বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এক গভীর টানটান উত্তেজনার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। রাজনৈতিক কর্মসূচি, পাল্টাপাল্টি আন্দোলন, সহিংস সংঘর্ষ, গ্রেপ্তার, মামলা এবং পাল্টা অভিযোগ—সব মিলিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজ এক ধরনের অস্থিরতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। এই অস্থিরতার সরাসরি প্রভাব পড়ছে গণমাধ্যমের ওপর। সংবাদ সংগ্রহ, তথ্য যাচাই এবং সত্য তুলে ধরার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিকরা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাজনৈতিক সহিংসতার এই সময়টিতে গণমাধ্যমের ওপর ধারাবাহিক হামলা কেবল একটি পেশাজীবী গোষ্ঠীর নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভিত্তি, আইনের শাসন এবং সাধারণ মানুষের আস্থার জন্য এক গভীর সংকেত। বাংলাদেশে রাজনৈতিক আন্দোলন ও নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতার ইতিহাস নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ের পার্থক্য হলো এখন সাংবাদিকরা কেবল ঘটনাস্থলে ‘পাশে পড়ে আহত’ হচ্ছেন না, বরং অনেক ক্ষেত্রেই টার্গেট করে হামলার শিকার হচ্ছেন। ক্যামেরা, মাইক্রোফোন, প্রেস লেখা জ্যাকেট এসব এখন অনেক সময় সাংবাদিকদের সুরক্ষার পরিবর্তে তাদের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। রাজনৈতিক সমাবেশ, মিছিল, অবরোধ কিংবা সংঘর্ষ কাভার করতে গিয়ে সাংবাদিকদের মারধর, ক্যামেরা ভাঙচুর, মোবাইল ছিনতাই এবং হুমকির ঘটনা বেড়েছে। শুধু মাঠপর্যায়ের রিপোর্টার নয়, অফিসে বসে কাজ করা সম্পাদক ও সাংবাদিকরাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হুমকির মুখে পড়ছেন।
একজন অভিজ্ঞ ফটোসাংবাদিক বলেন, আগে ক্যামেরা ছিল সুরক্ষা। এখন ক্যামেরা দেখলেই আক্রমণ আসে কারণ ছবি মানেই প্রমাণ। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রবণতা হলো মব তৈরি করে সাংবাদিকদের ওপর হামলা। রাজনৈতিক উত্তেজনা, গুজব এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানির মাধ্যমে মুহূর্তেই সংঘবদ্ধ জনতা তৈরি হচ্ছে। এই মবের কাছে সাংবাদিক পরিচয়, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কিংবা আইনের কোনো মূল্য নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, মব সহিংসতা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ সংকেত। কারণ এখানে দায়বদ্ধতার জায়গা অস্পষ্ট হয়ে যায়। কেউ দায় নেয় না, সবাই মিলে অপরাধ করে। একজন অপরাধ বিশ্লেষক বলেন, মব তৈরি হলে প্রথমেই তারা আঘাত করে সেই জায়গায়, যেখানে সত্য বের হওয়ার আশঙ্কা থাকে আর সেটি হলো গণমাধ্যম। প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের ওপর হামলা প্রতীকী নয়, কাঠামোগত সংকেত।
আরও পড়ুন, মৌলভীবাজার-২ (কুলাউড়া) আসনে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন ৪ প্রার্থী
সম্প্রতি দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার এর ওপর হামলার ঘটনা গণমাধ্যম অঙ্গনে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। অনেকেই এটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখতে নারাজ। বরং তারা মনে করছেন, এটি একটি বড় প্রবণতার প্রতিফলন। যখন দেশের সবচেয়ে প্রতিষ্ঠিত, প্রভাবশালী ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সংবাদমাধ্যমও নিরাপদ নয়, তখন প্রান্তিক বা জেলা পর্যায়ের সাংবাদিকদের নিরাপত্তা কতটা নাজুক—তা সহজেই অনুমান করা যায়। একজন জ্যেষ্ঠ সম্পাদক বলেন, এটি শুধু দুটি গণমাধ্যমের ওপর হামলা নয়; এটি পুরো সাংবাদিক সমাজের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এই ঘটনার পর গণমাধ্যমগুলোর মধ্যে সরকারের ভূমিকা নিয়ে আস্থার ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অনেক সাংবাদিক মনে করছেন, সরকার দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নেওয়ায় একটি ভুল বার্তা যাচ্ছে।
বর্তমান সরকার বিভিন্ন সময় সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশনা, হামলার ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি এসব বক্তব্য নিয়মিতই শোনা যায়। কিন্তু বাস্তবতায় অনেক ক্ষেত্রেই এসব আশ্বাসের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। অনেক সাংবাদিক অভিযোগ করেন, হামলার পর মামলা করতে গেলে তাদের নানাভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়। কোথাও মামলার তদন্ত ধীরগতির, কোথাও আবার অভিযুক্তরা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, আশ্বাস নয়, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই নিরাপত্তার প্রকৃত বার্তা দেয়। বাংলাদেশের সংবিধান মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদেও সাংবাদিক সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। তবু প্রশ্ন উঠছে এই আইনি কাঠামো বাস্তবে কতটা কার্যকর? সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনাগুলোতে দ্রুত বিচার না হওয়ায় অপরাধীরা উৎসাহিত হয়। বিশেষ করে মব হামলার ঘটনায় দায়ীদের শনাক্ত ও শাস্তি নিশ্চিত না হলে এই সহিংসতা বন্ধ করা সম্ভব নয়। অনেকেই সাংবাদিকদের জন্য আলাদা সুরক্ষা আইন বা বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের দাবি তুলেছেন।
আরও পড়ুন, মাদক সেবনের অপরাধে ভ্রাম্যমান আদালতে যুবকের কারাদণ্ড
বর্তমান সংকটে গণমাধ্যমের নিজেদের ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, গণমাধ্যমগুলোর মধ্যে পারস্পরিক প্রতিযোগিতা, রাজনৈতিক বিভাজন ও মালিকানাগত স্বার্থ সাংবাদিকদের সম্মিলিত শক্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। যখন একটি গণমাধ্যম আক্রান্ত হয়, অন্যরা যদি শক্ত অবস্থান না নেয়, তবে হামলাকারীরা আরও সাহস পায়। এই প্রেক্ষাপটে সাংবাদিক সমাজের একটি বড় অংশ অন্যায়ের বিরুদ্ধে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানাচ্ছেন। সম্পাদক পরিষদ, সাংবাদিক ইউনিয়ন এবং গণমাধ্যম মালিকদের ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা করা কঠিন। গণমাধ্যমের ওপর হামলার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় সাধারণ মানুষের আস্থায়। মানুষ গণমাধ্যমের মাধ্যমে সত্য জানতে চায়। কিন্তু যখন দেখে সত্য প্রকাশের জন্য সাংবাদিকরা নিরাপদ নন, তখন তারা রাষ্ট্রের ওপর আস্থা হারাতে শুরু করে।
আরও পড়ুন, দুদকের অভিযানে শতাধিক অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন
একজন সমাজবিজ্ঞানী বলেন, গণমাধ্যম আক্রান্ত মানে নাগরিকের জানার অধিকার আক্রান্ত। এই আস্থাহীনতা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। রাজনৈতিক সহিংসতা ও গণমাধ্যমে হামলার পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের সহিংস রাজনৈতিক সংস্কৃতি। ভিন্নমতকে শত্রু হিসেবে দেখা, সমালোচনাকে রাষ্ট্রবিরোধিতা হিসেবে চিহ্নিত করা এই মানসিকতা থেকেই সাংবাদিকদের ওপর হামলার জন্ম। রাজনৈতিক দলগুলো যদি তাদের কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়, তবে আইন প্রয়োগ করেও এই সহিংসতা বন্ধ করা কঠিন। বর্তমান সরকারের জন্য এটি একটি কঠিন পরীক্ষা। একদিকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, অন্যদিকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করা সহজ নয়। গণমাধ্যমের ওপর হামলার ঘটনায় দ্রুত, নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নিলে সরকারের ওপর আস্থার সংকট আরও গভীর হবে। বিশেষজ্ঞ ও সাংবাদিকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন।
একটি স্বাধীন দেশে গণমাধ্যমের ওপর ধারাবাহিক হামলা চলতে থাকলে তা কেবল সাংবাদিকতার মৃত্যু নয় গণতন্ত্রেরও ধীর, নীরব অবসান। বর্তমান টানটান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গণমাধ্যমকে নিরাপদ রাখা মানে রাষ্ট্রকে নিরাপদ রাখা। আজ যদি সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না যায়, তবে আগামী দিনে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ সত্যের পথ বন্ধ হলে গুজব, সহিংসতা ও অরাজকতাই রাষ্ট্রের নিয়তি হয়ে ওঠে। এই বাস্তবতা উপলব্ধি করেই এখন সময় শুধু বক্তব্য নয়, কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার।

মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২২ ডিসেম্বর ২০২৫
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এক গভীর টানটান উত্তেজনার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। রাজনৈতিক কর্মসূচি, পাল্টাপাল্টি আন্দোলন, সহিংস সংঘর্ষ, গ্রেপ্তার, মামলা এবং পাল্টা অভিযোগ—সব মিলিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজ এক ধরনের অস্থিরতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। এই অস্থিরতার সরাসরি প্রভাব পড়ছে গণমাধ্যমের ওপর। সংবাদ সংগ্রহ, তথ্য যাচাই এবং সত্য তুলে ধরার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিকরা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাজনৈতিক সহিংসতার এই সময়টিতে গণমাধ্যমের ওপর ধারাবাহিক হামলা কেবল একটি পেশাজীবী গোষ্ঠীর নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভিত্তি, আইনের শাসন এবং সাধারণ মানুষের আস্থার জন্য এক গভীর সংকেত। বাংলাদেশে রাজনৈতিক আন্দোলন ও নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতার ইতিহাস নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ের পার্থক্য হলো এখন সাংবাদিকরা কেবল ঘটনাস্থলে ‘পাশে পড়ে আহত’ হচ্ছেন না, বরং অনেক ক্ষেত্রেই টার্গেট করে হামলার শিকার হচ্ছেন। ক্যামেরা, মাইক্রোফোন, প্রেস লেখা জ্যাকেট এসব এখন অনেক সময় সাংবাদিকদের সুরক্ষার পরিবর্তে তাদের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। রাজনৈতিক সমাবেশ, মিছিল, অবরোধ কিংবা সংঘর্ষ কাভার করতে গিয়ে সাংবাদিকদের মারধর, ক্যামেরা ভাঙচুর, মোবাইল ছিনতাই এবং হুমকির ঘটনা বেড়েছে। শুধু মাঠপর্যায়ের রিপোর্টার নয়, অফিসে বসে কাজ করা সম্পাদক ও সাংবাদিকরাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হুমকির মুখে পড়ছেন।
একজন অভিজ্ঞ ফটোসাংবাদিক বলেন, আগে ক্যামেরা ছিল সুরক্ষা। এখন ক্যামেরা দেখলেই আক্রমণ আসে কারণ ছবি মানেই প্রমাণ। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রবণতা হলো মব তৈরি করে সাংবাদিকদের ওপর হামলা। রাজনৈতিক উত্তেজনা, গুজব এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানির মাধ্যমে মুহূর্তেই সংঘবদ্ধ জনতা তৈরি হচ্ছে। এই মবের কাছে সাংবাদিক পরিচয়, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কিংবা আইনের কোনো মূল্য নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, মব সহিংসতা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ সংকেত। কারণ এখানে দায়বদ্ধতার জায়গা অস্পষ্ট হয়ে যায়। কেউ দায় নেয় না, সবাই মিলে অপরাধ করে। একজন অপরাধ বিশ্লেষক বলেন, মব তৈরি হলে প্রথমেই তারা আঘাত করে সেই জায়গায়, যেখানে সত্য বের হওয়ার আশঙ্কা থাকে আর সেটি হলো গণমাধ্যম। প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের ওপর হামলা প্রতীকী নয়, কাঠামোগত সংকেত।
আরও পড়ুন, মৌলভীবাজার-২ (কুলাউড়া) আসনে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন ৪ প্রার্থী
সম্প্রতি দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার এর ওপর হামলার ঘটনা গণমাধ্যম অঙ্গনে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। অনেকেই এটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখতে নারাজ। বরং তারা মনে করছেন, এটি একটি বড় প্রবণতার প্রতিফলন। যখন দেশের সবচেয়ে প্রতিষ্ঠিত, প্রভাবশালী ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সংবাদমাধ্যমও নিরাপদ নয়, তখন প্রান্তিক বা জেলা পর্যায়ের সাংবাদিকদের নিরাপত্তা কতটা নাজুক—তা সহজেই অনুমান করা যায়। একজন জ্যেষ্ঠ সম্পাদক বলেন, এটি শুধু দুটি গণমাধ্যমের ওপর হামলা নয়; এটি পুরো সাংবাদিক সমাজের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এই ঘটনার পর গণমাধ্যমগুলোর মধ্যে সরকারের ভূমিকা নিয়ে আস্থার ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অনেক সাংবাদিক মনে করছেন, সরকার দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নেওয়ায় একটি ভুল বার্তা যাচ্ছে।
বর্তমান সরকার বিভিন্ন সময় সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশনা, হামলার ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি এসব বক্তব্য নিয়মিতই শোনা যায়। কিন্তু বাস্তবতায় অনেক ক্ষেত্রেই এসব আশ্বাসের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। অনেক সাংবাদিক অভিযোগ করেন, হামলার পর মামলা করতে গেলে তাদের নানাভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়। কোথাও মামলার তদন্ত ধীরগতির, কোথাও আবার অভিযুক্তরা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, আশ্বাস নয়, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই নিরাপত্তার প্রকৃত বার্তা দেয়। বাংলাদেশের সংবিধান মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদেও সাংবাদিক সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। তবু প্রশ্ন উঠছে এই আইনি কাঠামো বাস্তবে কতটা কার্যকর? সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনাগুলোতে দ্রুত বিচার না হওয়ায় অপরাধীরা উৎসাহিত হয়। বিশেষ করে মব হামলার ঘটনায় দায়ীদের শনাক্ত ও শাস্তি নিশ্চিত না হলে এই সহিংসতা বন্ধ করা সম্ভব নয়। অনেকেই সাংবাদিকদের জন্য আলাদা সুরক্ষা আইন বা বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের দাবি তুলেছেন।
আরও পড়ুন, মাদক সেবনের অপরাধে ভ্রাম্যমান আদালতে যুবকের কারাদণ্ড
বর্তমান সংকটে গণমাধ্যমের নিজেদের ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, গণমাধ্যমগুলোর মধ্যে পারস্পরিক প্রতিযোগিতা, রাজনৈতিক বিভাজন ও মালিকানাগত স্বার্থ সাংবাদিকদের সম্মিলিত শক্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। যখন একটি গণমাধ্যম আক্রান্ত হয়, অন্যরা যদি শক্ত অবস্থান না নেয়, তবে হামলাকারীরা আরও সাহস পায়। এই প্রেক্ষাপটে সাংবাদিক সমাজের একটি বড় অংশ অন্যায়ের বিরুদ্ধে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানাচ্ছেন। সম্পাদক পরিষদ, সাংবাদিক ইউনিয়ন এবং গণমাধ্যম মালিকদের ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা করা কঠিন। গণমাধ্যমের ওপর হামলার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় সাধারণ মানুষের আস্থায়। মানুষ গণমাধ্যমের মাধ্যমে সত্য জানতে চায়। কিন্তু যখন দেখে সত্য প্রকাশের জন্য সাংবাদিকরা নিরাপদ নন, তখন তারা রাষ্ট্রের ওপর আস্থা হারাতে শুরু করে।
আরও পড়ুন, দুদকের অভিযানে শতাধিক অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন
একজন সমাজবিজ্ঞানী বলেন, গণমাধ্যম আক্রান্ত মানে নাগরিকের জানার অধিকার আক্রান্ত। এই আস্থাহীনতা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। রাজনৈতিক সহিংসতা ও গণমাধ্যমে হামলার পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের সহিংস রাজনৈতিক সংস্কৃতি। ভিন্নমতকে শত্রু হিসেবে দেখা, সমালোচনাকে রাষ্ট্রবিরোধিতা হিসেবে চিহ্নিত করা এই মানসিকতা থেকেই সাংবাদিকদের ওপর হামলার জন্ম। রাজনৈতিক দলগুলো যদি তাদের কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়, তবে আইন প্রয়োগ করেও এই সহিংসতা বন্ধ করা কঠিন। বর্তমান সরকারের জন্য এটি একটি কঠিন পরীক্ষা। একদিকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, অন্যদিকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করা সহজ নয়। গণমাধ্যমের ওপর হামলার ঘটনায় দ্রুত, নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নিলে সরকারের ওপর আস্থার সংকট আরও গভীর হবে। বিশেষজ্ঞ ও সাংবাদিকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন।
একটি স্বাধীন দেশে গণমাধ্যমের ওপর ধারাবাহিক হামলা চলতে থাকলে তা কেবল সাংবাদিকতার মৃত্যু নয় গণতন্ত্রেরও ধীর, নীরব অবসান। বর্তমান টানটান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গণমাধ্যমকে নিরাপদ রাখা মানে রাষ্ট্রকে নিরাপদ রাখা। আজ যদি সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না যায়, তবে আগামী দিনে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ সত্যের পথ বন্ধ হলে গুজব, সহিংসতা ও অরাজকতাই রাষ্ট্রের নিয়তি হয়ে ওঠে। এই বাস্তবতা উপলব্ধি করেই এখন সময় শুধু বক্তব্য নয়, কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার।

আপনার মতামত লিখুন