দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

বনানীতে মার্ভেল ইন হোটেল ঘিরে মিজান ও পায়েলের বিরুদ্ধে অভিযোগ

বনানীতে মার্ভেল ইন হোটেল ঘিরে মিজান ও পায়েলের বিরুদ্ধে অভিযোগ
বনানীতে মার্ভেল ইন হোটেল ঘিরে মিজান ও পায়েলের বিরুদ্ধে অভিযোগ

রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানীর আবাসিক পরিবেশ দীর্ঘদিন ধরেই নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ হিসেবে পরিচিত। তবে সম্প্রতি বনানীর ২৭ নম্বর রোডে অবস্থিত একটি ভবনে পরিচালিত “মার্ভেল ইন” নামের একটি হোটেল কেন্দ্র করে নানা অনিয়ম ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠে এসেছে। স্থানীয় সূত্র, অনুসন্ধানী তথ্য এবং পূর্ববর্তী একাধিক সংবাদ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জানা যায়, এই গেস্ট হাউজটি দীর্ঘদিন ধরে নারী ও মাদক সিন্ডিকেটের আড়াল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রথমদিকে এটি একটি সাধারণ আবাসিক গেস্ট হাউজ হিসেবে চালু হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর কার্যক্রমে অস্বভাবিকতা লক্ষ্য করা যায়। বিভিন্ন সময় অচেনা ব্যক্তিদের আসা-যাওয়া, রাতের বেলায় অস্বভাবিক ভিড় এবং স্বল্প সময়ের জন্য কক্ষ ভাড়া দেওয়ার প্রবণতা সন্দেহের জন্ম দেয়। পরে অনুসন্ধানে উঠে আসে, এখানে ঘণ্টাভিত্তিক কক্ষ ভাড়া দেওয়া হচ্ছে, যা সাধারণ আবাসিক ব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

একাধিক গণমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো কার্যকর ব্যবস্থা এখনো গ্রহণ করা হয়নি। বরং অভিযোগ রয়েছে, প্রতিবেদন প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা ও হয়রানির হুমকি দেওয়া হচ্ছে। তাদের অপরাধ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করলেই গণমাধ্যমকর্মীদের উপর চলে আসে হুমকি। এবিষয়ে বনানী থানার অফিসার ইনচার্জকে একাধিকবার জানালে তার কোন দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই এবং কোন এক রহস্যের বেড়াজালে তিনি পদক্ষেপ নেয়নি সেটা সবার জানার দরকার। কিন্তু তাকে একাধিকবার ফোন করে কোন সুরাহা পাওয়া যায়নি।  

আরও পড়ুন, কালিয়াকৈরে শান্ত-জাকিরের হোটেলের আড়ালে অপরাধ সাম্রাজ্য

অনুসন্ধানে জানা গেছে, হোটেল মালিকপক্ষ নিজেদের বৈধতা দাবি করে আসছেন এবং তারা প্রকাশ্যে বলেছেন যে, “আমাদের বিরুদ্ধে নিউজ করে কিছু হবে না, আমাদের সবকিছু বৈধ। ” তবে এই বৈধতার দাবি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে। আরও অভিযোগ রয়েছে, এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত কয়েকজন ব্যক্তি নিজেদের সাংবাদিক, রাজনৈতিক কর্মী বা প্রভাবশালী মহলের পরিচয়ে পরিচিত করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করছেন। ফলে স্থানীয়রা অনেক সময় অভিযোগ জানাতে ভয় পাচ্ছেন।

সূত্রে জানা গেছে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পূর্বে স্পা ব্যবসার আড়ালে অনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগে গুলশান থানায় মামলাও হয়েছিল। সেই ব্যবসা বন্ধ বা সীমিত হয়ে যাওয়ার পর তারা নতুনভাবে গেস্ট হাউজের আড়ালে একই ধরনের কার্যক্রম চালানোর পথ বেছে নিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই রূপান্তর প্রক্রিয়াটি পরিকল্পিত কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনাকারীরা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নজর এড়াতে ব্যবসার ধরন পরিবর্তন করে থাকে।

অভিযোগ অনুযায়ী, হোটেলটিতে “স্বামী-স্ত্রী” পরিচয়ে কক্ষ ভাড়া দেওয়া হলেও প্রকৃতপক্ষে সেখানে অসামাজিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। “এসকর্ট সার্ভিস” এর নামে নারী সরবরাহ, অশ্লীলতা বাণিজ্য এবং মাদক লেনদেনের অভিযোগও উঠে এসেছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন ব্যক্তিদের আনাগোনা দেখা যায় এবং অনেক সময় মাদকসেবীদের উপস্থিতিও লক্ষ্য করা যায়। এতে করে আশপাশের পরিবেশ ক্রমেই অস্বস্তিকর হয়ে উঠছে। বিষয়টি নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে। একাধিকবার অভিযোগ ও সংবাদ প্রকাশের পরও কেন কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

আরও পড়ুন, সিকেডি হাসপাতালে চাঁদাবাজির ঘটনায় মূল হোতাসহ ৭ জন গ্রেপ্তার

কিছু বাসিন্দা জানান, তারা বিষয়টি সংশ্লিষ্ট থানায় অবহিত করলেও দৃশ্যমান কোনো অভিযান বা তদন্ত চোখে পড়েনি। এতে করে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে বলে তারা মনে করেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিবেদন প্রকাশ করলেই সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা, হুমকি ও হয়রানির আশ্রয় নিচ্ছে। গণমাধ্যম বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য হুমকিস্বরূপ। যদি সত্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে সাংবাদিকরা হুমকির মুখে পড়েন, তাহলে সমাজে সচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো আবাসিক এলাকায় গেস্ট হাউজ পরিচালনা করতে হলে নির্দিষ্ট নিয়মনীতি মেনে চলতে হয়। বিশেষ করে ঘণ্টাভিত্তিক কক্ষ ভাড়া দেওয়া, অসামাজিক কার্যক্রম পরিচালনা করা বা মাদক সংশ্লিষ্টতা থাকলে তা গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। এছাড়া, ভুয়া পরিচয়ে কক্ষ ভাড়া দেওয়া এবং অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের আওতায় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত তদন্ত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। তারা চান, আবাসিক এলাকার শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে প্রশাসন যেন কঠোর অবস্থান নেয়। একজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা এখানে পরিবার নিয়ে থাকি। প্রতিদিন এই ধরনের কার্যক্রম চললে আমাদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে। আমরা চাই প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নিক।

আরও পড়ুন, উত্তরায় হোটেল গ্রান্ড প্লাজার কাণ্ড: ফের সক্রিয় নারী চক্র

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, সংশ্লিষ্ট হোটেলটির এক মালিক পূর্বে গোপালগঞ্জের রাজনৈতিক পরিচয় এবং তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের নাম ভাঙিয়ে দীর্ঘদিন ধরে হোটেল ও স্পা ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করেছে, এসব স্পা প্রতিষ্ঠানের আড়ালে অনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগে গুলশান ও বনানী এলাকায় একাধিকবার আইনগত জটিলতায় পড়েছিলেন তিনি। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে তার পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে বিস্তারিত ব্যাখ্যা খুব কমই পাওয়া গেছে, তবুও অতীতের ঘটনাগুলো বর্তমান কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করছে।

একই সঙ্গে, এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত “মিজান” নামের এক ব্যক্তির ভূমিকাও অনুসন্ধানে সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিজেকে সাংবাদিকদের ঘনিষ্ঠ বা অংশীদার হিসেবে পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করেন। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, কোনো অভিযোগ উঠলেই তিনি গণমাধ্যমের নাম ব্যবহার করে বিষয়টি চাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন এবং কখনো কখনো ভীতি প্রদর্শনের পথও অবলম্বন করেন। এতে করে সাধারণ মানুষ যেমন নিরুৎসাহিত হন, তেমনি প্রকৃত অনুসন্ধান কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশে আবাসিক এলাকায় হোটেল বা গেস্ট হাউজ পরিচালনার বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রিত এবং নির্দিষ্ট কিছু শর্তের ওপর নির্ভরশীল। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এবং সিটি কর্পোরেশনের নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো ভবন যদি আবাসিক হিসেবে অনুমোদিত হয়, তাহলে সেখানে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা সাধারণত অনুমোদিত নয় যদি না তা নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য রূপান্তর করা হয়। যদি কোনো প্রতিষ্ঠান শর্ত পূরণ না করে আবাসিক এলাকায় হোটেল বা গেস্ট হাউজ পরিচালনা করে, তাহলে তা আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চাইলে তা বন্ধ করে দিতে পারে।

আরও পড়ুন, গাজীপুরে দক্ষিণ বাংলায় হোটেল সিন্ডিকেট নিয়ে নতুন বিতর্ক

উক্ত হোটেল/গেস্ট হাউজটির মালিকপক্ষ বারবার তাদের ব্যবসা “বৈধ” বলে দাবি করলেও অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আবাসিক এলাকা ঘণ্টাভিত্তিক কক্ষ ভাড়া দেওয়ার নামে স্কর্ট সার্ভিস ও ভুয়া পরিচয়ে অতিথি প্রবেশ এবং অসামাজিক কার্যক্রমের অভিযোগ এসবই বৈধতার দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তবে কেবল ট্রেড লাইসেন্স থাকলেই একটি হোটেল বৈধ হয়ে যায় না, বরং সেটি কী ধরনের এলাকায় পরিচালিত হচ্ছে, কী ধরনের কার্যক্রম চলছে এবং আইনগত শর্তগুলো মানা হচ্ছে কিনা এসব বিষয় একত্রে বিবেচনা করতে হয়। মালিকপক্ষ ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ এবং অতীতের বিতর্কিত কার্যক্রমের তথ্য সামনে আসায় পুরো বিষয়টি আরও গুরুত্ব পাচ্ছে। যদি কোনো প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক পরিচয়, পেশাগত প্রভাব বা ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে আইন এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে, তাহলে তা আইনের শাসনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু তাদের হোটেলে অনুসন্ধান করতে গেছে তারা সাংবাদিকদের বাধা প্রদান করেন এবং বলেন, এখানে পরিচিত লোক ছাড়া প্রবেশ করা নিষেধ। 

বিষয় : অভিযোগ হোটেল বনানী

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬


বনানীতে মার্ভেল ইন হোটেল ঘিরে মিজান ও পায়েলের বিরুদ্ধে অভিযোগ

প্রকাশের তারিখ : ২২ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানীর আবাসিক পরিবেশ দীর্ঘদিন ধরেই নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ হিসেবে পরিচিত। তবে সম্প্রতি বনানীর ২৭ নম্বর রোডে অবস্থিত একটি ভবনে পরিচালিত “মার্ভেল ইন” নামের একটি হোটেল কেন্দ্র করে নানা অনিয়ম ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠে এসেছে। স্থানীয় সূত্র, অনুসন্ধানী তথ্য এবং পূর্ববর্তী একাধিক সংবাদ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জানা যায়, এই গেস্ট হাউজটি দীর্ঘদিন ধরে নারী ও মাদক সিন্ডিকেটের আড়াল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রথমদিকে এটি একটি সাধারণ আবাসিক গেস্ট হাউজ হিসেবে চালু হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর কার্যক্রমে অস্বভাবিকতা লক্ষ্য করা যায়। বিভিন্ন সময় অচেনা ব্যক্তিদের আসা-যাওয়া, রাতের বেলায় অস্বভাবিক ভিড় এবং স্বল্প সময়ের জন্য কক্ষ ভাড়া দেওয়ার প্রবণতা সন্দেহের জন্ম দেয়। পরে অনুসন্ধানে উঠে আসে, এখানে ঘণ্টাভিত্তিক কক্ষ ভাড়া দেওয়া হচ্ছে, যা সাধারণ আবাসিক ব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

একাধিক গণমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো কার্যকর ব্যবস্থা এখনো গ্রহণ করা হয়নি। বরং অভিযোগ রয়েছে, প্রতিবেদন প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা ও হয়রানির হুমকি দেওয়া হচ্ছে। তাদের অপরাধ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করলেই গণমাধ্যমকর্মীদের উপর চলে আসে হুমকি। এবিষয়ে বনানী থানার অফিসার ইনচার্জকে একাধিকবার জানালে তার কোন দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই এবং কোন এক রহস্যের বেড়াজালে তিনি পদক্ষেপ নেয়নি সেটা সবার জানার দরকার। কিন্তু তাকে একাধিকবার ফোন করে কোন সুরাহা পাওয়া যায়নি।  

আরও পড়ুন, কালিয়াকৈরে শান্ত-জাকিরের হোটেলের আড়ালে অপরাধ সাম্রাজ্য

অনুসন্ধানে জানা গেছে, হোটেল মালিকপক্ষ নিজেদের বৈধতা দাবি করে আসছেন এবং তারা প্রকাশ্যে বলেছেন যে, “আমাদের বিরুদ্ধে নিউজ করে কিছু হবে না, আমাদের সবকিছু বৈধ। ” তবে এই বৈধতার দাবি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে। আরও অভিযোগ রয়েছে, এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত কয়েকজন ব্যক্তি নিজেদের সাংবাদিক, রাজনৈতিক কর্মী বা প্রভাবশালী মহলের পরিচয়ে পরিচিত করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করছেন। ফলে স্থানীয়রা অনেক সময় অভিযোগ জানাতে ভয় পাচ্ছেন।

সূত্রে জানা গেছে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পূর্বে স্পা ব্যবসার আড়ালে অনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগে গুলশান থানায় মামলাও হয়েছিল। সেই ব্যবসা বন্ধ বা সীমিত হয়ে যাওয়ার পর তারা নতুনভাবে গেস্ট হাউজের আড়ালে একই ধরনের কার্যক্রম চালানোর পথ বেছে নিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই রূপান্তর প্রক্রিয়াটি পরিকল্পিত কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনাকারীরা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নজর এড়াতে ব্যবসার ধরন পরিবর্তন করে থাকে।

অভিযোগ অনুযায়ী, হোটেলটিতে “স্বামী-স্ত্রী” পরিচয়ে কক্ষ ভাড়া দেওয়া হলেও প্রকৃতপক্ষে সেখানে অসামাজিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। “এসকর্ট সার্ভিস” এর নামে নারী সরবরাহ, অশ্লীলতা বাণিজ্য এবং মাদক লেনদেনের অভিযোগও উঠে এসেছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন ব্যক্তিদের আনাগোনা দেখা যায় এবং অনেক সময় মাদকসেবীদের উপস্থিতিও লক্ষ্য করা যায়। এতে করে আশপাশের পরিবেশ ক্রমেই অস্বস্তিকর হয়ে উঠছে। বিষয়টি নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে। একাধিকবার অভিযোগ ও সংবাদ প্রকাশের পরও কেন কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

আরও পড়ুন, সিকেডি হাসপাতালে চাঁদাবাজির ঘটনায় মূল হোতাসহ ৭ জন গ্রেপ্তার

কিছু বাসিন্দা জানান, তারা বিষয়টি সংশ্লিষ্ট থানায় অবহিত করলেও দৃশ্যমান কোনো অভিযান বা তদন্ত চোখে পড়েনি। এতে করে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে বলে তারা মনে করেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিবেদন প্রকাশ করলেই সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা, হুমকি ও হয়রানির আশ্রয় নিচ্ছে। গণমাধ্যম বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য হুমকিস্বরূপ। যদি সত্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে সাংবাদিকরা হুমকির মুখে পড়েন, তাহলে সমাজে সচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো আবাসিক এলাকায় গেস্ট হাউজ পরিচালনা করতে হলে নির্দিষ্ট নিয়মনীতি মেনে চলতে হয়। বিশেষ করে ঘণ্টাভিত্তিক কক্ষ ভাড়া দেওয়া, অসামাজিক কার্যক্রম পরিচালনা করা বা মাদক সংশ্লিষ্টতা থাকলে তা গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। এছাড়া, ভুয়া পরিচয়ে কক্ষ ভাড়া দেওয়া এবং অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের আওতায় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত তদন্ত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। তারা চান, আবাসিক এলাকার শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে প্রশাসন যেন কঠোর অবস্থান নেয়। একজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা এখানে পরিবার নিয়ে থাকি। প্রতিদিন এই ধরনের কার্যক্রম চললে আমাদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে। আমরা চাই প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নিক।

আরও পড়ুন, উত্তরায় হোটেল গ্রান্ড প্লাজার কাণ্ড: ফের সক্রিয় নারী চক্র

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, সংশ্লিষ্ট হোটেলটির এক মালিক পূর্বে গোপালগঞ্জের রাজনৈতিক পরিচয় এবং তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের নাম ভাঙিয়ে দীর্ঘদিন ধরে হোটেল ও স্পা ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করেছে, এসব স্পা প্রতিষ্ঠানের আড়ালে অনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগে গুলশান ও বনানী এলাকায় একাধিকবার আইনগত জটিলতায় পড়েছিলেন তিনি। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে তার পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে বিস্তারিত ব্যাখ্যা খুব কমই পাওয়া গেছে, তবুও অতীতের ঘটনাগুলো বর্তমান কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করছে।

একই সঙ্গে, এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত “মিজান” নামের এক ব্যক্তির ভূমিকাও অনুসন্ধানে সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিজেকে সাংবাদিকদের ঘনিষ্ঠ বা অংশীদার হিসেবে পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করেন। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, কোনো অভিযোগ উঠলেই তিনি গণমাধ্যমের নাম ব্যবহার করে বিষয়টি চাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন এবং কখনো কখনো ভীতি প্রদর্শনের পথও অবলম্বন করেন। এতে করে সাধারণ মানুষ যেমন নিরুৎসাহিত হন, তেমনি প্রকৃত অনুসন্ধান কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশে আবাসিক এলাকায় হোটেল বা গেস্ট হাউজ পরিচালনার বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রিত এবং নির্দিষ্ট কিছু শর্তের ওপর নির্ভরশীল। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এবং সিটি কর্পোরেশনের নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো ভবন যদি আবাসিক হিসেবে অনুমোদিত হয়, তাহলে সেখানে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা সাধারণত অনুমোদিত নয় যদি না তা নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য রূপান্তর করা হয়। যদি কোনো প্রতিষ্ঠান শর্ত পূরণ না করে আবাসিক এলাকায় হোটেল বা গেস্ট হাউজ পরিচালনা করে, তাহলে তা আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চাইলে তা বন্ধ করে দিতে পারে।

আরও পড়ুন, গাজীপুরে দক্ষিণ বাংলায় হোটেল সিন্ডিকেট নিয়ে নতুন বিতর্ক

উক্ত হোটেল/গেস্ট হাউজটির মালিকপক্ষ বারবার তাদের ব্যবসা “বৈধ” বলে দাবি করলেও অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আবাসিক এলাকা ঘণ্টাভিত্তিক কক্ষ ভাড়া দেওয়ার নামে স্কর্ট সার্ভিস ও ভুয়া পরিচয়ে অতিথি প্রবেশ এবং অসামাজিক কার্যক্রমের অভিযোগ এসবই বৈধতার দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তবে কেবল ট্রেড লাইসেন্স থাকলেই একটি হোটেল বৈধ হয়ে যায় না, বরং সেটি কী ধরনের এলাকায় পরিচালিত হচ্ছে, কী ধরনের কার্যক্রম চলছে এবং আইনগত শর্তগুলো মানা হচ্ছে কিনা এসব বিষয় একত্রে বিবেচনা করতে হয়। মালিকপক্ষ ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ এবং অতীতের বিতর্কিত কার্যক্রমের তথ্য সামনে আসায় পুরো বিষয়টি আরও গুরুত্ব পাচ্ছে। যদি কোনো প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক পরিচয়, পেশাগত প্রভাব বা ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে আইন এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে, তাহলে তা আইনের শাসনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু তাদের হোটেলে অনুসন্ধান করতে গেছে তারা সাংবাদিকদের বাধা প্রদান করেন এবং বলেন, এখানে পরিচিত লোক ছাড়া প্রবেশ করা নিষেধ। 


দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

সম্পাদক ও প্রকাশক: এ বি এম মনিরুজ্জামান 
নির্বাহী সম্পাদক: রিপন রুদ্র
যুগ্ম সম্পাদক: জাকিয়া সুলতানা (লাভলী)

কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক সংবাদ দিগন্ত । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত