দৈনিক সংবাদ দিগন্ত
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

প্রবীণ ও নবীন ভোটারদের কণ্ঠে ফিরে আসা গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা

প্রবীণ ও নবীন ভোটারদের কণ্ঠে ফিরে আসা গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা
প্রবীণ ও নবীন ভোটারদের কণ্ঠে ফিরে আসা গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা

ভোটাধিকার হারানোর দীর্ঘ একটি যুগের হতাশা আর অপেক্ষার শেষে আবারও ভোটকেন্দ্রমুখী হচ্ছে মানুষ। টানা একতরফা নির্বাচনের ভেতর দিয়ে যাওয়া একটি দেশে এবার ভোট মানে শুধু ব্যালট নয়, গণতন্ত্রে ফেরার আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ। সেই আকাঙ্ক্ষা যেমন শোনা যাচ্ছে জীবনের শেষ ভোট দেওয়ার অপেক্ষায় থাকা প্রবীণদের কণ্ঠে, তেমনি প্রতিফলিত হচ্ছে জীবনের প্রথম ভোট দিতে শত কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়া নবীন ভোটারদের চোখে। 

ঢাকা-১৫ আসনে এমনই দুই প্রজন্মের ভোটারের সঙ্গে কথা হলে, তাদের কথায় উঠে এসেছে হারানো ভোটাধিকার ফিরে পাওয়ার প্রত্যাশা, ভয় কাটিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ়তা এবং গণতন্ত্রে ফেরার স্বপ্ন। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শরিয়ত হুসাইন। বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) মোহাম্মাদীয়া হাউজিং সোসাইটিতে একটি দলের নির্বাচনী ক্যাম্পে নিজের জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে হাজির হন তিনি। উদ্দেশ্য, ভোটকেন্দ্র সম্পর্কিত তথ্য জানা। তিনি বলেন, আমাদের বয়সী প্রজন্ম এখন দেশের প্রবীণদের কাতারে। আমরা জীবনে দুবার স্বৈরাচার সরকারের পতনের পর দেশে গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে আসার নির্বাচন দেখছি। কিন্তু টানা তিনটি একতরফা নির্বাচনের কারণে আমাদের প্রজন্মের অনেকেই ভেবেছিল, জীবদ্দশায় আর ভোট দেওয়ার সুযোগ পাওয়া যাবে না। 

শরিয়ত হুসাইন বলেন, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর ১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারিতে যে নির্বাচন হয়েছিল, সেটিও ছিল গণতন্ত্রে ফেরার নির্বাচন। এবারও দেশ আবার সেই পথেই ফিরছে। তাই এটিকে জীবনের শেষ ভোট মনে করেই কেন্দ্রে যাব। গত তিনবারের মতো এবার আর কেউ বাধা দিতে পারবে না। অন্যদিকে মো. তপু ইসলাম একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জুনিয়র প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত। ভোটার হওয়ার পরও গত দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে পারেননি এই নবীন ভোটার। এবার জীবনের প্রথম ভোট দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কর্মস্থল ঢাকা থেকে খুলনার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন তিনি।

তপু ইসলাম বলেন, নতুন প্রজন্মের ভোটার হিসেবে জীবনের প্রথম ভোট দেওয়ার অনুভূতিটাই আলাদা। দীর্ঘদিন পর দেশে এমন একটি নির্বাচন হতে যাচ্ছে, যেখান থেকে আবার গণতন্ত্রে ফেরার আশা তৈরি হয়েছে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটবে বলেই আমরা বিশ্বাস করি। আজ বৃহস্পতিবার ১২ ফেব্রুয়ারি। স্বাধীনতার ৫৫ বছরে দাঁড়িয়ে দেশ সাক্ষী হতে যাচ্ছে এক ঐতিহাসিক দিনের। দীর্ঘ দেড় দশক পর বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এমন একটি জাতীয় নির্বাচন, যেটিকে সাধারণ মানুষ ও বুদ্ধিজীবী সমাজ স্পষ্টভাবেই গণতন্ত্রে ফেরার নির্বাচন হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, ফলাফল যে দলের পক্ষেই যাক না কেন, এই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করে গণতান্ত্রিক ধারাকে অব্যাহত রাখাই হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য।

নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান এবং ২৭ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের প্রেক্ষাপট টানলে বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে একটি স্পষ্ট সাদৃশ্য চোখে পড়ে। ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি দেশে অনুষ্ঠিত হয় পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এটি ছিল স্বৈরাচার এরশাদের পতনের পর প্রথম জাতীয় নির্বাচন এবং ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নির্দলীয় অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে ভোট আয়োজন করা হয়। সেই সরকারের প্রধান ছিলেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ, যাকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। সেই নির্বাচনই বাংলাদেশকে আবার গণতান্ত্রিক ধারায় ফেরার পথ দেখিয়েছিল। ১৯৯১ সালের আগে দেশের ইতিহাসে কোনো স্থানীয় বা জাতীয় নির্বাচন কিংবা গণভোটই নির্দলীয় সরকারব্যবস্থার অধীনে অনুষ্ঠিত হয়নি। সে কারণে অনেকের কাছেই সে বছর ২৭ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনটি ছিল একেবারেই ব্যতিক্রমী। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি ছিল সবচেয়ে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনগুলোর একটি। সে সময় সরকার ও প্রশাসনের ভূমিকা ছিল তুলনামূলকভাবে নিরপেক্ষ, যা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনে।

স্বৈরাচার এরশাদ আমলে দেশের বিচারব্যবস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রশাসন, ব্যাংক ও ব্যবসা-বাণিজ্যসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই ভাঙন ধরে। দলীয়করণের নগ্ন হস্তক্ষেপ থেকে বাদ পড়েনি নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও। এর ফলে নির্বাচন কমিশন ও পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই আস্থাহীনতার প্রেক্ষাপটেই নির্দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি জোরালো হয়ে ওঠে। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম মূল দাবি ছিল নির্বাচনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা। সেই আন্দোলনের প্রত্যক্ষ ফসল হিসেবেই অনুষ্ঠিত হয় ২৭ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন, যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আছে।

চব্বিশে অভ্যুত্থান ও ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের প্রেক্ষাপট

চব্বিশের অভ্যুত্থান ও ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের প্রেক্ষাপট বুঝতে হলে ২০১১ সালের রাজনৈতিক মোড় ঘোরানো ঘটনাগুলোর দিকে তাকাতে হয়। ১৯৯৬ সালে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল বিএনপি বিরোধী জোট আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর দাবি এবং ধারাবাহিক আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু ২০১১ সালে আপিল বিভাগের একটি রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভারসাম্য ভেঙে পড়ে। পরবর্তী এক যুগেরও বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগ, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে, রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকে কার্যত একদলীয় স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা কায়েম করে বলে অভিযোগ ওঠে।

এই সময়কালকে সমালোচকেরা ