করা নথি এখানে নেই। তাই তাঁর বিরুদ্ধে শত কোটি টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগকে প্রমাণিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা যাচ্ছে না।
সম্পদের উৎস যাচাই করতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আয়কর রিটার্ন, বেতন-ভাতা, সম্পদ বিবরণী, জমি ও বাড়ির দলিল, গাড়ির নিবন্ধন, ব্যাংক হিসাব এবং বিনিয়োগের নথি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদের ক্ষেত্রে মালিকানা ও অর্থের প্রকৃত উৎস অনুসন্ধান করা যেতে পারে। কোনো সম্পদ শুধু পরিবারের সদস্যের নামে রয়েছে বলেই সেটিকে অবৈধ সম্পদ বলা যায় না। একইভাবে সম্পদের পরিমাণ বেশি হলেই দুর্নীতি প্রমাণিত হয় না। বৈধ আয়ের সঙ্গে সম্পদের অসামঞ্জস্য, অর্থের উৎস এবং সংশ্লিষ্ট লেনদেনের প্রমাণের ভিত্তিতেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
মেঘনা পেট্রোলিয়ামের একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিয়োগসংক্রান্ত জালিয়াতি, প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার, আর্থিক অনিয়ম এবং বিপুল সম্পদ অর্জনের মতো একাধিক অভিযোগ ওঠায় বিষয়গুলো নথিভিত্তিকভাবে যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের মতে, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন ও প্রতিষ্ঠানের বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে কোম্পানির অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বিভাগ, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং এখতিয়ারসম্পন্ন তদন্তকারী সংস্থা নিজ নিজ ক্ষমতার মধ্যে থেকে বিষয়গুলো পরীক্ষা করতে পারে। দুর্নীতি বা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের প্রমাণ পাওয়া গেলে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে।
তদন্তে শুধু অভিযুক্ত কর্মকর্তার ভূমিকা নয়, নিয়োগ অনুমোদনকারী, আর্থিক ব্যয় অনুমোদনকারী এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের দায়িত্বও প্রাসঙ্গিক হলে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগকারীদের বক্তব্য, নথিপত্র এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তার ব্যাখ্যা বিবেচনায় নেওয়া হলে তদন্তের নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে মো. রাশেদুল হকের বক্তব্য, মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের অগ্রগতি জানা গেলে প্রতিবেদনটি আরও পূর্ণাঙ্গ হবে। এসব বক্তব্য ছাড়া অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি প্রতিষ্ঠানের অর্থ ও প্রশাসনিক ক্ষমতা জনস্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই সেখানে নিয়োগ থেকে শুরু করে পদোন্নতি, বদলি, ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং সম্পদ অর্জন—প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। মেঘনা পেট্রোলিয়ামের এজিএম মো. রাশেদুল হকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর ক্ষেত্রেও প্রয়োজন নথিনির্ভর অনুসন্ধান, সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য গ্রহণ এবং আইনসম্মত তদন্ত। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সুনাম ও ন্যায্য অধিকার সুরক্ষিত রাখাই হবে ন্যায়সংগত প্রক্রিয়ার অংশ।

শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০২ অক্টোবর ২০২৬
রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি বিপণন প্রতিষ্ঠান মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডে (পিএলসি) নিয়োগপ্রক্রিয়া, পদোন্নতি, বদলি, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও সম্পদ অর্জনকে কেন্দ্র করে অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার (এজিএম-এমআই) মো. রাশেদুল হকের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ভুয়া সনদ ব্যবহার করে চাকরি নেওয়া, দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে বহাল থাকা, নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্যের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার এবং কোম্পানির অর্থ আত্মসাতের মতো গুরুতর অভিযোগ সামনে এনেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হলে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ অনিয়মের চিত্র এবং কথিত সিন্ডিকেটের কার্যক্রম সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা নথি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত প্রতিবেদন কিংবা অভিযুক্ত কর্মকর্তার বক্তব্য এখানে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোকে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই এবং অভিযুক্তের বক্তব্য গ্রহণের মাধ্যমে বিষয়গুলোর সত্যতা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
অভিযোগের প্রথম দিকেই রয়েছে মো. রাশেদুল হকের নিয়োগপ্রক্রিয়া ও শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন। অভিযোগকারীদের দাবি, ২০১২ সালের ১ নভেম্বর মেঘনা পেট্রোলিয়ামে যোগদানের সময় তিনি নিয়োগসংক্রান্ত কাগজপত্র ও ছাড়পত্রের ক্ষেত্রে অনিয়মের আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাঁদের অভিযোগ, নিয়োগের জন্য নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ না করেও তিনি জাল বা ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে চাকরি লাভ করেন এবং কারিগরি শাখার পদসংশ্লিষ্ট সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করেন। তথ্য অনুযায়ী, কোম্পানির তৎকালীন সার্ভিস নীতিমালা ও নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে সাধারণ শাখার সপ্তম গ্রেডের অফিসার পদে প্রথম বিভাগে স্নাতকোত্তর ডিগ্রির পাশাপাশি ন্যূনতম তিন বছরের অভিজ্ঞতার শর্ত ছিল। অন্যদিকে, কারিগরি শাখার পঞ্চম গ্রেডের পদের জন্য বিএসসি ডিগ্রির যোগ্যতা নির্ধারিত ছিল বলে দাবি করা হয়েছে। এই দুই পদের নিয়োগযোগ্যতা, গ্রেড ও দায়িত্বের মধ্যে পার্থক্য থাকায় রাশেদুল হকের নিয়োগের সময় কোন পদে কী যোগ্যতা নির্ধারিত ছিল, তিনি কোন সনদ জমা দিয়েছিলেন এবং সেসব সনদ কোন কর্তৃপক্ষ যাচাই করেছিল, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, নিয়োগপত্র, শিক্ষাগত সনদ, অভিজ্ঞতার প্রত্যয়নপত্র এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ছাড়পত্র পরীক্ষা করা প্রয়োজন। যদি নথি যাচাইয়ে সনদ জালিয়াতি বা নিয়োগবিধি লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে তা শুধু একজন কর্মকর্তার নিয়োগসংক্রান্ত অনিয়মের বিষয় থাকবে না; বরং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করবে।
রাশেদুল হকের বিরুদ্ধে ওঠা আরেকটি অভিযোগ হলো, তিনি দীর্ঘ সময় ধরে একই গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রশাসনিক বদলি ও পদায়নের প্রচলিত প্রক্রিয়া কার্যকর থাকা সত্ত্বেও তিনি দীর্ঘদিন একই জায়গায় দায়িত্বে বহাল রয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার মাধ্যমে তিনি নিজের অবস্থান শক্তিশালী করেছেন। তবে তাঁর কর্মজীবনের সুনির্দিষ্ট সময়কাল, দায়িত্ব পরিবর্তনের ইতিহাস এবং সংশ্লিষ্ট পদে থাকার প্রশাসনিক অনুমোদন যাচাই না করে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। বদলি নীতিমালা, পদায়ন আদেশ, দায়িত্ব বণ্টনের নথি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করলে বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার ফলে প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন প্রশাসনিক ও আর্থিক কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়ে থাকতে পারে। তাঁদের দাবি, এই অবস্থানের সঙ্গে অন্য কোনো অনিয়মের যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
মেঘনা পেট্রোলিয়ামের অভ্যন্তরে নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলিকে কেন্দ্র করে একটি অঘোষিত সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে রাশেদুল হকের বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিয়োগপ্রার্থী এবং পদোন্নতি ও বদলিপ্রত্যাশী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর প্রভাব বিস্তার করা হতো। যোগ্যতা ও জ্যেষ্ঠতার পরিবর্তে আর্থিক লেনদেনের ভিত্তিতে নিয়োগ কিংবা পদোন্নতির সুযোগ তৈরি করা হতো। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত কোম্পানির ডিপো থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগও সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কথিত এই অর্থ আদায়ে সম্মত না হলে বদলি বা প্রশাসনিক হয়রানির আশঙ্কা দেখানো হতো। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট লেনদেনের নথি, অর্থ প্রদানের রসিদ, ব্যাংক হিসাব, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের লিখিত অভিযোগ কিংবা প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য এখানে উপস্থাপিত হয়নি। ফলে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগের সত্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন। নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞপ্তি, মূল্যায়নপত্র, বোর্ডের কার্যবিবরণী, জ্যেষ্ঠতার তালিকা এবং অনুমোদনসংক্রান্ত নথি পরীক্ষা করা যেতে পারে। পাশাপাশি ডিপোভিত্তিক আর্থিক লেনদেন ও বদলির আদেশ পর্যালোচনা করলে অভিযোগগুলোর প্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব।
কোম্পানির অর্থ ব্যবস্থাপনাকে ঘিরেও রাশেদুল হকের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, মামলা পরিচালনার ব্যয়, দাপ্তরিক খরচ, আপ্যায়ন এবং রক্ষণাবেক্ষণের নামে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে কোম্পানির অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, কোম্পানির নামে পরিচালিত বিভিন্ন মামলার আইনি ব্যয়ের হিসাবেও অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া হয়ে থাকতে পারে। এ ছাড়া কোম্পানির বরাদ্দ করা গাড়ি ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কাজে ব্যবহার এবং সেই গাড়ির জ্বালানি ব্যয় প্রতিষ্ঠানের তহবিল থেকে পরিশোধের অভিযোগও করা হয়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় এসব অভিযোগের গুরুত্ব রয়েছে। কারণ, প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি ব্যয়ের বিপরীতে যথাযথ অনুমোদন, গ্রহণযোগ্য বিল-ভাউচার এবং নিরীক্ষাযোগ্য হিসাব থাকা প্রয়োজন। কোনো ব্যয় বাস্তবে সংঘটিত হয়েছে কি না, অর্থ নির্ধারিত খাতে ব্যবহার করা হয়েছে কি না এবং অনুমোদিত ব্যক্তিরাই ব্যয়ের সুবিধা পেয়েছেন কি না, তা নথি যাচাইয়ের মাধ্যমে নির্ধারণ করা যায়। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সময়ের হিসাববই, ভাউচার, ব্যাংক লেনদেন, আইনি পরামর্শকের বিল, মামলার নথি, গাড়ির লগবুক এবং জ্বালানি ব্যবহারের হিসাব নিরীক্ষা করা প্রয়োজন। কোনো ব্যয়ে অসংগতি পাওয়া গেলে তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের ভূমিকা আলাদাভাবে পরীক্ষা করা জরুরি।
রাশেদুল হকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো তাঁর কথিত বিপুল সম্পদ অর্জন। অভিযোগকারীদের দাবি, ভোলায় তাঁর গ্রামের বাড়িতে বিপুল অর্থ ব্যয়ে বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া নিজের ও পরিবারের সদস্যদের ব্যবহারের জন্য একাধিক দামি গাড়ি কেনা এবং স্ত্রী-সন্তানদের নামে ব্যাংকে স্থায়ী আমানত বা এফডিআর ও সরকারি সঞ্চয়পত্রে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের একাংশের দাবি, এসব সম্পদের পরিমাণ তাঁর বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা তদন্ত করা প্রয়োজন। তবে বাড়ি, গাড়ি, ব্যাংক আমানত ও সঞ্চয়পত্রের প্রকৃত পরিমাণ, মালিকানা এবং অর্থের উৎস সম্পর্কে যাচাই করা নথি এখানে নেই। তাই তাঁর বিরুদ্ধে শত কোটি টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগকে প্রমাণিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা যাচ্ছে না।
সম্পদের উৎস যাচাই করতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আয়কর রিটার্ন, বেতন-ভাতা, সম্পদ বিবরণী, জমি ও বাড়ির দলিল, গাড়ির নিবন্ধন, ব্যাংক হিসাব এবং বিনিয়োগের নথি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদের ক্ষেত্রে মালিকানা ও অর্থের প্রকৃত উৎস অনুসন্ধান করা যেতে পারে। কোনো সম্পদ শুধু পরিবারের সদস্যের নামে রয়েছে বলেই সেটিকে অবৈধ সম্পদ বলা যায় না। একইভাবে সম্পদের পরিমাণ বেশি হলেই দুর্নীতি প্রমাণিত হয় না। বৈধ আয়ের সঙ্গে সম্পদের অসামঞ্জস্য, অর্থের উৎস এবং সংশ্লিষ্ট লেনদেনের প্রমাণের ভিত্তিতেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
মেঘনা পেট্রোলিয়ামের একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিয়োগসংক্রান্ত জালিয়াতি, প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার, আর্থিক অনিয়ম এবং বিপুল সম্পদ অর্জনের মতো একাধিক অভিযোগ ওঠায় বিষয়গুলো নথিভিত্তিকভাবে যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের মতে, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন ও প্রতিষ্ঠানের বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে কোম্পানির অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বিভাগ, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং এখতিয়ারসম্পন্ন তদন্তকারী সংস্থা নিজ নিজ ক্ষমতার মধ্যে থেকে বিষয়গুলো পরীক্ষা করতে পারে। দুর্নীতি বা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের প্রমাণ পাওয়া গেলে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে।
তদন্তে শুধু অভিযুক্ত কর্মকর্তার ভূমিকা নয়, নিয়োগ অনুমোদনকারী, আর্থিক ব্যয় অনুমোদনকারী এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের দায়িত্বও প্রাসঙ্গিক হলে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগকারীদের বক্তব্য, নথিপত্র এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তার ব্যাখ্যা বিবেচনায় নেওয়া হলে তদন্তের নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে মো. রাশেদুল হকের বক্তব্য, মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের অগ্রগতি জানা গেলে প্রতিবেদনটি আরও পূর্ণাঙ্গ হবে। এসব বক্তব্য ছাড়া অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি প্রতিষ্ঠানের অর্থ ও প্রশাসনিক ক্ষমতা জনস্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই সেখানে নিয়োগ থেকে শুরু করে পদোন্নতি, বদলি, ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং সম্পদ অর্জন—প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। মেঘনা পেট্রোলিয়ামের এজিএম মো. রাশেদুল হকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর ক্ষেত্রেও প্রয়োজন নথিনির্ভর অনুসন্ধান, সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য গ্রহণ এবং আইনসম্মত তদন্ত। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সুনাম ও ন্যায্য অধিকার সুরক্ষিত রাখাই হবে ন্যায়সংগত প্রক্রিয়ার অংশ।

আপনার মতামত লিখুন