বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব, সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে আজ বুধবার বিকেলে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়েছে। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে স্বামী ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। এর আগে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা ও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে অনুষ্ঠিত তার জানাজায় মানুষের ঢল নামে।
৮০ বছর বয়সী বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে লিভার সিরোসিস, হৃদরোগ ও কিডনি জটিলতাসহ নানাবিধ শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল ৩০ ডিসেম্বর (মঙ্গলবার) ভোর ৬টায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
আজ (বুধবার) বাদ জোহর বেলা ৩,টা ৪,মিনিট জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা ও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে তার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় ইমামতি করেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি আবদুল মালেক। জানাজাকে কেন্দ্র করে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ এবং এর আশপাশের এলাকায় ছিল জনারণ্য। দলীয় নেতাকর্মী ছাড়াও সাধারণ মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, জানাজাস্থলে কয়েক লক্ষ মানুষ সমবেত হয়েছিলেন, যা এক বিশাল জনসমুদ্রে রূপ নেয়। জানাজা শেষে তাকে গার্ড অফ অনার প্রদান করা হয় এবং জিয়া উদ্যানে মরহুমের স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমাধির পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়।
বিদেশি নেতাদের অংশগ্রহণ:
বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে এবং শ্রদ্ধা জানাতে বেশ কয়েকজন বিদেশি কূটনীতিক ও প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। বিশেষ করে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর (S. Jaishankar) ভারত সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে জানাজায় অংশ নিতে ঢাকায় আসেন। এছাড়া ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান, চীনসহ ২৮টি দেশের কূটনীতিকরা শোক বইয়ে স্বাক্ষর করেন এবং জানাজায় বা শ্রদ্ধা নিবেদন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে।
রাষ্ট্রীয় শোক ও ছুটি:
তার মৃত্যুতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ৩১ ডিসেম্বর থেকে ২ জানুয়ারি পর্যন্ত তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে। আজ ৩১ ডিসেম্বর সারাদেশে সাধারণ ছুটি পালিত হচ্ছে। দেশের সকল সরকারি ও আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে।
এক নজরে দেশনেত্রীর রাজনৈতিক জীবনীঃ
বাংলাদেশের রাজনীতির ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিত বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম, দ্বিতীয় এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী। তার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের প্রধান দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
জন্ম ও পরিবার: ১৯৪৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ১৯৬০ সালে জিয়াউর রহমানের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
রাজনীতিতে প্রবেশ: ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর তিনি বিএনপির হাল ধরেন। গৃহবধূ থেকে তিনি হয়ে ওঠেন রাজপথের লড়াকু নেত্রী। ১৯৮৪ সালে তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন: ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব দেন। স্বৈরাচারী এরশাদের অধীনে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহন না করার ঐক্যমত্য হলেও আওয়ামীলীগ সহ কয়েকটি দল নির্বাচনে অংশগ্রহন করলেও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি অংশগ্রহন করেনি। অন্যায়ের সাথে আপষ না করে তার অনমনীয় ভূমিকার জন্য তাকে ‘আপসহীন নেত্রী’ উপাধি দেওয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রীত্ব: ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হন। এরপর ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি মোট তিন মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
অবদান: তার শাসনামলে সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ, নারী শিক্ষা অবৈতনিক করা এবং ভ্যাট ব্যবস্থা প্রবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
সংগ্রাম ও কারাবাস: স্বৈরাচারী এরশাদের আমলে গৃহবন্ধী হওয়া সহ ১/১১-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনকালীন সময়ে এবং পরবর্তীতে স্বৈরাচারী হাসিনার সময়ে বিভিন্ন মামলায় তাকে দীর্ঘ সময় কারাগারে ও গৃহবন্দী থাকতে হয়। ২০১৮ সালে প্রহসনমুলক দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে তিনি কারাগারে যান, পরবর্তীতে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পেলেও তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে ছিলেন। ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে তিনি মুক্ত হন এবং বিদেশে চিকিৎসায় যান। তবে শারীরিক অবস্থার অবনতির কারণে তাকে দেশেই চিকিৎসা নিতে হচ্ছিল।
বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি মহাকালের সমাপ্তি ঘটল। তার সমর্থকদের কাছে তিনি ‘মাদার অফ ডেমোক্রেসি’ বা গণতন্ত্রের মা হিসেবে আজীবন স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব, সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে আজ বুধবার বিকেলে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়েছে। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে স্বামী ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। এর আগে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা ও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে অনুষ্ঠিত তার জানাজায় মানুষের ঢল নামে।
৮০ বছর বয়সী বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে লিভার সিরোসিস, হৃদরোগ ও কিডনি জটিলতাসহ নানাবিধ শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল ৩০ ডিসেম্বর (মঙ্গলবার) ভোর ৬টায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
আজ (বুধবার) বাদ জোহর বেলা ৩,টা ৪,মিনিট জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা ও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে তার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় ইমামতি করেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি আবদুল মালেক। জানাজাকে কেন্দ্র করে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ এবং এর আশপাশের এলাকায় ছিল জনারণ্য। দলীয় নেতাকর্মী ছাড়াও সাধারণ মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, জানাজাস্থলে কয়েক লক্ষ মানুষ সমবেত হয়েছিলেন, যা এক বিশাল জনসমুদ্রে রূপ নেয়। জানাজা শেষে তাকে গার্ড অফ অনার প্রদান করা হয় এবং জিয়া উদ্যানে মরহুমের স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমাধির পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়।
বিদেশি নেতাদের অংশগ্রহণ:
বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে এবং শ্রদ্ধা জানাতে বেশ কয়েকজন বিদেশি কূটনীতিক ও প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। বিশেষ করে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর (S. Jaishankar) ভারত সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে জানাজায় অংশ নিতে ঢাকায় আসেন। এছাড়া ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান, চীনসহ ২৮টি দেশের কূটনীতিকরা শোক বইয়ে স্বাক্ষর করেন এবং জানাজায় বা শ্রদ্ধা নিবেদন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে।
রাষ্ট্রীয় শোক ও ছুটি:
তার মৃত্যুতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ৩১ ডিসেম্বর থেকে ২ জানুয়ারি পর্যন্ত তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে। আজ ৩১ ডিসেম্বর সারাদেশে সাধারণ ছুটি পালিত হচ্ছে। দেশের সকল সরকারি ও আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে।
এক নজরে দেশনেত্রীর রাজনৈতিক জীবনীঃ
বাংলাদেশের রাজনীতির ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিত বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম, দ্বিতীয় এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী। তার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের প্রধান দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
জন্ম ও পরিবার: ১৯৪৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ১৯৬০ সালে জিয়াউর রহমানের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
রাজনীতিতে প্রবেশ: ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর তিনি বিএনপির হাল ধরেন। গৃহবধূ থেকে তিনি হয়ে ওঠেন রাজপথের লড়াকু নেত্রী। ১৯৮৪ সালে তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন: ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব দেন। স্বৈরাচারী এরশাদের অধীনে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহন না করার ঐক্যমত্য হলেও আওয়ামীলীগ সহ কয়েকটি দল নির্বাচনে অংশগ্রহন করলেও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি অংশগ্রহন করেনি। অন্যায়ের সাথে আপষ না করে তার অনমনীয় ভূমিকার জন্য তাকে ‘আপসহীন নেত্রী’ উপাধি দেওয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রীত্ব: ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হন। এরপর ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি মোট তিন মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
অবদান: তার শাসনামলে সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ, নারী শিক্ষা অবৈতনিক করা এবং ভ্যাট ব্যবস্থা প্রবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
সংগ্রাম ও কারাবাস: স্বৈরাচারী এরশাদের আমলে গৃহবন্ধী হওয়া সহ ১/১১-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনকালীন সময়ে এবং পরবর্তীতে স্বৈরাচারী হাসিনার সময়ে বিভিন্ন মামলায় তাকে দীর্ঘ সময় কারাগারে ও গৃহবন্দী থাকতে হয়। ২০১৮ সালে প্রহসনমুলক দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে তিনি কারাগারে যান, পরবর্তীতে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পেলেও তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে ছিলেন। ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে তিনি মুক্ত হন এবং বিদেশে চিকিৎসায় যান। তবে শারীরিক অবস্থার অবনতির কারণে তাকে দেশেই চিকিৎসা নিতে হচ্ছিল।
বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি মহাকালের সমাপ্তি ঘটল। তার সমর্থকদের কাছে তিনি ‘মাদার অফ ডেমোক্রেসি’ বা গণতন্ত্রের মা হিসেবে আজীবন স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

আপনার মতামত লিখুন