দেশে চাঁদাবাজি, অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে আলোচনা হলেই একটি অদ্ভুত দ্বৈত মানদণ্ড সামনে আসে। পুলিশের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে মাসোহারা গ্রহণ, অপরাধীদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ নেওয়া কিংবা অবৈধ কর্মকাণ্ডে নীরব সমর্থন দেওয়ার অভিযোগ উঠলে অনেক ক্ষেত্রেই তা নিয়ে তেমন আলোচনা হয় না। কিন্তু কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অর্থ গ্রহণের অভিযোগ উঠলেই তাঁকে চাঁদাবাজ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা দেখা যায়। প্রশ্ন হচ্ছে, অনৈতিকভাবে অর্থ বা সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ যদি অপরাধ হয়, তাহলে সেটি পুলিশ, সাংবাদিক কিংবা অন্য যে পেশার মানুষের বিরুদ্ধেই উঠুক না কেন, একই মানদণ্ডে বিচার হবে না কেন? সাংবাদিকতা একটি দায়িত্বশীল পেশা। রাষ্ট্র, সমাজ ও জনগণের কাছে সংবাদ তুলে ধরা, অনিয়ম-দুর্নীতি প্রকাশ করা এবং ক্ষমতাবানদের জবাবদিহির আওতায় আনাই সাংবাদিকদের অন্যতম দায়িত্ব। অন্যদিকে পুলিশের দায়িত্ব অপরাধ দমন, নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা। দুটি পেশার দায়িত্ব আলাদা হলেও উভয়ের কাছেই সততা, পেশাগত নৈতিকতা ও জবাবদিহি প্রত্যাশিত। কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যায়, কোনো এলাকায় অবৈধ ব্যবসা, মাদক কারবার, জুয়া, চাঁদাবাজি কিংবা বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠে। কোথাও কোথাও অভিযোগ থাকে, অপরাধী চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সখ্য রয়েছে, নিয়মিত মাসোহারা নেওয়া হয় কিংবা অর্থের বিনিময়ে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা জরুরি। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। অথচ কোনো সাংবাদিক কোনো ব্যবসায়ী, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা কিংবা সামাজিক ব্যক্তিত্বের কাছ থেকে ব্যক্তিগত সৌজন্য উপহার গ্রহণ করলে অনেক সময় সেটিকেও চাঁদাবাজির অভিযোগের সঙ্গে এক করে দেখা হয়। এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য বোঝা প্রয়োজন। কাউকে ভয়ভীতি দেখিয়ে, সংবাদ প্রকাশের হুমকি দিয়ে কিংবা সংবাদ বন্ধ রাখার শর্তে অর্থ আদায় করা অবশ্যই অপরাধ। কিন্তু কোনো ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কাউকে উপহার দিলে, সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে চাঁদাবাজি হয়ে যায় না।
আরও পড়ুন,জীবিকার বনেই নিরাপত্তাহীন বনজীবীরা
তবে উপহারের বিনিময়ে সংবাদ প্রকাশ, সংবাদ গোপন কিংবা পেশাগত সিদ্ধান্ত প্রভাবিত হলে সেটিও সাংবাদিকতার নৈতিকতার পরিপন্থী। প্রশ্ন হচ্ছে, পুলিশের কোনো সদস্য যদি কোনো অপরাধী, ব্যবসায়ী কিংবা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ গ্রহণ করেন, তাহলে সেটিকে কি শুধু সৌজন্য উপহার বলা যাবে? নিশ্চয়ই নয়। একইভাবে সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যদি অর্থ দাবি করেন, ভয় দেখান কিংবা সংবাদ প্রকাশের হুমকি দেন, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। অর্থাৎ পেশার পরিচয় কাউকে অপরাধের দায় থেকে মুক্তি দিতে পারে না। বর্তমানে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করতে গিয়ে অনেক সাংবাদিককে নানা ধরনের চাপের মুখে পড়তে হয়। কোনো প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম, দুর্নীতি, অবৈধ ব্যবসা, মাদক কারবার, দখলবাজি কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে সংবাদ প্রকাশের উদ্যোগ নিলেই সংশ্লিষ্ট মহলের কেউ কেউ সাংবাদিককে বিতর্কিত করার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কোনো প্রতিবেদনের তথ্য জানতে চাওয়া, বক্তব্য নেওয়া কিংবা অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করাকে অনেক সময় ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়। আবার কোথাও ব্যক্তিগত বিরোধ, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব কিংবা সংবাদ প্রকাশের প্রতিশোধ নিতে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ তোলার ঘটনাও ঘটতে পারে। তবে এসব অভিযোগের প্রতিটিই প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করতে হবে। একই সঙ্গে সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে যারা প্রকৃত অর্থেই চাঁদাবাজি, ব্ল্যাকমেইলিং কিংবা ভয়ভীতি প্রদর্শনের সঙ্গে জড়িত, তাদের পক্ষেও কোনো অবস্থান নেওয়ার সুযোগ নেই। অপসাংবাদিকতা ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সাংবাদিক সমাজকেই সোচ্চার হতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে মাসোহারা গ্রহণের অভিযোগ উঠলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। কারণ একজন পুলিশ সদস্যের দায়িত্ব অপরাধ দমন করা। তিনি যদি অর্থের বিনিময়ে অপরাধীদের আশ্রয় দেন কিংবা অবৈধ কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করেন, তাহলে সেটি শুধু ব্যক্তিগত দুর্নীতি নয়, রাষ্ট্রীয় দায়িত্বেরও গুরুতর লঙ্ঘন। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ ব্যবসা, মাদক কারবার, চাঁদাবাজি, জুয়া, অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠান কিংবা বিভিন্ন অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। কোথাও কোথাও স্থানীয় পর্যায়ে মাসোহারা বাণিজ্যের অভিযোগও শোনা যায়। এসব অভিযোগের সত্যতা অনুসন্ধানে পুলিশের নিজস্ব গোয়েন্দা বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন,কসবায় ২২ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৪৫ মেধাবী শিক্ষার্থীকে আর্থিক সহায়তা
কোনো থানার আওতাধীন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ কর্মকাণ্ড চললেও পুলিশ কেন ব্যবস্থা নিচ্ছে না, কারা এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কী ভূমিকা পালন করছেন এসব প্রশ্নের জবাবদিহি থাকতে হবে। সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। ব্যক্তিগত সৌজন্য, সামাজিক সম্পর্ক কিংবা কোনো উপলক্ষে স্বেচ্ছায় দেওয়া উপহার এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায় এক বিষয় নয়। চাঁদাবাজির ক্ষেত্রে জবরদস্তি, ভয়ভীতি, হুমকি কিংবা অন্যায় চাপের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে উপহার গ্রহণের ক্ষেত্রেও সাংবাদিকের পেশাগত নিরপেক্ষতা ও স্বার্থের সংঘাতের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। কোনো সাংবাদিক যদি অর্থের বিনিময়ে সংবাদ প্রকাশ করেন, বিজ্ঞাপনকে সংবাদ হিসেবে উপস্থাপন করেন কিংবা অর্থের বিনিময়ে কোনো অপরাধের তথ্য গোপন করেন, তাহলে তা পেশাগত অসততা। আবার কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে তাঁর অনুসন্ধানী কাজ বন্ধ করার চেষ্টা করাও গ্রহণযোগ্য নয়। পুলিশ অবৈধ হোটেল, মাদক ব্যবসায়ী, গেষ্ট হাউস, অবৈধ স্পা, কিংবা ফুটপাত থেকে চাঁদা বা মাসোহার নিলে কি বৈধ তা জাতি জানতে চায়।আইনের শাসনের মূলনীতি হচ্ছে, অপরাধের বিচার হবে প্রমাণের ভিত্তিতে, পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়। পুলিশ, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী কিংবা অন্য কোনো পেশার মানুষ কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন। পুলিশের বিরুদ্ধে মাসোহারা গ্রহণের অভিযোগ থাকলে নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। সাংবাদিকের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ থাকলেও প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু কোনো পেশার মানুষের বিরুদ্ধে ঢালাও অপবাদ দেওয়া কিংবা কোনো পেশাকে দায়মুক্তি দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। সাংবাদিকদের জন্য যেমন পেশাগত নীতিমালা ও স্বচ্ছতা প্রয়োজন, তেমনি পুলিশের জন্যও কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কোনো অভিযোগ উঠলেই কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা যাবে না। আবার পদ-পদবি কিংবা পেশাগত পরিচয়ের কারণে কাউকে দায়মুক্তিও দেওয়া যাবে না। সবশেষে প্রশ্ন একটাই—পুলিশের বিরুদ্ধে মাসোহারা গ্রহণের অভিযোগ উঠলে যদি তদন্ত প্রয়োজন হয়, তাহলে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠলেও তদন্ত প্রয়োজন। আর সাংবাদিকের স্বেচ্ছায় পাওয়া উপহারকে যদি চাঁদাবাজি বলা হয়, তাহলে পুলিশের অনৈতিক সুবিধা গ্রহণকে কোনোভাবেই বৈধতা দেওয়ার সুযোগ নেই। অপরাধের বিচার হোক অপরাধের ভিত্তিতে, পেশার পরিচয়ে নয়। সাংবাদিকতা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী—উভয় ক্ষেত্রেই সততা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হলেই সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরে আসবে।
আরও পড়ুন,টেংরাগিরির ১৪ হরিণের মধ্যে এখন বেঁচে আছে মাত্র ৩টি
কারণ রাষ্ট্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে সবার জন্য একই আইন ও একই নৈতিক মানদণ্ড কার্যকর থাকতে হবে। এবিষয়ে আইন বিশেষজ্ঞেরা বলেন, আইনের দৃষ্টিতে চাঁদাবাজি ও স্বেচ্ছায় দেওয়া উপহার সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ভয়ভীতি প্রদর্শন, হুমকি, চাপ সৃষ্টি কিংবা সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় করা হলে তা পরিস্থিতি ও প্রমাণের ভিত্তিতে দণ্ডবিধির ৩৮৩ ও ৩৮৪ ধারায় চাঁদাবাজির অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে কোনো ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কাউকে উপহার বা আর্থিক সহযোগিতা দিলে সেটিকে সরাসরি চাঁদাবাজি বলা যায় না। একইভাবে পুলিশের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে মাসোহারা গ্রহণ, অপরাধীদের কাছ থেকে অবৈধ সুবিধা নেওয়া কিংবা দায়িত্ব পালনে অনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠলে সেটিও তদন্তসাপেক্ষে দুর্নীতি ও অন্যান্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। আইনের প্রয়োগে পুলিশ ও সাংবাদিকদের জন্য আলাদা কোনো মানদণ্ড নেই। সাংবাদিক পরিচয় যেমন কাউকে চাঁদাবাজির দায় থেকে রক্ষা করে না, তেমনি পুলিশের পোশাকও কাউকে দুর্নীতির দায়মুক্তি দেয় না। অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা যাবে না; নিরপেক্ষ তদন্ত ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণের মাধ্যমে অপরাধ প্রমাণ করতে হবে। আমার মতে, পেশাগত পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে হয়রানি কিংবা কাউকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সবার জন্য সমান বিচার নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তবে এসব অপরাধে পুলিশের শাস্তির বিধান রয়েছে? বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে পুলিশ সদস্যরাও অপরাধ করলে শাস্তির আওতাভুক্ত। দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা অনুযায়ী ঘুষ, অবৈধ সুবিধা গ্রহণ কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে সম্পদ অর্জনের অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। দণ্ডবিধির ১৬৬ ধারায় দায়িত্ব পালনে আইন অমান্য করে ক্ষতিসাধনের জন্য সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। ২১৭ ধারায় অপরাধীকে শাস্তি থেকে বাঁচাতে আইন অমান্য করলে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। পাশাপাশি বিভাগীয় ব্যবস্থায় চাকরিচ্যুতিও হতে পারে।

শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩১ অক্টোবর ২০২৬
দেশে চাঁদাবাজি, অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে আলোচনা হলেই একটি অদ্ভুত দ্বৈত মানদণ্ড সামনে আসে। পুলিশের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে মাসোহারা গ্রহণ, অপরাধীদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ নেওয়া কিংবা অবৈধ কর্মকাণ্ডে নীরব সমর্থন দেওয়ার অভিযোগ উঠলে অনেক ক্ষেত্রেই তা নিয়ে তেমন আলোচনা হয় না। কিন্তু কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অর্থ গ্রহণের অভিযোগ উঠলেই তাঁকে চাঁদাবাজ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা দেখা যায়। প্রশ্ন হচ্ছে, অনৈতিকভাবে অর্থ বা সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ যদি অপরাধ হয়, তাহলে সেটি পুলিশ, সাংবাদিক কিংবা অন্য যে পেশার মানুষের বিরুদ্ধেই উঠুক না কেন, একই মানদণ্ডে বিচার হবে না কেন? সাংবাদিকতা একটি দায়িত্বশীল পেশা। রাষ্ট্র, সমাজ ও জনগণের কাছে সংবাদ তুলে ধরা, অনিয়ম-দুর্নীতি প্রকাশ করা এবং ক্ষমতাবানদের জবাবদিহির আওতায় আনাই সাংবাদিকদের অন্যতম দায়িত্ব। অন্যদিকে পুলিশের দায়িত্ব অপরাধ দমন, নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা। দুটি পেশার দায়িত্ব আলাদা হলেও উভয়ের কাছেই সততা, পেশাগত নৈতিকতা ও জবাবদিহি প্রত্যাশিত। কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যায়, কোনো এলাকায় অবৈধ ব্যবসা, মাদক কারবার, জুয়া, চাঁদাবাজি কিংবা বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠে। কোথাও কোথাও অভিযোগ থাকে, অপরাধী চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সখ্য রয়েছে, নিয়মিত মাসোহারা নেওয়া হয় কিংবা অর্থের বিনিময়ে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা জরুরি। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। অথচ কোনো সাংবাদিক কোনো ব্যবসায়ী, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা কিংবা সামাজিক ব্যক্তিত্বের কাছ থেকে ব্যক্তিগত সৌজন্য উপহার গ্রহণ করলে অনেক সময় সেটিকেও চাঁদাবাজির অভিযোগের সঙ্গে এক করে দেখা হয়। এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য বোঝা প্রয়োজন। কাউকে ভয়ভীতি দেখিয়ে, সংবাদ প্রকাশের হুমকি দিয়ে কিংবা সংবাদ বন্ধ রাখার শর্তে অর্থ আদায় করা অবশ্যই অপরাধ। কিন্তু কোনো ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কাউকে উপহার দিলে, সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে চাঁদাবাজি হয়ে যায় না।
আরও পড়ুন,জীবিকার বনেই নিরাপত্তাহীন বনজীবীরা
তবে উপহারের বিনিময়ে সংবাদ প্রকাশ, সংবাদ গোপন কিংবা পেশাগত সিদ্ধান্ত প্রভাবিত হলে সেটিও সাংবাদিকতার নৈতিকতার পরিপন্থী। প্রশ্ন হচ্ছে, পুলিশের কোনো সদস্য যদি কোনো অপরাধী, ব্যবসায়ী কিংবা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ গ্রহণ করেন, তাহলে সেটিকে কি শুধু সৌজন্য উপহার বলা যাবে? নিশ্চয়ই নয়। একইভাবে সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যদি অর্থ দাবি করেন, ভয় দেখান কিংবা সংবাদ প্রকাশের হুমকি দেন, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। অর্থাৎ পেশার পরিচয় কাউকে অপরাধের দায় থেকে মুক্তি দিতে পারে না। বর্তমানে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করতে গিয়ে অনেক সাংবাদিককে নানা ধরনের চাপের মুখে পড়তে হয়। কোনো প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম, দুর্নীতি, অবৈধ ব্যবসা, মাদক কারবার, দখলবাজি কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে সংবাদ প্রকাশের উদ্যোগ নিলেই সংশ্লিষ্ট মহলের কেউ কেউ সাংবাদিককে বিতর্কিত করার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কোনো প্রতিবেদনের তথ্য জানতে চাওয়া, বক্তব্য নেওয়া কিংবা অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করাকে অনেক সময় ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়। আবার কোথাও ব্যক্তিগত বিরোধ, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব কিংবা সংবাদ প্রকাশের প্রতিশোধ নিতে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ তোলার ঘটনাও ঘটতে পারে। তবে এসব অভিযোগের প্রতিটিই প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করতে হবে। একই সঙ্গে সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে যারা প্রকৃত অর্থেই চাঁদাবাজি, ব্ল্যাকমেইলিং কিংবা ভয়ভীতি প্রদর্শনের সঙ্গে জড়িত, তাদের পক্ষেও কোনো অবস্থান নেওয়ার সুযোগ নেই। অপসাংবাদিকতা ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সাংবাদিক সমাজকেই সোচ্চার হতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে মাসোহারা গ্রহণের অভিযোগ উঠলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। কারণ একজন পুলিশ সদস্যের দায়িত্ব অপরাধ দমন করা। তিনি যদি অর্থের বিনিময়ে অপরাধীদের আশ্রয় দেন কিংবা অবৈধ কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করেন, তাহলে সেটি শুধু ব্যক্তিগত দুর্নীতি নয়, রাষ্ট্রীয় দায়িত্বেরও গুরুতর লঙ্ঘন। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ ব্যবসা, মাদক কারবার, চাঁদাবাজি, জুয়া, অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠান কিংবা বিভিন্ন অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। কোথাও কোথাও স্থানীয় পর্যায়ে মাসোহারা বাণিজ্যের অভিযোগও শোনা যায়। এসব অভিযোগের সত্যতা অনুসন্ধানে পুলিশের নিজস্ব গোয়েন্দা বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন,কসবায় ২২ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৪৫ মেধাবী শিক্ষার্থীকে আর্থিক সহায়তা
কোনো থানার আওতাধীন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ কর্মকাণ্ড চললেও পুলিশ কেন ব্যবস্থা নিচ্ছে না, কারা এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কী ভূমিকা পালন করছেন এসব প্রশ্নের জবাবদিহি থাকতে হবে। সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। ব্যক্তিগত সৌজন্য, সামাজিক সম্পর্ক কিংবা কোনো উপলক্ষে স্বেচ্ছায় দেওয়া উপহার এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায় এক বিষয় নয়। চাঁদাবাজির ক্ষেত্রে জবরদস্তি, ভয়ভীতি, হুমকি কিংবা অন্যায় চাপের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে উপহার গ্রহণের ক্ষেত্রেও সাংবাদিকের পেশাগত নিরপেক্ষতা ও স্বার্থের সংঘাতের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। কোনো সাংবাদিক যদি অর্থের বিনিময়ে সংবাদ প্রকাশ করেন, বিজ্ঞাপনকে সংবাদ হিসেবে উপস্থাপন করেন কিংবা অর্থের বিনিময়ে কোনো অপরাধের তথ্য গোপন করেন, তাহলে তা পেশাগত অসততা। আবার কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে তাঁর অনুসন্ধানী কাজ বন্ধ করার চেষ্টা করাও গ্রহণযোগ্য নয়। পুলিশ অবৈধ হোটেল, মাদক ব্যবসায়ী, গেষ্ট হাউস, অবৈধ স্পা, কিংবা ফুটপাত থেকে চাঁদা বা মাসোহার নিলে কি বৈধ তা জাতি জানতে চায়।আইনের শাসনের মূলনীতি হচ্ছে, অপরাধের বিচার হবে প্রমাণের ভিত্তিতে, পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়। পুলিশ, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী কিংবা অন্য কোনো পেশার মানুষ কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন। পুলিশের বিরুদ্ধে মাসোহারা গ্রহণের অভিযোগ থাকলে নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। সাংবাদিকের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ থাকলেও প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু কোনো পেশার মানুষের বিরুদ্ধে ঢালাও অপবাদ দেওয়া কিংবা কোনো পেশাকে দায়মুক্তি দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। সাংবাদিকদের জন্য যেমন পেশাগত নীতিমালা ও স্বচ্ছতা প্রয়োজন, তেমনি পুলিশের জন্যও কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কোনো অভিযোগ উঠলেই কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা যাবে না। আবার পদ-পদবি কিংবা পেশাগত পরিচয়ের কারণে কাউকে দায়মুক্তিও দেওয়া যাবে না। সবশেষে প্রশ্ন একটাই—পুলিশের বিরুদ্ধে মাসোহারা গ্রহণের অভিযোগ উঠলে যদি তদন্ত প্রয়োজন হয়, তাহলে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠলেও তদন্ত প্রয়োজন। আর সাংবাদিকের স্বেচ্ছায় পাওয়া উপহারকে যদি চাঁদাবাজি বলা হয়, তাহলে পুলিশের অনৈতিক সুবিধা গ্রহণকে কোনোভাবেই বৈধতা দেওয়ার সুযোগ নেই। অপরাধের বিচার হোক অপরাধের ভিত্তিতে, পেশার পরিচয়ে নয়। সাংবাদিকতা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী—উভয় ক্ষেত্রেই সততা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হলেই সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরে আসবে।
আরও পড়ুন,টেংরাগিরির ১৪ হরিণের মধ্যে এখন বেঁচে আছে মাত্র ৩টি
কারণ রাষ্ট্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে সবার জন্য একই আইন ও একই নৈতিক মানদণ্ড কার্যকর থাকতে হবে। এবিষয়ে আইন বিশেষজ্ঞেরা বলেন, আইনের দৃষ্টিতে চাঁদাবাজি ও স্বেচ্ছায় দেওয়া উপহার সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ভয়ভীতি প্রদর্শন, হুমকি, চাপ সৃষ্টি কিংবা সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় করা হলে তা পরিস্থিতি ও প্রমাণের ভিত্তিতে দণ্ডবিধির ৩৮৩ ও ৩৮৪ ধারায় চাঁদাবাজির অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে কোনো ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কাউকে উপহার বা আর্থিক সহযোগিতা দিলে সেটিকে সরাসরি চাঁদাবাজি বলা যায় না। একইভাবে পুলিশের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে মাসোহারা গ্রহণ, অপরাধীদের কাছ থেকে অবৈধ সুবিধা নেওয়া কিংবা দায়িত্ব পালনে অনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠলে সেটিও তদন্তসাপেক্ষে দুর্নীতি ও অন্যান্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। আইনের প্রয়োগে পুলিশ ও সাংবাদিকদের জন্য আলাদা কোনো মানদণ্ড নেই। সাংবাদিক পরিচয় যেমন কাউকে চাঁদাবাজির দায় থেকে রক্ষা করে না, তেমনি পুলিশের পোশাকও কাউকে দুর্নীতির দায়মুক্তি দেয় না। অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা যাবে না; নিরপেক্ষ তদন্ত ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণের মাধ্যমে অপরাধ প্রমাণ করতে হবে। আমার মতে, পেশাগত পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে হয়রানি কিংবা কাউকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সবার জন্য সমান বিচার নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তবে এসব অপরাধে পুলিশের শাস্তির বিধান রয়েছে? বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে পুলিশ সদস্যরাও অপরাধ করলে শাস্তির আওতাভুক্ত। দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা অনুযায়ী ঘুষ, অবৈধ সুবিধা গ্রহণ কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে সম্পদ অর্জনের অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। দণ্ডবিধির ১৬৬ ধারায় দায়িত্ব পালনে আইন অমান্য করে ক্ষতিসাধনের জন্য সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। ২১৭ ধারায় অপরাধীকে শাস্তি থেকে বাঁচাতে আইন অমান্য করলে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। পাশাপাশি বিভাগীয় ব্যবস্থায় চাকরিচ্যুতিও হতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন