দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

ফোনে মেলেনা আইগত সেবা

বনানীতে গেস্ট হাউজ-স্পা, ওসির ভূমিকা নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন

বনানীতে গেস্ট হাউজ-স্পা, ওসির ভূমিকা নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন

রাজধানীর অভিজাত বনানী থানা এলাকায় গেস্ট হাউজ, স্পা সেন্টার ও আবাসিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ঘিরে নানা অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে কথিত মাসোহারা, অপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয়, মাদক সেবন, নারী পাচার ও স্কর্ট সার্ভিসের আড়ালে অনৈতিক কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন অনিয়ম। এসব অভিযোগের সঙ্গে বনানী থানার বর্তমান ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ ফরিদুল ইসলামের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তবে অভিযোগগুলোর সবকটির স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈধ কাগজপত্র, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান।

আরও পড়ুন: পুলিশে একের পর এক রদবদল, অপরাধ দমনে নতুন পরীক্ষা

অনুসন্ধানে জানা যায়, এসব বিষয়ে গত ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়। পরে অভিযোগটি ৭ সেপ্টেম্বর গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনারের কাছে পাঠানো হয়। অভিযোগটির স্মারক নম্বর ২৯৯৩৫ বলে উল্লেখ করা হয়েছে এবং তৎকালীন গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার তানভীর আহম্মেদ আইনগত ব্যবস্থা নিতে বনানী থানার ওসিকে নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশও অমাণ্য করে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি তিনি। অভিযোগে বনানী এলাকার কয়েকটি গেস্ট হাউজ ও স্পা সেন্টারের কার্যক্রম খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। পরবর্তী সময়ে বিষয়টি বনানী থানার ওসির কাছে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।

অভিযোগকারী পক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, বিষয়টি নিয়ে বনানী থানার ওসির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে সংবাদকর্মীদের থানায় আসতে বলা হয়। পরে সংবাদকর্মীরা তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় তিনি আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন এবং সংবাদকর্মীকে গেষ্ট হাউজটিতে যেতে বলেন আমি তাদেরকে বলে দিয়েছি। তার এই ভাষ্য অনুযায়ী স্পষ্ট ফটে উঠে যাতে সংবাদকর্মীর উপর অপরাধীদেও দিয়ে মব সৃষ্টি হয়। কিন্তু এরপরও সংশ্লিষ্ট গেস্ট হাউজ ও স্পা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর অভিযান বা আইনগত পদক্ষেপ তারা দেখতে পাননি। শুধু তাই নয় তাকে একের পর এক ফোন করলেও পাওয়া যায়না ও মিলেনা আইনগত সেবাও।

আরও পড়ুন: বনানীতে স্পা-গেস্ট হাউজ ঘিরে ওসির বিরুদ্ধে অভিযোগ

এখানেই উঠছে মূল প্রশ্ন কোনো লিখিত অভিযোগ পুলিশের ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে থানায় পাঠানোর পর তার তদন্ত বা যাচাই প্রক্রিয়া কীভাবে পরিচালিত হয়েছে? অভিযোগ সত্য হলে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, আর অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সেটি তদন্ত করে অভিযোগকারীকে কী জানানো হয়েছে এসব বিষয়ও পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।

বনানীর ২৭ নম্বর সড়কের ৮ নং বাড়িটিতে বিগত আ.লীগের কর্মী ও গোপালগঞ্জে তার বাড়ি  পরিচয়ে মার্ভেল ইন গেস্ট হাউজ এবং একই সড়কে ৬৫/এ নম্বরের লাক্সারী গেষ্ট হাউজ যাহার মালিক সাকিব ও হান্নানসহ বেশ কয়েকজন। এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়মিতভাবে নারী ও মানব পাচারচক্রের তৎপরতা, কথিত স্কর্ট সার্ভিস এবং মাদকসেবনের আসর বসার মতো কর্মকাণ্ড চলে। তবে এসব অভিযোগের কোনোটি আদালতে প্রমাণিত হয়েছে এমন তথ্য এই প্রতিবেদনের অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স, ফায়ার সেফটি ছাড়পত্র, ভবনের ব্যবহার অনুমোদন, অতিথি নিবন্ধন খাতা, সিসিটিভি ফুটেজ এবং পুলিশের তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বিশেষ করে কোনো গেস্ট হাউজ বা স্পা প্রতিষ্ঠানে মানব পাচারের মতো গুরুতর অপরাধের অভিযোগ থাকলে সেটি কেবল স্থানীয় থানার পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না রেখে সংশ্লিষ্ট বিশেষায়িত ইউনিটের মাধ্যমে তদন্তের প্রয়োজন হতে পারে।

