দৈনিক সংবাদ দিগন্ত
প্রকাশ : সোমবার, ০৯ মার্চ ২০২৬

শরীয়তপুর রেজিস্ট্রি অফিসে ঘুষের সাম্রাজ্য? অভিযোগের কেন্দ্রে জেলা রেজিস্ট্রার হেলেনা পারভীন

শরীয়তপুর রেজিস্ট্রি অফিসে ঘুষের সাম্রাজ্য? অভিযোগের কেন্দ্রে জেলা রেজিস্ট্রার হেলেনা পারভীন
শরীয়তপুর রেজিস্ট্রি অফিসে ঘুষের সাম্রাজ্য? অভিযোগের কেন্দ্রে জেলা রেজিস্ট্রার হেলেনা পারভীন

শরীয়তপুর জেলা রেজিস্ট্রার হেলেনা পারভীন যেন বিতর্কের আরেক নাম। প্রথমবার জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে শরীয়তপুরে পদায়নের পর থেকেই একের পর এক অভিযোগে জেরবার তিনি। কিন্তু অভিযোগের পাহাড় জমলেও রহস্যজনক কারণে বারবার পার পেয়ে যাওয়ার ঘটনাও প্রশ্ন তুলছে সচেতন মহলে। 

১৯৭৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি কুষ্টিয়ায় জন্ম নেওয়া হেলেনা পারভীন ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। পরবর্তীতে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক বলয়ের প্রভাব কাজে লাগিয়ে প্রশাসনিক ক্যারিয়ারে দ্রুত প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সূত্র বলছে, ক্ষমতার কেন্দ্রের আশীর্বাদেই তিনি দীর্ঘদিন ধরে নানা বিতর্ক সত্ত্বেও বহাল তবিয়তে রয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, সাব-রেজিস্ট্রার থাকাকালীন সময় থেকেই তিনি গড়ে তোলেন একটি শক্তিশালী অর্থবাণিজ্যের সিন্ডিকেট। গোপালগঞ্জ সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে কর্মরত থাকাকালীন ২০১৬ সালেই তার সীমাহীন অর্থলিপ্সা ও স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে দলিল লেখকদের ধর্মঘট পর্যন্ত হয়েছিল। পরে ময়মনসিংহের গৌরীপুরেও একই ধরনের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।

শরীয়তপুরে জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে যোগদানের পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নিয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের। অভিযোগ অনুযায়ী, তার প্রধান সহকারী জাকির হোসেনের মাধ্যমে জেলার ৬টি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল প্রতি ৫০০ টাকা এবং নকল উত্তোলনে ২৫০ টাকা করে অবৈধভাবে আদায় করা হচ্ছে। প্রতিদিন এসব অফিসে গড়ে ৫০০ থেকে সাড়ে ৫০০টি দলিল সম্পাদন হয়। সেই হিসেবে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা ঘুষের টাকা উঠছে বলে অভিযোগ রয়েছে। শুধু এখানেই শেষ নয়। লাইসেন্স নবায়ন, অডিট, সারপ্রাইজ ভিজিট, দলিলের শ্রেণি পরিবর্তন—এসব ক্ষেত্রেও নেওয়া হচ্ছে মোটা অঙ্কের অনৈতিক অর্থ। এদিকে শরীয়তপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে অনিয়মের অভিযোগে অভিযান চালায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ২০২৫ সালের ১৬ এপ্রিল দুদকের মাদারীপুর সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আখতারুজ্জামানের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসে।

দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে পাওয়া যায়—

দলিলের শ্রেণি পরিবর্তন করে রাজস্ব ফাঁকি। সরকারি খাস খতিয়ান, শত্রু সম্পত্তি ও বন বিভাগের জমি ব্যক্তি মালিকানায় রেজিস্ট্রেশন। ভলিউম লোপাট ও দলিল টেম্পারিং। নকল এনআইডি ব্যবহার। নামজারি ছাড়াই জমি রেজিস্ট্রেশন। দলিল প্রতি অতিরিক্ত অর্থ আদায়। এমনকি অভিযোগ রয়েছে, দলিল প্রতি লাখে ১ হাজার টাকা এবং কথিত ডিআর স্যারের নাস্তা খরচ” নামে আরও ৫০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হতো।

দুদক কর্মকর্তারা গণমাধ্যমকে জানান, এসব অনিয়ম প্রতিরোধের দায়িত্ব মূলত জেলা রেজিস্ট্রারের। কিন্তু তদারকির অভাবে কিংবা নীরব সমর্থনের কারণেই এসব দুর্নীতি দীর্ঘদিন ধরে চলতে পারছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে অভিযানের সময় শরীয়তপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রার ওমর ফারুক গণমাধ্যমকে জানান, দুদকের অভিযানকে তারা স্বাগত জানান এবং যেসব দলিলে রাজস্ব ঘাটতি রয়েছে তা যাচাই করা হচ্ছে। কিন্তু স্থানীয়দের দাবি, প্রকাশ্যে যা বলা হচ্ছে বাস্তবে চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। রেজিস্ট্রি অফিসকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী ঘুষ বাণিজ্যের চক্র, যার শিকড় পৌঁছে গেছে অনেক উঁচু পর্যায় পর্যন্ত।

এখন প্রশ্ন উঠছে—

অভিযোগের এত প্রমাণ, দুদকের অভিযান, জনমতের চাপ—সবকিছুর পরও কেন বারবার রক্ষা পাচ্ছেন জেলা রেজিস্ট্রার হেলেনা পারভীন?

সচেতন মহলের দাবি, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হলেই বেরিয়ে আসবে পুরো সিন্ডিকেটের চিত্র।

বিষয় : অভিযোগ শরীয়তপুর ঘুষ হেলেনা পারভীন

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬


শরীয়তপুর রেজিস্ট্রি অফিসে ঘুষের সাম্রাজ্য? অভিযোগের কেন্দ্রে জেলা রেজিস্ট্রার হেলেনা পারভীন

প্রকাশের তারিখ : ০৯ মার্চ ২০২৬

featured Image

শরীয়তপুর জেলা রেজিস্ট্রার হেলেনা পারভীন যেন বিতর্কের আরেক নাম। প্রথমবার জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে শরীয়তপুরে পদায়নের পর থেকেই একের পর এক অভিযোগে জেরবার তিনি। কিন্তু অভিযোগের পাহাড় জমলেও রহস্যজনক কারণে বারবার পার পেয়ে যাওয়ার ঘটনাও প্রশ্ন তুলছে সচেতন মহলে। 

১৯৭৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি কুষ্টিয়ায় জন্ম নেওয়া হেলেনা পারভীন ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। পরবর্তীতে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক বলয়ের প্রভাব কাজে লাগিয়ে প্রশাসনিক ক্যারিয়ারে দ্রুত প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সূত্র বলছে, ক্ষমতার কেন্দ্রের আশীর্বাদেই তিনি দীর্ঘদিন ধরে নানা বিতর্ক সত্ত্বেও বহাল তবিয়তে রয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, সাব-রেজিস্ট্রার থাকাকালীন সময় থেকেই তিনি গড়ে তোলেন একটি শক্তিশালী অর্থবাণিজ্যের সিন্ডিকেট। গোপালগঞ্জ সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে কর্মরত থাকাকালীন ২০১৬ সালেই তার সীমাহীন অর্থলিপ্সা ও স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে দলিল লেখকদের ধর্মঘট পর্যন্ত হয়েছিল। পরে ময়মনসিংহের গৌরীপুরেও একই ধরনের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।

শরীয়তপুরে জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে যোগদানের পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নিয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের। অভিযোগ অনুযায়ী, তার প্রধান সহকারী জাকির হোসেনের মাধ্যমে জেলার ৬টি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল প্রতি ৫০০ টাকা এবং নকল উত্তোলনে ২৫০ টাকা করে অবৈধভাবে আদায় করা হচ্ছে। প্রতিদিন এসব অফিসে গড়ে ৫০০ থেকে সাড়ে ৫০০টি দলিল সম্পাদন হয়। সেই হিসেবে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা ঘুষের টাকা উঠছে বলে অভিযোগ রয়েছে। শুধু এখানেই শেষ নয়। লাইসেন্স নবায়ন, অডিট, সারপ্রাইজ ভিজিট, দলিলের শ্রেণি পরিবর্তন—এসব ক্ষেত্রেও নেওয়া হচ্ছে মোটা অঙ্কের অনৈতিক অর্থ। এদিকে শরীয়তপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে অনিয়মের অভিযোগে অভিযান চালায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ২০২৫ সালের ১৬ এপ্রিল দুদকের মাদারীপুর সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আখতারুজ্জামানের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসে।

দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে পাওয়া যায়—

দলিলের শ্রেণি পরিবর্তন করে রাজস্ব ফাঁকি। সরকারি খাস খতিয়ান, শত্রু সম্পত্তি ও বন বিভাগের জমি ব্যক্তি মালিকানায় রেজিস্ট্রেশন। ভলিউম লোপাট ও দলিল টেম্পারিং। নকল এনআইডি ব্যবহার। নামজারি ছাড়াই জমি রেজিস্ট্রেশন। দলিল প্রতি অতিরিক্ত অর্থ আদায়। এমনকি অভিযোগ রয়েছে, দলিল প্রতি লাখে ১ হাজার টাকা এবং কথিত ডিআর স্যারের নাস্তা খরচ” নামে আরও ৫০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হতো।

দুদক কর্মকর্তারা গণমাধ্যমকে জানান, এসব অনিয়ম প্রতিরোধের দায়িত্ব মূলত জেলা রেজিস্ট্রারের। কিন্তু তদারকির অভাবে কিংবা নীরব সমর্থনের কারণেই এসব দুর্নীতি দীর্ঘদিন ধরে চলতে পারছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে অভিযানের সময় শরীয়তপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রার ওমর ফারুক গণমাধ্যমকে জানান, দুদকের অভিযানকে তারা স্বাগত জানান এবং যেসব দলিলে রাজস্ব ঘাটতি রয়েছে তা যাচাই করা হচ্ছে। কিন্তু স্থানীয়দের দাবি, প্রকাশ্যে যা বলা হচ্ছে বাস্তবে চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। রেজিস্ট্রি অফিসকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী ঘুষ বাণিজ্যের চক্র, যার শিকড় পৌঁছে গেছে অনেক উঁচু পর্যায় পর্যন্ত।

এখন প্রশ্ন উঠছে—

অভিযোগের এত প্রমাণ, দুদকের অভিযান, জনমতের চাপ—সবকিছুর পরও কেন বারবার রক্ষা পাচ্ছেন জেলা রেজিস্ট্রার হেলেনা পারভীন?

সচেতন মহলের দাবি, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হলেই বেরিয়ে আসবে পুরো সিন্ডিকেটের চিত্র।


দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

সম্পাদক ও প্রকাশক: এ বি এম মনিরুজ্জামান 
নির্বাহী সম্পাদক: রিপন রুদ্র
যুগ্ম সম্পাদক: জাকিয়া সুলতানা (লাভলী)

কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক সংবাদ দিগন্ত । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত