অপসংস্কৃতি ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের নতুন নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে 'কথিত সাংবাদিকতা'। তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রবাহের যুগে লাইসেন্সহীন অনিবন্ধিত অনলাইন পোর্টাল, ফেসবুক পেজ এবং ইউটিউব চ্যানেলের মাশরুমের মতো বৃদ্ধি দেশের গণমাধ্যম খাতকে এক অভূতপূর্ব সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। সত্য উন্মোচন বা জনস্বার্থে সংবাদ প্রকাশের পরিবর্তে এসব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে চলছে ভিউ-বাণিজ্য, গুজব রটানো এবং প্রকাশ্য চাঁদাবাজি। নিজেদের 'বড় মাপের সাংবাদিক' দাবি করা এসব ব্যক্তির অপকর্মে আজ অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারাও।
আরও পড়ুন: অনলাইন পোর্টাল ও ফেসবুক পেজ খুলেই কথিত ‘সাংবাদিক’!
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই চোখে পড়ে চমকপ্রদ ও বিভ্রান্তিকর শিরোনামের নানা ভিডিও। সাংবাদিকতার ন্যূনতম নীতিমালা না মেনে, তথ্য যাচাই-বাছাই ছাড়া কেবল 'ভিউ' বাড়িয়ে অর্থ উপার্জনের নেশায় মেতে উঠেছে একশ্রেণীর সুযোগসন্ধানী। 'ক্লিকবেইট' বা চটকদার থাম্বনেইল ব্যবহার করে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানো এখন নিত্যদিনের ঘটনা। তবে এই ভূঁইফোড় সাংবাদিকদের অপকর্ম কেবল ভিউ-বাণিজ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি রূপ নিয়েছে ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা আদায়ের এক ভয়ঙ্কর হাতিয়ারে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে স্থানীয় ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মচারী, শিক্ষক এমনকি সাধারণ গৃহস্থদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে হেনস্তা করা হচ্ছে। কোনো একটি মিথ্যা বা আংশিক সত্য ঘটনাকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে "লাইভ" সম্প্রচারের হুমকি দেওয়া হয়। এরপর 'সংবাদ প্রকাশ না করার' কিংবা 'লাইভ বন্ধ করার' বিনিময়ে দাবি করা হয় মোটা অংকের টাকা। এভাবেই ভীতি প্রদর্শন করে মাস শেষে তারা হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা।
সাম্প্রতিক সময়ে এই অপসাংবাদিকতার সবচেয়ে ভুক্তভোগী হচ্ছেন দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যরা। পেশাগত কাজে বা কোনো অপরাধ দমনে পুলিশ যখনই মাঠে নামছে, তখনই তথাকথিত ক্যামেরা বা মোবাইল ফোন হাতে পুলিশকে ঘিরে ধরছে এসব ভূঁইফোড় সাংবাদিক।
আরও পড়ুন: জিরো কস্ট স্কিমে ক্ষতিগ্রস্তদের অগ্রাধিকার
অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো তল্লাশি বা গ্রেপ্তারের সময় পুলিশকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করার নামে তাদের কাজে সরাসরি বাধা প্রদান করা হচ্ছে। "লাইভ চলছে" বলে চাপ সৃষ্টি করে পুলিশের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে বিতর্কিত করার অপচেষ্টা চালানো হয়। পুলিশের পেশাদারিত্ব ও মনোবল ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে প্রায়শই তাদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্ব বা দুর্নীতির কাল্পনিক অভিযোগ তুলে ফেসবুকে ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের এভাবে খপ্পরে পড়া এবং হেনস্তার শিকার হওয়া একটি দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক ইঙ্গিত।
কথিত সাংবাদিকদের এই অপকর্মের খেসারত দিতে হচ্ছে বছরের পর বছর ধরে সততা ও পেশাদারিত্বের সাথে কাজ করে যাওয়া মূলধারার প্রকৃত সাংবাদিকদের। ভন্ড ও চাঁদাবাজ সাংবাদিকদের কারণে সাধারণ মানুষের কাছে পুরো সাংবাদিক সমাজ আজ খাটো হচ্ছে। মাঠে কাজ করতে গিয়ে মূলধারার পেশাদার সাংবাদিকরা আর আগের মতো আস্থা পাচ্ছেন না, নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দিতে গিয়ে আজ তারা চরম নাজুক ও বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছেন। একই সাথে তথাকথিত সাংবাদিকদের উৎপাতের কারণে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি দপ্তর এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখন প্রকৃত সাংবাদিকদের তথ্য দিতেও দ্বিধাবোধ করছে। এর ফলে বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা এক মারাত্মক সংকটের মুখে পড়েছে এবং দেশের 'চতুর্থ স্তম্ভ' বা গণমাধ্যম তার ঐতিহ্য ও বিশ্বাসযোগ্যতা হারাতে বসেছে।
আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভা বৈঠক, আলোচনায় নতুন পে-স্কেল
ভূঁইফোড় সাংবাদিকদের এই বেপরোয়া তাণ্ডব কেবল গণমাধ্যমের সমস্যা নয়, এটি সরাসরি দেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার সাথে সম্পর্কিত। ভিত্তিহীন সংবাদ ছড়িয়ে যেকোনো মুহূর্তে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, সহিংসতা বা গণপিটুনির মতো ঘটনা ঘটানো সম্ভব হচ্ছে। পাশাপাশি ভুয়া লাইভের মাধ্যমে অনেক সম্মানিত ব্যক্তির সামাজিক সম্মান মুহূর্তেই ধূলিসাৎ করে দেওয়া হচ্ছে, যা অনেক সময় ভুক্তভোগীকে আত্মহত্যার মতো চরম পথ বেছে নিতে বাধ্য করে। অন্যদিকে, ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের ফলে দেশের ব্যবসার পরিবেশও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আগেই রাষ্ট্রকে কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। প্রথমত, অনিবন্ধিত অনলাইন পোর্টাল, আইপি টিভি এবং ইউটিউব চ্যানেলগুলোর বিরুদ্ধে অবিলম্বে অভিযান চালিয়ে সাইবার অপরাধ ও চাঁদাবাজির সুনির্দিষ্ট অভিযোগে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান ব্যতীত কাউকে প্রেস কার্ড বহন করতে দেওয়া যাবে না। এর পাশাপাশি সাংবাদিকতায় যোগদানের জন্য নূন্যতম শিক্ষাগত যোগ্যতা ও প্রেস কাউন্সিলের নির্ধারিত নীতিমালা কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। দায়িত্ব পালনকালে পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর কাজে বাধা দিলে তা দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করে তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সাথে সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে যাতে তারা যেকোনো ফেসবুক পেজকে 'গণমাধ্যম' হিসেবে বিশ্বাস না করেন।
আরও পড়ুন: জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে সংসদে সরকার-বিরোধী দলের টানাপোড়েন ফের উত্তাপ
সংবাদমাধ্যম হলো একটি দেশের আয়না এবং গণতন্ত্রের পাহাদার। কিন্তু সেই আয়না যদি অপরাধের আস্তরণে ঢেকে যায়, তবে পুরো রাষ্ট্রই সঠিক পথ হারাবে। দেশের ভাবমূর্তি রক্ষা, মূলধারার সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা প্রদান এবং সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে তথাকথিত ভূঁইফোড় সাংবাদিকদের লাগাম টেনে ধরার এখনই উপযুক্ত সময়। দেশ ও জাতির স্বার্থে অবিলম্বে এদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় না আনলে ভবিষ্যতে এই অপসাংবাদিকতার আগুন পুরো সমাজব্যবস্থাকে ভস্মীভূত করে দেবে। ভন্ড ও চাঁদাবাজ কথিত সাংবাদিকদের কারণে সাধারণ মানুষের চোখে পুরো সাংবাদিক সমাজ আজ খাটো হচ্ছে। মানুষের মন থেকে সংবাদমাধ্যমের প্রতি সম্মান ও বিশ্বাস কমে যাচ্ছে। মাঠে কাজ করতে গিয়ে মূলধারার পেশাদার সাংবাদিকরা সাধারণ মানুষের আস্থাহীনতার মুখোমুখি হচ্ছেন। নিজেদের সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিতে গিয়ে আজ তারা চরম নাজুক, লজ্জিত ও বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছেন। তথাকথিত সাংবাদিকদের উৎপাত ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের কারণে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দপ্তর, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এখন প্রকৃত সাংবাদিকদের তথ্য ও বক্তব্য দিতেও ইতস্তত বোধ করছে। ফলে অনুসন্ধানমূলক বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার পথ রুদ্ধ হয়ে আসছে।
আরও পড়ুন: বছর শেষের আগে সরকারি চাকরিজীবীদের ৫ দিনের ছুটি
ইদানিং দেখা যাচ্ছে, এই অপসাংবাদিকতার হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন না আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও। মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশ কর্মকর্তারা নিয়মিতভাবে এসব কথিত সাংবাদিকদের খপ্পরে পড়ছেন। পেশাগত কারণে পুলিশ যখন কোনো অপরাধীকে গ্রেপ্তার করতে যায়, কোনো স্থানে তল্লাশি চালায় কিংবা ট্রাফিক আইন প্রয়োগ করে ঠিক তখনই ক্যামেরা বা স্মার্টফোন হাতে একদল কথিত সাংবাদিক চারপাশ থেকে চেপে ধরে। তারা নিজেদের 'সাংবাদিক' পরিচয় দিয়ে পুলিশের আইনি প্রক্রিয়ায় সরাসরি হস্তক্ষেপ করে। বিচারকের ভঙ্গিতে পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে উসকানিমূলক প্রশ্নবাণ নিক্ষেপ করা হয় এবং তা ফেসবুকে সরাসরি 'লাইভ' করা শুরু হয়। এর উদ্দেশ্য একটাই—পুলিশকে মানসিকভাবে চাপে ফেলা এবং তাদের স্বাভাবিক আইনি কার্যক্রমে বাধা প্রদান করা। পুলিশ যদি তাদের আইনি সীমা লঙ্ঘন করতে নিষেধ করে, তবে সাথে সাথে "সাংবাদিকের ওপর আক্রমণ" বা "সংবাদ প্রকাশে বাধা" শিরোনামে অসত্য ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া হয়। পুলিশের মনোবল ভেঙে দেওয়া এবং জনসমক্ষে পুলিশ বাহিনীকে বিতর্কিত করার এই অপচেষ্টা দেশের অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে। টেকসই গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে হলে বিচার বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি। দল-মত নির্বিশেষে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই এখন প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।
গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের মতামত: সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার অর্থ কোনোভাবেই অপসাংবাদিকতা বা ব্ল্যাকমেইলিংয়ের লাইসেন্স নয়। নিবন্ধনহীন আইপি টিভি ও ভুঁইফোড় পোর্টালগুলো সাংবাদিকতার ন্যূনতম নীতি-নৈতিকতা না মেনে মূলধারার পেশাদার সাংবাদিকদের আস্থাসঙ্কটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। প্রেস কাউন্সিল ও তথ্য মন্ত্রণালয়কে অনতিবিলম্বে কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন করে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান ছাড়া কাউকে প্রেস কার্ড ব্যবহারের সুযোগ বন্ধ করতে হবে।
আরও পড়ুন: বনানীতে স্পা-গেস্ট হাউজ ঘিরে ওসির বিরুদ্ধে অভিযোগ
সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল আইন বিশেষজ্ঞের মতে, ভিউ-বাণিজ্য ও ক্লিকবেইট থাম্বনেইল ব্যবহার করে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানো এবং লাইভের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় এক ধরণের সংঘবদ্ধ সাইবার চাঁদাবাজি। কেবল কন্টেন্ট মুছে ফেলা বা পেজ ডাউন করাই যথেষ্ট নয়; সাইবার সুরক্ষা আইন এবং দণ্ডবিধির অধীনে এদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক মেয়াদি শাস্তির আওতায় আনা না গেলে ডিজিটাল মাধ্যমে নাগরিক নিরাপত্তা ব্যাহত হতেই থাকবে।"
সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা ও অপরাধ বিশ্লেষক বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা যখন অপরাধী গ্রেপ্তার বা অভিযানে যান, তখন কথিত সাংবাদিকদের ক্যামেরা নিয়ে হস্তক্ষেপে শুধু আইনি প্রক্রিয়াই বাধাগ্রস্ত হয় না, বরং আলামত নষ্ট হওয়া ও অপরাধী পালিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। দায়িত্ব পালনকালে পুলিশকে মানসিকভাবে চাপে ফেলা এবং লাইভের মাধ্যমে ব্ল্যাকমেইলিং করা রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক বিপজ্জনক।
আরও পড়ুন: গ্রাহকের অর্থ কোথায়? Divine Group-এর প্রকল্প ও সম্পদ
এদিকে সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশ্লেষক বলেন, ভুয়া ও মনগড়া সংবাদ ছড়ানোর মাধ্যমে একজন মানুষের সামাজিক সম্মান এক মুহূর্তেই ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে, যা অনেক সময় ভুক্তভোগীকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেয়। তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ ব্যবহারে গণমাধ্যম সচেতনতা (গবফরধ খরঃবৎধপু) বাড়াতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ বুঝতে পারেন কোন সংবাদ উৎসটি বিশ্বাসযোগ্য আর কোনটি ভিউ বাণিজ্যের ফাঁদ।

সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩১ আগস্ট ২০২৬
অপসংস্কৃতি ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের নতুন নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে 'কথিত সাংবাদিকতা'। তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রবাহের যুগে লাইসেন্সহীন অনিবন্ধিত অনলাইন পোর্টাল, ফেসবুক পেজ এবং ইউটিউব চ্যানেলের মাশরুমের মতো বৃদ্ধি দেশের গণমাধ্যম খাতকে এক অভূতপূর্ব সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। সত্য উন্মোচন বা জনস্বার্থে সংবাদ প্রকাশের পরিবর্তে এসব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে চলছে ভিউ-বাণিজ্য, গুজব রটানো এবং প্রকাশ্য চাঁদাবাজি। নিজেদের 'বড় মাপের সাংবাদিক' দাবি করা এসব ব্যক্তির অপকর্মে আজ অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারাও।
আরও পড়ুন: অনলাইন পোর্টাল ও ফেসবুক পেজ খুলেই কথিত ‘সাংবাদিক’!
