গুলশান বারিধারায় দোলার অবৈধ স্পা সেন্টার নিয়ে বিতর্ক
রাজধানীর অভিজাত এলাকা হিসেবে পরিচিত গুলশান-বারিধারা দীর্ঘদিন ধরেই কূটনৈতিক জোন, উচ্চবিত্ত আবাসন এবং নিরাপদ পরিবেশের জন্য আলোচিত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই আবাসিক এলাকাকে ঘিরে বিভিন্ন স্পা সেন্টার, বিউটি সেলুন এবং ব্যক্তিগত ওয়েলনেস প্রতিষ্ঠানের আড়ালে অনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগ নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে স্থানীয়দের মধ্যে। বিশেষ করে বারিধারা এলাকার একটি স্পা প্রতিষ্ঠান “আবেরা”কে ঘিরে নারী সিন্ডিকেট পরিচালনা, অসামাজিক কার্যক্রম এবং দীর্ঘদিন ধরে নারী সিন্ডিকেটের দোলার ছত্রছায়ায় ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।আরও পড়ুন: উত্তরায় পুলিশের নাকের ডগায় গ্রান্ড প্লাজায় সোহেলের অসামাজিক কার্যক্রমস্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বারিধারার মতো অভিজাত ও আবাসিক এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে নিরবে পরিচালিত হচ্ছে কয়েকটি স্পা সেন্টার। অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানের কিছু অংশে নিয়মিত স্পা বা ম্যাসাজ সেবার আড়ালে চলছে অনৈতিক কর্মকাণ্ড। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ বলছেন, দিনের তুলনায় রাতের বেলায় এসব প্রতিষ্ঠানে সন্দেহজনক লোকজনের যাতায়াত বাড়তে দেখা যায়। অনেক সময় বিলাসবহুল গাড়িতে আগত ব্যক্তিদের উপস্থিতি নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হলেও প্রকাশ্যে কেউ মুখ খুলতে চান না।অভিযোগের কেন্দ্রে থাকা “আবেরা” নামের প্রতিষ্ঠানটি নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে রয়েছে নানা আলোচনা। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমের সঙ্গে একটি সংঘবদ্ধ নারী সিন্ডিকেট জড়িত। দীর্ঘদিন ধরে নীরবে এসব কর্মকাণ্ড চললেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বিভিন্ন সময়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলেও রহস্যজনক কারণে তা আর সামনে এগোয়নি।আরও পড়ুন: অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তে টিকা দেরি, বাড়ল শিশুমৃত্যুতারা দাবি করেন, বারিধারার মতো কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা সংবেদনশীল এলাকায় এ ধরনের অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানের আড়ালে শুধু অনৈতিক কর্মকাণ্ডই নয়, মাদক লেনদেন, ব্ল্যাকমেইলিং কিংবা সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের সম্পৃক্ততার ঝুঁকিও থেকে যায়। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।অনুসন্ধানে জানা গেছে, আলোচিত প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে কয়েকবার হাতবদল হয়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, মালিকানা পরিবর্তনের মাধ্যমে কার্যক্রম আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে বর্তমানে দোলা নামের এক নারীর তত্ত্বাবধানে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য যাচাই করতে দোলার সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।আরও পড়ুন: ঈদুল আজহা সামনে রেখে কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফেরা শুরু করেছেন হাজারো মানুষ।স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব প্রতিষ্ঠানে অনেক সময় বাইরের জেলা থেকে তরুণীদের এনে কাজ করানো হয়। তাদের একটি অংশকে উচ্চ বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে ঢাকায় আনা হলেও পরে বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা পুরোপুরি যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবুও স্থানীয়দের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীর বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় স্পা সেন্টারের আড়ালে অনৈতিক ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ নতুন নয়। অতীতেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিভিন্ন অভিযানে এমন অভিযোগে একাধিক প্রতিষ্ঠান সিলগালা করেছে। কিন্তু অভিযানের কিছুদিন পরই নতুন নামে বা নতুন ব্যবস্থাপনায় একই ধরনের কার্যক্রম আবারও চালু হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।আরও পড়ুন: আগৈলঝাড়া ‘ক্রসফায়ার’ হত্যা: হাসিনার ফুফাতো ভাই হাসানাত আবদুল্লাহসহ ৪ জনের বিচার শুরুএদিকে বারিধারা সোসাইটির পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, আবাসিক এলাকার পরিবেশ রক্ষায় সোসাইটির আরও কার্যকর ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। কারণ একটি আবাসিক এলাকায় যদি দিনের পর দিন বিতর্কিত কার্যক্রম চলে, তাহলে সেটি পুরো এলাকার নিরাপত্তা ও সামাজিক পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, শুধুমাত্র প্রশাসনিক অভিযান নয়, বরং নিয়মিত মনিটরিং এবং লাইসেন্স যাচাই প্রক্রিয়া জোরদার করা প্রয়োজন। অনেক সময় ট্রেড লাইসেন্স বা বিউটি ও ওয়েলনেস সেন্টারের অনুমোদন নিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ উঠে। ফলে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত নজরদারি অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন তারা। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, রাজধানীর কিছু এলাকায় গড়ে ওঠা এই ধরনের স্পা সেন্টারগুলোতে বিশেষ কিছু গ্রাহক শ্রেণিকে টার্গেট করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন বিজ্ঞাপন কিংবা গোপন যোগাযোগের মাধ্যমে গ্রাহক সংগ্রহ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে বিষয়টি শুধু স্থানীয় পর্যায়ের সমস্যা নয়, বরং এটি একটি সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্কের অংশ হতে পারে বলে ধারণা করছেন অনেকে।আরও পড়ুন: মুগদা পেট্রল পাম্প সংলগ্ন হোটেল গ্রীন সিলেট ঘিরে চাঞ্চল্যসামাজিক বিশ্লেষকরা বলছেন, অভিজাত এলাকায় এ ধরনের কার্যক্রম দীর্ঘদিন টিকে থাকার পেছনে প্রভাবশালী চক্রের সম্পৃক্ততা কিংবা দুর্বল মনিটরিং বড় কারণ হতে পারে। কারণ সাধারণত আবাসিক এলাকায় যেকোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণের আওতায় থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই তা কার্যকরভাবে হয় না।অন্যদিকে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের একটি অংশ বলছেন, পুরো স্পা বা ওয়েলনেস খাতকে নেতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ নেই। অনেক বৈধ প্রতিষ্ঠানও সুনামের সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করছে। তবে কিছু বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানের কারণে পুরো খাত প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। তাই অভিযোগ পাওয়া মাত্র নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন তারা। রাজধানীতে অতীতে বিভিন্ন অভিযানে দেখা গেছে, কিছু স্পা সেন্টারে গোপন কক্ষ, বিশেষ সার্ভিস এবং সংঘবদ্ধ দালাল চক্র সক্রিয় ছিল। ফলে বারিধারার আলোচিত প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধেও যদি একই ধরনের অভিযোগ ওঠে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা।এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, মাঝে মধ্যেই গভীর রাত পর্যন্ত সন্দেহজনক যাতায়াত লক্ষ্য করা যায়। এতে আবাসিক এলাকার পরিবেশ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি নিরাপত্তা ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে পরিবার নিয়ে বসবাসকারী বাসিন্দারা বিষয়টি নিয়ে অস্বস্তিতে রয়েছেন।আরও পড়ুন: লামায় ড্রেইনের পানি ও কেমিক্যালে তৈরি হচ্ছে শিশুদের পছন্দের আইসক্রিমআইনশৃঙ্খলা বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজধানীর কূটনৈতিক ও অভিজাত এলাকায় যেকোনো ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ড শুধু সামাজিক সমস্যা নয়, বরং এটি নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। কারণ এসব স্থানে বিদেশি নাগরিক, কূটনীতিক এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বসবাস রয়েছে। ফলে সন্দেহজনক কার্যক্রমের বিষয়ে দ্রুত তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সিটি কর্পোরেশন যৌথভাবে বিষয়টি খতিয়ে দেখবে। একই সঙ্গে আবাসিক এলাকায় পরিচালিত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা হবে। তবে অভিযোগের বিপরীতে অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য পাওয়া না যাওয়ায় বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তারপরও স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের আলোচনা এবং একাধিক অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কার্যকর কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ না থাকায় জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে রাজধানীর বারিধারার মতো অভিজাত এলাকায় একটি স্পা সেন্টারকে ঘিরে নারী সিন্ডিকেট ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি কতটা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করে এবং অভিযোগের সত্যতা পেলে কী ধরনের ব্যবস্থা নেয়, সেটিই দেখার অপেক্ষা।