দেশব্যাপী পুলিশি সেবায় আমূল পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে প্রতিটি জেলায় অন্তত একটি করে ‘জিরো কমপ্লেইন (অভিযোগশূন্য) থানা’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। জেলার সদর থানাগুলোকে এই মডেলে রূপান্তরের প্রাথমিক পরিকল্পনা তুলে ধরে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির।
সোমবার (২ মার্চ) দেশের ৬৪ জেলার পুলিশ সুপারদের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠকে তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল না থাকলে বিনিয়োগ আসবে না, কর্মসংস্থানও বাড়বে না। তাই পুলিশকে প্রচলিত কাঠামোর বাইরে গিয়ে জনমুখী ও দায়বদ্ধ সেবা নিশ্চিত করতে হবে।বৈঠকে আইজিপি ‘মব কালচার’ বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, কেউ ডাকলেই লোকজন রাস্তায় জড়ো হচ্ছে এটি সুস্থ সমাজের লক্ষণ নয়। কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ড বাড়াতে সহায়ক পরিবেশ গড়ে তুলতে পারলে এমন পরিস্থিতি কমবে। পুলিশকে সেই পরিবেশ তৈরিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
বৈঠকে উপস্থিত একাধিক কর্মকর্তা জানান, প্রতিটি জেলার সদর থানাকে ‘জিরো কমপ্লেইন থানা’ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সার্কেল অফিসার ওই থানার কার্যক্রম সার্বক্ষণিক তদারক করবেন। মাসে অন্তত দু-একদিন পুলিশ সুপার নিজে সেখানে উপস্থিত থেকে জনসাধারণের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। আইজিপি স্পষ্ট করে বলেন, থানায় আসা যেকোনো ব্যক্তি যেন পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার সুযোগ না পান এটি নিশ্চিত করতে হবে। মানুষের দুর্ভোগ লাঘব করে হাসিমুখে বাড়ি ফেরানোই হবে থানার সাফল্যের মানদণ্ড।
আরও পড়ুন, নেত্রকোনা মডেল থানার ওসি আল মামুন সরকার বিভিন্ন কাজের প্রশংসায় ভাসছেন
চাঞ্চল্যকর অপরাধের ক্ষেত্রে দেরি না করে তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশ সদরদপ্তরকে অবহিত করার নির্দেশ দেন পুলিশপ্রধান। ঘটনাস্থল দ্রুত পরিদর্শন ও আইনগত ব্যবস্থা নিতে বিলম্ব হলে তা কঠোরভাবে দেখা হবে বলেও জানান তিনি। চাঁদাবাজির ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক বা দলীয় বিবেচনা গ্রহণযোগ্য নয় এ বার্তাও পুনর্ব্যক্ত করেন আইজিপি। মহাসড়কে ডাকাতি ও ছিনতাই রোধে বিশেষ নজরদারির নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, ঈদকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের অপরাধ সহ্য করা হবে না। পোশাক শিল্পে বেতন-বোনাস ইস্যুতে শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কা থাকলে আগেভাগে মালিক-শ্রমিকদের সঙ্গে বসে সমাধান করতে হবে।
মামলার তদন্তে গুণগত মান বাড়াতে থানার বিদ্যমান তদন্ত উইংকে আরও দক্ষ ও প্রশিক্ষিত করে তোলার নির্দেশ দেন আইজিপি। তিনি বলেন, আলাদা তদন্ত শাখা গঠনের প্রস্তাব থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি; এখন বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যেই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট ও পুলিশ ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশনের সঙ্গে সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। উগ্রবাদী তৎপরতা প্রতিরোধে বিশেষভাবে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলায় নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেন আইজিপি। প্রাথমিক পর্যায়েই তথ্য সংগ্রহ করে কঠোর ব্যবস্থা নিতে এন্টি টেরোরিস্ট ইউনিটের সঙ্গে সমন্বয়ের কথা বলেন তিনি।
মাদককে অধিকাংশ অপরাধের মূল উৎস হিসেবে চিহ্নিত করে পুলিশ সদস্যদেরও এ বিষয়ে কঠোরভাবে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন। কিশোর গ্যাং, ধর্ষণসহ নানা অপরাধ দমনে শক্ত অবস্থান নেওয়ার বার্তা দেন পুলিশপ্রধান। রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও হাজারীবাগ এলাকায় প্রতিদিন ৩০-৪০টি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটত উল্লেখ করে আইজিপি জানান, দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি নিজে পরিদর্শনে গিয়ে কম্বিং অপারেশন ও ব্লক রেইড জোরদার করেন। এর ইতিবাচক ফল মিলছে বলে দাবি করেন তিনি।
পুলিশ সদস্যদের মানবিক ও কল্যাণমূলক বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন আলী হোসেন ফকির। শারীরিকভাবে অক্ষম বা অসুস্থ সদস্যদের অযৌক্তিক বদলি যেন না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করেন তিনি। আসন্ন ঈদে ঘরমুখো মানুষের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করতে যানজট নিয়ন্ত্রণ, মহাসড়কে টহল বৃদ্ধি এবং যাত্রী নিরাপত্তায় সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন পুলিশপ্রধান। পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ের এ নির্দেশনা বাস্তবায়িত হলে জেলা পর্যায়ে অন্তত একটি করে ‘জিরো কমপ্লেইন থানা’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনআস্থা পুনর্গঠনের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট মহলের।

মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ মার্চ ২০২৬
দেশব্যাপী পুলিশি সেবায় আমূল পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে প্রতিটি জেলায় অন্তত একটি করে ‘জিরো কমপ্লেইন (অভিযোগশূন্য) থানা’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। জেলার সদর থানাগুলোকে এই মডেলে রূপান্তরের প্রাথমিক পরিকল্পনা তুলে ধরে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির।
সোমবার (২ মার্চ) দেশের ৬৪ জেলার পুলিশ সুপারদের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠকে তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল না থাকলে বিনিয়োগ আসবে না, কর্মসংস্থানও বাড়বে না। তাই পুলিশকে প্রচলিত কাঠামোর বাইরে গিয়ে জনমুখী ও দায়বদ্ধ সেবা নিশ্চিত করতে হবে।বৈঠকে আইজিপি ‘মব কালচার’ বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, কেউ ডাকলেই লোকজন রাস্তায় জড়ো হচ্ছে এটি সুস্থ সমাজের লক্ষণ নয়। কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ড বাড়াতে সহায়ক পরিবেশ গড়ে তুলতে পারলে এমন পরিস্থিতি কমবে। পুলিশকে সেই পরিবেশ তৈরিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
বৈঠকে উপস্থিত একাধিক কর্মকর্তা জানান, প্রতিটি জেলার সদর থানাকে ‘জিরো কমপ্লেইন থানা’ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সার্কেল অফিসার ওই থানার কার্যক্রম সার্বক্ষণিক তদারক করবেন। মাসে অন্তত দু-একদিন পুলিশ সুপার নিজে সেখানে উপস্থিত থেকে জনসাধারণের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। আইজিপি স্পষ্ট করে বলেন, থানায় আসা যেকোনো ব্যক্তি যেন পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার সুযোগ না পান এটি নিশ্চিত করতে হবে। মানুষের দুর্ভোগ লাঘব করে হাসিমুখে বাড়ি ফেরানোই হবে থানার সাফল্যের মানদণ্ড।
আরও পড়ুন, নেত্রকোনা মডেল থানার ওসি আল মামুন সরকার বিভিন্ন কাজের প্রশংসায় ভাসছেন
চাঞ্চল্যকর অপরাধের ক্ষেত্রে দেরি না করে তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশ সদরদপ্তরকে অবহিত করার নির্দেশ দেন পুলিশপ্রধান। ঘটনাস্থল দ্রুত পরিদর্শন ও আইনগত ব্যবস্থা নিতে বিলম্ব হলে তা কঠোরভাবে দেখা হবে বলেও জানান তিনি। চাঁদাবাজির ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক বা দলীয় বিবেচনা গ্রহণযোগ্য নয় এ বার্তাও পুনর্ব্যক্ত করেন আইজিপি। মহাসড়কে ডাকাতি ও ছিনতাই রোধে বিশেষ নজরদারির নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, ঈদকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের অপরাধ সহ্য করা হবে না। পোশাক শিল্পে বেতন-বোনাস ইস্যুতে শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কা থাকলে আগেভাগে মালিক-শ্রমিকদের সঙ্গে বসে সমাধান করতে হবে।
মামলার তদন্তে গুণগত মান বাড়াতে থানার বিদ্যমান তদন্ত উইংকে আরও দক্ষ ও প্রশিক্ষিত করে তোলার নির্দেশ দেন আইজিপি। তিনি বলেন, আলাদা তদন্ত শাখা গঠনের প্রস্তাব থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি; এখন বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যেই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট ও পুলিশ ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশনের সঙ্গে সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। উগ্রবাদী তৎপরতা প্রতিরোধে বিশেষভাবে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলায় নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেন আইজিপি। প্রাথমিক পর্যায়েই তথ্য সংগ্রহ করে কঠোর ব্যবস্থা নিতে এন্টি টেরোরিস্ট ইউনিটের সঙ্গে সমন্বয়ের কথা বলেন তিনি।
মাদককে অধিকাংশ অপরাধের মূল উৎস হিসেবে চিহ্নিত করে পুলিশ সদস্যদেরও এ বিষয়ে কঠোরভাবে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন। কিশোর গ্যাং, ধর্ষণসহ নানা অপরাধ দমনে শক্ত অবস্থান নেওয়ার বার্তা দেন পুলিশপ্রধান। রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও হাজারীবাগ এলাকায় প্রতিদিন ৩০-৪০টি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটত উল্লেখ করে আইজিপি জানান, দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি নিজে পরিদর্শনে গিয়ে কম্বিং অপারেশন ও ব্লক রেইড জোরদার করেন। এর ইতিবাচক ফল মিলছে বলে দাবি করেন তিনি।
পুলিশ সদস্যদের মানবিক ও কল্যাণমূলক বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন আলী হোসেন ফকির। শারীরিকভাবে অক্ষম বা অসুস্থ সদস্যদের অযৌক্তিক বদলি যেন না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করেন তিনি। আসন্ন ঈদে ঘরমুখো মানুষের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করতে যানজট নিয়ন্ত্রণ, মহাসড়কে টহল বৃদ্ধি এবং যাত্রী নিরাপত্তায় সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন পুলিশপ্রধান। পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ের এ নির্দেশনা বাস্তবায়িত হলে জেলা পর্যায়ে অন্তত একটি করে ‘জিরো কমপ্লেইন থানা’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনআস্থা পুনর্গঠনের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট মহলের।

আপনার মতামত লিখুন