আরও পড়ুন: বনানীর আবাসিক ভবনে স্পা-গেস্ট হাউজ এখন অন্ধকার জগৎ

অভিযোগের সবচেয়ে গুরুতর অংশগুলোর একটি হলো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে বনানী থানার ওসির বিরুদ্ধে নিয়মিত মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগ। কথিত অবৈধ ব্যবসা পরিচালনাকারী কয়েকজন ব্যক্তি তাদের প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সম্পর্কে পুলিশের স্থানীয় পর্যায়ে জানাশোনা থাকার কথা বলেছেন এবং মাসোহারা দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। তবে এই অভিযোগের পক্ষে ব্যাংক লেনদেন, রসিদ, অডিও-ভিডিও, প্রত্যক্ষদর্শীর জবানবন্দি কিংবা অন্য কোনো স্বাধীন প্রমাণ এই প্রতিবেদকের হাতে আসেনি। ফলে অভিযোগটিকে আপাতত অভিযোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। বর্তমান অভিযোগের পাশাপাশি মুহাম্মদ ফরিদুল ইসলামের ২০২৩ সালের একটি ঘটনাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ২০২৩ সালের ২৬ আগস্ট একাধিক সংবাদমাধ্যমে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর থানার তৎকালীন ওসি মুহাম্মদ ফরিদুল ইসলামকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রথম আলো, কালের কণ্ঠ, ঢাকা ট্রিবিউন, ইত্তেফাক ও যুগান্তরসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, বদলির আদেশ পাওয়ার পর ভূঞাপুর থানার ওসি ফরিদুল ইসলাম থানায় ব্যবহৃত এসি, টেলিভিশন, আইপিএস ও সোফা খুলে নিজের কোয়ার্টারে নিয়ে যান।

যুগান্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২৪ আগস্ট ২০২৩ তারিখে পুলিশ সুপার সরকার মোহাম্মদ কায়সারের স্বাক্ষরিত আদেশে ফরিদুল ইসলামকে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়। এর পরদিন রাতে থানার কক্ষ থেকে এসি, টেলিভিশন, সোফা ও আইপিএস খুলে নেওয়া হয়। স্থানীয় সূত্রের দাবি ছিল, এসব সামগ্রী স্থানীয় ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের অনুদানে থানার উন্নয়ন ও ব্যবহারের জন্য দেওয়া হয়েছিল।

আরও পড়ুন: বনানীতে মার্ভেল ইন গেষ্ট হাউজ ঘিরে আবারও পায়েলের অপরাধ সিন্ডিকেট

অন্যদিকে ফরিদুল ইসলাম তখন সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, থানা থেকে খুলে নেওয়া সামগ্রীগুলো তার ব্যক্তিগত অর্থে কেনা। তাই সেগুলো তিনি নিতে পারেন। তৎকালীন জেলা পুলিশ সুপারও বলেছিলেন, যদি জিনিসগুলো ব্যক্তিগত অর্থে কেনা হয়ে থাকে, তাহলে নেওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা নেই; তবে অনুদানের অর্থে কেনা হলে তিনি নিতে পারবেন না।

অর্থাৎ ওই ঘটনার মূল বিতর্ক ছিল সামগ্রীগুলো ব্যক্তিগত অর্থে কেনা হয়েছিল, নাকি থানার জন্য অনুদান হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে স্থানীয় পক্ষের বক্তব্য এবং ফরিদুল ইসলামের বক্তব্য দুই ধরনের অবস্থানই উঠে এসেছিল।

২০২৬ সালের মার্চে ডিএমপির এক আদেশে মুহাম্মদ ফরিদুল ইসলামকে বনানী থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। একই আদেশে বনানী থানার তৎকালীন ওসি মোহাম্মদ খালিদ মুনসুরকে উত্তরা-পশ্চিম থানায় বদলি করা হয়। এরপর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমেও তার নতুন দায়িত্ব নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। মে ২০২৬-এ যুগান্তর ‘থানা থেকে এসি-সোফা সেট নিয়ে যাওয়া সেই ওসি এখন বনানী থানায়’ শিরোনামে ২০২৩ সালের ঘটনাটিকে সামনে এনে তার বর্তমান পদায়নের বিষয়টি তুলে ধরে।

আরও পড়ুন: অবৈধ অস্ত্রের সন্ধান দিলে পুরস্কার দেবে এসআরবি

অন্যদিকে ২০২৬ সালেই বনানী থানার বিভিন্ন অপরাধ দমন কার্যক্রমে ফরিদুল ইসলামের বক্তব্য সংবাদমাধ্যমে এসেছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বনানী অংশ থেকে মুখে স্কচটেপ বাঁধা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায়ও বনানী থানার ওসি হিসেবে তিনি গণমাধ্যমকে তথ্য দেন। অর্থাৎ একদিকে ২০২৩ সালের পুরোনো বিতর্কিত ঘটনা, অন্যদিকে ২০২৬ সালে গুরুত্বপূর্ণ বনানী থানায় তার পদায়ন—এই দুই বিষয়কে কেন্দ্র করে এখন নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।

অভিযোগকারীদের বক্তব্য, বনানীর গেস্ট হাউজ ও স্পা সেন্টারগুলোতে যদি সত্যিই কোনো অপরাধী চক্রের তৎপরতা থাকে, তাহলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান পরিচালনা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে মানব পাচার, মাদক ব্যবসা, যৌন হয়রানি বা সংঘবদ্ধ অপরাধের অভিযোগ থাকলে শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত না করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বের করে আনা জরুরি।

এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর লাইসেন্স, নিবন্ধন, ভবন ব্যবহারের অনুমোদন, কর্মচারীদের পরিচয়, অতিথি রেজিস্টার, সিসিটিভি ফুটেজ এবং অভিযোগে উল্লেখিত কথিত আর্থিক লেনদেনের তথ্য যাচাই করা যেতে পারে। কারণ একজন থানার ওসির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি অভিযুক্ত কর্মকর্তার বক্তব্য প্রকাশ করাও সাংবাদিকতার মৌলিক নীতির অংশ।

সব মিলিয়ে বনানীর গেস্ট হাউজ ও স্পা সেন্টার ঘিরে ওঠা অভিযোগকে কেন্দ্র করে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। ৩ সেপ্টেম্বরের অভিযোগের পর কী তদন্ত হয়েছে? ৭ সেপ্টেম্বর গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ে পাঠানো অভিযোগের পর কী নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল? স্মারক নম্বর ২৯৯৩৫-এর অভিযোগের বর্তমান অবস্থা কী? বনানী থানায় পাঠানোর পর তদন্ত কর্মকর্তা বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কি কোনো প্রতিবেদন দিয়েছেন? অভিযোগে উল্লেখ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈধতা যাচাই করা হয়েছে কি না? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ওসির বিরুদ্ধে ওঠা মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা কি কোনো অনুসন্ধান করবেন? এসব প্রশ্নের উত্তর মিললেই বোঝা যাবে অভিযোগগুলো কতটা বাস্তব, কতটা অতিরঞ্জিত এবং কোথাও দায়িত্বে অবহেলা বা অন্য কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না।

আরও পড়ুন: এনআইডিতে ভুল থাকলে সংশোধনে লাগতে পারে যেসব কাগজ

একই সঙ্গে ২০২৩ সালের ভূঞাপুর থানার ঘটনারও একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন সেই ঘটনায় সরকারি বা অনুদানের অর্থে কেনা সামগ্রী ব্যক্তিগতভাবে নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে শেষ পর্যন্ত কী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হয়েছিল এবং তার কোনো তদন্ত বা নিষ্পত্তির নথি রয়েছে কি না। কারণ পুলিশের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে জনআস্থা বজায় রাখতে অভিযোগের সত্যতা যেমন নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন, তেমনি কোনো কর্মকর্তা সম্পর্কে ভিত্তিহীন অভিযোগ থাকলেও সেটির তদন্ত করে প্রকৃত তথ্য জনসম্মুখে আনা জরুরি।

বনানীর মতো রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকায় গেস্ট হাউজ ও স্পা সেন্টারকে ঘিরে অপরাধের অভিযোগ থাকলে তার দায় শুধু একটি থানার ওপর নয়; সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলা কর্তৃপক্ষেরও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। আর যদি অভিযোগগুলো মিথ্যা হয়, তাহলেও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তা স্পষ্ট হওয়া দরকার।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, বনানীর মতো গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক এলাকায় গেস্ট হাউজ ও স্পা সেন্টারের কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা অভিযোগ শোনা যায়। কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ থাকলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত তদারকি ও প্রয়োজনীয় তদন্ত করা উচিত। তাদের ভাষ্য, অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। স্থানীয়দের দাবি, পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিয়মিতভাবে এসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স, অনুমোদন, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও কার্যক্রম যাচাই করলে এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও স্বচ্ছ থাকবে। একই সঙ্গে কোনো পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা জনসমক্ষে আনার দাবি জানান তারা।

আরও পড়ুন: ডিএমপির অভিযানে অস্ত্র মাদকসহ গ্রেফতার ৫১৫

এ বিষয়ে একজন আইন বিশেষজ্ঞ বলেন, কোনো পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মাসোহারা গ্রহণ, অপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় কিংবা দায়িত্বে অবহেলার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠলে শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি অভিযোগটি উপেক্ষা করাও সমীচীন নয়। অভিযোগের ধরন ও গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে নিরপেক্ষভাবে তথ্য-প্রমাণ যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগের পক্ষে অর্থ লেনদেনের তথ্য, অডিও-ভিডিও, কল রেকর্ড, সাক্ষ্য বা অন্যান্য নথি থাকলে সেগুলো আইনানুগভাবে পরীক্ষা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বক্তব্য নেওয়াও ন্যায়সংগত তদন্তের অংশ। তিনি আরও বলেন, অভিযোগটি যদি পুলিশের কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে হয়, তাহলে একই চেইন অব কমান্ডের মধ্যে তদন্তের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বা উপযুক্ত স্বাধীন তদন্তকারী সংস্থার মাধ্যমে বিষয়টি যাচাই করা হলে জনআস্থা বাড়বে। অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সেটিও স্পষ্টভাবে জানানো উচিত।

এ বিষয়ে পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কোনো থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। অভিযোগের ধরন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈধতা, তাদের কার্যক্রম, পুলিশের ভূমিকা এবং অভিযোগের পক্ষে থাকা তথ্য-প্রমাণ যাচাই করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, কোনো গেস্ট হাউজ বা স্পা সেন্টারে মাদক, মানব পাচার কিংবা অন্য কোনো অপরাধ সংঘটনের তথ্য পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। একইভাবে কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অর্থ গ্রহণ বা দায়িত্ব পালনে অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তারও তদন্ত হওয়া উচিত। প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন: পুলিশে একের পর এক রদবদল, অপরাধ দমনে নতুন পরীক্ষাপুলিশে একের পর এক রদবদল, অপরাধ দমনে নতুন পরীক্ষা

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ জমা পড়লে সেটির নথিভুক্তি, যাচাই এবং প্রয়োজনীয় তদন্তের প্রক্রিয়া রয়েছে। অভিযোগের স্মারক নম্বর থাকলে সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে তার বর্তমান অবস্থাও জানা সম্ভব। বনানীর মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা পুলিশের দায়িত্ব। তাই কোনো অভিযোগকে ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে রেখে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করা উচিত।

এবিষয়ে বানানী থানার ওসির মুঠোফোনে একাধিক ফোন করলে তাকে পাওয়া যায়নি।

বিষয় : স্পা পুলিশ অপরাধ বনানী ওসি গেষ্ট হাউজ

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬


বনানীতে গেস্ট হাউজ-স্পা, ওসির ভূমিকা নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন

প্রকাশের তারিখ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

রাজধানীর অভিজাত বনানী থানা এলাকায় গেস্ট হাউজ, স্পা সেন্টার ও আবাসিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ঘিরে নানা অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে কথিত মাসোহারা, অপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয়, মাদক সেবন, নারী পাচার ও স্কর্ট সার্ভিসের আড়ালে অনৈতিক কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন অনিয়ম। এসব অভিযোগের সঙ্গে বনানী থানার বর্তমান ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ ফরিদুল ইসলামের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তবে অভিযোগগুলোর সবকটির স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈধ কাগজপত্র, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান।

আরও পড়ুন: পুলিশে একের পর এক রদবদল, অপরাধ দমনে নতুন পরীক্ষা

অনুসন্ধানে জানা যায়, এসব বিষয়ে গত ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়। পরে অভিযোগটি ৭ সেপ্টেম্বর গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনারের কাছে পাঠানো হয়। অভিযোগটির স্মারক নম্বর ২৯৯৩৫ বলে উল্লেখ করা হয়েছে এবং তৎকালীন গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার তানভীর আহম্মেদ আইনগত ব্যবস্থা নিতে বনানী থানার ওসিকে নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশও অমাণ্য করে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি তিনি। অভিযোগে বনানী এলাকার কয়েকটি গেস্ট হাউজ ও স্পা সেন্টারের কার্যক্রম খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। পরবর্তী সময়ে বিষয়টি বনানী থানার ওসির কাছে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।

অভিযোগকারী পক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, বিষয়টি নিয়ে বনানী থানার ওসির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে সংবাদকর্মীদের থানায় আসতে বলা হয়। পরে সংবাদকর্মীরা তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় তিনি আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন এবং সংবাদকর্মীকে গেষ্ট হাউজটিতে যেতে বলেন আমি তাদেরকে বলে দিয়েছি। তার এই ভাষ্য অনুযায়ী স্পষ্ট ফটে উঠে যাতে সংবাদকর্মীর উপর অপরাধীদেও দিয়ে মব সৃষ্টি হয়। কিন্তু এরপরও সংশ্লিষ্ট গেস্ট হাউজ ও স্পা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর অভিযান বা আইনগত পদক্ষেপ তারা দেখতে পাননি। শুধু তাই নয় তাকে একের পর এক ফোন করলেও পাওয়া যায়না ও মিলেনা আইনগত সেবাও।

আরও পড়ুন: বনানীতে স্পা-গেস্ট হাউজ ঘিরে ওসির বিরুদ্ধে অভিযোগ

এখানেই উঠছে মূল প্রশ্ন কোনো লিখিত অভিযোগ পুলিশের ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে থানায় পাঠানোর পর তার তদন্ত বা যাচাই প্রক্রিয়া কীভাবে পরিচালিত হয়েছে? অভিযোগ সত্য হলে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, আর অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সেটি তদন্ত করে অভিযোগকারীকে কী জানানো হয়েছে এসব বিষয়ও পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।

বনানীর ২৭ নম্বর সড়কের ৮ নং বাড়িটিতে বিগত আ.লীগের কর্মী ও গোপালগঞ্জে তার বাড়ি  পরিচয়ে মার্ভেল ইন গেস্ট হাউজ এবং একই সড়কে ৬৫/এ নম্বরের লাক্সারী গেষ্ট হাউজ যাহার মালিক সাকিব ও হান্নানসহ বেশ কয়েকজন। এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়মিতভাবে নারী ও মানব পাচারচক্রের তৎপরতা, কথিত স্কর্ট সার্ভিস এবং মাদকসেবনের আসর বসার মতো কর্মকাণ্ড চলে। তবে এসব অভিযোগের কোনোটি আদালতে প্রমাণিত হয়েছে এমন তথ্য এই প্রতিবেদনের অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স, ফায়ার সেফটি ছাড়পত্র, ভবনের ব্যবহার অনুমোদন, অতিথি নিবন্ধন খাতা, সিসিটিভি ফুটেজ এবং পুলিশের তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বিশেষ করে কোনো গেস্ট হাউজ বা স্পা প্রতিষ্ঠানে মানব পাচারের মতো গুরুতর অপরাধের অভিযোগ থাকলে সেটি কেবল স্থানীয় থানার পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না রেখে সংশ্লিষ্ট বিশেষায়িত ইউনিটের মাধ্যমে তদন্তের প্রয়োজন হতে পারে।

আরও পড়ুন: বনানীর আবাসিক ভবনে স্পা-গেস্ট হাউজ এখন অন্ধকার জগৎ

অভিযোগের সবচেয়ে গুরুতর অংশগুলোর একটি হলো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে বনানী থানার ওসির বিরুদ্ধে নিয়মিত মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগ। কথিত অবৈধ ব্যবসা পরিচালনাকারী কয়েকজন ব্যক্তি তাদের প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সম্পর্কে পুলিশের স্থানীয় পর্যায়ে জানাশোনা থাকার কথা বলেছেন এবং মাসোহারা দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। তবে এই অভিযোগের পক্ষে ব্যাংক লেনদেন, রসিদ, অডিও-ভিডিও, প্রত্যক্ষদর্শীর জবানবন্দি কিংবা অন্য কোনো স্বাধীন প্রমাণ এই প্রতিবেদকের হাতে আসেনি। ফলে অভিযোগটিকে আপাতত অভিযোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। বর্তমান অভিযোগের পাশাপাশি মুহাম্মদ ফরিদুল ইসলামের ২০২৩ সালের একটি ঘটনাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ২০২৩ সালের ২৬ আগস্ট একাধিক সংবাদমাধ্যমে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর থানার তৎকালীন ওসি মুহাম্মদ ফরিদুল ইসলামকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রথম আলো, কালের কণ্ঠ, ঢাকা ট্রিবিউন, ইত্তেফাক ও যুগান্তরসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, বদলির আদেশ পাওয়ার পর ভূঞাপুর থানার ওসি ফরিদুল ইসলাম থানায় ব্যবহৃত এসি, টেলিভিশন, আইপিএস ও সোফা খুলে নিজের কোয়ার্টারে নিয়ে যান।

যুগান্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২৪ আগস্ট ২০২৩ তারিখে পুলিশ সুপার সরকার মোহাম্মদ কায়সারের স্বাক্ষরিত আদেশে ফরিদুল ইসলামকে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়। এর পরদিন রাতে থানার কক্ষ থেকে এসি, টেলিভিশন, সোফা ও আইপিএস খুলে নেওয়া হয়। স্থানীয় সূত্রের দাবি ছিল, এসব সামগ্রী স্থানীয় ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের অনুদানে থানার উন্নয়ন ও ব্যবহারের জন্য দেওয়া হয়েছিল।

আরও পড়ুন: বনানীতে মার্ভেল ইন গেষ্ট হাউজ ঘিরে আবারও পায়েলের অপরাধ সিন্ডিকেট

অন্যদিকে ফরিদুল ইসলাম তখন সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, থানা থেকে খুলে নেওয়া সামগ্রীগুলো তার ব্যক্তিগত অর্থে কেনা। তাই সেগুলো তিনি নিতে পারেন। তৎকালীন জেলা পুলিশ সুপারও বলেছিলেন, যদি জিনিসগুলো ব্যক্তিগত অর্থে কেনা হয়ে থাকে, তাহলে নেওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা নেই; তবে অনুদানের অর্থে কেনা হলে তিনি নিতে পারবেন না।

অর্থাৎ ওই ঘটনার মূল বিতর্ক ছিল সামগ্রীগুলো ব্যক্তিগত অর্থে কেনা হয়েছিল, নাকি থানার জন্য অনুদান হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে স্থানীয় পক্ষের বক্তব্য এবং ফরিদুল ইসলামের বক্তব্য দুই ধরনের অবস্থানই উঠে এসেছিল।

২০২৬ সালের মার্চে ডিএমপির এক আদেশে মুহাম্মদ ফরিদুল ইসলামকে বনানী থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। একই আদেশে বনানী থানার তৎকালীন ওসি মোহাম্মদ খালিদ মুনসুরকে উত্তরা-পশ্চিম থানায় বদলি করা হয়। এরপর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমেও তার নতুন দায়িত্ব নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। মে ২০২৬-এ যুগান্তর ‘থানা থেকে এসি-সোফা সেট নিয়ে যাওয়া সেই ওসি এখন বনানী থানায়’ শিরোনামে ২০২৩ সালের ঘটনাটিকে সামনে এনে তার বর্তমান পদায়নের বিষয়টি তুলে ধরে।

আরও পড়ুন: অবৈধ অস্ত্রের সন্ধান দিলে পুরস্কার দেবে এসআরবি

অন্যদিকে ২০২৬ সালেই বনানী থানার বিভিন্ন অপরাধ দমন কার্যক্রমে ফরিদুল ইসলামের বক্তব্য সংবাদমাধ্যমে এসেছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বনানী অংশ থেকে মুখে স্কচটেপ বাঁধা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায়ও বনানী থানার ওসি হিসেবে তিনি গণমাধ্যমকে তথ্য দেন। অর্থাৎ একদিকে ২০২৩ সালের পুরোনো বিতর্কিত ঘটনা, অন্যদিকে ২০২৬ সালে গুরুত্বপূর্ণ বনানী থানায় তার পদায়ন—এই দুই বিষয়কে কেন্দ্র করে এখন নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।

অভিযোগকারীদের বক্তব্য, বনানীর গেস্ট হাউজ ও স্পা সেন্টারগুলোতে যদি সত্যিই কোনো অপরাধী চক্রের তৎপরতা থাকে, তাহলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান পরিচালনা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে মানব পাচার, মাদক ব্যবসা, যৌন হয়রানি বা সংঘবদ্ধ অপরাধের অভিযোগ থাকলে শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত না করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বের করে আনা জরুরি।

এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর লাইসেন্স, নিবন্ধন, ভবন ব্যবহারের অনুমোদন, কর্মচারীদের পরিচয়, অতিথি রেজিস্টার, সিসিটিভি ফুটেজ এবং অভিযোগে উল্লেখিত কথিত আর্থিক লেনদেনের তথ্য যাচাই করা যেতে পারে। কারণ একজন থানার ওসির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি অভিযুক্ত কর্মকর্তার বক্তব্য প্রকাশ করাও সাংবাদিকতার মৌলিক নীতির অংশ।

সব মিলিয়ে বনানীর গেস্ট হাউজ ও স্পা সেন্টার ঘিরে ওঠা অভিযোগকে কেন্দ্র করে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। ৩ সেপ্টেম্বরের অভিযোগের পর কী তদন্ত হয়েছে? ৭ সেপ্টেম্বর গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ে পাঠানো অভিযোগের পর কী নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল? স্মারক নম্বর ২৯৯৩৫-এর অভিযোগের বর্তমান অবস্থা কী? বনানী থানায় পাঠানোর পর তদন্ত কর্মকর্তা বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কি কোনো প্রতিবেদন দিয়েছেন? অভিযোগে উল্লেখ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈধতা যাচাই করা হয়েছে কি না? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ওসির বিরুদ্ধে ওঠা মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা কি কোনো অনুসন্ধান করবেন? এসব প্রশ্নের উত্তর মিললেই বোঝা যাবে অভিযোগগুলো কতটা বাস্তব, কতটা অতিরঞ্জিত এবং কোথাও দায়িত্বে অবহেলা বা অন্য কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না।

আরও পড়ুন: এনআইডিতে ভুল থাকলে সংশোধনে লাগতে পারে যেসব কাগজ

একই সঙ্গে ২০২৩ সালের ভূঞাপুর থানার ঘটনারও একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন সেই ঘটনায় সরকারি বা অনুদানের অর্থে কেনা সামগ্রী ব্যক্তিগতভাবে নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে শেষ পর্যন্ত কী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হয়েছিল এবং তার কোনো তদন্ত বা নিষ্পত্তির নথি রয়েছে কি না। কারণ পুলিশের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে জনআস্থা বজায় রাখতে অভিযোগের সত্যতা যেমন নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন, তেমনি কোনো কর্মকর্তা সম্পর্কে ভিত্তিহীন অভিযোগ থাকলেও সেটির তদন্ত করে প্রকৃত তথ্য জনসম্মুখে আনা জরুরি।

বনানীর মতো রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকায় গেস্ট হাউজ ও স্পা সেন্টারকে ঘিরে অপরাধের অভিযোগ থাকলে তার দায় শুধু একটি থানার ওপর নয়; সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলা কর্তৃপক্ষেরও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। আর যদি অভিযোগগুলো মিথ্যা হয়, তাহলেও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তা স্পষ্ট হওয়া দরকার।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, বনানীর মতো গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক এলাকায় গেস্ট হাউজ ও স্পা সেন্টারের কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা অভিযোগ শোনা যায়। কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ থাকলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত তদারকি ও প্রয়োজনীয় তদন্ত করা উচিত। তাদের ভাষ্য, অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। স্থানীয়দের দাবি, পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিয়মিতভাবে এসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স, অনুমোদন, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও কার্যক্রম যাচাই করলে এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও স্বচ্ছ থাকবে। একই সঙ্গে কোনো পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা জনসমক্ষে আনার দাবি জানান তারা।

আরও পড়ুন: ডিএমপির অভিযানে অস্ত্র মাদকসহ গ্রেফতার ৫১৫

এ বিষয়ে একজন আইন বিশেষজ্ঞ বলেন, কোনো পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মাসোহারা গ্রহণ, অপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় কিংবা দায়িত্বে অবহেলার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠলে শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি অভিযোগটি উপেক্ষা করাও সমীচীন নয়। অভিযোগের ধরন ও গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে নিরপেক্ষভাবে তথ্য-প্রমাণ যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগের পক্ষে অর্থ লেনদেনের তথ্য, অডিও-ভিডিও, কল রেকর্ড, সাক্ষ্য বা অন্যান্য নথি থাকলে সেগুলো আইনানুগভাবে পরীক্ষা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বক্তব্য নেওয়াও ন্যায়সংগত তদন্তের অংশ। তিনি আরও বলেন, অভিযোগটি যদি পুলিশের কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে হয়, তাহলে একই চেইন অব কমান্ডের মধ্যে তদন্তের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বা উপযুক্ত স্বাধীন তদন্তকারী সংস্থার মাধ্যমে বিষয়টি যাচাই করা হলে জনআস্থা বাড়বে। অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সেটিও স্পষ্টভাবে জানানো উচিত।

এ বিষয়ে পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কোনো থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। অভিযোগের ধরন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈধতা, তাদের কার্যক্রম, পুলিশের ভূমিকা এবং অভিযোগের পক্ষে থাকা তথ্য-প্রমাণ যাচাই করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, কোনো গেস্ট হাউজ বা স্পা সেন্টারে মাদক, মানব পাচার কিংবা অন্য কোনো অপরাধ সংঘটনের তথ্য পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। একইভাবে কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অর্থ গ্রহণ বা দায়িত্ব পালনে অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তারও তদন্ত হওয়া উচিত। প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন: পুলিশে একের পর এক রদবদল, অপরাধ দমনে নতুন পরীক্ষাপুলিশে একের পর এক রদবদল, অপরাধ দমনে নতুন পরীক্ষা

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ জমা পড়লে সেটির নথিভুক্তি, যাচাই এবং প্রয়োজনীয় তদন্তের প্রক্রিয়া রয়েছে। অভিযোগের স্মারক নম্বর থাকলে সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে তার বর্তমান অবস্থাও জানা সম্ভব। বনানীর মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা পুলিশের দায়িত্ব। তাই কোনো অভিযোগকে ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে রেখে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করা উচিত।

এবিষয়ে বানানী থানার ওসির মুঠোফোনে একাধিক ফোন করলে তাকে পাওয়া যায়নি।



দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

সম্পাদক ও প্রকাশক: এ বি এম মনিরুজ্জামান 
নির্বাহী সম্পাদক: রিপন রুদ্র
যুগ্ম সম্পাদক: জাকিয়া সুলতানা (লাভলী)

কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক সংবাদ দিগন্ত । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
বনানীতে গেস্ট হাউজ-স্পা, ওসির ভূমিকা নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন
0:00 0:00
1.0x