পাহাড়, নদী আর সবুজে ঘেরা মনোরম ও জনবহুল এক জনপদ বান্দরবানের লামা উপজেলা। এই দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে সরকারের নানামুখী উন্নয়ন ও নাগরিক সেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে দিনরাত নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন শত শত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী। কিন্তু তীব্র আবাসন সংকটের কারণে একদিকে যেমন কর্মীরা চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছেন, অন্যদিকে তেমনি ব্যাহত হচ্ছে উপজেলার জরুরি নাগরিক সেবা। বর্তমানে লামা উপজেলায় কর্মরত ১ হাজার ৩২৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিপরীতে থাকার জন্য কোনো সরকারি ডরমিটরি বা আবাসন কোয়ার্টার নেই।সরেজমিনে দেখা গেছে, স্থানীয় বাজারের বিভিন্ন এলাকার সাধারণ মেসে বা জরাজীর্ণ বাসা-বাড়িতে কয়েকজন কর্মচারী একসঙ্গে গাদাগাদি করে বসবাস করছেন। আবার কেউ কেউ বাধ্য হয়ে থাকছেন অতি সাধারণ পাহাড়ি ঘরবাড়িতে, যেখানে ন্যূনতম নাগরিক সুযোগ-সুবিধাও অনুপস্থিত। দূর-দূরান্ত থেকে বদলি হয়ে আসা চাকরিজীবীদের কর্মস্থলে যোগ দিয়েই পড়তে হচ্ছে এই চরম সংকটে। সুনির্দিষ্ট আবাসন ব্যবস্থা না থাকায় স্থানীয় এলাকায় চড়া মূল্যে বাসা ভাড়া নিতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। অনেকেই বাধ্য হয়ে পরিবার-পরিজন দূরে রেখে একাকী মেস জীবন কাটাচ্ছেন।
আরও পড়ুন, সারদা পুলিশ একাডেমিতে প্রশিক্ষণ চলাকালে এসআই’র মৃত্যু
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ১৯২০ সালের ৭ সেপ্টেম্বর লামা থানা গঠিত হয়। ১৯৭০ সালের ৯ অক্টোবর আলীকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি, বাইশারী ও গজালিয়া থানাকে নিয়ে এটি ‘লামা মহকুমা’য় উন্নীত হয়। ১৯৮৩ সালে দেশের সব মহকুমা বিলুপ্ত করে জেলা ঘোষণার সময় তৎকালীন সরকারি প্রজ্ঞাপনে লামাকে জেলা ঘোষণা করা হলেও তা মাত্র ৩ দিন স্থায়ী হয়েছিল। তবে মহকুমা ও জেলা ঘোষণার ইতিহাসের কারণে একটি জেলা শহরে সরকারের প্রশাসনিক কাজের যতগুলো দপ্তর থাকে, তার প্রায় সবই রয়ে গেছে এই উপজেলায়। বন বিভাগ ও পোস্ট অফিস বাদে বর্তমানে লামা উপজেলায় সরকারের ৩৩টি দপ্তর রয়েছে। এসব দপ্তরে বর্তমানে ১৪২ জন কর্মকর্তা এবং ১ হাজার ১৮৩ জন কর্মচারীসহ সর্বমোট ১ হাজার ৩২৫ জন কর্মী কর্মরআবাসন সংকটের নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি পড়ছে দাপ্তরিক কাজে। দূরবর্তী স্থান থেকে যাতায়াত করতে গিয়ে যেমন সময় অপচয় হচ্ছে, তেমনি অতিরিক্ত মানসিক ও শারীরিক ক্লান্তির কারণে ব্যাহত হচ্ছে নাগরিক সেবা। বিশেষ করে জরুরি সেবার সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কর্মস্থলে সার্বক্ষণিক অবস্থান করতে হিমশিম খাচ্ছেন।উপপ্রশাসনিক কর্মকর্তা উচিংমে চাক বলেন, নারী হিসেবে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আবাসন সুবিধা না থাকাটা সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা সংকট। পরিবার নিয়ে থাকার মতো ভালো বাসা এখানে পাওয়াই যায় না, আর পেলেও ভাড়া আকাশচুম্বী।
আরও পড়ুন , সাভারে তালাবদ্ধ ফ্ল্যাট থেকে নারীর মরদেহ উদ্ধার, স্বামী ছাত্রদল নেতা পলাতক
সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা বামং সিং মার্মা বলেন, অফিস শেষ করে একটু শান্তিতে যে বিশ্রাম নেব, সেই পরিবেশটুকুও নেই। ভাঙাচোরা মেসবাড়িতে থাকতে হয়। ডরমিটরি থাকলে আমাদের কাজের মনোযোগ আরও বাড়ত।উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা কাঞ্চন দে বলেন, পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে যারা নিজেদের শ্রম ও মেধা উৎসর্গ করছেন, তাদের ন্যূনতম মৌলিক চাহিদা পূরণ করা সময়ের দাবি। লামায় সরকারি কর্মচারীদের জন্য একটি আধুনিক ডরমিটরি বা কোয়ার্টার নির্মাণ এখন আর কেবল বিলাসিতা নয়, বরং সেবার মান বজায় রাখার জন্য অত্যন্ত জরুরি।লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মঈন উদ্দিন জানান, বান্দরবানের ৭টি উপজেলার মধ্যে ৬টিতেই অফিসার্স কোয়ার্টার ও ডরমিটরি থাকলেও, কেবলমাত্র লামা উপজেলাতেই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোনো আবাসন ব্যবস্থা নেই।ইউএনও আরও জানান, লামা উপজেলায় কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য আবাসিক গেজেটেড কোয়ার্টার ও ডরমিটরি নির্মাণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগের নিকট ইতোমধ্যে অনুরোধ জানিয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে প্রস্তাব আকারে সম্ভাব্য স্থানগুলোর নকশা তৈরি ও পরিচিহ্নিত করে দেওয়া হয়েছে।
বিষয় : ভোগান্তি নাগরিক সেবা কোয়ার্টার

বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৯ জুন ২০২৬
পাহাড়, নদী আর সবুজে ঘেরা মনোরম ও জনবহুল এক জনপদ বান্দরবানের লামা উপজেলা। এই দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে সরকারের নানামুখী উন্নয়ন ও নাগরিক সেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে দিনরাত নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন শত শত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী। কিন্তু তীব্র আবাসন সংকটের কারণে একদিকে যেমন কর্মীরা চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছেন, অন্যদিকে তেমনি ব্যাহত হচ্ছে উপজেলার জরুরি নাগরিক সেবা। বর্তমানে লামা উপজেলায় কর্মরত ১ হাজার ৩২৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিপরীতে থাকার জন্য কোনো সরকারি ডরমিটরি বা আবাসন কোয়ার্টার নেই।সরেজমিনে দেখা গেছে, স্থানীয় বাজারের বিভিন্ন এলাকার সাধারণ মেসে বা জরাজীর্ণ বাসা-বাড়িতে কয়েকজন কর্মচারী একসঙ্গে গাদাগাদি করে বসবাস করছেন। আবার কেউ কেউ বাধ্য হয়ে থাকছেন অতি সাধারণ পাহাড়ি ঘরবাড়িতে, যেখানে ন্যূনতম নাগরিক সুযোগ-সুবিধাও অনুপস্থিত। দূর-দূরান্ত থেকে বদলি হয়ে আসা চাকরিজীবীদের কর্মস্থলে যোগ দিয়েই পড়তে হচ্ছে এই চরম সংকটে। সুনির্দিষ্ট আবাসন ব্যবস্থা না থাকায় স্থানীয় এলাকায় চড়া মূল্যে বাসা ভাড়া নিতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। অনেকেই বাধ্য হয়ে পরিবার-পরিজন দূরে রেখে একাকী মেস জীবন কাটাচ্ছেন।
আরও পড়ুন, সারদা পুলিশ একাডেমিতে প্রশিক্ষণ চলাকালে এসআই’র মৃত্যু
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ১৯২০ সালের ৭ সেপ্টেম্বর লামা থানা গঠিত হয়। ১৯৭০ সালের ৯ অক্টোবর আলীকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি, বাইশারী ও গজালিয়া থানাকে নিয়ে এটি ‘লামা মহকুমা’য় উন্নীত হয়। ১৯৮৩ সালে দেশের সব মহকুমা বিলুপ্ত করে জেলা ঘোষণার সময় তৎকালীন সরকারি প্রজ্ঞাপনে লামাকে জেলা ঘোষণা করা হলেও তা মাত্র ৩ দিন স্থায়ী হয়েছিল। তবে মহকুমা ও জেলা ঘোষণার ইতিহাসের কারণে একটি জেলা শহরে সরকারের প্রশাসনিক কাজের যতগুলো দপ্তর থাকে, তার প্রায় সবই রয়ে গেছে এই উপজেলায়। বন বিভাগ ও পোস্ট অফিস বাদে বর্তমানে লামা উপজেলায় সরকারের ৩৩টি দপ্তর রয়েছে। এসব দপ্তরে বর্তমানে ১৪২ জন কর্মকর্তা এবং ১ হাজার ১৮৩ জন কর্মচারীসহ সর্বমোট ১ হাজার ৩২৫ জন কর্মী কর্মরআবাসন সংকটের নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি পড়ছে দাপ্তরিক কাজে। দূরবর্তী স্থান থেকে যাতায়াত করতে গিয়ে যেমন সময় অপচয় হচ্ছে, তেমনি অতিরিক্ত মানসিক ও শারীরিক ক্লান্তির কারণে ব্যাহত হচ্ছে নাগরিক সেবা। বিশেষ করে জরুরি সেবার সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কর্মস্থলে সার্বক্ষণিক অবস্থান করতে হিমশিম খাচ্ছেন।উপপ্রশাসনিক কর্মকর্তা উচিংমে চাক বলেন, নারী হিসেবে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আবাসন সুবিধা না থাকাটা সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা সংকট। পরিবার নিয়ে থাকার মতো ভালো বাসা এখানে পাওয়াই যায় না, আর পেলেও ভাড়া আকাশচুম্বী।
আরও পড়ুন , সাভারে তালাবদ্ধ ফ্ল্যাট থেকে নারীর মরদেহ উদ্ধার, স্বামী ছাত্রদল নেতা পলাতক
সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা বামং সিং মার্মা বলেন, অফিস শেষ করে একটু শান্তিতে যে বিশ্রাম নেব, সেই পরিবেশটুকুও নেই। ভাঙাচোরা মেসবাড়িতে থাকতে হয়। ডরমিটরি থাকলে আমাদের কাজের মনোযোগ আরও বাড়ত।উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা কাঞ্চন দে বলেন, পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে যারা নিজেদের শ্রম ও মেধা উৎসর্গ করছেন, তাদের ন্যূনতম মৌলিক চাহিদা পূরণ করা সময়ের দাবি। লামায় সরকারি কর্মচারীদের জন্য একটি আধুনিক ডরমিটরি বা কোয়ার্টার নির্মাণ এখন আর কেবল বিলাসিতা নয়, বরং সেবার মান বজায় রাখার জন্য অত্যন্ত জরুরি।লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মঈন উদ্দিন জানান, বান্দরবানের ৭টি উপজেলার মধ্যে ৬টিতেই অফিসার্স কোয়ার্টার ও ডরমিটরি থাকলেও, কেবলমাত্র লামা উপজেলাতেই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোনো আবাসন ব্যবস্থা নেই।ইউএনও আরও জানান, লামা উপজেলায় কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য আবাসিক গেজেটেড কোয়ার্টার ও ডরমিটরি নির্মাণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগের নিকট ইতোমধ্যে অনুরোধ জানিয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে প্রস্তাব আকারে সম্ভাব্য স্থানগুলোর নকশা তৈরি ও পরিচিহ্নিত করে দেওয়া হয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন