রমজান মাসে দিনের বেলায় সাধারণ আবাসিক হোটেল। কিন্তু সন্ধ্যা পেরোতেই যেন বদলে যায় পুরো দৃশ্যপট। রাজধানীর পূর্বাঞ্চলের জনবহুল এলাকা যাত্রাবাড়ি কয়েকটি ভবনকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে জমেছে নারী বাণিজ্যের সিন্ডিকেট। চলছে রমজান মাস তবুও থেমে নেই হোটেল রংধনু ও পানামার নারী বাণিজ্যের আতঙ্ক। স্থানীয়দের দাবি, আলামিন নামে এক ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত একটি লাইসেন্সবিহীন হোটেলকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে নারী সিন্ডিকেট ও মাদক চক্রের শক্ত ঘাঁটি। তবে রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভবনটির সামনে বাড়তে থাকে মোটরসাইকেলের আনাগোনা। অচেনা তরুণ-যুবকদের দ্রুত প্রবেশ ও প্রস্থান, পর্দা টানা কক্ষ, ফিসফিসে যোগাযোগ—সব মিলিয়ে এলাকাবাসীর ভাষায়, এটি আর সাধারণ হোটেল নেই; এটি একটি নেটওয়ার্ক। স্থানীয় প্রশাসনিক নীতিমালা অনুযায়ী, আবাসিক এলাকায় হোটেল পরিচালনার জন্য প্রয়োজন নির্দিষ্ট অনুমোদন ও লাইসেন্স। কিন্তু এলাকাবাসীর অভিযোগ এই হোটেলের দৃশ্যমান কোনো লাইসেন্স নম্বর নেই, নেই অনুমোদনের স্বচ্ছ তথ্য।
একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী বলেন, আমরা ছোট দোকান চালাতে গেলেও কাগজপত্র লাগে। আর এখানে বছরের পর বছর একটি হোটেল চলছে কেউ জবাবদিহি করছে না কেন? অভিযোগ রয়েছে, বৈধতা না থাকায় হোটেলটি কার্যত তদারকির বাইরে। এই ‘নজরদারিহীনতা’ই অপরাধ চক্রের জন্য নিরাপদ আশ্রয় তৈরি করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগ, হোটেল দুটি কেন্দ্র করে সক্রিয় একটি নারী সিন্ডিকেট। এরমধ্যে হোটেল পানামা নিয়ন্ত্রন করেন তারেকসহ আরো বেশ কয়েকজন নারী সিন্ডিকেট। লাইসেন্সবিহীন হোটেলগুলো প্রায়ই নারী শোষণের কেন্দ্রে পরিণত হয়। কারণ এখানে কোনো পরিচয় যাচাই, নিবন্ধন বা জবাবদিহির প্রক্রিয়া থাকে না।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, হোটেলে প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় বিশেষ সতর্কতা নেওয়া হয়। বাইরের লোকজন যাতে সহজে কিছু বুঝতে না পারে, সে জন্য ব্যবস্থাপনায় রয়েছে ‘নিজস্ব লোক’। অভিযোগ আছে, আশপাশে নজরদারি রাখতেও কয়েকজন নিয়োজিত থাকে। এলাকাবাসীর আরেকটি বড় অভিযোগ হোটেলটি মাদক লেনদেনের সঙ্গেও জড়িত। রাতের দিকে ছোট প্যাকেট আদান প্রদানের দৃশ্য বহুবার দেখা গেছে বলে দাবি করেছেন কয়েকজন বাসিন্দা। আগে আমাদের এলাকায় এভাবে মাদক পাওয়া যেত না। এখন কিশোরদের হাতেও পৌঁছে যাচ্ছে। সবাই জানে উৎস কোথায়। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বড় উদ্ধার অভিযানের তথ্য প্রকাশ পায়নি, তবুও স্থানীয়দের আশঙ্কা এটি একটি বড় চক্রের অংশ, যা আড়ালে থেকে কাজ করছে।
স্থানীয়দের আরো ভাষ্য অনুযায়ী, আলামিন শুধু হোটেল পরিচালনাকারী নন, বরং পুরো নেটওয়ার্কের সমন্বয়কারী। অভিযোগ আছে, কোনো অভিযোগ উঠলেই দ্রুত পরিস্থিতি ‘ম্যানেজ’ করা হয়। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আলামিন বলেন, আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হচ্ছে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। স্থানীয় থানা সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগের ভিত্তিতে কয়েকবার অভিযান চালানো হয়েছে। তবে প্রতিবারই উল্লেখযোগ্য কিছু পাওয়া যায়নি বলে দাবি পুলিশের। একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, অভিযোগ পেলে আমরা অভিযান চালাই। সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিষয়টি নজরদারিতে আছে।
আরও পড়ুন, পুরোনো ঘটনা, নতুন বিতর্ক: আপেল মাহমুদকে ঘিরে অপপ্রচার !
তবে এলাকাবাসীর প্রশ্ন যদি সব স্বচ্ছ হয়, তাহলে অভিযোগের এত পুনরাবৃত্তি কেন? রাতের সন্দেহজনক কার্যক্রমই বা থামছে না কেন? যাত্রাবাড়ি এলাকায় স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও প্রবীণদের বসবাস এখানে। এমন এলাকায় একটি কথিত অবৈধ হোটেলকে ঘিরে অপরাধের অভিযোগ স্থানীয়দের মানসিক স্বস্তি কেড়ে নিয়েছে। এদিকে একজন শিক্ষক বলেন, আমরা চাই আমাদের সন্তানরা সুস্থ পরিবেশে বড় হোক। কিন্তু আশপাশের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। নারীদের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এক নারী বাসিন্দা বলেন, রাতে একা বের হতে ভয় লাগে। হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে অচেনা লোকজন।
অণ্যদিকে অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, লাইসেন্সবিহীন আবাসিক হোটেলগুলো প্রায়ই সংগঠিত অপরাধের আড়াল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সময়মতো নজরদারি না বাড়ালে ছোট পরিসরের কার্যক্রম বড় নেটওয়ার্কে রূপ নিতে পারে। প্রশাসনের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, লাইসেন্স যাচাই, নিয়মিত তদারকি এবং প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। গণমাধ্যমে বিষয়টি উঠে আসার পর নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এখন সবার নজর প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। যাত্রাবাড়ি এলাকায় আলামিন ও তারেকের কথিত অবৈধ হোটেল ঘিরে যে অভিযোগ উঠেছে, তা শুধুমাত্র একটি প্রতিষ্ঠানের বিষয় নয়, এটি পুরো এলাকার সামাজিক নিরাপত্তা, নারী সুরক্ষা এবং আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন।
যাত্রাবাড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বলেন, হোটেলগুলো ঘিরে যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো আমরা গুরুত্ব সহকারে দেখছি। ইতোমধ্যে প্রাথমিকভাবে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে এবং গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। কেউ আইনবহির্ভূতভাবে হোটেল পরিচালনা করলে বা নারী ও মাদক সংক্রান্ত কোনো অপরাধে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি এবং প্রয়োজন হলে আরও সমন্বিত অভিযান চালানো হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
বিষয় : যাত্রাবাড়ি আবাসিক অন্ধকার

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ মার্চ ২০২৬
রমজান মাসে দিনের বেলায় সাধারণ আবাসিক হোটেল। কিন্তু সন্ধ্যা পেরোতেই যেন বদলে যায় পুরো দৃশ্যপট। রাজধানীর পূর্বাঞ্চলের জনবহুল এলাকা যাত্রাবাড়ি কয়েকটি ভবনকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে জমেছে নারী বাণিজ্যের সিন্ডিকেট। চলছে রমজান মাস তবুও থেমে নেই হোটেল রংধনু ও পানামার নারী বাণিজ্যের আতঙ্ক। স্থানীয়দের দাবি, আলামিন নামে এক ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত একটি লাইসেন্সবিহীন হোটেলকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে নারী সিন্ডিকেট ও মাদক চক্রের শক্ত ঘাঁটি। তবে রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভবনটির সামনে বাড়তে থাকে মোটরসাইকেলের আনাগোনা। অচেনা তরুণ-যুবকদের দ্রুত প্রবেশ ও প্রস্থান, পর্দা টানা কক্ষ, ফিসফিসে যোগাযোগ—সব মিলিয়ে এলাকাবাসীর ভাষায়, এটি আর সাধারণ হোটেল নেই; এটি একটি নেটওয়ার্ক। স্থানীয় প্রশাসনিক নীতিমালা অনুযায়ী, আবাসিক এলাকায় হোটেল পরিচালনার জন্য প্রয়োজন নির্দিষ্ট অনুমোদন ও লাইসেন্স। কিন্তু এলাকাবাসীর অভিযোগ এই হোটেলের দৃশ্যমান কোনো লাইসেন্স নম্বর নেই, নেই অনুমোদনের স্বচ্ছ তথ্য।
একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী বলেন, আমরা ছোট দোকান চালাতে গেলেও কাগজপত্র লাগে। আর এখানে বছরের পর বছর একটি হোটেল চলছে কেউ জবাবদিহি করছে না কেন? অভিযোগ রয়েছে, বৈধতা না থাকায় হোটেলটি কার্যত তদারকির বাইরে। এই ‘নজরদারিহীনতা’ই অপরাধ চক্রের জন্য নিরাপদ আশ্রয় তৈরি করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগ, হোটেল দুটি কেন্দ্র করে সক্রিয় একটি নারী সিন্ডিকেট। এরমধ্যে হোটেল পানামা নিয়ন্ত্রন করেন তারেকসহ আরো বেশ কয়েকজন নারী সিন্ডিকেট। লাইসেন্সবিহীন হোটেলগুলো প্রায়ই নারী শোষণের কেন্দ্রে পরিণত হয়। কারণ এখানে কোনো পরিচয় যাচাই, নিবন্ধন বা জবাবদিহির প্রক্রিয়া থাকে না।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, হোটেলে প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় বিশেষ সতর্কতা নেওয়া হয়। বাইরের লোকজন যাতে সহজে কিছু বুঝতে না পারে, সে জন্য ব্যবস্থাপনায় রয়েছে ‘নিজস্ব লোক’। অভিযোগ আছে, আশপাশে নজরদারি রাখতেও কয়েকজন নিয়োজিত থাকে। এলাকাবাসীর আরেকটি বড় অভিযোগ হোটেলটি মাদক লেনদেনের সঙ্গেও জড়িত। রাতের দিকে ছোট প্যাকেট আদান প্রদানের দৃশ্য বহুবার দেখা গেছে বলে দাবি করেছেন কয়েকজন বাসিন্দা। আগে আমাদের এলাকায় এভাবে মাদক পাওয়া যেত না। এখন কিশোরদের হাতেও পৌঁছে যাচ্ছে। সবাই জানে উৎস কোথায়। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বড় উদ্ধার অভিযানের তথ্য প্রকাশ পায়নি, তবুও স্থানীয়দের আশঙ্কা এটি একটি বড় চক্রের অংশ, যা আড়ালে থেকে কাজ করছে।
স্থানীয়দের আরো ভাষ্য অনুযায়ী, আলামিন শুধু হোটেল পরিচালনাকারী নন, বরং পুরো নেটওয়ার্কের সমন্বয়কারী। অভিযোগ আছে, কোনো অভিযোগ উঠলেই দ্রুত পরিস্থিতি ‘ম্যানেজ’ করা হয়। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আলামিন বলেন, আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হচ্ছে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। স্থানীয় থানা সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগের ভিত্তিতে কয়েকবার অভিযান চালানো হয়েছে। তবে প্রতিবারই উল্লেখযোগ্য কিছু পাওয়া যায়নি বলে দাবি পুলিশের। একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, অভিযোগ পেলে আমরা অভিযান চালাই। সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিষয়টি নজরদারিতে আছে।
আরও পড়ুন, পুরোনো ঘটনা, নতুন বিতর্ক: আপেল মাহমুদকে ঘিরে অপপ্রচার !
তবে এলাকাবাসীর প্রশ্ন যদি সব স্বচ্ছ হয়, তাহলে অভিযোগের এত পুনরাবৃত্তি কেন? রাতের সন্দেহজনক কার্যক্রমই বা থামছে না কেন? যাত্রাবাড়ি এলাকায় স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও প্রবীণদের বসবাস এখানে। এমন এলাকায় একটি কথিত অবৈধ হোটেলকে ঘিরে অপরাধের অভিযোগ স্থানীয়দের মানসিক স্বস্তি কেড়ে নিয়েছে। এদিকে একজন শিক্ষক বলেন, আমরা চাই আমাদের সন্তানরা সুস্থ পরিবেশে বড় হোক। কিন্তু আশপাশের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। নারীদের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এক নারী বাসিন্দা বলেন, রাতে একা বের হতে ভয় লাগে। হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে অচেনা লোকজন।
অণ্যদিকে অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, লাইসেন্সবিহীন আবাসিক হোটেলগুলো প্রায়ই সংগঠিত অপরাধের আড়াল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সময়মতো নজরদারি না বাড়ালে ছোট পরিসরের কার্যক্রম বড় নেটওয়ার্কে রূপ নিতে পারে। প্রশাসনের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, লাইসেন্স যাচাই, নিয়মিত তদারকি এবং প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। গণমাধ্যমে বিষয়টি উঠে আসার পর নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এখন সবার নজর প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। যাত্রাবাড়ি এলাকায় আলামিন ও তারেকের কথিত অবৈধ হোটেল ঘিরে যে অভিযোগ উঠেছে, তা শুধুমাত্র একটি প্রতিষ্ঠানের বিষয় নয়, এটি পুরো এলাকার সামাজিক নিরাপত্তা, নারী সুরক্ষা এবং আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন।
যাত্রাবাড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বলেন, হোটেলগুলো ঘিরে যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো আমরা গুরুত্ব সহকারে দেখছি। ইতোমধ্যে প্রাথমিকভাবে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে এবং গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। কেউ আইনবহির্ভূতভাবে হোটেল পরিচালনা করলে বা নারী ও মাদক সংক্রান্ত কোনো অপরাধে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি এবং প্রয়োজন হলে আরও সমন্বিত অভিযান চালানো হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন