রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান যেখানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি তুলনামূলকভাবে বেশি থাকার কথা, সেখানেই আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে অবৈধ স্পা সেন্টার ঘিরে নারী পাচার, দালাল চক্র ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ। গুলশান-১ এর ১৩২ নম্বর রোডে ৫৪/এ (৪র্থ তলা) অবস্থিত একটি স্পা সেন্টার নিয়ে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে, যা কয়েক মাস আগেই গুলশান থানা পুলিশের অভিযানে বন্ধ হয়ে তালাবদ্ধ করা হয়েছিল।
স্থানীয় সূত্র ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওই স্পা সেন্টারটি প্রথমে ‘আরিপের স্পা সেন্টার’ নামে পরিচিত ছিল। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছিল। বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে কয়েক মাস আগে গুলশান থানা পুলিশ সেখানে অভিযান চালায়। অভিযানের সময় প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে দেওয়া হয়, তালা লাগানো হয় এবং এ ঘটনায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। পুলিশি অভিযানের পর স্পা সেন্টারটি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় এলাকাবাসী মনে করেছিলেন, অবশেষে অবৈধ কার্যক্রমের অবসান হয়েছে। তবে সেই ধারণা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সম্প্রতি জাবেদ নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে চুক্তিভিত্তিকভাবে স্পা সেন্টারটি আবারও নেয় আরিফ নামের এক ব্যক্তি। এরপর নীরবে শুরু হয় পুনরায় কার্যক্রম। কয়েক সপ্তাহ ধরে লক্ষ্য করছি, আগের মতোই রাত বাড়লেই অচেনা লোকজনের আনাগোনা বেড়ে যায়। যেটা বন্ধ থাকার সময় একেবারেই ছিল না।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত আরিফের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রতিবেদককে বলেন, ভাই, আমি কষ্ট করে এই ক্যাবল (কেবল) প্রতিষ্ঠানটা আবার চালু করেছি। গুলশান থানার ওসি থেকে শুরু করে সবার সাথেই কথা বলে তারপর চালাচ্ছি। না হলে কি আর সম্ভব? তার এই বক্তব্য ঘিরেই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে আসলে কীভাবে একটি মামলাভুক্ত ও পুলিশি অভিযানে বন্ধ হওয়া প্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু হয়? কার অনুমতিতে বা কার আশ্বাসে চলছে এই কার্যক্রম?
আরিফ সম্পর্কে আরও গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র। তাদের দাবি, আরিফ একজন ইয়াবা ব্যবসায়ী হিসেবে এলাকায় পরিচিত। অতীতে তিনি বিভিন্ন স্পা সেন্টারে দালাল হিসেবে কাজ করতেন এবং একই সঙ্গে ইয়াবা ব্যবসার একটি সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী বলেন, আরিফ আগে একাধিক স্পা সেন্টারে দালালি করত। মেয়েদের জোগাড় করা, কাস্টমার আনা এসবই তার কাজ ছিল। পাশাপাশি ইয়াবার লেনদেনের অভিযোগও আমরা বহুবার শুনেছি। এজন্যই সে আগে কোনো স্পা সেন্টারে বেশিদিন টিকতে পারেনি। অনুসন্ধানে জানা গেছে, গুলশান ও বনানী এলাকায় বেশ কয়েকটি স্পা সেন্টার ঘিরে একটি সংঘবদ্ধ দালাল সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। এই সিন্ডিকেটের কাজ হচ্ছে—গ্রাম ও শহরতলির অসচ্ছল নারীদের ভালো বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ঢাকায় আনা এবং পরে স্পা সেন্টারের আড়ালে অনৈতিক কাজে বাধ্য করা।
একটি মানবাধিকার সংগঠনের এক কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এই স্পা সেন্টারগুলো মূলত একটি নেটওয়ার্কের অংশ। এক জায়গায় অভিযান হলে তারা অন্য জায়গায় সরে যায়। আবার কিছুদিন পর আগের জায়গাতেই ফিরে আসে। এর পেছনে শক্তিশালী দালাল ও অর্থের জোগান রয়েছে। যদিও আরিফ দাবি করেছেন যে তিনি গুলশান থানার ওসি থেকে শুরু করে সবার সাথে কথা বলেই প্রতিষ্ঠানটি চালাচ্ছেন, তবে এ বিষয়ে গুলশান থানার পক্ষ থেকে ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে।
গুলশান থানার এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কোনো অবৈধ স্পা সেন্টার চালানোর অনুমতি কাউকে দেওয়া হয়নি। যদি কেউ পুলিশের নাম ব্যবহার করে অবৈধ কার্যক্রম চালায়, সেটি তদন্তসাপেক্ষ বিষয়। তবে এলাকাবাসীর প্রশ্ন যদি অনুমতি না থাকে, তাহলে কীভাবে একটি তালাবদ্ধ ও মামলাভুক্ত প্রতিষ্ঠান আবারও চালু হলো?
আরও পড়ুন, গণভোট গণবিরোধী হিসেবে বিবেচিত হবে: মোমিন মেহেদী
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আগের অভিযানে দায়ের করা মামলাটি এখনো তদন্তাধীন। কিন্তু মামলার নিষ্পত্তি বা আদালতের কোনো আদেশ ছাড়াই প্রতিষ্ঠানটি পুনরায় চালু হওয়ায় আইনগত প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি কোনো প্রতিষ্ঠান সিলগালা বা তালাবদ্ধ করা হয় এবং মামলা চলমান থাকে, তাহলে আদালতের অনুমতি ছাড়া সেটি চালু করা সম্পূর্ণ বেআইনি। গুলশানের মতো এলাকায় এ ধরনের অবৈধ কার্যক্রম শুধু নৈতিক অবক্ষয় নয়, বরং মাদক, নারী নির্যাতন ও অপরাধ বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করে। ইয়াবা সিন্ডিকেটের অভিযোগ যুক্ত হওয়ায় বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক।
একজন সমাজবিজ্ঞানী বলেন, স্পা সেন্টারের আড়ালে যদি মাদক ও নারী পাচারের মতো অপরাধ চলে, তাহলে সেটি পুরো এলাকার সামাজিক নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে। গুলশানের ১৩২ নম্বর রোডের এই স্পা সেন্টার শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের গল্প নয়; এটি রাজধানীতে অবৈধ স্পা ব্যবসা, দালাল সিন্ডিকেট ও সম্ভাব্য মাদক চক্রের একটি প্রতিচ্ছবি। প্রশাসনের কঠোর ও স্বচ্ছ ভূমিকা ছাড়া এই চক্র ভাঙা সম্ভব নয়—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রতিবেদন প্রকাশের আগ পর্যন্ত অভিযুক্ত আরিফ ও সংশ্লিষ্ট অন্যদের পক্ষ থেকে লিখিত কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ভবিষ্যতে তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী সংখ্যায় প্রকাশ করা হবে।
বিষয় : গুলশান স্পা সেন্টার

মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৫ জানুয়ারি ২০২৬
রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান যেখানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি তুলনামূলকভাবে বেশি থাকার কথা, সেখানেই আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে অবৈধ স্পা সেন্টার ঘিরে নারী পাচার, দালাল চক্র ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ। গুলশান-১ এর ১৩২ নম্বর রোডে ৫৪/এ (৪র্থ তলা) অবস্থিত একটি স্পা সেন্টার নিয়ে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে, যা কয়েক মাস আগেই গুলশান থানা পুলিশের অভিযানে বন্ধ হয়ে তালাবদ্ধ করা হয়েছিল।
স্থানীয় সূত্র ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওই স্পা সেন্টারটি প্রথমে ‘আরিপের স্পা সেন্টার’ নামে পরিচিত ছিল। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছিল। বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে কয়েক মাস আগে গুলশান থানা পুলিশ সেখানে অভিযান চালায়। অভিযানের সময় প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে দেওয়া হয়, তালা লাগানো হয় এবং এ ঘটনায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। পুলিশি অভিযানের পর স্পা সেন্টারটি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় এলাকাবাসী মনে করেছিলেন, অবশেষে অবৈধ কার্যক্রমের অবসান হয়েছে। তবে সেই ধারণা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সম্প্রতি জাবেদ নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে চুক্তিভিত্তিকভাবে স্পা সেন্টারটি আবারও নেয় আরিফ নামের এক ব্যক্তি। এরপর নীরবে শুরু হয় পুনরায় কার্যক্রম। কয়েক সপ্তাহ ধরে লক্ষ্য করছি, আগের মতোই রাত বাড়লেই অচেনা লোকজনের আনাগোনা বেড়ে যায়। যেটা বন্ধ থাকার সময় একেবারেই ছিল না।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত আরিফের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রতিবেদককে বলেন, ভাই, আমি কষ্ট করে এই ক্যাবল (কেবল) প্রতিষ্ঠানটা আবার চালু করেছি। গুলশান থানার ওসি থেকে শুরু করে সবার সাথেই কথা বলে তারপর চালাচ্ছি। না হলে কি আর সম্ভব? তার এই বক্তব্য ঘিরেই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে আসলে কীভাবে একটি মামলাভুক্ত ও পুলিশি অভিযানে বন্ধ হওয়া প্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু হয়? কার অনুমতিতে বা কার আশ্বাসে চলছে এই কার্যক্রম?
আরিফ সম্পর্কে আরও গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র। তাদের দাবি, আরিফ একজন ইয়াবা ব্যবসায়ী হিসেবে এলাকায় পরিচিত। অতীতে তিনি বিভিন্ন স্পা সেন্টারে দালাল হিসেবে কাজ করতেন এবং একই সঙ্গে ইয়াবা ব্যবসার একটি সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী বলেন, আরিফ আগে একাধিক স্পা সেন্টারে দালালি করত। মেয়েদের জোগাড় করা, কাস্টমার আনা এসবই তার কাজ ছিল। পাশাপাশি ইয়াবার লেনদেনের অভিযোগও আমরা বহুবার শুনেছি। এজন্যই সে আগে কোনো স্পা সেন্টারে বেশিদিন টিকতে পারেনি। অনুসন্ধানে জানা গেছে, গুলশান ও বনানী এলাকায় বেশ কয়েকটি স্পা সেন্টার ঘিরে একটি সংঘবদ্ধ দালাল সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। এই সিন্ডিকেটের কাজ হচ্ছে—গ্রাম ও শহরতলির অসচ্ছল নারীদের ভালো বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ঢাকায় আনা এবং পরে স্পা সেন্টারের আড়ালে অনৈতিক কাজে বাধ্য করা।
একটি মানবাধিকার সংগঠনের এক কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এই স্পা সেন্টারগুলো মূলত একটি নেটওয়ার্কের অংশ। এক জায়গায় অভিযান হলে তারা অন্য জায়গায় সরে যায়। আবার কিছুদিন পর আগের জায়গাতেই ফিরে আসে। এর পেছনে শক্তিশালী দালাল ও অর্থের জোগান রয়েছে। যদিও আরিফ দাবি করেছেন যে তিনি গুলশান থানার ওসি থেকে শুরু করে সবার সাথে কথা বলেই প্রতিষ্ঠানটি চালাচ্ছেন, তবে এ বিষয়ে গুলশান থানার পক্ষ থেকে ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে।
গুলশান থানার এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কোনো অবৈধ স্পা সেন্টার চালানোর অনুমতি কাউকে দেওয়া হয়নি। যদি কেউ পুলিশের নাম ব্যবহার করে অবৈধ কার্যক্রম চালায়, সেটি তদন্তসাপেক্ষ বিষয়। তবে এলাকাবাসীর প্রশ্ন যদি অনুমতি না থাকে, তাহলে কীভাবে একটি তালাবদ্ধ ও মামলাভুক্ত প্রতিষ্ঠান আবারও চালু হলো?
আরও পড়ুন, গণভোট গণবিরোধী হিসেবে বিবেচিত হবে: মোমিন মেহেদী
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আগের অভিযানে দায়ের করা মামলাটি এখনো তদন্তাধীন। কিন্তু মামলার নিষ্পত্তি বা আদালতের কোনো আদেশ ছাড়াই প্রতিষ্ঠানটি পুনরায় চালু হওয়ায় আইনগত প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি কোনো প্রতিষ্ঠান সিলগালা বা তালাবদ্ধ করা হয় এবং মামলা চলমান থাকে, তাহলে আদালতের অনুমতি ছাড়া সেটি চালু করা সম্পূর্ণ বেআইনি। গুলশানের মতো এলাকায় এ ধরনের অবৈধ কার্যক্রম শুধু নৈতিক অবক্ষয় নয়, বরং মাদক, নারী নির্যাতন ও অপরাধ বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করে। ইয়াবা সিন্ডিকেটের অভিযোগ যুক্ত হওয়ায় বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক।
একজন সমাজবিজ্ঞানী বলেন, স্পা সেন্টারের আড়ালে যদি মাদক ও নারী পাচারের মতো অপরাধ চলে, তাহলে সেটি পুরো এলাকার সামাজিক নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে। গুলশানের ১৩২ নম্বর রোডের এই স্পা সেন্টার শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের গল্প নয়; এটি রাজধানীতে অবৈধ স্পা ব্যবসা, দালাল সিন্ডিকেট ও সম্ভাব্য মাদক চক্রের একটি প্রতিচ্ছবি। প্রশাসনের কঠোর ও স্বচ্ছ ভূমিকা ছাড়া এই চক্র ভাঙা সম্ভব নয়—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রতিবেদন প্রকাশের আগ পর্যন্ত অভিযুক্ত আরিফ ও সংশ্লিষ্ট অন্যদের পক্ষ থেকে লিখিত কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ভবিষ্যতে তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী সংখ্যায় প্রকাশ করা হবে।

আপনার মতামত লিখুন