রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানের ৩৩ নম্বর সড়ক। কূটনৈতিক ও আবাসিক গুরুত্বপূর্ণ এই এলাকায় আবাসিক ভবনের আড়ালে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ নতুন নয়। তবে সম্প্রতি এই সড়কের একটি ভবনের দুটি ফ্লোরে পরিচালিত কথিত ‘মিরাজের গেস্ট হাউজ/স্পা’কে ঘিরে উঠেছে নানা গুরুতর অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, সেখানে নিয়মিতভাবে বহিরাগতদের আনাগোনা দেখা যায়। অভিযোগ রয়েছে, গেস্ট হাউজ ও স্পার আড়ালে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি মাদকসেবী ও সংশ্লিষ্ট একটি চক্রের যাতায়াতও রয়েছে।
আরও পড়ুন: বনানীতে মার্ভেল ইন-লাক্সারী গেস্ট হাউজ ঘিরে পুলিশের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ব্যবসাটির মূল নিয়ন্ত্রক হিসেবে ‘মিরাজ’ নামের এক ব্যক্তির কথা বিভিন্ন মহলে আলোচিত হলেও তাকে খুব একটা প্রকাশ্যে দেখা যায় না। সংশ্লিষ্টদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি বিপুল অর্থ-সম্পদের মালিক হয়েছেন। রাজধানীর অভিজাত এলাকায় ফ্ল্যাট, গাড়িসহ নানা সম্পদ গড়ে তোলার কথাও স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে। তবে এসব সম্পদের প্রকৃত উৎস তার অবৈধ ব্যবসা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, কথিত গেস্ট হাউজ/স্পার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একাধিক ব্যক্তি বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করেন। তাদের মধ্যে দালাল বা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পরিচিত কয়েকজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে সম্ভাব্য গ্রাহকদের কাছে বিভিন্ন ধরনের প্রস্তাব পৌঁছে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ফেসবুক, মেসেঞ্জার, ইমো, হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে যোগাযোগ করে গ্রাহক সংগ্রহ করা হয় এমন অভিযোগও রয়েছে।
আরও পড়ুন: বনানীতে মার্ভেল ইন গেষ্ট হাউজ ঘিরে আবারও পায়েলের অপরাধ সিন্ডিকেট
বর্তমানে অনলাইনভিত্তিক প্রচারণা ব্যবহার করে আবাসিক হোটেল, গেস্ট হাউজ ও স্পা ব্যবসায় গ্রাহক সংগ্রহের প্রবণতা বেড়েছে। গুলশানের ৩৩ নম্বর সড়কের ওই প্রতিষ্ঠানকেও ঘিরে একই ধরনের কার্যক্রম চলছে বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তি। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন, ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করে সম্ভাব্য গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। পরে তাদের নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করে একটি মধ্যস্থতাকারী চক্র। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট, মোবাইল নম্বর, লেনদেনের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন। কারণ অনলাইনে পরিচালিত অনেক অ্যাকাউন্ট প্রকৃত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত কি না, সেটিও অনেক সময় স্পষ্ট থাকে না।
স্থানীয় কয়েকটি সূত্রের দাবি, প্রতিষ্ঠানটিকে ঘিরে একটি দালাল চক্র সক্রিয় রয়েছে। এই চক্রের সদস্যরা সম্ভাব্য গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের গেস্ট হাউজ বা স্পায় নিয়ে আসেন বলে অভিযোগ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে গ্রাহকদের সঙ্গে প্রথমে অনলাইনে যোগাযোগ করা হয়। এরপর তাদের কাছ থেকে ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি কিংবা ভিডিও সংগ্রহের চেষ্টা করা হতে পারে। এসব তথ্য পরবর্তীতে অপব্যবহার করে ভয়ভীতি দেখানো বা ব্ল্যাকমেইলের আশঙ্কাও রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে গ্রাহকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সুযোগ নিয়ে তাদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হয়। তবে এই অভিযোগের বিষয়ে নির্দিষ্ট ভুক্তভোগীর বক্তব্য বা আইনগত নথি ছাড়া নিশ্চিতভাবে কোনো ব্যক্তিকে দায়ী করা যায় না। আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, এই ধরনের প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক দালাল চক্রের সঙ্গে মানব পাচারকারী চক্রের যোগাযোগ থাকতে পারে। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী ও অন্যান্য সেবার নামে প্রচারণা চালিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে লোকজন সংগ্রহ করা হয় এমন অভিযোগ উঠেছে। তবে মানব পাচারের মতো গুরুতর অভিযোগ প্রমাণের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত, ভুক্তভোগীর সাক্ষ্য, যোগাযোগের রেকর্ড, আর্থিক লেনদেন এবং অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ প্রয়োজন। ফলে অভিযোগগুলোকে এখনই চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা না করে তদন্তের দাবি হিসেবে দেখা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন: বনানীতে শহিদের অবৈধ স্পা সেন্টার ঘিরে অন্ধকার জগৎ
স্থানীয়দের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটি ঘুরছে, তা হলো স্বল্প পরিসরের একটি গেস্ট হাউজ বা স্পা ব্যবসা থেকে দীর্ঘদিনে কীভাবে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া সম্ভব হলো? অভিযোগকারীদের ভাষ্য, মিরাজ দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে তার গাড়ি রয়েছে এবং গুলশানের মতো ব্যয়বহুল এলাকায় ফ্ল্যাটও কেনার কথা শোনা যাচ্ছে। তার সম্পদের পরিমাণ, ব্যবসায়িক আয় এবং কর-সংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা গেলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে। তবে শুধু সম্পদ থাকা বা গাড়ি-ফ্ল্যাট কেনার ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অবৈধ আয়ের অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হয় না। সম্পদের বৈধ উৎস, আয়কর নথি, ব্যাংক লেনদেন, ব্যবসায়িক হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিকানা কাঠামো পর্যালোচনা করেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব।
স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, কথিত গেস্ট হাউজ বা স্পার মূল নিয়ন্ত্রক হিসেবে মিরাজের নাম শোনা গেলেও তাকে সেখানে নিয়মিত দেখা যায় না। বরং কর্মচারী, ব্যবস্থাপক ও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালিত হয়। প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা কাঠামো কী? ভবনের দুটি ফ্লোর কোন প্রতিষ্ঠানের নামে ভাড়া নেওয়া হয়েছে? ট্রেড লাইসেন্স কী নামে? প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন রয়েছে কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি। একই সঙ্গে ভবনের মালিক বা ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানতেন কি না যে সেখানে কী ধরনের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, সেটিও তদন্তের বিষয়।
আরও পড়ুন: তৃণমূলের কাণ্ডারী বকুল: ফরিদপুর বিএনপিতে ফের নেতৃত্বের আশাবাদ
গুলশান রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। এখানে কোনো গেস্ট হাউজ, স্পা বা আবাসিক প্রতিষ্ঠানে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট থানা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি থাকা স্বাভাবিক। দীর্ঘদিন ধরে যদি সেখানে সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড চলে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে বিষয়টি এসেছে কি না। অভিযোগ সত্য হলে কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি এ প্রশ্নও উঠছে। তবে পুলিশের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগও প্রমাণসাপেক্ষ। কোনো কর্মকর্তা বা সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তার বক্তব্য নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় নথি যাচাই করা সাংবাদিকতার দায়িত্ব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আবাসিক হোটেল, গেস্ট হাউজ কিংবা স্পা অবৈধ ব্যবসা। কিন্তু তার ব্যবসার আড়ালে মাদক, মানব পাচার, যৌন শোষণ, ব্ল্যাকমেইল বা অন্য কোনো অপরাধমূলক কার্যক্রমের জন্য ব্যবহৃত হয়, তাহলে সেটি শুধু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিষয় নয়; এটি জননিরাপত্তারও বিষয়। বিশেষ করে রাজধানীর অভিজাত এলাকাগুলোতে অনলাইনের মাধ্যমে গ্রাহক সংগ্রহ, ভুয়া পরিচয়ে যোগাযোগ এবং ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে অপরাধ সংঘটনের ঝুঁকি রয়েছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স, কর্মীদের পরিচয়, অতিথিদের রেজিস্টার, সিসিটিভি ফুটেজ এবং আর্থিক লেনদেন নিয়মিতভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালানো ব্যক্তিদের শনাক্ত করে তাদের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের যোগাযোগ রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা জরুরি। কোনো গ্রাহক ব্ল্যাকমেইলের শিকার হয়েছেন কি না, কিংবা কারও ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও ব্যবহার করে অর্থ আদায়ের ঘটনা ঘটেছে কি না তাও তদন্তের আওতায় আসা উচিত।
আরও পড়ুন: এক উপজেলার সব ইউনিয়নে একই দিনে ভোট, জানাল ইসি
এ বিষয়ে মিরাজের বক্তব্য জানতে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি বক্তব্য দিতে রাজি হননি। একইভাবে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা, ভবন মালিক, সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ এবং প্রয়োজনীয় সরকারি সংস্থার বক্তব্যও নেওয়া প্রয়োজন। কারণ অভিযোগ যতই গুরুতর হোক, সাংবাদিকতার মূলনীতি হলো অভিযোগের পাশাপাশি অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য, নথি ও প্রমাণ যাচাই করা।
গুলশানের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় একটি প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে এমন অভিযোগ চলতে থাকলে বিষয়টি আর কেবল একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সঙ্গে জননিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা, মাদক নিয়ন্ত্রণ, মানব পাচার প্রতিরোধ এবং নাগরিকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার প্রশ্নও জড়িয়ে যায়। তাই গুলশান ৩৩ নম্বর সড়কের কথিত ‘মিরাজের গেস্ট হাউজ/স্পা’কে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের দাবি উঠেছে স্থানীয় মহলে। নিছক একটি অবৈধ গেস্ট হাউজ বা স্পা ব্যবসা, নাকি এর আড়ালে সত্যিই কোনো সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র সক্রিয় রয়েছে।
বিষয় : গুলশান অপরাধ গেস্ট হাউজ

সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানের ৩৩ নম্বর সড়ক। কূটনৈতিক ও আবাসিক গুরুত্বপূর্ণ এই এলাকায় আবাসিক ভবনের আড়ালে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ নতুন নয়। তবে সম্প্রতি এই সড়কের একটি ভবনের দুটি ফ্লোরে পরিচালিত কথিত ‘মিরাজের গেস্ট হাউজ/স্পা’কে ঘিরে উঠেছে নানা গুরুতর অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, সেখানে নিয়মিতভাবে বহিরাগতদের আনাগোনা দেখা যায়। অভিযোগ রয়েছে, গেস্ট হাউজ ও স্পার আড়ালে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি মাদকসেবী ও সংশ্লিষ্ট একটি চক্রের যাতায়াতও রয়েছে।
আরও পড়ুন: বনানীতে মার্ভেল ইন-লাক্সারী গেস্ট হাউজ ঘিরে পুলিশের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ব্যবসাটির মূল নিয়ন্ত্রক হিসেবে ‘মিরাজ’ নামের এক ব্যক্তির কথা বিভিন্ন মহলে আলোচিত হলেও তাকে খুব একটা প্রকাশ্যে দেখা যায় না। সংশ্লিষ্টদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি বিপুল অর্থ-সম্পদের মালিক হয়েছেন। রাজধানীর অভিজাত এলাকায় ফ্ল্যাট, গাড়িসহ নানা সম্পদ গড়ে তোলার কথাও স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে। তবে এসব সম্পদের প্রকৃত উৎস তার অবৈধ ব্যবসা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, কথিত গেস্ট হাউজ/স্পার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একাধিক ব্যক্তি বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করেন। তাদের মধ্যে দালাল বা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পরিচিত কয়েকজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে সম্ভাব্য গ্রাহকদের কাছে বিভিন্ন ধরনের প্রস্তাব পৌঁছে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ফেসবুক, মেসেঞ্জার, ইমো, হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে যোগাযোগ করে গ্রাহক সংগ্রহ করা হয় এমন অভিযোগও রয়েছে।
আরও পড়ুন: বনানীতে মার্ভেল ইন গেষ্ট হাউজ ঘিরে আবারও পায়েলের অপরাধ সিন্ডিকেট
বর্তমানে অনলাইনভিত্তিক প্রচারণা ব্যবহার করে আবাসিক হোটেল, গেস্ট হাউজ ও স্পা ব্যবসায় গ্রাহক সংগ্রহের প্রবণতা বেড়েছে। গুলশানের ৩৩ নম্বর সড়কের ওই প্রতিষ্ঠানকেও ঘিরে একই ধরনের কার্যক্রম চলছে বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তি। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন, ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করে সম্ভাব্য গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। পরে তাদের নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করে একটি মধ্যস্থতাকারী চক্র। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট, মোবাইল নম্বর, লেনদেনের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন। কারণ অনলাইনে পরিচালিত অনেক অ্যাকাউন্ট প্রকৃত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত কি না, সেটিও অনেক সময় স্পষ্ট থাকে না।
স্থানীয় কয়েকটি সূত্রের দাবি, প্রতিষ্ঠানটিকে ঘিরে একটি দালাল চক্র সক্রিয় রয়েছে। এই চক্রের সদস্যরা সম্ভাব্য গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের গেস্ট হাউজ বা স্পায় নিয়ে আসেন বলে অভিযোগ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে গ্রাহকদের সঙ্গে প্রথমে অনলাইনে যোগাযোগ করা হয়। এরপর তাদের কাছ থেকে ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি কিংবা ভিডিও সংগ্রহের চেষ্টা করা হতে পারে। এসব তথ্য পরবর্তীতে অপব্যবহার করে ভয়ভীতি দেখানো বা ব্ল্যাকমেইলের আশঙ্কাও রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে গ্রাহকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সুযোগ নিয়ে তাদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হয়। তবে এই অভিযোগের বিষয়ে নির্দিষ্ট ভুক্তভোগীর বক্তব্য বা আইনগত নথি ছাড়া নিশ্চিতভাবে কোনো ব্যক্তিকে দায়ী করা যায় না। আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, এই ধরনের প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক দালাল চক্রের সঙ্গে মানব পাচারকারী চক্রের যোগাযোগ থাকতে পারে। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী ও অন্যান্য সেবার নামে প্রচারণা চালিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে লোকজন সংগ্রহ করা হয় এমন অভিযোগ উঠেছে। তবে মানব পাচারের মতো গুরুতর অভিযোগ প্রমাণের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত, ভুক্তভোগীর সাক্ষ্য, যোগাযোগের রেকর্ড, আর্থিক লেনদেন এবং অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ প্রয়োজন। ফলে অভিযোগগুলোকে এখনই চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা না করে তদন্তের দাবি হিসেবে দেখা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন: বনানীতে শহিদের অবৈধ স্পা সেন্টার ঘিরে অন্ধকার জগৎ
স্থানীয়দের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটি ঘুরছে, তা হলো স্বল্প পরিসরের একটি গেস্ট হাউজ বা স্পা ব্যবসা থেকে দীর্ঘদিনে কীভাবে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া সম্ভব হলো? অভিযোগকারীদের ভাষ্য, মিরাজ দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে তার গাড়ি রয়েছে এবং গুলশানের মতো ব্যয়বহুল এলাকায় ফ্ল্যাটও কেনার কথা শোনা যাচ্ছে। তার সম্পদের পরিমাণ, ব্যবসায়িক আয় এবং কর-সংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা গেলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে। তবে শুধু সম্পদ থাকা বা গাড়ি-ফ্ল্যাট কেনার ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অবৈধ আয়ের অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হয় না। সম্পদের বৈধ উৎস, আয়কর নথি, ব্যাংক লেনদেন, ব্যবসায়িক হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিকানা কাঠামো পর্যালোচনা করেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব।
স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, কথিত গেস্ট হাউজ বা স্পার মূল নিয়ন্ত্রক হিসেবে মিরাজের নাম শোনা গেলেও তাকে সেখানে নিয়মিত দেখা যায় না। বরং কর্মচারী, ব্যবস্থাপক ও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালিত হয়। প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা কাঠামো কী? ভবনের দুটি ফ্লোর কোন প্রতিষ্ঠানের নামে ভাড়া নেওয়া হয়েছে? ট্রেড লাইসেন্স কী নামে? প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন রয়েছে কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি। একই সঙ্গে ভবনের মালিক বা ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানতেন কি না যে সেখানে কী ধরনের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, সেটিও তদন্তের বিষয়।
আরও পড়ুন: তৃণমূলের কাণ্ডারী বকুল: ফরিদপুর বিএনপিতে ফের নেতৃত্বের আশাবাদ
গুলশান রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। এখানে কোনো গেস্ট হাউজ, স্পা বা আবাসিক প্রতিষ্ঠানে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট থানা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি থাকা স্বাভাবিক। দীর্ঘদিন ধরে যদি সেখানে সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড চলে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে বিষয়টি এসেছে কি না। অভিযোগ সত্য হলে কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি এ প্রশ্নও উঠছে। তবে পুলিশের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগও প্রমাণসাপেক্ষ। কোনো কর্মকর্তা বা সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তার বক্তব্য নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় নথি যাচাই করা সাংবাদিকতার দায়িত্ব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আবাসিক হোটেল, গেস্ট হাউজ কিংবা স্পা অবৈধ ব্যবসা। কিন্তু তার ব্যবসার আড়ালে মাদক, মানব পাচার, যৌন শোষণ, ব্ল্যাকমেইল বা অন্য কোনো অপরাধমূলক কার্যক্রমের জন্য ব্যবহৃত হয়, তাহলে সেটি শুধু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিষয় নয়; এটি জননিরাপত্তারও বিষয়। বিশেষ করে রাজধানীর অভিজাত এলাকাগুলোতে অনলাইনের মাধ্যমে গ্রাহক সংগ্রহ, ভুয়া পরিচয়ে যোগাযোগ এবং ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে অপরাধ সংঘটনের ঝুঁকি রয়েছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স, কর্মীদের পরিচয়, অতিথিদের রেজিস্টার, সিসিটিভি ফুটেজ এবং আর্থিক লেনদেন নিয়মিতভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালানো ব্যক্তিদের শনাক্ত করে তাদের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের যোগাযোগ রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা জরুরি। কোনো গ্রাহক ব্ল্যাকমেইলের শিকার হয়েছেন কি না, কিংবা কারও ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও ব্যবহার করে অর্থ আদায়ের ঘটনা ঘটেছে কি না তাও তদন্তের আওতায় আসা উচিত।
আরও পড়ুন: এক উপজেলার সব ইউনিয়নে একই দিনে ভোট, জানাল ইসি
এ বিষয়ে মিরাজের বক্তব্য জানতে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি বক্তব্য দিতে রাজি হননি। একইভাবে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা, ভবন মালিক, সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ এবং প্রয়োজনীয় সরকারি সংস্থার বক্তব্যও নেওয়া প্রয়োজন। কারণ অভিযোগ যতই গুরুতর হোক, সাংবাদিকতার মূলনীতি হলো অভিযোগের পাশাপাশি অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য, নথি ও প্রমাণ যাচাই করা।
গুলশানের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় একটি প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে এমন অভিযোগ চলতে থাকলে বিষয়টি আর কেবল একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সঙ্গে জননিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা, মাদক নিয়ন্ত্রণ, মানব পাচার প্রতিরোধ এবং নাগরিকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার প্রশ্নও জড়িয়ে যায়। তাই গুলশান ৩৩ নম্বর সড়কের কথিত ‘মিরাজের গেস্ট হাউজ/স্পা’কে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের দাবি উঠেছে স্থানীয় মহলে। নিছক একটি অবৈধ গেস্ট হাউজ বা স্পা ব্যবসা, নাকি এর আড়ালে সত্যিই কোনো সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র সক্রিয় রয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন