শারদীয় দুর্গোৎসবকে সামনে রেখে সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার বড়দল ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী বুড়িয়া সার্বজনীন দুর্গামন্দিরে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। মণ্ডপে মণ্ডপে যখন প্রতিমা সাজানো ও প্যান্ডেল নির্মাণে ব্যস্ত সময় পার করছেন শিল্পী ও ডেকোরেটররা, তখন বুড়িয়ায় এবারের আয়োজন পেয়েছে ভিন্ন মাত্রা। প্রচলিত সাজসজ্জার বাইরে গিয়ে দুর্গা প্রতিমায় ব্যবহার করা হয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার মুক্তা। ফলে মুক্তার ঝিকিমিকিতে নতুন রূপে সেজেছে দেবী দুর্গা। প্রায় ৭০ বছরের পুরোনো এই পূজামণ্ডপে এবার ১৩টি প্রতিমার সাজসজ্জায় ব্যবহার করা হয়েছে মুক্তা। এ কাজে ব্যয় হয়েছে প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা। প্রতিমার শরীরে মাটির প্রলেপ ও রঙের কাজ শেষ করে সূক্ষ্ম কারুকার্যের মাধ্যমে একে একে বসানো হয়েছে হাজার হাজার মুক্তা। আলো পড়তেই প্রতিমার শরীরজুড়ে ফুটে উঠছে ঝলমলে আভা। বুধবার (০৭ অক্টোবর '২৬) সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ১৩টি প্রতিমায় মুক্তা বসানোর কাজ শেষ হয়েছে। চলছে রং ও সাজসজ্জার শেষ মুহূর্তের কাজ। পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হতে এখনও কয়েক দিন বাকি থাকলেও ব্যতিক্রমী এই প্রতিমা দেখতে ইতোমধ্যে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ মণ্ডপে আসছেন। পাশাপাশি প্যান্ডেল নির্মাণ ও আলোকসজ্জার কাজেও ব্যস্ত সময় পার করছেন শ্রমিকরা। আয়োজকদের অন্যতম বুড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক উত্তম মণ্ডল সংবাদ দিগন্তকে বলেন, এবারের আয়োজনের মূল আকর্ষণ মুক্তার কারুকাজ। প্রচলিত সাজসজ্জার বাইরে গিয়ে ভিন্ন নকশায় ১৩টি প্রতিমা তৈরি করা হয়েছে।
আরও পড়ুন, ছিনতাইকারী ধরতে গিয়ে ছুরিকাঘাতে আহত এসআই, আটক ২
প্রতিমার শরীর, অলংকারসহ বিভিন্ন অংশে মুক্তা ব্যবহার করা হয়েছে। পূজা শুরুর আগেই মানুষ প্রতিমা তৈরির কাজ দেখতে আসছেন। এবারের পূজা সর্বধর্মের মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হবে বলে আশা করছেন তারা। প্রতিমাশিল্পী প্রকাশ মণ্ডল সংবাদ দিগন্তকে জানান, গত ৫ জুলাই প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু করেন তিনি। প্রায় আড়াই মাস ধরে চারজন শিল্পী ধাপে ধাপে কাঠামো তৈরি, মাটির কাজ, অবয়ব, রং, সাজসজ্জা ও মুক্তার কারুকার্য সম্পন্ন করেছেন। ১৩টি প্রতিমায় প্রায় ৩৫ হাজার মুক্তা ব্যবহার করা হয়েছে। চারজন শিল্পীর প্রায় ৫২ দিন সময় লেগেছে শুধু প্রতিমা নির্মাণ ও সাজসজ্জার কাজে। তিনি সংবাদ দিগন্তকে আরো বলেন, ‘প্রতিবছরই দর্শনার্থীদের নতুন কিছু দেওয়ার চেষ্টা করি। এবার দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমায় দেখা কয়েকটি মূর্তির নকশার সঙ্গে নিজের পরিকল্পনা মিলিয়ে প্রতিমার নকশা করেছি। মুক্তার কাজ অত্যন্ত সূক্ষ্ম হওয়ায় সময় ও শ্রম দুটোই বেশি লেগেছে। বর্তমানে প্রায় ৯৭ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। আশা করছি, এক সপ্তাহের মধ্যেই বাকি কাজ শেষ হবে।’ স্থানীয় প্রবীণ কৃষ্ণপদ মণ্ডল সংবাদ দিগন্তকে জানান, প্রায় ৭০ বছর আগে ওয়াল্ড ভিশনের স্কুল প্রাঙ্গণে স্থানীয় নারায়ণ সরকার, কমলেশ সরকারসহ কয়েকজনের উদ্যোগে এখানে দুর্গাপূজা শুরু হয়। পরে স্থান সংকট দেখা দিলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতায় বর্তমান স্থানে মন্দির ও পূজার আয়োজন গড়ে ওঠে। কপোতাক্ষ নদের তীরবর্তী বুড়িয়া মন্দিরের এবারের মুক্তার প্রতিমা দর্শনার্থীদের বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। বুড়িয়া সার্বজনীন দুর্গামন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি অর্ধেন্দু মণ্ডল সংবাদ দিগন্তকে বলেন, দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ধরে রেখে প্রতিবছরই নতুন কিছু করার চেষ্টা করা হয়। এবার প্রতিমায় মুক্তার কারুকার্য যুক্ত করে ভিন্নতা আনা হয়েছে। দর্শনার্থীরা যেন মণ্ডপে এসে নতুনত্ব অনুভব করেন, সেটিই তাদের মূল লক্ষ্য। তিনি আরো সংবাদ দিগন্তকে জানান,
আরও পড়ুন, রাতের আগুনে পুড়ল ঐতিহ্যবাহী ঝলমল সিনেমা হল
দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়তে পারে বিবেচনায় নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। মণ্ডপে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবকেরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবেন।
মন্দির পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক প্রবীর মণ্ডল সংবাদ দিগন্তকে বলেন, প্রতিমা তৈরির কাজ দেখতে পূজার আগেই মানুষের ভিড় বাড়ছে। এবারের আয়োজন নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। পূজার পাঁচ দিন যাতে সুশৃঙ্খল ও উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়, সে জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
আয়োজকদের তথ্যমতে, ১৭ অক্টোবর শনিবার ষষ্ঠীর বোধনের মধ্য দিয়ে এবারের দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। ২১ অক্টোবর বুধবার বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে উৎসব শেষ হবে। অষ্টমীতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং নবমীতে ধর্মীয় যাত্রাপালার আয়োজন থাকবে।
তবে বড়দল ইউনিয়নে দশমীর দিন থাকছে আরও একটি বিশেষ আয়োজন। বিভিন্ন মণ্ডপের প্রতিমা একত্র করে ঐতিহ্যবাহী বুড়িয়া আড়ং মেলার মাধ্যমে সম্মিলিত বিসর্জন দেওয়া হবে। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, বড়দল বাজার, মধ্যম বড়দল, দক্ষিণ বড়দল, বিষ্ণুপুর, ফাকরাবাদ পূর্বপাড়া, কইসিটি ও বুড়িয়াসহ আশপাশের প্রায় ১০টি মণ্ডপের প্রতিমা এতে অংশ নেবে।
স্থানীয় বাসিন্দা লিটন মণ্ডল সংবাদ দিগন্তকে বলেন, বুড়িয়া আড়ংকে ঘিরে প্রতি বছরই মানুষের মধ্যে আলাদা উৎসাহ থাকে। এবার মুক্তার কারুকাজের প্রতিমা সেই আকর্ষণ আরও বাড়িয়েছে।
বিষয় : ভিন্নতার বার্তা ঐতিহ্যবাহী বুড়ি

বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৭ অক্টোবর ২০২৬
শারদীয় দুর্গোৎসবকে সামনে রেখে সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার বড়দল ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী বুড়িয়া সার্বজনীন দুর্গামন্দিরে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। মণ্ডপে মণ্ডপে যখন প্রতিমা সাজানো ও প্যান্ডেল নির্মাণে ব্যস্ত সময় পার করছেন শিল্পী ও ডেকোরেটররা, তখন বুড়িয়ায় এবারের আয়োজন পেয়েছে ভিন্ন মাত্রা। প্রচলিত সাজসজ্জার বাইরে গিয়ে দুর্গা প্রতিমায় ব্যবহার করা হয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার মুক্তা। ফলে মুক্তার ঝিকিমিকিতে নতুন রূপে সেজেছে দেবী দুর্গা। প্রায় ৭০ বছরের পুরোনো এই পূজামণ্ডপে এবার ১৩টি প্রতিমার সাজসজ্জায় ব্যবহার করা হয়েছে মুক্তা। এ কাজে ব্যয় হয়েছে প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা। প্রতিমার শরীরে মাটির প্রলেপ ও রঙের কাজ শেষ করে সূক্ষ্ম কারুকার্যের মাধ্যমে একে একে বসানো হয়েছে হাজার হাজার মুক্তা। আলো পড়তেই প্রতিমার শরীরজুড়ে ফুটে উঠছে ঝলমলে আভা। বুধবার (০৭ অক্টোবর '২৬) সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ১৩টি প্রতিমায় মুক্তা বসানোর কাজ শেষ হয়েছে। চলছে রং ও সাজসজ্জার শেষ মুহূর্তের কাজ। পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হতে এখনও কয়েক দিন বাকি থাকলেও ব্যতিক্রমী এই প্রতিমা দেখতে ইতোমধ্যে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ মণ্ডপে আসছেন। পাশাপাশি প্যান্ডেল নির্মাণ ও আলোকসজ্জার কাজেও ব্যস্ত সময় পার করছেন শ্রমিকরা। আয়োজকদের অন্যতম বুড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক উত্তম মণ্ডল সংবাদ দিগন্তকে বলেন, এবারের আয়োজনের মূল আকর্ষণ মুক্তার কারুকাজ। প্রচলিত সাজসজ্জার বাইরে গিয়ে ভিন্ন নকশায় ১৩টি প্রতিমা তৈরি করা হয়েছে।
আরও পড়ুন, ছিনতাইকারী ধরতে গিয়ে ছুরিকাঘাতে আহত এসআই, আটক ২
প্রতিমার শরীর, অলংকারসহ বিভিন্ন অংশে মুক্তা ব্যবহার করা হয়েছে। পূজা শুরুর আগেই মানুষ প্রতিমা তৈরির কাজ দেখতে আসছেন। এবারের পূজা সর্বধর্মের মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হবে বলে আশা করছেন তারা। প্রতিমাশিল্পী প্রকাশ মণ্ডল সংবাদ দিগন্তকে জানান, গত ৫ জুলাই প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু করেন তিনি। প্রায় আড়াই মাস ধরে চারজন শিল্পী ধাপে ধাপে কাঠামো তৈরি, মাটির কাজ, অবয়ব, রং, সাজসজ্জা ও মুক্তার কারুকার্য সম্পন্ন করেছেন। ১৩টি প্রতিমায় প্রায় ৩৫ হাজার মুক্তা ব্যবহার করা হয়েছে। চারজন শিল্পীর প্রায় ৫২ দিন সময় লেগেছে শুধু প্রতিমা নির্মাণ ও সাজসজ্জার কাজে। তিনি সংবাদ দিগন্তকে আরো বলেন, ‘প্রতিবছরই দর্শনার্থীদের নতুন কিছু দেওয়ার চেষ্টা করি। এবার দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমায় দেখা কয়েকটি মূর্তির নকশার সঙ্গে নিজের পরিকল্পনা মিলিয়ে প্রতিমার নকশা করেছি। মুক্তার কাজ অত্যন্ত সূক্ষ্ম হওয়ায় সময় ও শ্রম দুটোই বেশি লেগেছে। বর্তমানে প্রায় ৯৭ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। আশা করছি, এক সপ্তাহের মধ্যেই বাকি কাজ শেষ হবে।’ স্থানীয় প্রবীণ কৃষ্ণপদ মণ্ডল সংবাদ দিগন্তকে জানান, প্রায় ৭০ বছর আগে ওয়াল্ড ভিশনের স্কুল প্রাঙ্গণে স্থানীয় নারায়ণ সরকার, কমলেশ সরকারসহ কয়েকজনের উদ্যোগে এখানে দুর্গাপূজা শুরু হয়। পরে স্থান সংকট দেখা দিলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতায় বর্তমান স্থানে মন্দির ও পূজার আয়োজন গড়ে ওঠে। কপোতাক্ষ নদের তীরবর্তী বুড়িয়া মন্দিরের এবারের মুক্তার প্রতিমা দর্শনার্থীদের বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। বুড়িয়া সার্বজনীন দুর্গামন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি অর্ধেন্দু মণ্ডল সংবাদ দিগন্তকে বলেন, দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ধরে রেখে প্রতিবছরই নতুন কিছু করার চেষ্টা করা হয়। এবার প্রতিমায় মুক্তার কারুকার্য যুক্ত করে ভিন্নতা আনা হয়েছে। দর্শনার্থীরা যেন মণ্ডপে এসে নতুনত্ব অনুভব করেন, সেটিই তাদের মূল লক্ষ্য। তিনি আরো সংবাদ দিগন্তকে জানান,
আরও পড়ুন, রাতের আগুনে পুড়ল ঐতিহ্যবাহী ঝলমল সিনেমা হল
দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়তে পারে বিবেচনায় নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। মণ্ডপে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবকেরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবেন।
মন্দির পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক প্রবীর মণ্ডল সংবাদ দিগন্তকে বলেন, প্রতিমা তৈরির কাজ দেখতে পূজার আগেই মানুষের ভিড় বাড়ছে। এবারের আয়োজন নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। পূজার পাঁচ দিন যাতে সুশৃঙ্খল ও উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়, সে জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
আয়োজকদের তথ্যমতে, ১৭ অক্টোবর শনিবার ষষ্ঠীর বোধনের মধ্য দিয়ে এবারের দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। ২১ অক্টোবর বুধবার বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে উৎসব শেষ হবে। অষ্টমীতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং নবমীতে ধর্মীয় যাত্রাপালার আয়োজন থাকবে।
তবে বড়দল ইউনিয়নে দশমীর দিন থাকছে আরও একটি বিশেষ আয়োজন। বিভিন্ন মণ্ডপের প্রতিমা একত্র করে ঐতিহ্যবাহী বুড়িয়া আড়ং মেলার মাধ্যমে সম্মিলিত বিসর্জন দেওয়া হবে। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, বড়দল বাজার, মধ্যম বড়দল, দক্ষিণ বড়দল, বিষ্ণুপুর, ফাকরাবাদ পূর্বপাড়া, কইসিটি ও বুড়িয়াসহ আশপাশের প্রায় ১০টি মণ্ডপের প্রতিমা এতে অংশ নেবে।
স্থানীয় বাসিন্দা লিটন মণ্ডল সংবাদ দিগন্তকে বলেন, বুড়িয়া আড়ংকে ঘিরে প্রতি বছরই মানুষের মধ্যে আলাদা উৎসাহ থাকে। এবার মুক্তার কারুকাজের প্রতিমা সেই আকর্ষণ আরও বাড়িয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন