দৈনিক সংবাদ দিগন্ত
প্রকাশ : বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬

কৃষি প্রণোদনায় দুর্নীতির চ্যাম্পিয়ন হতে যাচ্ছে মিঠাপুকুরের ভাংনী ইউনিয়ন

কৃষি প্রণোদনায় দুর্নীতির চ্যাম্পিয়ন হতে যাচ্ছে মিঠাপুকুরের ভাংনী ইউনিয়ন
কৃষি প্রণোদনায় দুর্নীতির চ্যাম্পিয়ন হতে যাচ্ছে মিঠাপুকুরের ভাংনী ইউনিয়ন

কাগজে-কলমে সরকার দেশের প্রান্তিক ও প্রকৃত ক্ষুদ্র কৃষকদের বাঁচাতে কোটি কোটি টাকার সার ও উন্নত বীজ বিনামূল্যে দিচ্ছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। সরকারের এই মহৎ উদ্যোগকে মিঠাপুকুরের ৪ নং ভাংনী ইউনিয়নের ঠাকুরবাড়ী ব্লকে স্থানীয় কিছু সুবিধাভোগী, জনপ্রতিনিধি ও কৃষি অফিসের অসাধু চক্র মিলে নিজেদের ব্যক্তিগত ‘পারিবারিক সম্পত্তি’ বানিয়ে ফেলেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ঠাকুরবাড়ী ব্লকের (৪, ৫ ও ৬ নং ওয়ার্ড) সর্বশেষ খরিপ-১ মৌসুমের বীজ ও সার বিতরণের চূড়ান্ত সরকারি তালিকা বিশ্লেষণ করে স্বজনপ্রীতি, ভৌগোলিক বৈষম্য এবং দুর্নীতির এক নগ্ন চিত্র হাতেনাতে ধরা পড়েছে।ঠাকুরবাড়ী ব্লকের গ্রামভিত্তিক বরাদ্দের গাণিতিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে যে কেউ থমকে যাবেন। পুরো ব্লকে মোট সুবিধাভোগী ৪৫ জন হলেও দলসিংহপুর গ্রাম একাই সাবাড় করেছে পুরো তালিকার সিংহভাগ বা ৪৪.৪৪ শতাংশ, যার সংখ্যা ২০ জন। অথচ ব্লকের মূল নাম যে গ্রামের, সেই ঠাকুরবাড়ী গ্রাম পেয়েছে মাত্র ৩ জনের বরাদ্দ, যা মোটের ওপর মাত্র ৬.৬৭ শতাংশ।

আরও পড়ুন ,শরীয়তপুরে আওয়ামী লীগ নেতার মুক্তির দাবিতে বিএনপির বিক্ষোভ, ভিডিও ভাইরাল

 বাকি গ্রামগুলোর অবস্থা আরও শোচনীয়; এর মধ্যে রায়পুর ৩ জন (৬.৬৭%), পোতখানা ৪ জন (৮.৮৯%), লাহীড়ীগঞ্জ ৪ জন (৮.৮৯%), এবং রাধানগর পেয়েছে মাত্র ২ জনের (৪.৪৪%) বরাদ্দ। সবচেয়ে বড় অনিয়ম ও বৈষম্যটি হয়েছে কসবানুরপুর, চন্দ্রপুর এবং খানপুর গ্রামের কৃষকদের ওপর। সরকারি তালিকায় এই ৩টি গ্রামের নামের পাশে জ্বলজ্বল করছে শূন্য বরাদ্দ।অনুসন্ধানে জানা গেছে, দলসিংহপুর গ্রামের এই একচেটিয়া ২০ জন সুবিধাভোগীর তালিকা কোনো সাধারণ তালিকা নয়। পুরো বরাদ্দ গিলে খেয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা আঞ্জুর এক বিশাল পারিবারিক সিন্ডিকেট। আঞ্জু নিজের ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে সরকারি প্রণোদনার তালিকায় নিজের ঘর ও শ্বশুরবাড়ির পুরো গোষ্ঠীর নাম ঢুকিয়ে দিয়েছেন। এই আঞ্জু সিন্ডিকেটের সুবিধাভোগী আত্মীয়-স্বজনদের তালিকায় রয়েছেন আঞ্জুর ছেলে ইসমাইল, স্ত্রী এসমোতারা, তিন শালা আলামিন, ইব্রাহিম ও গোলাম মোস্তফা মওলা মন্ডল, ভগ্নিপতি মাসুদ এবং ভায়রাভাই আকতারুজ্জামান। যেখানে সাধারণ কৃষকেরা এক ছটাক সারের জন্য কৃষি অফিসে দিনের পর দিন ঘুরছেন, সেখানে আঞ্জু মিয়ার ছেলে, স্ত্রী, তিন শালা, ভগ্নিপতি আর ভায়রাভাই মিলে সরকারি প্রণোদনা পকেটে পুরছেন। এলাকার সাধারণ কৃষকদের প্রশ্ন—এটি কি স্রেফ স্বজনপ্রীতি, নাকি সরকারি সম্পদের ওপর প্রকাশ্য ডাকাতি?

আরও পড়ুন, ভোলার আলোচিত মিতু হত্যা মামলা, পলাতক আসামিরা র‍্যাবের জালে গ্রেপ্তার

নিজেদের ব্লকের ৩টি গ্রামের কৃষকদের যখন এক ছটাক বীজ বা সার দেওয়া হয়নি, তখন অন্য ওয়ার্ডের অর্থাৎ ৮ নং ওয়ার্ডের ভগবানপুর গ্রামের বাসিন্দা মাসুদ রানা নামের এক বহিরাগতকে এনে এই তালিকায় সুবিধা পাইয়ে দেওয়া হয়েছে। নিজের এলাকার প্রান্তিক কৃষকদের উপোস রেখে বাইরের মানুষকে সুবিধা দেওয়ার এই নীতি কিসের ইঙ্গিত করে, তা নিয়ে এলাকায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। কসবানুরপুর, চন্দ্রপুর ও খানপুরের কৃষকদের কোন অদৃশ্য ‘বিশেষ কানেকশন’ বা গোপন লেনদেনের কারণে পুরোপুরি শূন্য হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হলো, সেই রহস্য এখনো অধরাই রয়ে গেছে।এ বিষয়ে ঠাকুরবাড়ী ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সাজ্জাদুল ইসলাম বলেন, যারা আইডি কার্ড জমা দিয়েছেন, তাদের মধ্য থেকেই তালিকা করা হয়েছে। তবে ৪ নং ভাংনী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল ওয়াহেদী জানান, এই তালিকা প্রস্তুতের ব্যাপারে তাঁকে অফিশিয়ালি কিছুই জানানো হয়নি। কৃষি অফিসার ও স্থানীয় যাচাই-বাছাই কমিটির সভার রেজুলেশন বা কার্যবিবরণী খতিয়ে দেখলে এই অনিয়মের আসল হোতাদের নাম প্রকাশ্যে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এই দুর্নীতির অকাট্য প্রমাণ ও নথিপত্র সংগ্রহে তথ্য অধিকার আইনে (RTI) ইতিমধ্যে আবেদনের প্রস্তুতি চলছে।

বিষয় : দুর্নীতি বিনামূল্যে চ্যাম্পিয়ন হ বিনামূল্যে

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬


কৃষি প্রণোদনায় দুর্নীতির চ্যাম্পিয়ন হতে যাচ্ছে মিঠাপুকুরের ভাংনী ইউনিয়ন

প্রকাশের তারিখ : ১৭ জুন ২০২৬

featured Image

কাগজে-কলমে সরকার দেশের প্রান্তিক ও প্রকৃত ক্ষুদ্র কৃষকদের বাঁচাতে কোটি কোটি টাকার সার ও উন্নত বীজ বিনামূল্যে দিচ্ছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। সরকারের এই মহৎ উদ্যোগকে মিঠাপুকুরের ৪ নং ভাংনী ইউনিয়নের ঠাকুরবাড়ী ব্লকে স্থানীয় কিছু সুবিধাভোগী, জনপ্রতিনিধি ও কৃষি অফিসের অসাধু চক্র মিলে নিজেদের ব্যক্তিগত ‘পারিবারিক সম্পত্তি’ বানিয়ে ফেলেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ঠাকুরবাড়ী ব্লকের (৪, ৫ ও ৬ নং ওয়ার্ড) সর্বশেষ খরিপ-১ মৌসুমের বীজ ও সার বিতরণের চূড়ান্ত সরকারি তালিকা বিশ্লেষণ করে স্বজনপ্রীতি, ভৌগোলিক বৈষম্য এবং দুর্নীতির এক নগ্ন চিত্র হাতেনাতে ধরা পড়েছে।ঠাকুরবাড়ী ব্লকের গ্রামভিত্তিক বরাদ্দের গাণিতিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে যে কেউ থমকে যাবেন। পুরো ব্লকে মোট সুবিধাভোগী ৪৫ জন হলেও দলসিংহপুর গ্রাম একাই সাবাড় করেছে পুরো তালিকার সিংহভাগ বা ৪৪.৪৪ শতাংশ, যার সংখ্যা ২০ জন। অথচ ব্লকের মূল নাম যে গ্রামের, সেই ঠাকুরবাড়ী গ্রাম পেয়েছে মাত্র ৩ জনের বরাদ্দ, যা মোটের ওপর মাত্র ৬.৬৭ শতাংশ।

আরও পড়ুন ,শরীয়তপুরে আওয়ামী লীগ নেতার মুক্তির দাবিতে বিএনপির বিক্ষোভ, ভিডিও ভাইরাল

 বাকি গ্রামগুলোর অবস্থা আরও শোচনীয়; এর মধ্যে রায়পুর ৩ জন (৬.৬৭%), পোতখানা ৪ জন (৮.৮৯%), লাহীড়ীগঞ্জ ৪ জন (৮.৮৯%), এবং রাধানগর পেয়েছে মাত্র ২ জনের (৪.৪৪%) বরাদ্দ। সবচেয়ে বড় অনিয়ম ও বৈষম্যটি হয়েছে কসবানুরপুর, চন্দ্রপুর এবং খানপুর গ্রামের কৃষকদের ওপর। সরকারি তালিকায় এই ৩টি গ্রামের নামের পাশে জ্বলজ্বল করছে শূন্য বরাদ্দ।অনুসন্ধানে জানা গেছে, দলসিংহপুর গ্রামের এই একচেটিয়া ২০ জন সুবিধাভোগীর তালিকা কোনো সাধারণ তালিকা নয়। পুরো বরাদ্দ গিলে খেয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা আঞ্জুর এক বিশাল পারিবারিক সিন্ডিকেট। আঞ্জু নিজের ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে সরকারি প্রণোদনার তালিকায় নিজের ঘর ও শ্বশুরবাড়ির পুরো গোষ্ঠীর নাম ঢুকিয়ে দিয়েছেন। এই আঞ্জু সিন্ডিকেটের সুবিধাভোগী আত্মীয়-স্বজনদের তালিকায় রয়েছেন আঞ্জুর ছেলে ইসমাইল, স্ত্রী এসমোতারা, তিন শালা আলামিন, ইব্রাহিম ও গোলাম মোস্তফা মওলা মন্ডল, ভগ্নিপতি মাসুদ এবং ভায়রাভাই আকতারুজ্জামান। যেখানে সাধারণ কৃষকেরা এক ছটাক সারের জন্য কৃষি অফিসে দিনের পর দিন ঘুরছেন, সেখানে আঞ্জু মিয়ার ছেলে, স্ত্রী, তিন শালা, ভগ্নিপতি আর ভায়রাভাই মিলে সরকারি প্রণোদনা পকেটে পুরছেন। এলাকার সাধারণ কৃষকদের প্রশ্ন—এটি কি স্রেফ স্বজনপ্রীতি, নাকি সরকারি সম্পদের ওপর প্রকাশ্য ডাকাতি?

আরও পড়ুন, ভোলার আলোচিত মিতু হত্যা মামলা, পলাতক আসামিরা র‍্যাবের জালে গ্রেপ্তার

নিজেদের ব্লকের ৩টি গ্রামের কৃষকদের যখন এক ছটাক বীজ বা সার দেওয়া হয়নি, তখন অন্য ওয়ার্ডের অর্থাৎ ৮ নং ওয়ার্ডের ভগবানপুর গ্রামের বাসিন্দা মাসুদ রানা নামের এক বহিরাগতকে এনে এই তালিকায় সুবিধা পাইয়ে দেওয়া হয়েছে। নিজের এলাকার প্রান্তিক কৃষকদের উপোস রেখে বাইরের মানুষকে সুবিধা দেওয়ার এই নীতি কিসের ইঙ্গিত করে, তা নিয়ে এলাকায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। কসবানুরপুর, চন্দ্রপুর ও খানপুরের কৃষকদের কোন অদৃশ্য ‘বিশেষ কানেকশন’ বা গোপন লেনদেনের কারণে পুরোপুরি শূন্য হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হলো, সেই রহস্য এখনো অধরাই রয়ে গেছে।এ বিষয়ে ঠাকুরবাড়ী ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সাজ্জাদুল ইসলাম বলেন, যারা আইডি কার্ড জমা দিয়েছেন, তাদের মধ্য থেকেই তালিকা করা হয়েছে। তবে ৪ নং ভাংনী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল ওয়াহেদী জানান, এই তালিকা প্রস্তুতের ব্যাপারে তাঁকে অফিশিয়ালি কিছুই জানানো হয়নি। কৃষি অফিসার ও স্থানীয় যাচাই-বাছাই কমিটির সভার রেজুলেশন বা কার্যবিবরণী খতিয়ে দেখলে এই অনিয়মের আসল হোতাদের নাম প্রকাশ্যে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এই দুর্নীতির অকাট্য প্রমাণ ও নথিপত্র সংগ্রহে তথ্য অধিকার আইনে (RTI) ইতিমধ্যে আবেদনের প্রস্তুতি চলছে।


দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

সম্পাদক ও প্রকাশক: এ বি এম মনিরুজ্জামান 
নির্বাহী সম্পাদক: রিপন রুদ্র
যুগ্ম সম্পাদক: জাকিয়া সুলতানা (লাভলী)

কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক সংবাদ দিগন্ত । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত