এনবিআরের কর্মকর্তা সহিদুল ইসলামের অবৈধ সম্পদের পাহাড়
বাংলাদেশের সরকারি চাকরিজীবীদের আয়-ব্যয়ের সীমাবদ্ধতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই জনপরিসরে আলোচনা রয়েছে। বিশেষ করে রাজস্ব, শুল্ক, কাস্টমস এবং ভ্যাট প্রশাসনের মতো সংবেদনশীল খাতগুলোতে কর্মরত কর্মকর্তাদের সম্পদ বৃদ্ধির ঘটনা প্রায়ই জনমনে প্রশ্নের জন্ম দেয়। সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তা সহিদুল ইসলামের সম্পদ নিয়ে এমনই এক বিস্তৃত অনুসন্ধানে উঠে এসেছে বিপুল পরিমাণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের তথ্য, যার বাজারমূল্য কয়েকশ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। অনুসন্ধানে পাওয়া নথি, জমির খতিয়ান, ফ্ল্যাট মালিকানার তথ্য, ব্যবসায়িক বিনিয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সহিদুল ইসলাম, তার স্ত্রী ফাহমিদা রাব্বি এবং কয়েকজন নিকট আত্মীয়ের নামে রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় বিপুল সম্পদের অস্তিত্ব রয়েছে।আরও পড়ুন: প্রভাবশালী পরিচয়ের আড়ালে বাহারের গুলশানে কথিত স্পা ব্যবসা?বসুন্ধরায় বহুতল ভবন: সম্পদের কেন্দ্রবিন্দুরাজধানীর অভিজাত আবাসিক এলাকা বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার জি ব্লকে অবস্থিত একটি ১০তলা ভবন অনুসন্ধানের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। ‘শেল কবিতা’ নামের এই ভবনটি সহিদুল ইসলাম ও তার স্ত্রীর মালিকানাধীন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। প্রতি তলায় দুটি করে প্রায় আড়াই হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাট নিয়ে গড়ে ওঠা ভবনটিতে মোট ২০টি ফ্ল্যাট রয়েছে। স্থানীয় রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী ও সম্পত্তি মূল্যায়ন সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিটি ফ্ল্যাটের সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় পাঁচ কোটি টাকা। সেই হিসাবে কেবল ভবনের ফ্ল্যাটগুলোর মূল্যই প্রায় ১০০ কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছায়। তবে জমির বর্তমান বাজারমূল্য, নির্মাণ ব্যয় এবং এলাকার বাণিজ্যিক সম্ভাবনা বিবেচনায় পুরো ভবনের মূল্য আরও বেশি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।রাজধানীজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ফ্ল্যাট সাম্রাজ্যঅনুসন্ধানে দেখা গেছে, বসুন্ধরার বাইরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সহিদুল ইসলাম, তার স্ত্রী এবং আত্মীয়স্বজনদের নামে আরও অন্তত ৩৩টি ফ্ল্যাট রয়েছে। বাংলামোটরের স্বজন টাওয়ারে সহিদুল ইসলামের নিজ নামে দুটি ফ্ল্যাটের তথ্য পাওয়া গেছে। একইভাবে ইস্কাটন গার্ডেন রোডের গার্ডেনিয়া টাওয়ারে তার স্ত্রীর নামে একটি ফ্ল্যাট রয়েছে, যার মূল্য প্রায় চার কোটি টাকা বলে ধারণা করা হচ্ছে। মিরপুরের রূপনগর আরামবাগ আবাসিক এলাকায় ফাহমিদা রাব্বির নামে থাকা একটি ছয়তলা ভবনে ১০টি ফ্ল্যাট রয়েছে। স্থানীয় সম্পত্তি বাজারের হিসাবে ভবনটির মূল্য প্রায় ৩০ কোটি টাকা।আরও পড়ুন: কক্সবাজারে এক পর্যটকের মরদেহ উদ্ধার নিখোঁজের ১৮ ঘন্টা পরমিরপুর ইস্টার্ন হাউজিংয়ে সম্পদের বিস্তারমিরপুর ইস্টার্ন হাউজিং দ্বিতীয় প্রকল্পে আরও একটি ছয়তলা ভবনের তথ্য পাওয়া গেছে, যা প্রথমে সহিদুল ইসলামের স্ত্রীর নামে ছিল বলে দাবি করা হয়েছে। পরে ভবনটি চার শ্যালকের নামে হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে মালিকানা কাগজপত্রে কাজী মুক্তাদীর ইবনু মিনান, কাজী মুতামিদ ইবনে মিনান, কাজী মুত্তাকী ইবনে মিনান এবং কাজী মুস্তাকীম ইবনে মিনানের নাম রয়েছে। উপলব্ধ তথ্য অনুযায়ী, সহিদুল ইসলাম, তার স্ত্রী এবং এই চার আত্মীয়ের নামে থাকা ৫৩টি ফ্ল্যাট ও দুটি দোকানের সম্মিলিত বাজারমূল্য অন্তত ১৬২ কোটি টাকা হতে পারে।আরও পড়ুন: নতুন পে-স্কেলে বেতনে বড় উল্লম্ফনের প্রস্তাব, চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষাজমি ও শিল্পকারখানার বিনিয়োগশুধু আবাসিক সম্পত্তিই নয়, শিল্পকারখানা ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের জমিতেও বড় ধরনের বিনিয়োগের তথ্য পাওয়া গেছে। মিরপুরের আগুন্দা এলাকায় প্রায় ১৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ জমির ওপর নির্মিত স্থাপনায় প্লাস্টিক কারখানা ভাড়া দেওয়া হয়েছে বলে জানা যায়। এর সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ২০ কোটি টাকা। অন্যদিকে গড়ানচটবাড়ি মৌজায় ৩৩ শতাংশ জমির মূল্য প্রায় ৩০ কোটি টাকা বলে স্থানীয় সম্পত্তি সংশ্লিষ্টরা ধারণা দিয়েছেন।নিউমার্কেট ও আজিজ সুপার মার্কেটে দোকানরাজধানীর দুই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্রেও সহিদুল ইসলামের সম্পদের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটের একটি দোকান এবং নিউমার্কেটের আরেকটি দোকানের মালিকানা তার নামে রয়েছে বলে নথিতে দেখা যায়। দুটি দোকানের সম্মিলিত বাজারমূল্য চার কোটি টাকারও বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে।আরও পড়ুন: মশক নিধন শিখতে ফ্লোরিডা নয়, ডোবার পাশেই যথেষ্ট’ : প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যেসাভারে বাংলোবাড়িসাভারের মধুমতি মডেল টাউনে ‘সেঁজুতি’ নামের একটি বাংলোবাড়ি স্থানীয়ভাবে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। ৩৫ কাঠা জমির ওপর নির্মিত এই বাড়িটি সহিদুল ইসলামের নামে রয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ আছে। এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়িটি অধিকাংশ সময় বন্ধ থাকে এবং সেখানে প্রবেশাধিকার সীমিত। বর্তমান বাজারদরে কেবল জমির মূল্যই প্রায় ১০ কোটি টাকার কাছাকাছি হতে পারে।মধুমতিতে আরও বিস্তৃত জমি মালিকানাঅনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, মধুমতি মডেল টাউন এলাকায় সহিদুল ইসলামের মালিকানায় একাধিক প্লট রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গ্যারেজ হিসেবে ব্যবহৃত জমি, পশু খামার হিসেবে ব্যবহৃত বড় প্লট এবং ভারী যন্ত্রপাতি সংরক্ষণের জন্য ভাড়া দেওয়া জমি। সব মিলিয়ে প্রায় ৩২০ কাঠা জমির বাজারমূল্য ৯০ কোটি টাকার কাছাকাছি বলে বিভিন্ন সূত্রের মূল্যায়নে উঠে এসেছে।আরও পড়ুন: চামড়া সংরক্ষণে চাহিদার মাত্র ১৬ শতাংশ লবণ দিয়েছে সরকারপূর্বাচলে জমির পর জমিপূর্বাচল ও আশপাশের এলাকায় সহিদুল ইসলাম ও তার স্ত্রীর নামে অন্তত ছয়টি প্লটের তথ্য পাওয়া গেছে। ডুমনি, পিতলগঞ্জ, দিঘলিয়া, বাড়িয়াছনি, মুশুরীগ্রাম এবং কামতা মৌজায় অবস্থিত এসব জমির সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ৬২ কোটির বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ছাড়া গাজীপুরের কালীগঞ্জেও তার নামে জমির মালিকানার নথি পাওয়া গেছে।শেয়ারবাজারে বিপুল বিনিয়োগস্থাবর সম্পদের পাশাপাশি অস্থাবর সম্পদের দিক থেকেও সহিদুল পরিবারের অবস্থান উল্লেখযোগ্য। তথ্য অনুযায়ী, তার স্ত্রী ফাহমিদা রাব্বির নামে একটি বিও অ্যাকাউন্টে প্রায় ৮০ কোটি টাকার শেয়ার বিনিয়োগ রয়েছে। এ ছাড়া ব্যাংক হিসাবেও উল্লেখযোগ্য অঙ্কের অর্থ জমা থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।সন্তানের ব্যবসায়িক কার্যক্রমসহিদুল ইসলামের ছেলে হাসিন ফারহানের নামেও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের তথ্য পাওয়া গেছে।বসুন্ধরার একটি বাণিজ্যিক ভবনে অফিস নিয়ে তিনি আর্কিটেকচার, ইন্টেরিয়র ডিজাইন ও মার্কেটিং খাতে একাধিক ব্যবসা পরিচালনা করছেন বলে জানা গেছে। অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে, এই ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করতে কয়েক কোটি টাকার প্রাথমিক বিনিয়োগ পরিবারের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছিল।আরও পড়ুন: তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুতে জিএম কাদেরের শোকসরকারি চাকরি বনাম সম্পদের হিসাবএকাধিক অবসরপ্রাপ্ত ও কর্মরত রাজস্ব কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একজন কাস্টমস বা এনবিআর কর্মকর্তার পুরো চাকরিজীবনের বৈধ আয়—বেতন, ভাতা, পেনশন, প্রভিডেন্ট ফান্ড এবং অন্যান্য সুবিধাসহ মোটামুটি কয়েক কোটি টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কথা। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ব্যয় বাদ দিলে সঞ্চয়ের পরিমাণ খুব বেশি হলে তিন কোটি টাকার কাছাকাছি হতে পারে। এই হিসাবের সঙ্গে অনুসন্ধানে উঠে আসা কয়েকশ কোটি টাকার সম্পদের অঙ্কের ব্যাপক পার্থক্য প্রশ্ন তৈরি করেছে।সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্নসহিদুল ইসলাম কর্মজীবনে এনবিআরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। এর মধ্যে শুল্ক ও আবগারি বিভাগের সদস্য, শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদ অন্তর্ভুক্ত। নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তার নামে থাকা অধিকাংশ সম্পদ ২০১০ সালের পর অর্জিত হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এই সম্পদগুলোর উৎস কী এবং সেগুলো আয়কর নথিতে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়েছে কি না সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।বক্তব্য পাওয়ার চেষ্টাঅভিযোগ ও সম্পদের উৎস সম্পর্কে বক্তব্য জানার জন্য সহিদুল ইসলাম ও তার স্ত্রীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে হয়েছে।সহিদুল ইসলাম ফোনকল কিংবা বার্তার জবাব দেননি। তার স্ত্রীও এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।আরও পড়ুন: ঈদের দীর্ঘ ছুটি শেষে খুলেছে অফিস-আদালত, উপস্থিতি কমজবাবদিহির দাবিসুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা বলছেন, সম্পদের উৎস সম্পর্কে সন্দেহ তৈরি হলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধান পরিচালনা করা। তাদের মতে, অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। আর অভিযোগ অসত্য হলে সেটিও স্পষ্টভাবে জনসমক্ষে তুলে ধরা উচিত। কারণ জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনআস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।তদন্তের নতুন পর্যায়?সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছে এবং ব্যাংক হিসাব পর্যালোচনা, সম্পদের উৎস যাচাই ও প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে প্রাথমিক প্রস্তুতি চলছে। এখন নজর থাকবে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো কী ধরনের তদন্ত চালায়, সম্পদের উৎস সম্পর্কে কী ব্যাখ্যা পাওয়া যায় এবং শেষ পর্যন্ত আইনগত প্রক্রিয়া কোন দিকে এগোয়। কারণ কয়েকশ কোটি টাকার সম্পদের এই প্রশ্ন কেবল একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সম্পদের হিসাব নয়; এটি রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি, সুশাসন এবং দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থার কার্যকারিতারও একটি বড় পরীক্ষা।আরও পড়ুন: আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ৬ শিশুর মৃত্যু, ৩ জুনের মধ্যে তদন্ত রিপোর্টদুর্নীতি প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একজন ১৩তম ব্যাচের কর্মকর্তার এই পরিমাণ সম্পত্তি অর্জনের ঘটনা প্রমাণ করে যে কাস্টমস বিভাগের ভেতরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার কতটা অভাব রয়েছে। এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার না হলে এবং অবৈধ সম্পত্তি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বাজেয়াপ্ত করা না হলে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের মধ্যে দুর্নীতির এই মরণব্যাধি থামানো অসম্ভব হয়ে পড়বে ।