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই চোখে পড়ে চমকপ্রদ ও বিভ্রান্তিকর শিরোনামের নানা ভিডিও। সাংবাদিকতার ন্যূনতম নীতিমালা না মেনে, তথ্য যাচাই-বাছাই ছাড়া কেবল 'ভিউ' বাড়িয়ে অর্থ উপার্জনের নেশায় মেতে উঠেছে একশ্রেণীর সুযোগসন্ধানী। 'ক্লিকবেইট' বা চটকদার থাম্বনেইল ব্যবহার করে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানো এখন নিত্যদিনের ঘটনা। তবে এই ভূঁইফোড় সাংবাদিকদের অপকর্ম কেবল ভিউ-বাণিজ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি রূপ নিয়েছে ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা আদায়ের এক ভয়ঙ্কর হাতিয়ারে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে স্থানীয় ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মচারী, শিক্ষক এমনকি সাধারণ গৃহস্থদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে হেনস্তা করা হচ্ছে। কোনো একটি মিথ্যা বা আংশিক সত্য ঘটনাকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে "লাইভ" সম্প্রচারের হুমকি দেওয়া হয়। এরপর 'সংবাদ প্রকাশ না করার' কিংবা 'লাইভ বন্ধ করার' বিনিময়ে দাবি করা হয় মোটা অংকের টাকা। এভাবেই ভীতি প্রদর্শন করে মাস শেষে তারা হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা।
সাম্প্রতিক সময়ে এই অপসাংবাদিকতার সবচেয়ে ভুক্তভোগী হচ্ছেন দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যরা। পেশাগত কাজে বা কোনো অপরাধ দমনে পুলিশ যখনই মাঠে নামছে, তখনই তথাকথিত ক্যামেরা বা মোবাইল ফোন হাতে পুলিশকে ঘিরে ধরছে এসব ভূঁইফোড় সাংবাদিক।
আরও পড়ুন: জিরো কস্ট স্কিমে ক্ষতিগ্রস্তদের অগ্রাধিকার
অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো তল্লাশি বা গ্রেপ্তারের সময় পুলিশকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করার নামে তাদের কাজে সরাসরি বাধা প্রদান করা হচ্ছে। "লাইভ চলছে" বলে চাপ সৃষ্টি করে পুলিশের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে বিতর্কিত করার অপচেষ্টা চালানো হয়। পুলিশের পেশাদারিত্ব ও মনোবল ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে প্রায়শই তাদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্ব বা দুর্নীতির কাল্পনিক অভিযোগ তুলে ফেসবুকে ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের এভাবে খপ্পরে পড়া এবং হেনস্তার শিকার হওয়া একটি দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক ইঙ্গিত।
কথিত সাংবাদিকদের এই অপকর্মের খেসারত দিতে হচ্ছে বছরের পর বছর ধরে সততা ও পেশাদারিত্বের সাথে কাজ করে যাওয়া মূলধারার প্রকৃত সাংবাদিকদের। ভন্ড ও চাঁদাবাজ সাংবাদিকদের কারণে সাধারণ মানুষের কাছে পুরো সাংবাদিক সমাজ আজ খাটো হচ্ছে। মাঠে কাজ করতে গিয়ে মূলধারার পেশাদার সাংবাদিকরা আর আগের মতো আস্থা পাচ্ছেন না, নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দিতে গিয়ে আজ তারা চরম নাজুক ও বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছেন। একই সাথে তথাকথিত সাংবাদিকদের উৎপাতের কারণে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি দপ্তর এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখন প্রকৃত সাংবাদিকদের তথ্য দিতেও দ্বিধাবোধ করছে। এর ফলে বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা এক মারাত্মক সংকটের মুখে পড়েছে এবং দেশের 'চতুর্থ স্তম্ভ' বা গণমাধ্যম তার ঐতিহ্য ও বিশ্বাসযোগ্যতা হারাতে বসেছে।
আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভা বৈঠক, আলোচনায় নতুন পে-স্কেল
ভূঁইফোড় সাংবাদিকদের এই বেপরোয়া তাণ্ডব কেবল গণমাধ্যমের সমস্যা নয়, এটি সরাসরি দেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার সাথে সম্পর্কিত। ভিত্তিহীন সংবাদ ছড়িয়ে যেকোনো মুহূর্তে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, সহিংসতা বা গণপিটুনির মতো ঘটনা ঘটানো সম্ভব হচ্ছে। পাশাপাশি ভুয়া লাইভের মাধ্যমে অনেক সম্মানিত ব্যক্তির সামাজিক সম্মান মুহূর্তেই ধূলিসাৎ করে দেওয়া হচ্ছে, যা অনেক সময় ভুক্তভোগীকে আত্মহত্যার মতো চরম পথ বেছে নিতে বাধ্য করে। অন্যদিকে, ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের ফলে দেশের ব্যবসার পরিবেশও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আগেই রাষ্ট্রকে কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। প্রথমত, অনিবন্ধিত অনলাইন পোর্টাল, আইপি টিভি এবং ইউটিউব চ্যানেলগুলোর বিরুদ্ধে অবিলম্বে অভিযান চালিয়ে সাইবার অপরাধ ও চাঁদাবাজির সুনির্দিষ্ট অভিযোগে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান ব্যতীত কাউকে প্রেস কার্ড বহন করতে দেওয়া যাবে না। এর পাশাপাশি সাংবাদিকতায় যোগদানের জন্য নূন্যতম শিক্ষাগত যোগ্যতা ও প্রেস কাউন্সিলের নির্ধারিত নীতিমালা কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। দায়িত্ব পালনকালে পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর কাজে বাধা দিলে তা দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করে তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সাথে সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে যাতে তারা যেকোনো ফেসবুক পেজকে 'গণমাধ্যম' হিসেবে বিশ্বাস না করেন।
আরও পড়ুন: জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে সংসদে সরকার-বিরোধী দলের টানাপোড়েন ফের উত্তাপ
সংবাদমাধ্যম হলো একটি দেশের আয়না এবং গণতন্ত্রের পাহাদার। কিন্তু সেই আয়না যদি অপরাধের আস্তরণে ঢেকে যায়, তবে পুরো রাষ্ট্রই সঠিক পথ হারাবে। দেশের ভাবমূর্তি রক্ষা, মূলধারার সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা প্রদান এবং সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে তথাকথিত ভূঁইফোড় সাংবাদিকদের লাগাম টেনে ধরার এখনই উপযুক্ত সময়। দেশ ও জাতির স্বার্থে অবিলম্বে এদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় না আনলে ভবিষ্যতে এই অপসাংবাদিকতার আগুন পুরো সমাজব্যবস্থাকে ভস্মীভূত করে দেবে। ভন্ড ও চাঁদাবাজ কথিত সাংবাদিকদের কারণে সাধারণ মানুষের চোখে পুরো সাংবাদিক সমাজ আজ খাটো হচ্ছে। মানুষের মন থেকে সংবাদমাধ্যমের প্রতি সম্মান ও বিশ্বাস কমে যাচ্ছে। মাঠে কাজ করতে গিয়ে মূলধারার পেশাদার সাংবাদিকরা সাধারণ মানুষের আস্থাহীনতার মুখোমুখি হচ্ছেন। নিজেদের সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিতে গিয়ে আজ তারা চরম নাজুক, লজ্জিত ও বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছেন। তথাকথিত সাংবাদিকদের উৎপাত ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের কারণে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দপ্তর, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এখন প্রকৃত সাংবাদিকদের তথ্য ও বক্তব্য দিতেও ইতস্তত বোধ করছে। ফলে অনুসন্ধানমূলক বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার পথ রুদ্ধ হয়ে আসছে।
আরও পড়ুন: বছর শেষের আগে সরকারি চাকরিজীবীদের ৫ দিনের ছুটি
ইদানিং দেখা যাচ্ছে, এই অপসাংবাদিকতার হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন না আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও। মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশ কর্মকর্তারা নিয়মিতভাবে এসব কথিত সাংবাদিকদের খপ্পরে পড়ছেন। পেশাগত কারণে পুলিশ যখন কোনো অপরাধীকে গ্রেপ্তার করতে যায়, কোনো স্থানে তল্লাশি চালায় কিংবা ট্রাফিক আইন প্রয়োগ করে ঠিক তখনই ক্যামেরা বা স্মার্টফোন হাতে একদল কথিত সাংবাদিক চারপাশ থেকে চেপে ধরে। তারা নিজেদের 'সাংবাদিক' পরিচয় দিয়ে পুলিশের আইনি প্রক্রিয়ায় সরাসরি হস্তক্ষেপ করে। বিচারকের ভঙ্গিতে পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে উসকানিমূলক প্রশ্নবাণ নিক্ষেপ করা হয় এবং তা ফেসবুকে সরাসরি 'লাইভ' করা শুরু হয়। এর উদ্দেশ্য একটাই—পুলিশকে মানসিকভাবে চাপে ফেলা এবং তাদের স্বাভাবিক আইনি কার্যক্রমে বাধা প্রদান করা। পুলিশ যদি তাদের আইনি সীমা লঙ্ঘন করতে নিষেধ করে, তবে সাথে সাথে "সাংবাদিকের ওপর আক্রমণ" বা "সংবাদ প্রকাশে বাধা" শিরোনামে অসত্য ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া হয়। পুলিশের মনোবল ভেঙে দেওয়া এবং জনসমক্ষে পুলিশ বাহিনীকে বিতর্কিত করার এই অপচেষ্টা দেশের অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে। টেকসই গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে হলে বিচার বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি। দল-মত নির্বিশেষে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই এখন প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।
গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের মতামত: সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার অর্থ কোনোভাবেই অপসাংবাদিকতা বা ব্ল্যাকমেইলিংয়ের লাইসেন্স নয়। নিবন্ধনহীন আইপি টিভি ও ভুঁইফোড় পোর্টালগুলো সাংবাদিকতার ন্যূনতম নীতি-নৈতিকতা না মেনে মূলধারার পেশাদার সাংবাদিকদের আস্থাসঙ্কটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। প্রেস কাউন্সিল ও তথ্য মন্ত্রণালয়কে অনতিবিলম্বে কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন করে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান ছাড়া কাউকে প্রেস কার্ড ব্যবহারের সুযোগ বন্ধ করতে হবে।
আরও পড়ুন: বনানীতে স্পা-গেস্ট হাউজ ঘিরে ওসির বিরুদ্ধে অভিযোগ
সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল আইন বিশেষজ্ঞের মতে, ভিউ-বাণিজ্য ও ক্লিকবেইট থাম্বনেইল ব্যবহার করে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানো এবং লাইভের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় এক ধরণের সংঘবদ্ধ সাইবার চাঁদাবাজি। কেবল কন্টেন্ট মুছে ফেলা বা পেজ ডাউন করাই যথেষ্ট নয়; সাইবার সুরক্ষা আইন এবং দণ্ডবিধির অধীনে এদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক মেয়াদি শাস্তির আওতায় আনা না গেলে ডিজিটাল মাধ্যমে নাগরিক নিরাপত্তা ব্যাহত হতেই থাকবে।"
সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা ও অপরাধ বিশ্লেষক বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা যখন অপরাধী গ্রেপ্তার বা অভিযানে যান, তখন কথিত সাংবাদিকদের ক্যামেরা নিয়ে হস্তক্ষেপে শুধু আইনি প্রক্রিয়াই বাধাগ্রস্ত হয় না, বরং আলামত নষ্ট হওয়া ও অপরাধী পালিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। দায়িত্ব পালনকালে পুলিশকে মানসিকভাবে চাপে ফেলা এবং লাইভের মাধ্যমে ব্ল্যাকমেইলিং করা রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক বিপজ্জনক।
আরও পড়ুন: গ্রাহকের অর্থ কোথায়? Divine Group-এর প্রকল্প ও সম্পদ
এদিকে সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশ্লেষক বলেন, ভুয়া ও মনগড়া সংবাদ ছড়ানোর মাধ্যমে একজন মানুষের সামাজিক সম্মান এক মুহূর্তেই ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে, যা অনেক সময় ভুক্তভোগীকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেয়। তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ ব্যবহারে গণমাধ্যম সচেতনতা (গবফরধ খরঃবৎধপু) বাড়াতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ বুঝতে পারেন কোন সংবাদ উৎসটি বিশ্বাসযোগ্য আর কোনটি ভিউ বাণিজ্যের ফাঁদ।

আপনার মতামত লিখুন