সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার প্রায় তিন লাখ মানুষের সরকারি চিকিৎসাসেবার অন্যতম প্রধান ভরসা কালিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। ১৯৬৩ সালে ২০ শয্যা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালটি ২০১০ সালের ২৪ ডিসেম্বর ৫০ শয্যায় উন্নীত হয়। কিন্তু চিকিৎসক ও জনবলসংকট, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব এবং মূল্যবান চিকিৎসা সরঞ্জামের অব্যবহারে হাসপাতালটির স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অস্ত্রোপচারের জন্য আধুনিক অপারেশন থিয়েটার থাকলেও তা কার্যত বন্ধ। রোগ নির্ণয়ের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রও পড়ে রয়েছে অব্যবহৃত অবস্থায়। হাসপাতালটিতে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ ৩৪টি। এর বিপরীতে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা ছাড়া কর্মরত চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র পাঁচজন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। ফলে বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে কর্তব্যরতদের। প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও জনবল না থাকায় বিশেষ করে প্রসূতি, অস্ত্রোপচারপ্রত্যাশী এবং জটিল রোগে আক্রান্তদের চিকিৎসা পেতে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। রোববার (২৫ অক্টোবর) সকাল ১০টার দিকে সরেজমিনে হাসপাতালটিতে গিয়ে দেখা যায়, বহির্বিভাগে মেডিকেল অফিসার ডা. রিপন বিশ্বাস রোগী দেখছেন। জরুরি বিভাগে একজন মহিলা উপস্বাস্থ্য সহকারী ছাড়া অন্য কোনো চিকিৎসককে দেখা যায়নি বলে প্রতিবেদকের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
আরও পড়ুন,হিজলায় ১ নং হরিনাথপুর ইউনিয়ন মহিলা দলের কর্মী সভা অনুষ্ঠিত
এ সময় চিকিৎসা নিতে আসা শত শত নারী-পুরুষের দীর্ঘ সারি সামলাতে কর্তব্যরত আনসার সদস্যদের হিমশিম খেতে হয়। হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসকদের মধ্যে রয়েছেন ডা. সুজায়েত হোসেন, ডা. সাইদুর রহমান, ডা. হাবিবুর রহমান, ডা. সাইফুল ইসলাম ও ডা. রিপন বিশ্বাস। সীমিতসংখ্যক চিকিৎসক দিয়ে বহির্বিভাগ, জরুরি বিভাগ এবং অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনা করায় রোগীদের অপেক্ষার সময় বাড়ছে বলে অভিযোগ করেছেন সেবাগ্রহীতারা। চিকিৎসকের পাশাপাশি নার্সিং ও অন্যান্য পদেও রয়েছে জনবলসংকট। হাসপাতালের ৩৬টি সেবিকা পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ২০ জন। নিরাপদ মাতৃত্ব ও প্রসবসেবা নিশ্চিত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ১০টি মিডওয়াইফ পদের মধ্যে পাঁচটি শূন্য রয়েছে। নার্সিং সুপারভাইজার ও সিনিয়র স্টাফ নার্সের ২৬টি পদের বিপরীতে সুপারভাইজারসহ ১৭টি পদ শূন্য বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। উপজেলার ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতেও চিকিৎসকসংকট রয়েছে। প্রথম শ্রেণির চিকিৎসক ও সহকারী সার্জনসহ সংশ্লিষ্ট ১২টি পদে জনবল নেই বলে দাবি করা হয়েছে। তৃতীয় শ্রেণির ১৪২টি পদের বিপরীতে ৬৮ জন কর্মরত রয়েছেন। চতুর্থ শ্রেণির ২৩টি পদের মধ্যে কর্মরত ১২ জন। অন্যদিকে আউটসোর্সিংয়ের জনবল নিয়েও রয়েছে ঘাটতি। এসব পদে প্রকৃত অনুমোদিত সংখ্যা, কর্মরত জনবল ও শূন্য পদের হিসাব সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথি দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন। হাসপাতালটির অন্যতম বড় সংকট হলো, আধুনিক অপারেশন থিয়েটার (ওটি) থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও কারিগরি জনবল না থাকায় সেখানে অস্ত্রোপচার কার্যক্রম চালানো যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। গাইনি ও সার্জারি বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ বিশেষজ্ঞ পদ শূন্য থাকায় সিজারিয়ান সেকশনসহ বিভিন্ন অস্ত্রোপচারের জন্য রোগীদের অন্য হাসপাতালে যেতে হচ্ছে। ফলে জটিল অবস্থায় থাকা প্রসূতি ও মুমূর্ষু রোগীদের প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ মাইল দূরে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল কিংবা সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
আরও পড়ুন,মাদরাসায় ভাঙচুর ও ১৭ লাখ টাকা লুটের অভিযোগ অস্বীকার
এতে জরুরি রোগীদের চিকিৎসা পেতে বিলম্বের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসা নিচ্ছে, যেখানে ব্যয় বহন করতে হচ্ছে নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী। চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রেও সংকট প্রকট। সোনোলজিস্ট, ইসিজি টেকনিশিয়ান ও এক্স-রে টেকনিশিয়ানের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য থাকায় আলট্রাসনোগ্রাম, ইসিজি ও এক্স-রে সেবা ব্যাহত হচ্ছে বলে জানা গেছে। সার্জারি টেকনিশিয়ানের অভাবে এক্স-রে কক্ষ তালাবদ্ধ থাকার অভিযোগও রয়েছে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও টেকনিশিয়ান না থাকায় মূল্যবান যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন অব্যবহৃত পড়ে থেকে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দন্ত বিভাগে যন্ত্রপাতি থাকলেও চিকিৎসক ও টেকনিশিয়ানের অভাবে সেবা ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। চোখের চিকিৎসার ক্ষেত্রেও স্থানীয়ভাবে প্রয়োজনীয় সেবা না পেয়ে দূরবর্তী প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে রোগীদের। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মোসাদ্দেক হোসেনকে প্রায় ছয় মাস আগে বদলি করা হলেও তিনি এখনো কালিগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগদান করেননি। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা ডা. ডালিয়া আক্তার গত ১২ অক্টোবর বদলি হন। তাঁর স্থলে ডা. নাসির উদ্দিনকে পদায়ন করা হলেও তিনি যোগদান না করায় পদটি শূন্য রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এ অবস্থায় আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. হাবিবুর রহমান অতিরিক্তভাবে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যদিকে মেডিকেল অফিসার ডা. রূপা রানী পাল মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকায় চিকিৎসকসংকট আরও বেড়েছে। হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা আলপনা গোস্বামী, সকিনা খাতুন, মনিরা বেগম, হালিমা খাতুন ও মনোয়ারা খাতুন জানান, দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তাঁরা প্রত্যাশিত চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন না। তাঁদের অভিযোগ, চিকিৎসকের স্বল্পতার কারণে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। অনেক সময় প্যারাসিটামল, গ্যাসের ওষুধ, অ্যালার্জির ট্যাবলেট ও ভিটামিনের মতো ওষুধ নিয়েই ফিরতে হয়। প্রয়োজনীয় অন্য ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে বলেও জানান তাঁরা।
আরও পড়ুন,মহেশপুরের পাতিবিলা গ্রামের হোসেন আলীর বিরুদ্ধে অন্যের জমি
হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ও অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান সংবাদ দিগন্তকে বলেন, চিকিৎসক ও জনবলসংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তবে এখনো সমস্যার সমাধান হয়নি। সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন ডা. আব্দুস সালাম সংবাদ দিগন্তকে বলেন, চিকিৎসক ও জনবলসংকটের বিষয়টি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। নতুন চিকিৎসক নিয়োগ বা পদায়ন করা হলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে। নতুন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তার যোগদান না করার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, পদায়নের পর কেউ যোগদান না করলে তাঁর পক্ষে এ বিষয়ে করণীয় সীমিত। স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক প্রয়োজনগুলোর অন্যতম। অথচ প্রায় তিন লাখ মানুষের চিকিৎসার ভরসাস্থল একটি সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক, নার্স, মিডওয়াইফ ও কারিগরি জনবলের ঘাটতি থাকলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়বেই। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও টেকনিশিয়ানের অভাবে মূল্যবান যন্ত্রপাতি অব্যবহৃত পড়ে থাকা যেমন সরকারি সম্পদের অপচয়ের আশঙ্কা তৈরি করে, তেমনি জরুরি চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার থেকেও মানুষ বঞ্চিত হয়।সচেতন মহল ও উপজেলাবাসী কালিগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শূন্য পদ পূরণ, গাইনি ও সার্জারি বিশেষজ্ঞসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসক পদায়ন, অপারেশন থিয়েটার চালু এবং এক্স-রে, আলট্রাসনোগ্রাম ও ইসিজি সেবা সচল করার দাবি জানিয়েছেন। এ সংকট নিরসনে প্রধানমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তাঁরা।দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে উপজেলা পর্যায়ে সাধারণ মানুষের সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্য আরও বাধাগ্রস্ত হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

রোববার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৫ অক্টোবর ২০২৬
সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার প্রায় তিন লাখ মানুষের সরকারি চিকিৎসাসেবার অন্যতম প্রধান ভরসা কালিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। ১৯৬৩ সালে ২০ শয্যা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালটি ২০১০ সালের ২৪ ডিসেম্বর ৫০ শয্যায় উন্নীত হয়। কিন্তু চিকিৎসক ও জনবলসংকট, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব এবং মূল্যবান চিকিৎসা সরঞ্জামের অব্যবহারে হাসপাতালটির স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অস্ত্রোপচারের জন্য আধুনিক অপারেশন থিয়েটার থাকলেও তা কার্যত বন্ধ। রোগ নির্ণয়ের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রও পড়ে রয়েছে অব্যবহৃত অবস্থায়। হাসপাতালটিতে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ ৩৪টি। এর বিপরীতে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা ছাড়া কর্মরত চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র পাঁচজন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। ফলে বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে কর্তব্যরতদের। প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও জনবল না থাকায় বিশেষ করে প্রসূতি, অস্ত্রোপচারপ্রত্যাশী এবং জটিল রোগে আক্রান্তদের চিকিৎসা পেতে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। রোববার (২৫ অক্টোবর) সকাল ১০টার দিকে সরেজমিনে হাসপাতালটিতে গিয়ে দেখা যায়, বহির্বিভাগে মেডিকেল অফিসার ডা. রিপন বিশ্বাস রোগী দেখছেন। জরুরি বিভাগে একজন মহিলা উপস্বাস্থ্য সহকারী ছাড়া অন্য কোনো চিকিৎসককে দেখা যায়নি বলে প্রতিবেদকের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
আরও পড়ুন,হিজলায় ১ নং হরিনাথপুর ইউনিয়ন মহিলা দলের কর্মী সভা অনুষ্ঠিত
এ সময় চিকিৎসা নিতে আসা শত শত নারী-পুরুষের দীর্ঘ সারি সামলাতে কর্তব্যরত আনসার সদস্যদের হিমশিম খেতে হয়। হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসকদের মধ্যে রয়েছেন ডা. সুজায়েত হোসেন, ডা. সাইদুর রহমান, ডা. হাবিবুর রহমান, ডা. সাইফুল ইসলাম ও ডা. রিপন বিশ্বাস। সীমিতসংখ্যক চিকিৎসক দিয়ে বহির্বিভাগ, জরুরি বিভাগ এবং অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনা করায় রোগীদের অপেক্ষার সময় বাড়ছে বলে অভিযোগ করেছেন সেবাগ্রহীতারা। চিকিৎসকের পাশাপাশি নার্সিং ও অন্যান্য পদেও রয়েছে জনবলসংকট। হাসপাতালের ৩৬টি সেবিকা পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ২০ জন। নিরাপদ মাতৃত্ব ও প্রসবসেবা নিশ্চিত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ১০টি মিডওয়াইফ পদের মধ্যে পাঁচটি শূন্য রয়েছে। নার্সিং সুপারভাইজার ও সিনিয়র স্টাফ নার্সের ২৬টি পদের বিপরীতে সুপারভাইজারসহ ১৭টি পদ শূন্য বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। উপজেলার ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতেও চিকিৎসকসংকট রয়েছে। প্রথম শ্রেণির চিকিৎসক ও সহকারী সার্জনসহ সংশ্লিষ্ট ১২টি পদে জনবল নেই বলে দাবি করা হয়েছে। তৃতীয় শ্রেণির ১৪২টি পদের বিপরীতে ৬৮ জন কর্মরত রয়েছেন। চতুর্থ শ্রেণির ২৩টি পদের মধ্যে কর্মরত ১২ জন। অন্যদিকে আউটসোর্সিংয়ের জনবল নিয়েও রয়েছে ঘাটতি। এসব পদে প্রকৃত অনুমোদিত সংখ্যা, কর্মরত জনবল ও শূন্য পদের হিসাব সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথি দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন। হাসপাতালটির অন্যতম বড় সংকট হলো, আধুনিক অপারেশন থিয়েটার (ওটি) থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও কারিগরি জনবল না থাকায় সেখানে অস্ত্রোপচার কার্যক্রম চালানো যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। গাইনি ও সার্জারি বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ বিশেষজ্ঞ পদ শূন্য থাকায় সিজারিয়ান সেকশনসহ বিভিন্ন অস্ত্রোপচারের জন্য রোগীদের অন্য হাসপাতালে যেতে হচ্ছে। ফলে জটিল অবস্থায় থাকা প্রসূতি ও মুমূর্ষু রোগীদের প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ মাইল দূরে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল কিংবা সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
আরও পড়ুন,মাদরাসায় ভাঙচুর ও ১৭ লাখ টাকা লুটের অভিযোগ অস্বীকার
এতে জরুরি রোগীদের চিকিৎসা পেতে বিলম্বের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসা নিচ্ছে, যেখানে ব্যয় বহন করতে হচ্ছে নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী। চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রেও সংকট প্রকট। সোনোলজিস্ট, ইসিজি টেকনিশিয়ান ও এক্স-রে টেকনিশিয়ানের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য থাকায় আলট্রাসনোগ্রাম, ইসিজি ও এক্স-রে সেবা ব্যাহত হচ্ছে বলে জানা গেছে। সার্জারি টেকনিশিয়ানের অভাবে এক্স-রে কক্ষ তালাবদ্ধ থাকার অভিযোগও রয়েছে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও টেকনিশিয়ান না থাকায় মূল্যবান যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন অব্যবহৃত পড়ে থেকে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দন্ত বিভাগে যন্ত্রপাতি থাকলেও চিকিৎসক ও টেকনিশিয়ানের অভাবে সেবা ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। চোখের চিকিৎসার ক্ষেত্রেও স্থানীয়ভাবে প্রয়োজনীয় সেবা না পেয়ে দূরবর্তী প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে রোগীদের। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মোসাদ্দেক হোসেনকে প্রায় ছয় মাস আগে বদলি করা হলেও তিনি এখনো কালিগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগদান করেননি। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা ডা. ডালিয়া আক্তার গত ১২ অক্টোবর বদলি হন। তাঁর স্থলে ডা. নাসির উদ্দিনকে পদায়ন করা হলেও তিনি যোগদান না করায় পদটি শূন্য রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এ অবস্থায় আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. হাবিবুর রহমান অতিরিক্তভাবে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যদিকে মেডিকেল অফিসার ডা. রূপা রানী পাল মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকায় চিকিৎসকসংকট আরও বেড়েছে। হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা আলপনা গোস্বামী, সকিনা খাতুন, মনিরা বেগম, হালিমা খাতুন ও মনোয়ারা খাতুন জানান, দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তাঁরা প্রত্যাশিত চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন না। তাঁদের অভিযোগ, চিকিৎসকের স্বল্পতার কারণে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। অনেক সময় প্যারাসিটামল, গ্যাসের ওষুধ, অ্যালার্জির ট্যাবলেট ও ভিটামিনের মতো ওষুধ নিয়েই ফিরতে হয়। প্রয়োজনীয় অন্য ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে বলেও জানান তাঁরা।
আরও পড়ুন,মহেশপুরের পাতিবিলা গ্রামের হোসেন আলীর বিরুদ্ধে অন্যের জমি
হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ও অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান সংবাদ দিগন্তকে বলেন, চিকিৎসক ও জনবলসংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তবে এখনো সমস্যার সমাধান হয়নি। সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন ডা. আব্দুস সালাম সংবাদ দিগন্তকে বলেন, চিকিৎসক ও জনবলসংকটের বিষয়টি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। নতুন চিকিৎসক নিয়োগ বা পদায়ন করা হলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে। নতুন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তার যোগদান না করার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, পদায়নের পর কেউ যোগদান না করলে তাঁর পক্ষে এ বিষয়ে করণীয় সীমিত। স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক প্রয়োজনগুলোর অন্যতম। অথচ প্রায় তিন লাখ মানুষের চিকিৎসার ভরসাস্থল একটি সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক, নার্স, মিডওয়াইফ ও কারিগরি জনবলের ঘাটতি থাকলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়বেই। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও টেকনিশিয়ানের অভাবে মূল্যবান যন্ত্রপাতি অব্যবহৃত পড়ে থাকা যেমন সরকারি সম্পদের অপচয়ের আশঙ্কা তৈরি করে, তেমনি জরুরি চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার থেকেও মানুষ বঞ্চিত হয়।সচেতন মহল ও উপজেলাবাসী কালিগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শূন্য পদ পূরণ, গাইনি ও সার্জারি বিশেষজ্ঞসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসক পদায়ন, অপারেশন থিয়েটার চালু এবং এক্স-রে, আলট্রাসনোগ্রাম ও ইসিজি সেবা সচল করার দাবি জানিয়েছেন। এ সংকট নিরসনে প্রধানমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তাঁরা।দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে উপজেলা পর্যায়ে সাধারণ মানুষের সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্য আরও বাধাগ্রস্ত হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

আপনার মতামত লিখুন