ঢাকার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় বড় দুর্বলতা হয়ে উঠেছে চিকিৎসার উচ্চ ব্যয় এবং কার্যকর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অভাব। সাধারণ রোগের চিকিৎসার জন্যও অনেক মানুষকে বড় হাসপাতাল কিংবা বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্রে যেতে হচ্ছে। এতে একদিকে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে চিকিৎসার সময় ও ব্যয়ও বাড়ছে। ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) ২০২৬ সালের ‘গ্লোবাল লিভেবিলিটি ইনডেক্স’ অনুযায়ী, বিশ্বের ১৭৩টি শহরের মধ্যে সামগ্রিক বাসযোগ্যতায় ঢাকার অবস্থান ১৭১তম। স্বাস্থ্যসেবা সূচকে ১০০-এর মধ্যে ঢাকার স্কোর মাত্র ৪২। বিপরীতে বিশ্ব গড় ৭৮ এবং এশিয়ার গড় ৭৬। বাসযোগ্যতার পাঁচটি প্রধান সূচকের একটি স্বাস্থ্যসেবা। এ খাতের স্কোর নির্ধারণে সরকারি ও বেসরকারি চিকিৎসাসেবার প্রাপ্যতা ও মান, সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা এবং ওষুধের প্রাপ্যতার মতো বিষয় বিবেচনা করা হয়েছে। সূচক অনুযায়ী, স্বাস্থ্যসেবায় ঢাকার অবস্থান বিশ্ব ও এশিয়ার গড়ের চেয়ে অনেক পিছিয়ে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার ওয়ার্ড ও মহল্লাভিত্তিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যকরভাবে চালু করা জরুরি। পাশাপাশি প্রয়োজন শক্তিশালী রেফারেল ব্যবস্থা, যাতে সাধারণ রোগের চিকিৎসার জন্য মানুষকে বড় হাসপাতালে ছুটতে না হয়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. মোশতাক হোসেনের মতে, ঢাকায় সরকারি পর্যায়ে কার্যকর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি রয়েছে। সামান্য অসুস্থতার জন্যও মানুষকে মেডিকেল কলেজ বা বেসরকারি হাসপাতালে যেতে হয়। এতে বড় হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়ে এবং জরুরি চিকিৎসাসেবাও ব্যাহত হতে পারে। চিকিৎসার ব্যয়কে বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের স্বাস্থ্য ব্যয়ের বড় অংশ রোগীদের নিজেদের বহন করতে হয়। বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেবার ওপর নির্ভরতা বাড়ায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ বেশি চাপে পড়ছেন। জনস্বাস্থ্যবিদ ড. আবদুস সবুর বলেন, ঢাকায় বিশ্বমানের কিছু বেসরকারি হাসপাতাল থাকলেও সেগুলোর চিকিৎসা ব্যয় সাধারণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের নাগালের বাইরে।
আরও পড়ুন, সার আমদানিনির্ভরতা কমাতে তিন কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ
চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে অনেক পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে। জীবন রক্ষাকারী ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা সরঞ্জামের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের মতে, হাসপাতালের সংখ্যা বা শয্যা বাড়ালেই স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত হয় না। চিকিৎসার মান, রোগীর নিরাপত্তা, ওষুধের গুণগত মান এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অনুমোদনহীন ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ফার্মেসির বিরুদ্ধে কার্যকর তদারকিও জরুরি। সাবেক ডিজিএইচএস পরামর্শক ডা. আইনুর নিশাদ রাজীব বলেন, ঢাকার স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে নতুন হাসপাতাল নির্মাণের পাশাপাশি শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা গড়ে তোলা প্রয়োজন। সরকারি-বেসরকারি চিকিৎসার মান ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার পরিচালক ডা. মো. নুরুল ইসলাম জানান, গত ছয় মাসে পাঁচ হাজারের বেশি বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করা হয়েছে। অনিয়মের কারণে প্রায় ২৫০টি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়েছে অথবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের তদারকি অব্যাহত রয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, নগরে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জেনারেল প্র্যাকটিসিং (জিপি) ক্লিনিক ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। চিকিৎসকদের কর্মস্থলে উপস্থিতি, সেবার মান ও সরকারি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, ঢাকার বাসযোগ্যতা বাড়াতে পরিবহন, আবাসন ও পরিবেশের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবায়ও মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন। সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করা না গেলে রাজধানীর স্বাস্থ্যসেবা সূচকের উন্নতি কঠিন হবে।

শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ নভেম্বর ২০২৬
ঢাকার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় বড় দুর্বলতা হয়ে উঠেছে চিকিৎসার উচ্চ ব্যয় এবং কার্যকর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অভাব। সাধারণ রোগের চিকিৎসার জন্যও অনেক মানুষকে বড় হাসপাতাল কিংবা বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্রে যেতে হচ্ছে। এতে একদিকে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে চিকিৎসার সময় ও ব্যয়ও বাড়ছে। ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) ২০২৬ সালের ‘গ্লোবাল লিভেবিলিটি ইনডেক্স’ অনুযায়ী, বিশ্বের ১৭৩টি শহরের মধ্যে সামগ্রিক বাসযোগ্যতায় ঢাকার অবস্থান ১৭১তম। স্বাস্থ্যসেবা সূচকে ১০০-এর মধ্যে ঢাকার স্কোর মাত্র ৪২। বিপরীতে বিশ্ব গড় ৭৮ এবং এশিয়ার গড় ৭৬। বাসযোগ্যতার পাঁচটি প্রধান সূচকের একটি স্বাস্থ্যসেবা। এ খাতের স্কোর নির্ধারণে সরকারি ও বেসরকারি চিকিৎসাসেবার প্রাপ্যতা ও মান, সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা এবং ওষুধের প্রাপ্যতার মতো বিষয় বিবেচনা করা হয়েছে। সূচক অনুযায়ী, স্বাস্থ্যসেবায় ঢাকার অবস্থান বিশ্ব ও এশিয়ার গড়ের চেয়ে অনেক পিছিয়ে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার ওয়ার্ড ও মহল্লাভিত্তিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যকরভাবে চালু করা জরুরি। পাশাপাশি প্রয়োজন শক্তিশালী রেফারেল ব্যবস্থা, যাতে সাধারণ রোগের চিকিৎসার জন্য মানুষকে বড় হাসপাতালে ছুটতে না হয়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. মোশতাক হোসেনের মতে, ঢাকায় সরকারি পর্যায়ে কার্যকর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি রয়েছে। সামান্য অসুস্থতার জন্যও মানুষকে মেডিকেল কলেজ বা বেসরকারি হাসপাতালে যেতে হয়। এতে বড় হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়ে এবং জরুরি চিকিৎসাসেবাও ব্যাহত হতে পারে। চিকিৎসার ব্যয়কে বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের স্বাস্থ্য ব্যয়ের বড় অংশ রোগীদের নিজেদের বহন করতে হয়। বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেবার ওপর নির্ভরতা বাড়ায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ বেশি চাপে পড়ছেন। জনস্বাস্থ্যবিদ ড. আবদুস সবুর বলেন, ঢাকায় বিশ্বমানের কিছু বেসরকারি হাসপাতাল থাকলেও সেগুলোর চিকিৎসা ব্যয় সাধারণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের নাগালের বাইরে।
আরও পড়ুন, সার আমদানিনির্ভরতা কমাতে তিন কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ
চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে অনেক পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে। জীবন রক্ষাকারী ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা সরঞ্জামের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের মতে, হাসপাতালের সংখ্যা বা শয্যা বাড়ালেই স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত হয় না। চিকিৎসার মান, রোগীর নিরাপত্তা, ওষুধের গুণগত মান এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অনুমোদনহীন ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ফার্মেসির বিরুদ্ধে কার্যকর তদারকিও জরুরি। সাবেক ডিজিএইচএস পরামর্শক ডা. আইনুর নিশাদ রাজীব বলেন, ঢাকার স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে নতুন হাসপাতাল নির্মাণের পাশাপাশি শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা গড়ে তোলা প্রয়োজন। সরকারি-বেসরকারি চিকিৎসার মান ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার পরিচালক ডা. মো. নুরুল ইসলাম জানান, গত ছয় মাসে পাঁচ হাজারের বেশি বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করা হয়েছে। অনিয়মের কারণে প্রায় ২৫০টি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়েছে অথবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের তদারকি অব্যাহত রয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, নগরে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জেনারেল প্র্যাকটিসিং (জিপি) ক্লিনিক ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। চিকিৎসকদের কর্মস্থলে উপস্থিতি, সেবার মান ও সরকারি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, ঢাকার বাসযোগ্যতা বাড়াতে পরিবহন, আবাসন ও পরিবেশের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবায়ও মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন। সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করা না গেলে রাজধানীর স্বাস্থ্যসেবা সূচকের উন্নতি কঠিন হবে।
