দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

বনানীতে ফের সক্রিয় অপরাধচক্র, পুলিশের মাসোহারা

বনানীতে ফের সক্রিয় অপরাধচক্র, পুলিশের মাসোহারা

রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানীতে আবাসিক ভবনে পরিচালিত কয়েকটি গেস্ট হাউজ ও স্পা সেন্টারকে ঘিরে অনৈতিক কর্মকাণ্ড, মাদক সেবন এবং অপরাধীচক্রের তৎপরতার অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সম্প্রতি বনানীর ডেলটা ডালিয়া ভবনের ষষ্ঠ তলায় পরিচালিত একটি গেস্ট হাউজে পুলিশের অভিযানে একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের পরও কয়েকদিনের ব্যবধানে সেখানে আবারও একই ধরনের কার্যক্রম শুরু হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে বনানীর ২৭ নম্বর সড়কের করিম ভিলা ভবনকে ঘিরেও একটি লাক্সারি গেস্ট হাউজ ও স্পা এবং সংশ্লিষ্ট মাদকচক্রের তৎপরতা নিয়ে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান কিংবা গ্রেপ্তারের পর কিছুদিন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও পরবর্তীতে আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠে সংশ্লিষ্ট চক্র। ফলে প্রশ্ন উঠেছে শুধু অভিযান ও গ্রেপ্তার করলেই কি এসব কর্মকাণ্ড বন্ধ করা সম্ভব, নাকি এর পেছনে থাকা মূল হোতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন?

আরও পড়ুন: বনানীতে স্পা-গেস্ট হাউজ ঘিরে ওসির বিরুদ্ধে অভিযোগ

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, বনানীর ডেলটা ডালিয়া ভবনের ষষ্ঠ তলায় পরিচালিত একটি গেস্ট হাউজে সম্প্রতি পুলিশের অভিযান চালানো হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, সেখানে অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও মাদক সেবনের সময় কয়েকজনকে আটক/গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযানের পর সাময়িকভাবে কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও কয়েকদিন পরই পুনরায় আগের পরিবেশ ফিরে আসার অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, কোনো একটি স্থাপনায় অভিযান পরিচালনার পর যদি একই ধরনের কার্যক্রম আবারও শুরু হয়, তাহলে শুধু সেখানে উপস্থিত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার নয় কারা এটি পরিচালনা করছে, কারা অর্থের জোগান দিচ্ছে, কারা ভাড়া দিয়েছে এবং কারা নিয়মিত যাতায়াত করছে এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনা জরুরি। অভিযোগ রয়েছে, ডেলটা ডালিয়ার ষষ্ঠ তলার ওই গেস্ট হাউজটি শুভসহ কয়েকজন ব্যক্তি পরিচালনা করেন। তবে এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

আরও পড়ুন: গুলশান ২৬-এ কথিত গেস্ট হাউস সিন্ডিকেটের রহস্য

এদিকে বনানীর ২৭ নম্বর সড়কের ৬৫/এ করিমস ভিলা ভবনকে ঘিরেও নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, ভবনটির একটি অংশে লাক্সারি গেস্ট হাউজ ও স্পা ব্যবসার আড়ালে অনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং মাদক সংশ্লিষ্ট একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, গেস্ট হাউজে আগত ব্যক্তিদের পরিচয় ও অবস্থানের বিষয়ে যথাযথ নজরদারি না থাকলে আবাসিক এলাকায় অপরাধীচক্রের নিরাপদ আস্তানা গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে নিয়মিতভাবে ভাড়াটিয়া বা অতিথিদের তথ্য সংরক্ষণ, পরিচয় যাচাই, সিসিটিভি নজরদারি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন রয়েছে কি না এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তবে করিম ভিলাকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও নথিপত্র যাচাই ছাড়া কোনো অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা সমীচীন নয়। সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে। সংশ্লিষ্ট গেস্ট হাউজগুলোর মালিক বা পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত কয়েকজনের দাবি তাদের ব্যবসা সম্পর্কে স্থানীয় থানা পুলিশ অবগত এবং পুলিশের ‘নলেজে’ রেখেই ব্যবসা পরিচালনা করতে হয়। তবে মোবাইল ফোনে জানা গেছে মাসুদ রনা নামের এক ব্যক্তি।

এমন বক্তব্য সত্য হলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্তের দাবি রাখে। কারণ কোনো অবৈধ কার্যক্রম সম্পর্কে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে তথ্য থাকার পরও তা বন্ধ না হলে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। তবে গেস্ট হাউজ মালিকদের এমন দাবির স্বাধীন কোনো প্রমাণ এই প্রতিবেদকের হাতে নেই। ফলে তাদের বক্তব্যকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্য ছাড়া এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও সম্ভব নয়।

আরও পড়ুন: বরেন্দ্র এক্সপ্রেসের স্প্রিং ভেঙে সাময়িকভাবে রেল চলাচল বন্ধ

গেস্ট হাউজ ও স্পা ব্যবসাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ে পুলিশের কোনো কোনো সদস্য নিয়মিত অর্থ গ্রহণ করেন এমন অভিযোগও উঠেছে। কয়েকটি সূত্র দাবি করেছে, এসব প্রতিষ্ঠান থেকে কথিত ‘মাসোহারা’ যাওয়ার কারণে কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পরও ব্যবসা আবার চালু করার সুযোগ তৈরি হয়। তবে কোনো পুলিশ কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে মাসোহারা গ্রহণ করেন ওসি। 

অভিযোগগুলোর বিষয়ে বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বক্তব্য জানতে সংবাদকর্মীরা একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। পাশাপাশি তার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে বার্তা পাঠিয়ে ডেলটা ডালিয়া ও করিম ভিলা-সংক্রান্ত অভিযোগ, পুলিশের অভিযান এবং গেস্ট হাউজগুলো পুনরায় অপরাধের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। কিন্তু প্রতিবেদন প্রস্তুত করা পর্যন্ত তিনি ফোন রিসিভ করেননি এবং অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্যও পাওয়া যায়নি। এতে স্পষ্ট বোঝা যায় ওসি ও বনানী থানার পুলিশ কর্মকর্তাদের অপরাধীদেও সাথে সম্পৃক্তা রয়েছে।

একজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্য এ ধরনের প্রতিবেদনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অভিযোগের সত্যতা, অভিযানের বিস্তারিত, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা, গেস্ট হাউজের বৈধতা এবং পরবর্তী ব্যবস্থা সম্পর্কে পুলিশের কাছ থেকেই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া সম্ভব। বনানীর মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও আবাসিক এলাকায় গেস্ট হাউজ, কিংবা স্পা পরিচালনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটির বৈধ ট্রেড লাইসেন্স, ভবন ব্যবহারের অনুমোদন, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, অতিথি নিবন্ধন এবং অন্যান্য প্রযোজ্য অনুমোদন রয়েছে কি না এসব বিষয় যাচাই করা জরুরি। শুধু একটি ট্রেড লাইসেন্স থাকলেই কোনো প্রতিষ্ঠানে যেকোনো ধরনের কার্যক্রম পরিচালনার বৈধতা পাওয়া যায় না। প্রতিষ্ঠানটি যে ধরনের ব্যবসা করছে, তার সঙ্গে অনুমোদিত ব্যবসার ধরন মিলছে কি না, ভবনের ব্যবহার অনুমোদিত কি না এবং নিরাপত্তা বিধি মানা হচ্ছে কি না এসব প্রশ্নের উত্তরও প্রয়োজন।

আরও পড়ুন: মির্জা ফখরুলের শপথে তারেক রহমানের শুভকামনা

অভিজ্ঞ মহলের মতে, কোনো গেস্ট হাউজে অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করার পর যদি মূল পরিচালনাকারী বা অর্থদাতাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে একই ব্যবসা অন্য নামে বা একই ভবনে পুনরায় চালু হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।

এ ক্ষেত্রে তদন্তে কয়েকটি বিষয় গুরুত্ব পাওয়া উচিত প্রতিষ্ঠানটির মালিকানা কার, ভাড়া নিয়েছেন কে, পরিচালনা করেন কারা, অতিথিদের রেজিস্টার সংরক্ষণ করা হয় কি না, সিসিটিভি ফুটেজ কী বলছে, কোনো মাদক উদ্ধার হয়েছে কি না, পূর্বের মামলায় গ্রেপ্তারদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং অভিযানের পর প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে পুনরায় কার্যক্রম শুরু করল।

একই সঙ্গে স্থানীয় থানা পুলিশের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সেটিও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা দরকার। এতে একদিকে যেমন পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগের অবসান হবে, অন্যদিকে সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।

বনানীর বিভিন্ন আবাসিক ভবনে গেস্ট হাউজ ও স্পা ব্যবসাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অভিযোগ রয়েছে। সব প্রতিষ্ঠান অবৈধ বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত এমন ধারণা অবশ্যই সঠিক নয়। অনেক বৈধ প্রতিষ্ঠান নিয়ম মেনে ব্যবসা পরিচালনা করে থাকে। কিন্তু বৈধ ব্যবসার আড়ালে যদি কোনো প্রতিষ্ঠান অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে, তাহলে সেটি শুধু আইনশৃঙ্খলার জন্য নয়, আশপাশের সাধারণ বাসিন্দাদের নিরাপত্তার জন্যও হুমকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে মাদক সেবন, অপরাধীচক্রের আনাগোনা কিংবা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্ট ভবনের অন্যান্য বাসিন্দারাও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে পারেন।

আরও পড়ুন: জাতীয় স্মৃতিসৌধে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুলের শ্রদ্ধা

ডেলটা ডালিয়া ভবনের ষষ্ঠ তলা এবং বনানীর ২৭ নম্বর সড়কের করিম ভিলাকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের বিষয়টি এখন অলোচনায়। পুলিশ যদি বলে থাকে যে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তাহলে সেই অভিযানের ফলাফল জনসমক্ষে স্পষ্ট করা উচিত। আর যদি কোনো প্রতিষ্ঠান বৈধভাবে পরিচালিত হয়, তাহলে তাদের বৈধতার নথিও যাচাই করে অভিযোগের অবসান ঘটানো যেতে পারে। সবশেষে প্রশ্ন একটাই অভিযানের পরও যদি কয়েকদিনের মধ্যে একই ধরনের কার্যক্রম আবার শুরু হয়, তাহলে এর পেছনে কারা রয়েছে?

বিষয় : অপরাধ বনানী গেষ্ট হাউজ

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

শনিবার, ২২ আগস্ট ২০২৬


বনানীতে ফের সক্রিয় অপরাধচক্র, পুলিশের মাসোহারা

প্রকাশের তারিখ : ২২ আগস্ট ২০২৬

featured Image

রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানীতে আবাসিক ভবনে পরিচালিত কয়েকটি গেস্ট হাউজ ও স্পা সেন্টারকে ঘিরে অনৈতিক কর্মকাণ্ড, মাদক সেবন এবং অপরাধীচক্রের তৎপরতার অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সম্প্রতি বনানীর ডেলটা ডালিয়া ভবনের ষষ্ঠ তলায় পরিচালিত একটি গেস্ট হাউজে পুলিশের অভিযানে একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের পরও কয়েকদিনের ব্যবধানে সেখানে আবারও একই ধরনের কার্যক্রম শুরু হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে বনানীর ২৭ নম্বর সড়কের করিম ভিলা ভবনকে ঘিরেও একটি লাক্সারি গেস্ট হাউজ ও স্পা এবং সংশ্লিষ্ট মাদকচক্রের তৎপরতা নিয়ে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান কিংবা গ্রেপ্তারের পর কিছুদিন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও পরবর্তীতে আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠে সংশ্লিষ্ট চক্র। ফলে প্রশ্ন উঠেছে শুধু অভিযান ও গ্রেপ্তার করলেই কি এসব কর্মকাণ্ড বন্ধ করা সম্ভব, নাকি এর পেছনে থাকা মূল হোতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন?

আরও পড়ুন: বনানীতে স্পা-গেস্ট হাউজ ঘিরে ওসির বিরুদ্ধে অভিযোগ

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, বনানীর ডেলটা ডালিয়া ভবনের ষষ্ঠ তলায় পরিচালিত একটি গেস্ট হাউজে সম্প্রতি পুলিশের অভিযান চালানো হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, সেখানে অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও মাদক সেবনের সময় কয়েকজনকে আটক/গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযানের পর সাময়িকভাবে কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও কয়েকদিন পরই পুনরায় আগের পরিবেশ ফিরে আসার অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, কোনো একটি স্থাপনায় অভিযান পরিচালনার পর যদি একই ধরনের কার্যক্রম আবারও শুরু হয়, তাহলে শুধু সেখানে উপস্থিত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার নয় কারা এটি পরিচালনা করছে, কারা অর্থের জোগান দিচ্ছে, কারা ভাড়া দিয়েছে এবং কারা নিয়মিত যাতায়াত করছে এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনা জরুরি। অভিযোগ রয়েছে, ডেলটা ডালিয়ার ষষ্ঠ তলার ওই গেস্ট হাউজটি শুভসহ কয়েকজন ব্যক্তি পরিচালনা করেন। তবে এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

আরও পড়ুন: গুলশান ২৬-এ কথিত গেস্ট হাউস সিন্ডিকেটের রহস্য

এদিকে বনানীর ২৭ নম্বর সড়কের ৬৫/এ করিমস ভিলা ভবনকে ঘিরেও নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, ভবনটির একটি অংশে লাক্সারি গেস্ট হাউজ ও স্পা ব্যবসার আড়ালে অনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং মাদক সংশ্লিষ্ট একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, গেস্ট হাউজে আগত ব্যক্তিদের পরিচয় ও অবস্থানের বিষয়ে যথাযথ নজরদারি না থাকলে আবাসিক এলাকায় অপরাধীচক্রের নিরাপদ আস্তানা গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে নিয়মিতভাবে ভাড়াটিয়া বা অতিথিদের তথ্য সংরক্ষণ, পরিচয় যাচাই, সিসিটিভি নজরদারি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন রয়েছে কি না এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তবে করিম ভিলাকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও নথিপত্র যাচাই ছাড়া কোনো অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা সমীচীন নয়। সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে। সংশ্লিষ্ট গেস্ট হাউজগুলোর মালিক বা পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত কয়েকজনের দাবি তাদের ব্যবসা সম্পর্কে স্থানীয় থানা পুলিশ অবগত এবং পুলিশের ‘নলেজে’ রেখেই ব্যবসা পরিচালনা করতে হয়। তবে মোবাইল ফোনে জানা গেছে মাসুদ রনা নামের এক ব্যক্তি।

এমন বক্তব্য সত্য হলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্তের দাবি রাখে। কারণ কোনো অবৈধ কার্যক্রম সম্পর্কে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে তথ্য থাকার পরও তা বন্ধ না হলে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। তবে গেস্ট হাউজ মালিকদের এমন দাবির স্বাধীন কোনো প্রমাণ এই প্রতিবেদকের হাতে নেই। ফলে তাদের বক্তব্যকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্য ছাড়া এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও সম্ভব নয়।

আরও পড়ুন: বরেন্দ্র এক্সপ্রেসের স্প্রিং ভেঙে সাময়িকভাবে রেল চলাচল বন্ধ

গেস্ট হাউজ ও স্পা ব্যবসাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ে পুলিশের কোনো কোনো সদস্য নিয়মিত অর্থ গ্রহণ করেন এমন অভিযোগও উঠেছে। কয়েকটি সূত্র দাবি করেছে, এসব প্রতিষ্ঠান থেকে কথিত ‘মাসোহারা’ যাওয়ার কারণে কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পরও ব্যবসা আবার চালু করার সুযোগ তৈরি হয়। তবে কোনো পুলিশ কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে মাসোহারা গ্রহণ করেন ওসি। 

অভিযোগগুলোর বিষয়ে বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বক্তব্য জানতে সংবাদকর্মীরা একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। পাশাপাশি তার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে বার্তা পাঠিয়ে ডেলটা ডালিয়া ও করিম ভিলা-সংক্রান্ত অভিযোগ, পুলিশের অভিযান এবং গেস্ট হাউজগুলো পুনরায় অপরাধের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। কিন্তু প্রতিবেদন প্রস্তুত করা পর্যন্ত তিনি ফোন রিসিভ করেননি এবং অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্যও পাওয়া যায়নি। এতে স্পষ্ট বোঝা যায় ওসি ও বনানী থানার পুলিশ কর্মকর্তাদের অপরাধীদেও সাথে সম্পৃক্তা রয়েছে।

একজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্য এ ধরনের প্রতিবেদনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অভিযোগের সত্যতা, অভিযানের বিস্তারিত, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা, গেস্ট হাউজের বৈধতা এবং পরবর্তী ব্যবস্থা সম্পর্কে পুলিশের কাছ থেকেই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া সম্ভব। বনানীর মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও আবাসিক এলাকায় গেস্ট হাউজ, কিংবা স্পা পরিচালনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটির বৈধ ট্রেড লাইসেন্স, ভবন ব্যবহারের অনুমোদন, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, অতিথি নিবন্ধন এবং অন্যান্য প্রযোজ্য অনুমোদন রয়েছে কি না এসব বিষয় যাচাই করা জরুরি। শুধু একটি ট্রেড লাইসেন্স থাকলেই কোনো প্রতিষ্ঠানে যেকোনো ধরনের কার্যক্রম পরিচালনার বৈধতা পাওয়া যায় না। প্রতিষ্ঠানটি যে ধরনের ব্যবসা করছে, তার সঙ্গে অনুমোদিত ব্যবসার ধরন মিলছে কি না, ভবনের ব্যবহার অনুমোদিত কি না এবং নিরাপত্তা বিধি মানা হচ্ছে কি না এসব প্রশ্নের উত্তরও প্রয়োজন।

আরও পড়ুন: মির্জা ফখরুলের শপথে তারেক রহমানের শুভকামনা

অভিজ্ঞ মহলের মতে, কোনো গেস্ট হাউজে অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করার পর যদি মূল পরিচালনাকারী বা অর্থদাতাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে একই ব্যবসা অন্য নামে বা একই ভবনে পুনরায় চালু হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।

এ ক্ষেত্রে তদন্তে কয়েকটি বিষয় গুরুত্ব পাওয়া উচিত প্রতিষ্ঠানটির মালিকানা কার, ভাড়া নিয়েছেন কে, পরিচালনা করেন কারা, অতিথিদের রেজিস্টার সংরক্ষণ করা হয় কি না, সিসিটিভি ফুটেজ কী বলছে, কোনো মাদক উদ্ধার হয়েছে কি না, পূর্বের মামলায় গ্রেপ্তারদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং অভিযানের পর প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে পুনরায় কার্যক্রম শুরু করল।

একই সঙ্গে স্থানীয় থানা পুলিশের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সেটিও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা দরকার। এতে একদিকে যেমন পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগের অবসান হবে, অন্যদিকে সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।

বনানীর বিভিন্ন আবাসিক ভবনে গেস্ট হাউজ ও স্পা ব্যবসাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অভিযোগ রয়েছে। সব প্রতিষ্ঠান অবৈধ বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত এমন ধারণা অবশ্যই সঠিক নয়। অনেক বৈধ প্রতিষ্ঠান নিয়ম মেনে ব্যবসা পরিচালনা করে থাকে। কিন্তু বৈধ ব্যবসার আড়ালে যদি কোনো প্রতিষ্ঠান অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে, তাহলে সেটি শুধু আইনশৃঙ্খলার জন্য নয়, আশপাশের সাধারণ বাসিন্দাদের নিরাপত্তার জন্যও হুমকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে মাদক সেবন, অপরাধীচক্রের আনাগোনা কিংবা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্ট ভবনের অন্যান্য বাসিন্দারাও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে পারেন।

আরও পড়ুন: জাতীয় স্মৃতিসৌধে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুলের শ্রদ্ধা

ডেলটা ডালিয়া ভবনের ষষ্ঠ তলা এবং বনানীর ২৭ নম্বর সড়কের করিম ভিলাকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের বিষয়টি এখন অলোচনায়। পুলিশ যদি বলে থাকে যে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তাহলে সেই অভিযানের ফলাফল জনসমক্ষে স্পষ্ট করা উচিত। আর যদি কোনো প্রতিষ্ঠান বৈধভাবে পরিচালিত হয়, তাহলে তাদের বৈধতার নথিও যাচাই করে অভিযোগের অবসান ঘটানো যেতে পারে। সবশেষে প্রশ্ন একটাই অভিযানের পরও যদি কয়েকদিনের মধ্যে একই ধরনের কার্যক্রম আবার শুরু হয়, তাহলে এর পেছনে কারা রয়েছে?



দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

সম্পাদক ও প্রকাশক: এ বি এম মনিরুজ্জামান 
নির্বাহী সম্পাদক: রিপন রুদ্র
যুগ্ম সম্পাদক: জাকিয়া সুলতানা (লাভলী)

কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক সংবাদ দিগন্ত । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত