দৈনিক সংবাদ দিগন্ত
আপডেট : মঙ্গলবার, ০৬ জানুয়ারি ২০২৬

দুর্নীতির অভিযোগে লামা প্রশাসন

দুর্নীতির অভিযোগে লামা প্রশাসন
দুর্নীতির অভিযোগে লামা প্রশাসন

দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দাখিল করা একটি লিখিত অভিযোগ ঘিরে বান্দরবান পার্বত্য জেলার লামা উপজেলায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, লামা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মঈন উদ্দিন দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার অপব্যবহার করে সীমাহীন দুর্নীতি, অনিয়ম, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, ঘুষ গ্রহণ এবং সাধারণ জনগণকে হয়রানির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন। অভিযোগকারী একজন সাধারণ নাগরিক হলেও অভিযোগের ভাষা, তথ্য ও ধারাবাহিকতায় উঠে এসেছে প্রশাসনিক দুর্নীতির এক ভয়াবহ চিত্র। এই প্রতিবেদনটি অভিযোগপত্রে উত্থাপিত বিষয়সমূহ, স্থানীয়দের বক্তব্য, প্রশাসনিক কাঠামো এবং দুর্নীতির সম্ভাব্য প্রভাব বিশ্লেষণ করে প্রস্তুত করা হয়েছে।

অভিযোগটি দাখিল করা হয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান বরাবর। অভিযোগকারী উসমান গণি। তিনি নিজেকে একজন আইন মেনে চলা, শান্তিপ্রিয় ও সাধারণ নাগরিক হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, দেশের প্রচলিত আইন ও ন্যায়বিচারের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে তিনি বাধ্য হয়েই এই অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিযোগপত্রে বলা হয়, অভিযুক্ত কর্মকর্তা রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম চালিয়ে যাচ্ছেন। স্থানীয়ভাবে এসব বিষয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না বলেও অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। অভিযোগপত্র অনুযায়ী, লামা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে যোগদানের পর থেকেই অভিযুক্ত কর্মকর্তা একের পর এক অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন। 

অভিযুক্ত ইউএনও একই সঙ্গে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন। অভিযোগকারীর দাবি, এসব আদালত অনেক ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগের জন্য নয়, বরং অর্থ আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র দোকানি ও সাধারণ মানুষকে সামান্য অজুহাতে জরিমানা করা হয়। পরে অনেক ক্ষেত্রেই সরকারি কোষাগারে পুরো অর্থ জমা না দিয়ে একটি অংশ ঘুষ হিসেবে গ্রহণ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, এটি ছিল একটি ‘কাগুজে উন্নয়ন প্রকল্প’, যার মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ছিল না এবং স্থানীয় জনগণের কোনো প্রয়োজনীয়তাও ছিল না। অভিযোগপত্রে আরো বলা হয়, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও বিভিন্ন দপ্তরের জনপ্রতিনিধি ও কর্মচারীদের ওপর প্রভাব খাটিয়ে নিয়মিত আর্থিক সুবিধা আদায় করা হতো। কেউ এই দাবিতে সাড়া না দিলে তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি করা হতো। অভিযুক্ত কর্মকর্তা তার অধীনস্থ ড্রাইভার, পিয়ন, অফিস সহায়ক, নিরাপত্তা কর্মীসহ একাধিক কর্মচারীকে দুর্নীতির কাজে ব্যবহার করেছেন। এসব কর্মচারীর মাধ্যমে ঘুষ সংগ্রহ, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং অবৈধ লেনদেন পরিচালিত হতো।

এই প্রতিবেদনের জন্য অনুসন্ধানে জানা যায়, লামা উপজেলায় প্রশাসনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতে মানুষ ভয় পান। অনেকেই নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ভাই এখানে ইউএনও সাহেবের বিরুদ্ধে কথা বললে কালই কোনো না কোনো মামলায় ফেঁসে যেতে হয়। আরেকজন একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বলেন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের নামে প্রায়ই তাকে ডাকা হতো এবং জরিমানার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করা হয়েছে। তবে তিনি লিখিতভাবে কিছু দিতে রাজি হননি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদ। স্থানীয় সরকারের কার্যক্রম, উন্নয়ন প্রকল্প, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং ভ্রাম্যমাণ আদালত সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে এই পদটি। তবে অভিযোগের ভিক্তিতে বান্দরবান পার্বত্য জেলার লামা উপজেলা প্রশাসন জেলা প্রশাসনের প্যাডে জারি করা একটি সরকারি চিঠিও অভিযোগের সহায়ক নথিতে গত ০৫ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে জারি করা (স্বারক নম্বর: ০৫.৪২.০৩০০.৪০১.০৩.০০২.২৫.৬১ চিঠিতে লামা উপজেলা প্রশাসনের একজন কর্মচারীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়টি উল্লেখ করে তা গুরুত্বসহকারে যাচাই বাছাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়েছে। চিঠিতে বিষয়টি তদন্তসাপেক্ষ বলে উল্লেখ রয়েছে।

অভিযোগপত্রে সরাসরি নির্দিষ্ট অঙ্ক উল্লেখ না থাকলেও বলা হয়েছে, অভিযুক্ত কর্মকর্তা “কোটি টাকার মালিক” হয়েছেন। ভ্রাম্যমাণ আদালত, উন্নয়ন প্রকল্প, ঘুষ ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে দীর্ঘ সময়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। দুদকের নিয়ম অনুযায়ী, এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে অভিযুক্ত কর্মকর্তার সম্পদ বিবরণী, ব্যাংক হিসাব, স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি এবং সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের অডিট রিপোর্ট পর্যালোচনা করা হয়।

প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের কর্মচারীরা সাধারণ মানুষের কাছে সরকারের প্রথম মুখ। তাদের সততা ও দায়িত্বশীলতার ওপরই নির্ভর করে রাষ্ট্রীয় সেবার বিশ্বাসযোগ্যতা। কিন্তু যখন সেই প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতর থেকেই দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে, তখন শুধু ব্যক্তি নয় পুরো ব্যবস্থাই প্রশ্নের মুখে পড়ে। বান্দরবান পার্বত্য জেলার লামা উপজেলায় তেমনই একটি অভিযোগ এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) মো: মঈন উদ্দিন এবং তার কার্যালয়ে কর্মরত পিয়ন সোহেলের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, প্রতারণা, ভূমি সংক্রান্ত জালিয়াতির বাণিজ্যের অভিযোগ উঠে আসছে। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বরাবর দায়ের করা লিখিত অভিযোগ এবং জেলা প্রশাসনের জারি করা সরকারি নথি এই অভিযোগগুলোকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। দৈনিক সংবাদ দিগন্তের হাতে থাকা দুদকে দাখিল করা লিখিত অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, লামা উপজেলা ইউএনও কার্যালয়ের পিয়ন সোহেল লামা দীর্ঘদিন ধরে ইউএনওর নাম ব্যবহার করে অবৈধভাবে বিভিন্ন খাত থেকে অর্থ আদায় করে আসছেন।

এসব ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ক্ষমতার ভয় দেখিয়ে নিয়মিত অর্থ আদায় করা হয়েছে। অভিযোগকারী দাবি করেন, এই চাঁদাবাজি ও কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে সোহেল অস্বাভাবিক হারে সম্পদের মালিক হয়েছেন। এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসন/উপজেলা প্রশাসন সংশ্লিষ্ট একটি সরকারি চিঠি (যার অনুলিপি দৈনিক সংবাদ দিগন্তের কাছে রয়েছে) প্রকাশ্যে এসেছে। চিঠিটি সরকারি প্যাডে জারি করা এবং এতে অভিযোগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার ইঙ্গিত রয়েছে। এই নথি প্রমাণ করে, সোহেলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ কেবল সামাজিক গুঞ্জন নয় বরং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উত্থাপিত একটি বিষয়।

স্থানীয় সূত্র ও অভিযোগপত্র অনুযায়ী, সোহেল লামা ধীরে ধীরে নিজেকে ইউএনও কার্যালয়ের ভেতরে একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘ম্যানেজিং ফিগার’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। তার অনুমতি ছাড়া অনেক ফাইল নড়ত না এমন অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, সে এমনভাবে চলাফেরা করত, যেন অফিসটা তারই। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী ও ঠিকাদারদের কাছে সোহেল নিজেকে ইউএনওর ঘনিষ্ঠ পরিচয় দিয়ে প্রভাব বিস্তার করেন। লামা উপজেলায় ইটভাটা, পাহাড় কাটা ও বালু উত্তোলন একটি স্পর্শকাতর ইস্যু। অভিযোগ রয়েছে, এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) মো: মঈন উদ্দিনের সোহেল নিয়মিত চাঁদা আদায় করতেন।

আরো পড়ুন, মাদারীপুরের কালকিনিতে অসহায় ৬০ জন জেলের মাঝে ৬০ বকনা গরু বিতরণ

এক ইটভাটা মালিক অভিযোগ করে বলেন, প্রতিমাসে সোহেল নিজের জন্য ৫ হাজার টাকা এবং ইউএনওর জন্য ৫০ হাজার টাকা দাবি করত। এমন একটি ভিডিওবার্তা সোসাল মিডিয়াতে ছড়িয়ে পড়েছে। এই অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে একাধিক ইটভাটা মালিক একই ধরনের অভিযোগ করেছেন।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, লামা উপজেলা ভূমি অফিসে সোহেলের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করত এবং এই সিন্ডিকেটে জড়িত রয়েছে কিছু সুবিধাভুগী গণমাধ্যমকর্মীরা। দৈনিক সংবাদ দিগন্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পর প্রথম শ্রেণী থেকে শুরু করে একাধিক গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ করে। তবে সংবাদ প্রকাশ হলে সিন্ডিকেটের সুবিধাভুগী গণমাধ্যমকর্মীরা ফোন বা সরাসরি বলেন, আপনার এলাকায় বসবাস করতে হবে না, আপনারা জেল খাটবেন বলে উঠতি বয়সের গণমাধ্যমকর্মীর হুমকি দিয়ে থাকেন যাতে আর কোন ধরনের সংবাদ প্রকাশ না করে থাকে। তবে ইট ভাটার ভিডিওর কথোপোকথন তারা এধাই বলে চালিয়ে যান। অথচ সেই ব্যক্তির আরেকটি ভিডিও বার্তায় তার কথোপোকথনটি মনে হয় কেউ তাকে চাপ প্রয়োগ করে ভিডিওটি ধারন করেন। এর অণ্যতম কারন তাদের ঘুষ বাণিজ্যটি ধামাচাপা দেওয়ার জণ্য বলা যেতে পারে একটি কৌশল।

আরো পড়ুন, গাজীপুরে অবৈধ ইটভাটা একাধিক, উচ্ছেদ হয়েছে ১টি

এদিকে ভুক্তভোগীদের দাবি, সোহেলের মাসিক আয় ছিল এক থেকে দেড় লাখ টাকা। অথচ সরকারি পিয়নের বেতন কাঠামো তুলনামূলকভাবে সীমিত এবং তার মাধ্যমেই নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) মো: মঈন উদ্দিন ঘুষ গ্রহন করতেন। এত অভিযোগের পরও তিনি বহাল তবিয়তে কর্মরত রয়েছেন।স্থানীয় মহলে আলোচনায় আছে, সোহেল নিজেকে ইতিপূর্বে স্থানীয় আওয়ামী লীগের কিছু নেতার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচয় দিতেন এবং এই পরিচয় ব্যবহার করে প্রশাসনের ভেতরে প্রভাব বিস্তার করতেন। তবে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতাদের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। দুদকে লিখিত অভিযোগ ও প্রশাসনিক নথি থাকার পরও দীর্ঘদিন ধরে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি এমন অভিযোগ তুলছেন স্থানীয়রা।

এই বিষয়ে নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) মো: মঈন উদ্দিন ও পিয়ন সোহেল লামার বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি এবং প্রশ্ন এড়িয়ে যান। তবে আইন অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য দেওয়ার পূর্ণ সুযোগ রয়েছে।

বিষয় : বান্দরবান অভিযোগপত্র

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬


দুর্নীতির অভিযোগে লামা প্রশাসন

প্রকাশের তারিখ : ০৫ জানুয়ারি ২০২৬

featured Image

দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দাখিল করা একটি লিখিত অভিযোগ ঘিরে বান্দরবান পার্বত্য জেলার লামা উপজেলায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, লামা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মঈন উদ্দিন দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার অপব্যবহার করে সীমাহীন দুর্নীতি, অনিয়ম, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, ঘুষ গ্রহণ এবং সাধারণ জনগণকে হয়রানির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন। অভিযোগকারী একজন সাধারণ নাগরিক হলেও অভিযোগের ভাষা, তথ্য ও ধারাবাহিকতায় উঠে এসেছে প্রশাসনিক দুর্নীতির এক ভয়াবহ চিত্র। এই প্রতিবেদনটি অভিযোগপত্রে উত্থাপিত বিষয়সমূহ, স্থানীয়দের বক্তব্য, প্রশাসনিক কাঠামো এবং দুর্নীতির সম্ভাব্য প্রভাব বিশ্লেষণ করে প্রস্তুত করা হয়েছে।

অভিযোগটি দাখিল করা হয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান বরাবর। অভিযোগকারী উসমান গণি। তিনি নিজেকে একজন আইন মেনে চলা, শান্তিপ্রিয় ও সাধারণ নাগরিক হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, দেশের প্রচলিত আইন ও ন্যায়বিচারের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে তিনি বাধ্য হয়েই এই অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিযোগপত্রে বলা হয়, অভিযুক্ত কর্মকর্তা রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম চালিয়ে যাচ্ছেন। স্থানীয়ভাবে এসব বিষয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না বলেও অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। অভিযোগপত্র অনুযায়ী, লামা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে যোগদানের পর থেকেই অভিযুক্ত কর্মকর্তা একের পর এক অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন। 

অভিযুক্ত ইউএনও একই সঙ্গে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন। অভিযোগকারীর দাবি, এসব আদালত অনেক ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগের জন্য নয়, বরং অর্থ আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র দোকানি ও সাধারণ মানুষকে সামান্য অজুহাতে জরিমানা করা হয়। পরে অনেক ক্ষেত্রেই সরকারি কোষাগারে পুরো অর্থ জমা না দিয়ে একটি অংশ ঘুষ হিসেবে গ্রহণ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, এটি ছিল একটি ‘কাগুজে উন্নয়ন প্রকল্প’, যার মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ছিল না এবং স্থানীয় জনগণের কোনো প্রয়োজনীয়তাও ছিল না। অভিযোগপত্রে আরো বলা হয়, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও বিভিন্ন দপ্তরের জনপ্রতিনিধি ও কর্মচারীদের ওপর প্রভাব খাটিয়ে নিয়মিত আর্থিক সুবিধা আদায় করা হতো। কেউ এই দাবিতে সাড়া না দিলে তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি করা হতো। অভিযুক্ত কর্মকর্তা তার অধীনস্থ ড্রাইভার, পিয়ন, অফিস সহায়ক, নিরাপত্তা কর্মীসহ একাধিক কর্মচারীকে দুর্নীতির কাজে ব্যবহার করেছেন। এসব কর্মচারীর মাধ্যমে ঘুষ সংগ্রহ, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং অবৈধ লেনদেন পরিচালিত হতো।

এই প্রতিবেদনের জন্য অনুসন্ধানে জানা যায়, লামা উপজেলায় প্রশাসনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতে মানুষ ভয় পান। অনেকেই নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ভাই এখানে ইউএনও সাহেবের বিরুদ্ধে কথা বললে কালই কোনো না কোনো মামলায় ফেঁসে যেতে হয়। আরেকজন একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বলেন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের নামে প্রায়ই তাকে ডাকা হতো এবং জরিমানার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করা হয়েছে। তবে তিনি লিখিতভাবে কিছু দিতে রাজি হননি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদ। স্থানীয় সরকারের কার্যক্রম, উন্নয়ন প্রকল্প, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং ভ্রাম্যমাণ আদালত সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে এই পদটি। তবে অভিযোগের ভিক্তিতে বান্দরবান পার্বত্য জেলার লামা উপজেলা প্রশাসন জেলা প্রশাসনের প্যাডে জারি করা একটি সরকারি চিঠিও অভিযোগের সহায়ক নথিতে গত ০৫ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে জারি করা (স্বারক নম্বর: ০৫.৪২.০৩০০.৪০১.০৩.০০২.২৫.৬১ চিঠিতে লামা উপজেলা প্রশাসনের একজন কর্মচারীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়টি উল্লেখ করে তা গুরুত্বসহকারে যাচাই বাছাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়েছে। চিঠিতে বিষয়টি তদন্তসাপেক্ষ বলে উল্লেখ রয়েছে।

অভিযোগপত্রে সরাসরি নির্দিষ্ট অঙ্ক উল্লেখ না থাকলেও বলা হয়েছে, অভিযুক্ত কর্মকর্তা “কোটি টাকার মালিক” হয়েছেন। ভ্রাম্যমাণ আদালত, উন্নয়ন প্রকল্প, ঘুষ ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে দীর্ঘ সময়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। দুদকের নিয়ম অনুযায়ী, এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে অভিযুক্ত কর্মকর্তার সম্পদ বিবরণী, ব্যাংক হিসাব, স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি এবং সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের অডিট রিপোর্ট পর্যালোচনা করা হয়।

প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের কর্মচারীরা সাধারণ মানুষের কাছে সরকারের প্রথম মুখ। তাদের সততা ও দায়িত্বশীলতার ওপরই নির্ভর করে রাষ্ট্রীয় সেবার বিশ্বাসযোগ্যতা। কিন্তু যখন সেই প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতর থেকেই দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে, তখন শুধু ব্যক্তি নয় পুরো ব্যবস্থাই প্রশ্নের মুখে পড়ে। বান্দরবান পার্বত্য জেলার লামা উপজেলায় তেমনই একটি অভিযোগ এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) মো: মঈন উদ্দিন এবং তার কার্যালয়ে কর্মরত পিয়ন সোহেলের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, প্রতারণা, ভূমি সংক্রান্ত জালিয়াতির বাণিজ্যের অভিযোগ উঠে আসছে। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বরাবর দায়ের করা লিখিত অভিযোগ এবং জেলা প্রশাসনের জারি করা সরকারি নথি এই অভিযোগগুলোকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। দৈনিক সংবাদ দিগন্তের হাতে থাকা দুদকে দাখিল করা লিখিত অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, লামা উপজেলা ইউএনও কার্যালয়ের পিয়ন সোহেল লামা দীর্ঘদিন ধরে ইউএনওর নাম ব্যবহার করে অবৈধভাবে বিভিন্ন খাত থেকে অর্থ আদায় করে আসছেন।

এসব ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ক্ষমতার ভয় দেখিয়ে নিয়মিত অর্থ আদায় করা হয়েছে। অভিযোগকারী দাবি করেন, এই চাঁদাবাজি ও কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে সোহেল অস্বাভাবিক হারে সম্পদের মালিক হয়েছেন। এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসন/উপজেলা প্রশাসন সংশ্লিষ্ট একটি সরকারি চিঠি (যার অনুলিপি দৈনিক সংবাদ দিগন্তের কাছে রয়েছে) প্রকাশ্যে এসেছে। চিঠিটি সরকারি প্যাডে জারি করা এবং এতে অভিযোগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার ইঙ্গিত রয়েছে। এই নথি প্রমাণ করে, সোহেলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ কেবল সামাজিক গুঞ্জন নয় বরং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উত্থাপিত একটি বিষয়।

স্থানীয় সূত্র ও অভিযোগপত্র অনুযায়ী, সোহেল লামা ধীরে ধীরে নিজেকে ইউএনও কার্যালয়ের ভেতরে একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘ম্যানেজিং ফিগার’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। তার অনুমতি ছাড়া অনেক ফাইল নড়ত না এমন অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, সে এমনভাবে চলাফেরা করত, যেন অফিসটা তারই। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী ও ঠিকাদারদের কাছে সোহেল নিজেকে ইউএনওর ঘনিষ্ঠ পরিচয় দিয়ে প্রভাব বিস্তার করেন। লামা উপজেলায় ইটভাটা, পাহাড় কাটা ও বালু উত্তোলন একটি স্পর্শকাতর ইস্যু। অভিযোগ রয়েছে, এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) মো: মঈন উদ্দিনের সোহেল নিয়মিত চাঁদা আদায় করতেন।

আরো পড়ুন, মাদারীপুরের কালকিনিতে অসহায় ৬০ জন জেলের মাঝে ৬০ বকনা গরু বিতরণ

এক ইটভাটা মালিক অভিযোগ করে বলেন, প্রতিমাসে সোহেল নিজের জন্য ৫ হাজার টাকা এবং ইউএনওর জন্য ৫০ হাজার টাকা দাবি করত। এমন একটি ভিডিওবার্তা সোসাল মিডিয়াতে ছড়িয়ে পড়েছে। এই অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে একাধিক ইটভাটা মালিক একই ধরনের অভিযোগ করেছেন।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, লামা উপজেলা ভূমি অফিসে সোহেলের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করত এবং এই সিন্ডিকেটে জড়িত রয়েছে কিছু সুবিধাভুগী গণমাধ্যমকর্মীরা। দৈনিক সংবাদ দিগন্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পর প্রথম শ্রেণী থেকে শুরু করে একাধিক গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ করে। তবে সংবাদ প্রকাশ হলে সিন্ডিকেটের সুবিধাভুগী গণমাধ্যমকর্মীরা ফোন বা সরাসরি বলেন, আপনার এলাকায় বসবাস করতে হবে না, আপনারা জেল খাটবেন বলে উঠতি বয়সের গণমাধ্যমকর্মীর হুমকি দিয়ে থাকেন যাতে আর কোন ধরনের সংবাদ প্রকাশ না করে থাকে। তবে ইট ভাটার ভিডিওর কথোপোকথন তারা এধাই বলে চালিয়ে যান। অথচ সেই ব্যক্তির আরেকটি ভিডিও বার্তায় তার কথোপোকথনটি মনে হয় কেউ তাকে চাপ প্রয়োগ করে ভিডিওটি ধারন করেন। এর অণ্যতম কারন তাদের ঘুষ বাণিজ্যটি ধামাচাপা দেওয়ার জণ্য বলা যেতে পারে একটি কৌশল।

আরো পড়ুন, গাজীপুরে অবৈধ ইটভাটা একাধিক, উচ্ছেদ হয়েছে ১টি

এদিকে ভুক্তভোগীদের দাবি, সোহেলের মাসিক আয় ছিল এক থেকে দেড় লাখ টাকা। অথচ সরকারি পিয়নের বেতন কাঠামো তুলনামূলকভাবে সীমিত এবং তার মাধ্যমেই নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) মো: মঈন উদ্দিন ঘুষ গ্রহন করতেন। এত অভিযোগের পরও তিনি বহাল তবিয়তে কর্মরত রয়েছেন।স্থানীয় মহলে আলোচনায় আছে, সোহেল নিজেকে ইতিপূর্বে স্থানীয় আওয়ামী লীগের কিছু নেতার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচয় দিতেন এবং এই পরিচয় ব্যবহার করে প্রশাসনের ভেতরে প্রভাব বিস্তার করতেন। তবে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতাদের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। দুদকে লিখিত অভিযোগ ও প্রশাসনিক নথি থাকার পরও দীর্ঘদিন ধরে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি এমন অভিযোগ তুলছেন স্থানীয়রা।

এই বিষয়ে নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) মো: মঈন উদ্দিন ও পিয়ন সোহেল লামার বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি এবং প্রশ্ন এড়িয়ে যান। তবে আইন অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য দেওয়ার পূর্ণ সুযোগ রয়েছে।


দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

সম্পাদক ও প্রকাশক: এ বি এম মনিরুজ্জামান 
নির্বাহী সম্পাদক: রিপন রুদ্র
যুগ্ম সম্পাদক: জাকিয়া সুলতানা (লাভলী)

কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক সংবাদ দিগন্ত । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত