দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

অভিযান হয়, ধরা পড়ে না কেউ!

মালিবাগে ‘শিখর’ ও ‘সিটি প্যালেজ’ ঘিরে অভিযোগ

মালিবাগে ‘শিখর’ ও ‘সিটি প্যালেজ’ ঘিরে অভিযোগ
হোটেল ‘শিখর’ ও ‘সিটি প্যালেজ

রাজধানীর মালিবাগ এলাকায় হাতিরঝিল থানা-অধীন আবাসিক হোটেল ‘শিখর’ ও ‘সিটি প্যালেজ’কে ঘিরে অনৈতিক কর্মকাণ্ড, মাদক বেচাকেনা এবং দালাল চক্রের তৎপরতার নানা অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে এসব হোটেলকে কেন্দ্র করে একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে। অভিযোগের তীর হোটেল মালিক রবিনের দিকেও। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে অভিযোগগুলো তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

আরও পড়ুন: আব্দুল্লাহপুরের ‘গ্রীন গার্ডেন’: আবাসিক হোটেলের আড়ালে কী চলছে?

স্থানীয়দের অভিযোগ, আবাসিক হোটেলের আড়ালে কিছু কক্ষকে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য ব্যবহারের সুযোগ করে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে মাদকসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আনাগোনার অভিযোগও রয়েছে। হোটেলকে কেন্দ্র করে বাইরে ও ভেতরে কয়েকজন দালাল সক্রিয় থাকার অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন সংগ্রহ করে হোটেলে নিয়ে আসে এবং কক্ষ ভাড়া ও অন্যান্য সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে মধ্যস্থতা করে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের সময়কে ঘিরে। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, হোটেলগুলোতে পুলিশি অভিযান পরিচালিত হলেও অনেক সময় অভিযানের আগেই কথিত দালাল ও সন্দেহভাজন ব্যক্তিরা সরে যায়। ফলে অভিযান শেষে কাউকে আটক বা গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয় না।

আরও পড়ুন: বনানীর আবাসিক ভবনে স্পা-গেস্ট হাউজ এখন অন্ধকার জগৎ

স্থানীয় এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “পুলিশ আসার খবর আগে থেকেই ছড়িয়ে পড়লে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা দ্রুত সরে যায়। পুলিশ আসার পর হোটেলে অনেক সময় স্বাভাবিক পরিবেশ দেখা যায়। এতে প্রকৃত চিত্র বের করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে অভিযান শুরুর আগে তথ্য ফাঁস হচ্ছে কি না, হলে কার মাধ্যমে হচ্ছে এমন প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে পুলিশের পক্ষ থেকে অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না; বরং অভিযোগের ধরন, হোটেলের নিবন্ধন, অতিথি-তথ্য, কর্মচারীদের ভূমিকা এবং কথিত দালালদের গতিবিধি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।


অভিযোগের বিষয়ে হোটেল মালিক রবিনের সঙ্গে কথা বললে তিনি অনৈতিক কর্মকাণ্ড বা মাদক ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেন বলে জানা গেছে। তবে হোটেল ব্যবসা পরিচালনা প্রসঙ্গে তার একটি বক্তব্য নিয়ে এলাকায় নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে। রবিনের ভাষ্য, এসব ব্যবসা পুলিশকে না জানিয়ে কী করা যায়? আমি দীর্ঘদিনের ব্যবসায়ী, এগুলো আমি বুঝি। শুধু রুম ভাড়া দিয়ে হোটেল চালানো যায় না।

আরও পড়ুন: দারুস সালামে আবাসিক হোটেলের আড়ালে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ

তার এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। হোটেল ব্যবসার স্বাভাবিক আয়-ব্যয়ের বাইরে কোনো ধরনের অবৈধ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে কি না, সেটিই এখন তদন্তের বিষয় বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। একই সঙ্গে ‘শুধু রুম ভাড়া দিয়ে হোটেল চালানো যায় না’ এ বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছেন, সেটিও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

কারণ, একটি বৈধ আবাসিক হোটেলের আয় কক্ষ ভাড়া, খাবার, সার্ভিস চার্জসহ অনুমোদিত বিভিন্ন সেবা থেকে আসতে পারে। এর বাইরে কোনো অবৈধ কর্মকাণ্ডকে ব্যবসার অংশ হিসেবে গ্রহণ করার সুযোগ আইন দেয় না। ফলে মালিকের বক্তব্যের প্রকৃত অর্থ ও ব্যবসার আর্থিক কার্যক্রম তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি। বাইরে সাইনবোর্ড থাকলেও ভিতরে চলছে অণ্য কারবার।

অনুসন্ধানে স্থানীয় পর্যায়ে কয়েকজন দালালের নাম ও তাদের তৎপরতার বিষয়ে অভিযোগ পাওয়া গেলেও যাচাইযোগ্য নথি ছাড়া কারও নাম প্রকাশ করা হয়নি। স্থানীয়দের দাবি, হোটেলের আশপাশে কিছু ব্যক্তি নিয়মিত ঘোরাফেরা করেন এবং সম্ভাব্য অতিথিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাদের কেউ কেউ হোটেলের কক্ষ ভাড়া, অতিথি আনা-নেওয়া কিংবা অন্যান্য সুবিধা প্রদানে মধ্যস্থতা করে থাকতে পারেন।

আরও পড়ুন: দারুসসালামে অনুমোদনহীন অনৈতিক কর্মকান্ডে জসিম ও হারুনের দাপট

অভিযোগ রয়েছে, এই কথিত দালালদের একটি অংশ হোটেলের ভেতরের পরিস্থিতি সম্পর্কে আগে থেকেই অবগত থাকে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতির খবর পেলে তারা দ্রুত স্থান ত্যাগ করে। যদিও এসব দাবির সত্যতা নিশ্চিত করতে পুলিশি তদন্ত ও গোয়েন্দা নজরদারি প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো আবাসিক হোটেলকে ঘিরে যদি দীর্ঘদিন ধরে অপরাধের অভিযোগ থাকে, তাহলে শুধু আকস্মিক অভিযান না চালিয়ে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি নজরদারি জরুরি। একই সঙ্গে হোটেলের সিসিটিভি ফুটেজ, অতিথি রেজিস্টার, কর্মচারীদের তথ্য, কক্ষ বুকিংয়ের রেকর্ড এবং আর্থিক লেনদেন পরীক্ষা করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।

পুলিশের অভিযান হয়, কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী অভিযানের সময় মূল সন্দেহভাজনদের পাওয়া যায় না—এমন পরিস্থিতি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে এর পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। অভিযানের বিষয়ে আগাম তথ্য চলে যাওয়া, হোটেলের ভেতরে সন্দেহভাজনদের অবস্থান পরিবর্তন, পর্যাপ্ত গোয়েন্দা তথ্যের অভাব অথবা অভিযানের ধরন সম্পর্কে আগাম ধারণা সবকিছুই তদন্তের আওতায় আসা প্রয়োজন।

আরও পড়ুন: গাজীপুরে লাইসেন্স ছাড়া এমএলএম কার্যক্রমের অভিযোগ

মালিবাগের ব্যস্ত এ এলাকায় আবাসিক হোটেলকে ঘিরে কোনো ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চললে তার প্রভাব আশপাশের পরিবেশের ওপরও পড়তে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বিশেষ করে পরিবার নিয়ে বসবাসকারী মানুষদের মধ্যে এ ধরনের অভিযোগ উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, হোটেল থাকবে, ব্যবসা করবে—এতে আপত্তি নেই। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানের আড়ালে যদি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চলে, তাহলে সেটা বন্ধ করা দরকার। নিয়মিত নজরদারি থাকলে সমস্যার অনেকটাই সমাধান সম্ভব।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সংশ্লিষ্ট হোটেল দুটির বৈধ কাগজপত্র, ট্রেড লাইসেন্স, আবাসিক হোটেল পরিচালনার অনুমোদন, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, অতিথি রেজিস্টার এবং কর্মচারীদের পরিচয় যাচাই করা প্রয়োজন। পাশাপাশি হোটেলের সিসিটিভি ব্যবস্থা সচল রয়েছে কি না এবং সেখানে ধারণ করা ফুটেজ নিয়মিত সংরক্ষণ করা হচ্ছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চাইলে গোপন তথ্য সংগ্রহ, গোয়েন্দা নজরদারি এবং প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যবস্থা নিতে পারে। বিশেষ করে মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একই সঙ্গে অভিযানের আগে তথ্য কীভাবে বাইরে যাচ্ছে এমন অভিযোগ থাকলে সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। কারণ অভিযানের আগেই যদি সন্দেহভাজনরা নিরাপদ স্থানে সরে যেতে সক্ষম হয়, তাহলে বারবার অভিযান পরিচালনা করেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। তবে অভিযোগ সত্য হলে হোটেল মালিক, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ, দালাল ও সংশ্লিষ্ট অন্যদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। 

সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি আবাসিক হোটেলের মালিকের দায়িত্ব শুধু কক্ষ ভাড়া দেওয়া নয়; বরং প্রতিষ্ঠানে কে অবস্থান করছেন, কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড হচ্ছে কি না এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর এর প্রভাব পড়ছে কি না এসব বিষয়েও দায়িত্বশীল থাকা জরুরি। ‘শিখর’ ও ‘সিটি প্যালেজ’ নিয়ে ওঠা অভিযোগের সত্যতা শেষ পর্যন্ত তদন্তেই নির্ধারিত হবে। তবে অভিযোগগুলো যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে দীর্ঘদিন ধরে একটি চক্র কীভাবে সেখানে সক্রিয় থাকতে পারছে, কেন অভিযান কাঙ্ক্ষিত ফল দিচ্ছে না এবং কোনো পর্যায়ে তথ্য ফাঁস হচ্ছে কি না এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি।

আরও পড়ুন: রাত ১টা পর্যন্ত ১৫ অঞ্চলে ঝোড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টির শঙ্কা

হাতিরঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বলেন,আবাসিক হোটেল শিখর ও সিটি প্যালেজকে ঘিরে অনৈতিক কর্মকাণ্ড, মাদক ব্যবসা বা কোনো ধরনের অপরাধমূলক তৎপরতার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হবে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো হোটেল বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেই কাউকে অপরাধী বলা যায় না; তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। হোটেলগুলোতে পুলিশের অভিযান পরিচালিত হলে অভিযানের আগেই কেউ সরে যাচ্ছে কি না, কিংবা অভিযানের তথ্য কোনোভাবে ফাঁস হচ্ছে কি না এমন অভিযোগ থাকলে সেটিও খতিয়ে দেখা হবে। মাদক ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আমাদের অভিযান নিয়মিতভাবে অব্যাহত রয়েছে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পুলিশের কোনো ধরনের অনৈতিক সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধেও বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিষয় : মালিবাগ অপরাধ আবাসিক হোটেল হাতিরঝিল থানা

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬


মালিবাগে ‘শিখর’ ও ‘সিটি প্যালেজ’ ঘিরে অভিযোগ

প্রকাশের তারিখ : ১৭ আগস্ট ২০২৬

featured Image

রাজধানীর মালিবাগ এলাকায় হাতিরঝিল থানা-অধীন আবাসিক হোটেল ‘শিখর’ ও ‘সিটি প্যালেজ’কে ঘিরে অনৈতিক কর্মকাণ্ড, মাদক বেচাকেনা এবং দালাল চক্রের তৎপরতার নানা অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে এসব হোটেলকে কেন্দ্র করে একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে। অভিযোগের তীর হোটেল মালিক রবিনের দিকেও। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে অভিযোগগুলো তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

আরও পড়ুন: আব্দুল্লাহপুরের ‘গ্রীন গার্ডেন’: আবাসিক হোটেলের আড়ালে কী চলছে?

স্থানীয়দের অভিযোগ, আবাসিক হোটেলের আড়ালে কিছু কক্ষকে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য ব্যবহারের সুযোগ করে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে মাদকসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আনাগোনার অভিযোগও রয়েছে। হোটেলকে কেন্দ্র করে বাইরে ও ভেতরে কয়েকজন দালাল সক্রিয় থাকার অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন সংগ্রহ করে হোটেলে নিয়ে আসে এবং কক্ষ ভাড়া ও অন্যান্য সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে মধ্যস্থতা করে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের সময়কে ঘিরে। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, হোটেলগুলোতে পুলিশি অভিযান পরিচালিত হলেও অনেক সময় অভিযানের আগেই কথিত দালাল ও সন্দেহভাজন ব্যক্তিরা সরে যায়। ফলে অভিযান শেষে কাউকে আটক বা গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয় না।

আরও পড়ুন: বনানীর আবাসিক ভবনে স্পা-গেস্ট হাউজ এখন অন্ধকার জগৎ

স্থানীয় এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “পুলিশ আসার খবর আগে থেকেই ছড়িয়ে পড়লে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা দ্রুত সরে যায়। পুলিশ আসার পর হোটেলে অনেক সময় স্বাভাবিক পরিবেশ দেখা যায়। এতে প্রকৃত চিত্র বের করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে অভিযান শুরুর আগে তথ্য ফাঁস হচ্ছে কি না, হলে কার মাধ্যমে হচ্ছে এমন প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে পুলিশের পক্ষ থেকে অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না; বরং অভিযোগের ধরন, হোটেলের নিবন্ধন, অতিথি-তথ্য, কর্মচারীদের ভূমিকা এবং কথিত দালালদের গতিবিধি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।


অভিযোগের বিষয়ে হোটেল মালিক রবিনের সঙ্গে কথা বললে তিনি অনৈতিক কর্মকাণ্ড বা মাদক ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেন বলে জানা গেছে। তবে হোটেল ব্যবসা পরিচালনা প্রসঙ্গে তার একটি বক্তব্য নিয়ে এলাকায় নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে। রবিনের ভাষ্য, এসব ব্যবসা পুলিশকে না জানিয়ে কী করা যায়? আমি দীর্ঘদিনের ব্যবসায়ী, এগুলো আমি বুঝি। শুধু রুম ভাড়া দিয়ে হোটেল চালানো যায় না।

আরও পড়ুন: দারুস সালামে আবাসিক হোটেলের আড়ালে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ

তার এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। হোটেল ব্যবসার স্বাভাবিক আয়-ব্যয়ের বাইরে কোনো ধরনের অবৈধ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে কি না, সেটিই এখন তদন্তের বিষয় বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। একই সঙ্গে ‘শুধু রুম ভাড়া দিয়ে হোটেল চালানো যায় না’ এ বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছেন, সেটিও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

কারণ, একটি বৈধ আবাসিক হোটেলের আয় কক্ষ ভাড়া, খাবার, সার্ভিস চার্জসহ অনুমোদিত বিভিন্ন সেবা থেকে আসতে পারে। এর বাইরে কোনো অবৈধ কর্মকাণ্ডকে ব্যবসার অংশ হিসেবে গ্রহণ করার সুযোগ আইন দেয় না। ফলে মালিকের বক্তব্যের প্রকৃত অর্থ ও ব্যবসার আর্থিক কার্যক্রম তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি। বাইরে সাইনবোর্ড থাকলেও ভিতরে চলছে অণ্য কারবার।

অনুসন্ধানে স্থানীয় পর্যায়ে কয়েকজন দালালের নাম ও তাদের তৎপরতার বিষয়ে অভিযোগ পাওয়া গেলেও যাচাইযোগ্য নথি ছাড়া কারও নাম প্রকাশ করা হয়নি। স্থানীয়দের দাবি, হোটেলের আশপাশে কিছু ব্যক্তি নিয়মিত ঘোরাফেরা করেন এবং সম্ভাব্য অতিথিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাদের কেউ কেউ হোটেলের কক্ষ ভাড়া, অতিথি আনা-নেওয়া কিংবা অন্যান্য সুবিধা প্রদানে মধ্যস্থতা করে থাকতে পারেন।

আরও পড়ুন: দারুসসালামে অনুমোদনহীন অনৈতিক কর্মকান্ডে জসিম ও হারুনের দাপট

অভিযোগ রয়েছে, এই কথিত দালালদের একটি অংশ হোটেলের ভেতরের পরিস্থিতি সম্পর্কে আগে থেকেই অবগত থাকে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতির খবর পেলে তারা দ্রুত স্থান ত্যাগ করে। যদিও এসব দাবির সত্যতা নিশ্চিত করতে পুলিশি তদন্ত ও গোয়েন্দা নজরদারি প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো আবাসিক হোটেলকে ঘিরে যদি দীর্ঘদিন ধরে অপরাধের অভিযোগ থাকে, তাহলে শুধু আকস্মিক অভিযান না চালিয়ে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি নজরদারি জরুরি। একই সঙ্গে হোটেলের সিসিটিভি ফুটেজ, অতিথি রেজিস্টার, কর্মচারীদের তথ্য, কক্ষ বুকিংয়ের রেকর্ড এবং আর্থিক লেনদেন পরীক্ষা করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।

পুলিশের অভিযান হয়, কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী অভিযানের সময় মূল সন্দেহভাজনদের পাওয়া যায় না—এমন পরিস্থিতি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে এর পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। অভিযানের বিষয়ে আগাম তথ্য চলে যাওয়া, হোটেলের ভেতরে সন্দেহভাজনদের অবস্থান পরিবর্তন, পর্যাপ্ত গোয়েন্দা তথ্যের অভাব অথবা অভিযানের ধরন সম্পর্কে আগাম ধারণা সবকিছুই তদন্তের আওতায় আসা প্রয়োজন।

আরও পড়ুন: গাজীপুরে লাইসেন্স ছাড়া এমএলএম কার্যক্রমের অভিযোগ

মালিবাগের ব্যস্ত এ এলাকায় আবাসিক হোটেলকে ঘিরে কোনো ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চললে তার প্রভাব আশপাশের পরিবেশের ওপরও পড়তে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বিশেষ করে পরিবার নিয়ে বসবাসকারী মানুষদের মধ্যে এ ধরনের অভিযোগ উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, হোটেল থাকবে, ব্যবসা করবে—এতে আপত্তি নেই। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানের আড়ালে যদি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চলে, তাহলে সেটা বন্ধ করা দরকার। নিয়মিত নজরদারি থাকলে সমস্যার অনেকটাই সমাধান সম্ভব।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সংশ্লিষ্ট হোটেল দুটির বৈধ কাগজপত্র, ট্রেড লাইসেন্স, আবাসিক হোটেল পরিচালনার অনুমোদন, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, অতিথি রেজিস্টার এবং কর্মচারীদের পরিচয় যাচাই করা প্রয়োজন। পাশাপাশি হোটেলের সিসিটিভি ব্যবস্থা সচল রয়েছে কি না এবং সেখানে ধারণ করা ফুটেজ নিয়মিত সংরক্ষণ করা হচ্ছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চাইলে গোপন তথ্য সংগ্রহ, গোয়েন্দা নজরদারি এবং প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যবস্থা নিতে পারে। বিশেষ করে মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একই সঙ্গে অভিযানের আগে তথ্য কীভাবে বাইরে যাচ্ছে এমন অভিযোগ থাকলে সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। কারণ অভিযানের আগেই যদি সন্দেহভাজনরা নিরাপদ স্থানে সরে যেতে সক্ষম হয়, তাহলে বারবার অভিযান পরিচালনা করেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। তবে অভিযোগ সত্য হলে হোটেল মালিক, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ, দালাল ও সংশ্লিষ্ট অন্যদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। 

সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি আবাসিক হোটেলের মালিকের দায়িত্ব শুধু কক্ষ ভাড়া দেওয়া নয়; বরং প্রতিষ্ঠানে কে অবস্থান করছেন, কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড হচ্ছে কি না এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর এর প্রভাব পড়ছে কি না এসব বিষয়েও দায়িত্বশীল থাকা জরুরি। ‘শিখর’ ও ‘সিটি প্যালেজ’ নিয়ে ওঠা অভিযোগের সত্যতা শেষ পর্যন্ত তদন্তেই নির্ধারিত হবে। তবে অভিযোগগুলো যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে দীর্ঘদিন ধরে একটি চক্র কীভাবে সেখানে সক্রিয় থাকতে পারছে, কেন অভিযান কাঙ্ক্ষিত ফল দিচ্ছে না এবং কোনো পর্যায়ে তথ্য ফাঁস হচ্ছে কি না এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি।

আরও পড়ুন: রাত ১টা পর্যন্ত ১৫ অঞ্চলে ঝোড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টির শঙ্কা

হাতিরঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বলেন,আবাসিক হোটেল শিখর ও সিটি প্যালেজকে ঘিরে অনৈতিক কর্মকাণ্ড, মাদক ব্যবসা বা কোনো ধরনের অপরাধমূলক তৎপরতার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হবে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো হোটেল বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেই কাউকে অপরাধী বলা যায় না; তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। হোটেলগুলোতে পুলিশের অভিযান পরিচালিত হলে অভিযানের আগেই কেউ সরে যাচ্ছে কি না, কিংবা অভিযানের তথ্য কোনোভাবে ফাঁস হচ্ছে কি না এমন অভিযোগ থাকলে সেটিও খতিয়ে দেখা হবে। মাদক ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আমাদের অভিযান নিয়মিতভাবে অব্যাহত রয়েছে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পুলিশের কোনো ধরনের অনৈতিক সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধেও বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

সম্পাদক ও প্রকাশক: এ বি এম মনিরুজ্জামান 
নির্বাহী সম্পাদক: রিপন রুদ্র
যুগ্ম সম্পাদক: জাকিয়া সুলতানা (লাভলী)

কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক সংবাদ দিগন্ত । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত