রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানীতে আবাসিক ভবনকে কেন্দ্র করে পরিচালিত বিভিন্ন স্পা, পার্লার, সেলুন ও গেস্ট হাউজের কার্যক্রম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে বনানীর ‘করিম ভিলা’ এবং ডেল্টা ডালিয়া ভবনের ষষ্ঠ তলায় পরিচালিত ‘লাক্সারি’ গেস্ট হাউজকে ঘিরে অনৈতিক কর্মকাণ্ড, কথিত মাদক সরবরাহ, অতিথি নিবন্ধন, নিরাপত্তা ও ব্যবসায়িক বৈধতা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠেছে। পূর্বের অনুসন্ধানেও এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে। নতুন করে অভিযোগ উঠেছে, এসব বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য, ছবি ও অভিযোগ বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো হলেও অভিযোগকারীদের প্রত্যাশিত দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা চোখে পড়েনি। অভিযোগকারীদের দাবি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করার পরও সংশ্লিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।তবে পুলিশের পক্ষ থেকে অভিযোগ পাওয়ার পর কোনো ধরনের অভ্যন্তরীণ যাচাই, নজরদারি বা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য এ প্রতিবেদকের হাতে নেই। ফলে বিষয়টি নিশ্চিত করতে পুলিশের বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করা জরুরি।
থানার এসি-টিভি খুলে বাসায় নিলেন ওসি’-শিরোনামে ২০২৩ সালের ২৬ আগস্ট একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। একই দিন অন্য একটি দৈনিকের শিরোনাম ছিল-‘বদলির আদেশ পাওয়ার পর থানার এসি-টেলিভিশন খুলে নিলেন ওসি।’ কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় দৈনিক বা নিউজ পোর্টালসহ প্রায় সব গণমাধ্যমেই খবরটি জায়গা করে নেয়।
যাকে নিয়ে এসব সংবাদ তিনি ছিলেন টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর থানার তৎকালীন ওসি মুহাম্মদ ফরিদুল ইসলাম। থানা থেকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি), টেলিভিশন, আইপিএস ও সোফা সেট নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় ব্যাপক আলোচনায় আসেন তিনি। অভিযোগ ওঠার পর ভূঞাপুর থানা থেকে জেলা পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয় তাকে। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রভাবশালী সেই ফরিদুল এখন রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বনানী থানার ওসি।
আরও পড়ুন: বনানীর আবাসিক ভবনে স্পা-গেস্ট হাউজ এখন অন্ধকার জগৎ
শুধু ফরিদুল ইসলাম একা নন, আওয়ামী আমলের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তারা ফের বিভিন্ন থানায় ওসির দায়িত্ব পাচ্ছেন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে যাদের ঢাকা থেকে দূরবর্তী স্টেশনে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছিল, তাদের পদায়ন দেওয়া হচ্ছে ঢাকায়। পুলিশের উচ্চপর্যায়কে ম্যানেজ করেই এসব পদায়ন হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
তবে বনানীর ‘করিম ভিলা’ নামের আবাসিক ভবনের কয়েকটি ফ্ল্যাটে বিউটি পার্লার, সেলুন ও স্পা-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। বৈধ ব্যবসা পরিচালনার বিষয়টি নিজে কোনো অপরাধ নয়। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো কোনো কার্যক্রমের আড়ালে ভিন্ন ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতে পারে এমন অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, দিনের তুলনায় সন্ধ্যার পর ভবনটিতে অপরিচিত নারী-পুরুষের যাতায়াত বাড়ে। দিনে ও গভীর রাত পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যক্তির চলাচল নিয়েও তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের বক্তব্য, আবাসিক ভবনে বৈধ ব্যবসা থাকতেই পারে; কিন্তু সেই ব্যবসার কারণে অন্য বাসিন্দাদের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিঘ্নিত হলে প্রশাসনের নজরদারি প্রয়োজন।
অভিযোগ রয়েছে, কথিত মধ্যস্থতাকারী বা দালালের মাধ্যমে নির্দিষ্ট গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। পরে তাদের বিভিন্ন পার্লার, সেলুন বা নির্দিষ্ট ফ্ল্যাটে নেওয়া হয় বলেও দাবি রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মোবাইল ফোনের মাধ্যমে যোগাযোগের অভিযোগও পাওয়া গেছে। তবে এসব দাবির পক্ষে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল নথি বা আইনগতভাবে যাচাইকৃত প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে নেই।
আরও পড়ুন: বনানীতে শৈশবের স্পা সেন্টার ঘিরে নারী ও দালাল সিন্ডিকেট
করিম ভিলাকে ঘিরে মাদক সরবরাহের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের কেউ কেউ ইয়াবা, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য সরবরাহের সঙ্গে কথিত একটি চক্র জড়িত থাকার দাবি করেছেন। তবে অনুসন্ধানের সময় কোনো মাদকদ্রব্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক জব্দ, রাসায়নিক পরীক্ষায় শনাক্ত অথবা আদালত বা পুলিশের নথিতে প্রমাণিত হয়েছে। তাই অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। করিম ভিলাকে ঘিরে কথিত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সোলেমান ওরফে সাকিব এবং মাসুদ নামের দুই ব্যক্তির নামও অভিযোগ সূত্রে এসেছে। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ করা হলেও সেগুলোর স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এবিষয়ে ওসিকে একাধিকবার ফোন করলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। যাহা সংবাদ দিগন্তর কাছে প্রমানিত রয়েছে।
সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুযায়ী গুরুতর অভিযোগ প্রকাশের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এ প্রতিবেদনের সময় পর্যন্ত তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য বা অভিযোগের বিষয়ে কোনো নির্ভরযোগ্য নথি পাওয়া গেলে পরবর্তী প্রতিবেদনে তা যথাযথভাবে তুলে ধরা হবে।
অভিযোগের বিভিন্ন দিক যাচাই করতে মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধানের সময় কথিত মাদকদ্রব্যের মূল্য নিয়ে একজনের সঙ্গে কথোপকথন রেকর্ড করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে কোনো কথোপকথন, অডিও বা ভিডিওকে এককভাবে মাদক বিক্রির চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। কথোপকথনের প্রেক্ষাপট, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয়, কথিত আর্থিক লেনদেন এবং বস্তুটির প্রকৃতি আইনগতভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
করিম ভিলার পাশাপাশি বনানীর ডেল্টা ডালিয়া নামের একটি বহুতল ভবনের ষষ্ঠ তলায় পরিচালিত ‘লাক্সারি’ গেস্ট হাউজ নিয়েও উঠেছে একাধিক প্রশ্ন। সাংবাদিকদের অনুসন্ধানে গেস্ট হাউজটির কার্যক্রম, অতিথি নিবন্ধন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও ব্যবসায়িক বৈধতার বিষয়গুলো সামনে আসে। গেস্ট হাউজটির বাইরে স্পষ্ট সাইনবোর্ড না থাকা এবং অতিথিদের পরিচয় যাচাই ও নিবন্ধন সংক্রান্ত নথি সাংবাদিকদের সামনে উপস্থাপন না করার অভিযোগও রয়েছে। অনুসন্ধানের সময় কয়েকজন অবস্থানরত অতিথির সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হয়। তাদের কয়েকজন দাবি করেন, কক্ষ নেওয়ার সময় জাতীয় পরিচয়পত্র জমা বা পরিচয় নিবন্ধনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। তবে এটি গেস্ট হাউজটির নিয়মিত নীতি কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
আরও পড়ুন: দারুস সালামে আবাসিক হোটেলের আড়ালে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ
এ কারণে অতিথি নিবন্ধন খাতা, পরিচয়পত্র সংরক্ষণের তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ এবং ব্যবসা পরিচালনার বৈধ কাগজপত্র যাচাই করা জরুরি বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। অনুসন্ধানের সময় একটি কক্ষে এক তরুণী নারী ও চল্লিশোর্ধ্ব এক ব্যক্তিকে মাদক সেবনের সরঞ্জামসহ দেখা গেছে বলে প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। ওই কক্ষে ট্যাবলেট সদৃশ কিছু বস্তু দেখা যায় বলেও জানানো হয়েছে।
অন্য একটি কক্ষে একজন নারী ও এনামুল হক নামে পরিচয় দেওয়া এক পুরুষকে অবস্থান করতে দেখা যায় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। তবে প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ একই কক্ষে অবস্থান করলেই তা অপরাধের প্রমাণ নয়। মূল বিষয় হলো গেস্ট হাউজ কর্তৃপক্ষ অতিথিদের পরিচয় যথাযথভাবে যাচাই করেছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান অনুসরণ করছে কি না।
গেস্ট হাউজটির অন্যান্য কক্ষ ও কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের সময় আল-আমিন নামের এক ব্যক্তি নিজেকে প্রতিষ্ঠানের মালিক হিসেবে পরিচয় দিয়ে সাংবাদিকদের অনুসন্ধানে বাধা দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবেদকের দাবি, এ সময় সংবাদ প্রকাশ নিয়ে আপত্তি জানিয়ে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। ওই ব্যক্তি স্থানীয় বিএনপি নেতা আনোয়ার হোসেন, সুজন ও শুভসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে তাদের কথিত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার দাবি করেন।
ডেল্টা ডালিয়া ভবনের কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, গত কয়েক বছরে ভবনে অপরিচিত মানুষের যাতায়াত বেড়েছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় বিভিন্ন ব্যক্তির চলাচল নিয়ে পরিবারগুলোর মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। আরেক বাসিন্দা বলেন, ভবনে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোর ট্রেড লাইসেন্স, ব্যবসার অনুমোদন, ভবনের ব্যবহার অনুমোদন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন: রাজধানীতে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান, ২৪ ঘণ্টায় গ্রেপ্তার ৪৮৮
নতুন অভিযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সংশ্লিষ্ট অভিযোগ, ছবি ও তথ্য বনানী থানার ওসির হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করছেন। তাদের প্রশ্ন, কোনো অপরাধের অভিযোগ পুলিশকে জানানো হলে তা যাচাই করা পুলিশের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। তাহলে তথ্য পাওয়ার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন, সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ, নথি যাচাই বা গোপন নজরদারি করা হয়েছে কি না?
এদিকে বনানী থানার ওসির বিরুদ্ধে কিছু প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিত ‘মাসোহারা’ নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, কথিত অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কয়েকটি প্রতিষ্ঠান স্থানীয়ভাবে আর্থিক সুবিধা দিয়ে প্রশাসনিক নজরদারি থেকে নিজেদের দূরে রাখছে। সুতরাং এটি আপাতত অভিযোগ মাত্র। অভিযোগটি সত্য হলে তা অত্যন্ত গুরুতর এবং বিভাগীয় তদন্তের দাবি রাখে। আবার অভিযোগটি মিথ্যা হলে একজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অপপ্রচারেরও প্রশ্ন উঠতে পারে। এ কারণে নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তে যাওয়া উচিত নয়। ওসির বনানী থানায় পদায়ন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাদের দাবি, কয়েক লাখ টাকার বিনিময়ে বনানী থানায় পোস্টিং নেওয়া হয়েছে এবং অসৎ উদ্দেশ্যে গুরুত্বপূর্ণ এই থানায় দায়িত্ব নেওয়া হয়েছে। তবে এ দাবির সমর্থনে কোনো সরকারি নথি, আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কোনো পুলিশ কর্মকর্তার পোস্টিং সাধারণত সরকারি প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হয়ে থাকে। তাই পোস্টিংয়ের সঙ্গে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ সত্য কি না, তা প্রমাণ করতে হলে বদলির আদেশ, প্রশাসনিক নথি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগকারীরা আরও দাবি করছেন, বর্তমান ওসি অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিভিন্ন থানায় ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং সেই সময়ে বিপুল অর্থ-সম্পদের মালিক হয়েছেন। এমনকি কোটি কোটি টাকা অর্জনের অভিযোগও করা হচ্ছে। তবে এসব দাবির পক্ষে সম্পদ বিবরণী, দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদন, আদালতের নথি বা নির্ভরযোগ্য আর্থিক তথ্য প্রতিবেদকের হাতে পাওয়া যায়নি। পূর্বের প্রতিবেদনে বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের প্রসঙ্গে অভিযোগ খতিয়ে দেখে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
তবে নতুন করে ওসির হোয়াটসঅ্যাপে তথ্য পাঠানোর পর কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে তার সুনির্দিষ্ট বক্তব্য এ প্রতিবেদনে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি। ফলে ওসির বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী সংস্করণে প্রকাশ করা হবে।
আরও পড়ুন: রাজধানীর সড়কে আজ থেকে ‘পিংক বাস’, চালক-কন্ডাক্টর দুজনই নারী
একজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ থাকলে তার বক্তব্য প্রকাশ করা যেমন সাংবাদিকতার নৈতিক দায়িত্ব, তেমনি পুলিশের পক্ষ থেকেও অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত ও অবস্থান পরিষ্কার করা গুরুত্বপূর্ণ।
বনানীতে বৈধভাবে পরিচালিত পার্লার, সেলুন, স্পা বা গেস্ট হাউজকে অপরাধের সঙ্গে এক করে দেখা কোনোভাবেই সমীচীন নয়। এসব থেকে ওসির মাসোহার কোন কুমতি নেই। আবার বৈধ ব্যবসার আড়ালে যদি সত্যিই মাদক, প্রতারণা, মানবপাচার বা অন্য কোনো অপরাধ পরিচালিত হয়, তাহলে সেটিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, আবাসিক ভবনে যদি দীর্ঘদিন ধরে একাধিক বাণিজ্যিক কার্যক্রম চলে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিয়মিত পরিদর্শন করছে কি না। ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, ভবনের ব্যবহার অনুমোদন, অগ্নিনিরাপত্তা ও অন্যান্য বিধিবিধান বাস্তবে কতটা মানা হচ্ছে তা দেখার দাবি জানিয়েছেন তারা।
করিম ভিলা ও লাক্সারি গেস্ট হাউজকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর কিছু গুরুতর হলেও সবগুলোর আইনগত সত্যতা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। একইভাবে বনানী থানার ওসির বিরুদ্ধে মাসোহারা গ্রহণ, অর্থের বিনিময়ে পোস্টিং এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ নতুন কিছু নয়।
বনানীর করিম ভিলা, ডেল্টা ডালিয়ার ‘লাক্সারি’ গেস্ট হাউজ এবং বনানী থানার ওসিকে ঘিরে ওঠা নতুন অভিযোগগুলো এখন একটি নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে। সাংবাদিকদের অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যকে চূড়ান্ত রায় হিসেবে নয়, বরং তদন্তের সূত্র হিসেবে দেখা উচিত। অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনা যেমন জরুরি, তেমনি অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে অভিযুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সুনাম ও অধিকার রক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৯ আগস্ট ২০২৬
রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানীতে আবাসিক ভবনকে কেন্দ্র করে পরিচালিত বিভিন্ন স্পা, পার্লার, সেলুন ও গেস্ট হাউজের কার্যক্রম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে বনানীর ‘করিম ভিলা’ এবং ডেল্টা ডালিয়া ভবনের ষষ্ঠ তলায় পরিচালিত ‘লাক্সারি’ গেস্ট হাউজকে ঘিরে অনৈতিক কর্মকাণ্ড, কথিত মাদক সরবরাহ, অতিথি নিবন্ধন, নিরাপত্তা ও ব্যবসায়িক বৈধতা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠেছে। পূর্বের অনুসন্ধানেও এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে। নতুন করে অভিযোগ উঠেছে, এসব বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য, ছবি ও অভিযোগ বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো হলেও অভিযোগকারীদের প্রত্যাশিত দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা চোখে পড়েনি। অভিযোগকারীদের দাবি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করার পরও সংশ্লিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।তবে পুলিশের পক্ষ থেকে অভিযোগ পাওয়ার পর কোনো ধরনের অভ্যন্তরীণ যাচাই, নজরদারি বা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য এ প্রতিবেদকের হাতে নেই। ফলে বিষয়টি নিশ্চিত করতে পুলিশের বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করা জরুরি।
থানার এসি-টিভি খুলে বাসায় নিলেন ওসি’-শিরোনামে ২০২৩ সালের ২৬ আগস্ট একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। একই দিন অন্য একটি দৈনিকের শিরোনাম ছিল-‘বদলির আদেশ পাওয়ার পর থানার এসি-টেলিভিশন খুলে নিলেন ওসি।’ কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় দৈনিক বা নিউজ পোর্টালসহ প্রায় সব গণমাধ্যমেই খবরটি জায়গা করে নেয়।
যাকে নিয়ে এসব সংবাদ তিনি ছিলেন টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর থানার তৎকালীন ওসি মুহাম্মদ ফরিদুল ইসলাম। থানা থেকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি), টেলিভিশন, আইপিএস ও সোফা সেট নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় ব্যাপক আলোচনায় আসেন তিনি। অভিযোগ ওঠার পর ভূঞাপুর থানা থেকে জেলা পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয় তাকে। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রভাবশালী সেই ফরিদুল এখন রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বনানী থানার ওসি।
আরও পড়ুন: বনানীর আবাসিক ভবনে স্পা-গেস্ট হাউজ এখন অন্ধকার জগৎ
শুধু ফরিদুল ইসলাম একা নন, আওয়ামী আমলের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তারা ফের বিভিন্ন থানায় ওসির দায়িত্ব পাচ্ছেন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে যাদের ঢাকা থেকে দূরবর্তী স্টেশনে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছিল, তাদের পদায়ন দেওয়া হচ্ছে ঢাকায়। পুলিশের উচ্চপর্যায়কে ম্যানেজ করেই এসব পদায়ন হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
তবে বনানীর ‘করিম ভিলা’ নামের আবাসিক ভবনের কয়েকটি ফ্ল্যাটে বিউটি পার্লার, সেলুন ও স্পা-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। বৈধ ব্যবসা পরিচালনার বিষয়টি নিজে কোনো অপরাধ নয়। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো কোনো কার্যক্রমের আড়ালে ভিন্ন ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতে পারে এমন অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, দিনের তুলনায় সন্ধ্যার পর ভবনটিতে অপরিচিত নারী-পুরুষের যাতায়াত বাড়ে। দিনে ও গভীর রাত পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যক্তির চলাচল নিয়েও তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের বক্তব্য, আবাসিক ভবনে বৈধ ব্যবসা থাকতেই পারে; কিন্তু সেই ব্যবসার কারণে অন্য বাসিন্দাদের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিঘ্নিত হলে প্রশাসনের নজরদারি প্রয়োজন।
অভিযোগ রয়েছে, কথিত মধ্যস্থতাকারী বা দালালের মাধ্যমে নির্দিষ্ট গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। পরে তাদের বিভিন্ন পার্লার, সেলুন বা নির্দিষ্ট ফ্ল্যাটে নেওয়া হয় বলেও দাবি রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মোবাইল ফোনের মাধ্যমে যোগাযোগের অভিযোগও পাওয়া গেছে। তবে এসব দাবির পক্ষে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল নথি বা আইনগতভাবে যাচাইকৃত প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে নেই।
আরও পড়ুন: বনানীতে শৈশবের স্পা সেন্টার ঘিরে নারী ও দালাল সিন্ডিকেট
করিম ভিলাকে ঘিরে মাদক সরবরাহের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের কেউ কেউ ইয়াবা, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য সরবরাহের সঙ্গে কথিত একটি চক্র জড়িত থাকার দাবি করেছেন। তবে অনুসন্ধানের সময় কোনো মাদকদ্রব্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক জব্দ, রাসায়নিক পরীক্ষায় শনাক্ত অথবা আদালত বা পুলিশের নথিতে প্রমাণিত হয়েছে। তাই অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। করিম ভিলাকে ঘিরে কথিত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সোলেমান ওরফে সাকিব এবং মাসুদ নামের দুই ব্যক্তির নামও অভিযোগ সূত্রে এসেছে। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ করা হলেও সেগুলোর স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এবিষয়ে ওসিকে একাধিকবার ফোন করলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। যাহা সংবাদ দিগন্তর কাছে প্রমানিত রয়েছে।
সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুযায়ী গুরুতর অভিযোগ প্রকাশের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এ প্রতিবেদনের সময় পর্যন্ত তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য বা অভিযোগের বিষয়ে কোনো নির্ভরযোগ্য নথি পাওয়া গেলে পরবর্তী প্রতিবেদনে তা যথাযথভাবে তুলে ধরা হবে।
অভিযোগের বিভিন্ন দিক যাচাই করতে মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধানের সময় কথিত মাদকদ্রব্যের মূল্য নিয়ে একজনের সঙ্গে কথোপকথন রেকর্ড করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে কোনো কথোপকথন, অডিও বা ভিডিওকে এককভাবে মাদক বিক্রির চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। কথোপকথনের প্রেক্ষাপট, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয়, কথিত আর্থিক লেনদেন এবং বস্তুটির প্রকৃতি আইনগতভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
করিম ভিলার পাশাপাশি বনানীর ডেল্টা ডালিয়া নামের একটি বহুতল ভবনের ষষ্ঠ তলায় পরিচালিত ‘লাক্সারি’ গেস্ট হাউজ নিয়েও উঠেছে একাধিক প্রশ্ন। সাংবাদিকদের অনুসন্ধানে গেস্ট হাউজটির কার্যক্রম, অতিথি নিবন্ধন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও ব্যবসায়িক বৈধতার বিষয়গুলো সামনে আসে। গেস্ট হাউজটির বাইরে স্পষ্ট সাইনবোর্ড না থাকা এবং অতিথিদের পরিচয় যাচাই ও নিবন্ধন সংক্রান্ত নথি সাংবাদিকদের সামনে উপস্থাপন না করার অভিযোগও রয়েছে। অনুসন্ধানের সময় কয়েকজন অবস্থানরত অতিথির সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হয়। তাদের কয়েকজন দাবি করেন, কক্ষ নেওয়ার সময় জাতীয় পরিচয়পত্র জমা বা পরিচয় নিবন্ধনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। তবে এটি গেস্ট হাউজটির নিয়মিত নীতি কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
আরও পড়ুন: দারুস সালামে আবাসিক হোটেলের আড়ালে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ
এ কারণে অতিথি নিবন্ধন খাতা, পরিচয়পত্র সংরক্ষণের তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ এবং ব্যবসা পরিচালনার বৈধ কাগজপত্র যাচাই করা জরুরি বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। অনুসন্ধানের সময় একটি কক্ষে এক তরুণী নারী ও চল্লিশোর্ধ্ব এক ব্যক্তিকে মাদক সেবনের সরঞ্জামসহ দেখা গেছে বলে প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। ওই কক্ষে ট্যাবলেট সদৃশ কিছু বস্তু দেখা যায় বলেও জানানো হয়েছে।
অন্য একটি কক্ষে একজন নারী ও এনামুল হক নামে পরিচয় দেওয়া এক পুরুষকে অবস্থান করতে দেখা যায় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। তবে প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ একই কক্ষে অবস্থান করলেই তা অপরাধের প্রমাণ নয়। মূল বিষয় হলো গেস্ট হাউজ কর্তৃপক্ষ অতিথিদের পরিচয় যথাযথভাবে যাচাই করেছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান অনুসরণ করছে কি না।
গেস্ট হাউজটির অন্যান্য কক্ষ ও কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের সময় আল-আমিন নামের এক ব্যক্তি নিজেকে প্রতিষ্ঠানের মালিক হিসেবে পরিচয় দিয়ে সাংবাদিকদের অনুসন্ধানে বাধা দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবেদকের দাবি, এ সময় সংবাদ প্রকাশ নিয়ে আপত্তি জানিয়ে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। ওই ব্যক্তি স্থানীয় বিএনপি নেতা আনোয়ার হোসেন, সুজন ও শুভসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে তাদের কথিত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার দাবি করেন।
ডেল্টা ডালিয়া ভবনের কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, গত কয়েক বছরে ভবনে অপরিচিত মানুষের যাতায়াত বেড়েছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় বিভিন্ন ব্যক্তির চলাচল নিয়ে পরিবারগুলোর মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। আরেক বাসিন্দা বলেন, ভবনে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোর ট্রেড লাইসেন্স, ব্যবসার অনুমোদন, ভবনের ব্যবহার অনুমোদন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন: রাজধানীতে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান, ২৪ ঘণ্টায় গ্রেপ্তার ৪৮৮
নতুন অভিযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সংশ্লিষ্ট অভিযোগ, ছবি ও তথ্য বনানী থানার ওসির হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করছেন। তাদের প্রশ্ন, কোনো অপরাধের অভিযোগ পুলিশকে জানানো হলে তা যাচাই করা পুলিশের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। তাহলে তথ্য পাওয়ার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন, সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ, নথি যাচাই বা গোপন নজরদারি করা হয়েছে কি না?
এদিকে বনানী থানার ওসির বিরুদ্ধে কিছু প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিত ‘মাসোহারা’ নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, কথিত অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কয়েকটি প্রতিষ্ঠান স্থানীয়ভাবে আর্থিক সুবিধা দিয়ে প্রশাসনিক নজরদারি থেকে নিজেদের দূরে রাখছে। সুতরাং এটি আপাতত অভিযোগ মাত্র। অভিযোগটি সত্য হলে তা অত্যন্ত গুরুতর এবং বিভাগীয় তদন্তের দাবি রাখে। আবার অভিযোগটি মিথ্যা হলে একজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অপপ্রচারেরও প্রশ্ন উঠতে পারে। এ কারণে নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তে যাওয়া উচিত নয়। ওসির বনানী থানায় পদায়ন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাদের দাবি, কয়েক লাখ টাকার বিনিময়ে বনানী থানায় পোস্টিং নেওয়া হয়েছে এবং অসৎ উদ্দেশ্যে গুরুত্বপূর্ণ এই থানায় দায়িত্ব নেওয়া হয়েছে। তবে এ দাবির সমর্থনে কোনো সরকারি নথি, আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কোনো পুলিশ কর্মকর্তার পোস্টিং সাধারণত সরকারি প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হয়ে থাকে। তাই পোস্টিংয়ের সঙ্গে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ সত্য কি না, তা প্রমাণ করতে হলে বদলির আদেশ, প্রশাসনিক নথি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগকারীরা আরও দাবি করছেন, বর্তমান ওসি অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিভিন্ন থানায় ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং সেই সময়ে বিপুল অর্থ-সম্পদের মালিক হয়েছেন। এমনকি কোটি কোটি টাকা অর্জনের অভিযোগও করা হচ্ছে। তবে এসব দাবির পক্ষে সম্পদ বিবরণী, দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদন, আদালতের নথি বা নির্ভরযোগ্য আর্থিক তথ্য প্রতিবেদকের হাতে পাওয়া যায়নি। পূর্বের প্রতিবেদনে বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের প্রসঙ্গে অভিযোগ খতিয়ে দেখে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
তবে নতুন করে ওসির হোয়াটসঅ্যাপে তথ্য পাঠানোর পর কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে তার সুনির্দিষ্ট বক্তব্য এ প্রতিবেদনে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি। ফলে ওসির বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী সংস্করণে প্রকাশ করা হবে।
আরও পড়ুন: রাজধানীর সড়কে আজ থেকে ‘পিংক বাস’, চালক-কন্ডাক্টর দুজনই নারী
একজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ থাকলে তার বক্তব্য প্রকাশ করা যেমন সাংবাদিকতার নৈতিক দায়িত্ব, তেমনি পুলিশের পক্ষ থেকেও অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত ও অবস্থান পরিষ্কার করা গুরুত্বপূর্ণ।
বনানীতে বৈধভাবে পরিচালিত পার্লার, সেলুন, স্পা বা গেস্ট হাউজকে অপরাধের সঙ্গে এক করে দেখা কোনোভাবেই সমীচীন নয়। এসব থেকে ওসির মাসোহার কোন কুমতি নেই। আবার বৈধ ব্যবসার আড়ালে যদি সত্যিই মাদক, প্রতারণা, মানবপাচার বা অন্য কোনো অপরাধ পরিচালিত হয়, তাহলে সেটিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, আবাসিক ভবনে যদি দীর্ঘদিন ধরে একাধিক বাণিজ্যিক কার্যক্রম চলে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিয়মিত পরিদর্শন করছে কি না। ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, ভবনের ব্যবহার অনুমোদন, অগ্নিনিরাপত্তা ও অন্যান্য বিধিবিধান বাস্তবে কতটা মানা হচ্ছে তা দেখার দাবি জানিয়েছেন তারা।
করিম ভিলা ও লাক্সারি গেস্ট হাউজকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর কিছু গুরুতর হলেও সবগুলোর আইনগত সত্যতা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। একইভাবে বনানী থানার ওসির বিরুদ্ধে মাসোহারা গ্রহণ, অর্থের বিনিময়ে পোস্টিং এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ নতুন কিছু নয়।
বনানীর করিম ভিলা, ডেল্টা ডালিয়ার ‘লাক্সারি’ গেস্ট হাউজ এবং বনানী থানার ওসিকে ঘিরে ওঠা নতুন অভিযোগগুলো এখন একটি নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে। সাংবাদিকদের অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যকে চূড়ান্ত রায় হিসেবে নয়, বরং তদন্তের সূত্র হিসেবে দেখা উচিত। অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনা যেমন জরুরি, তেমনি অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে অভিযুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সুনাম ও অধিকার রক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আপনার মতামত লিখুন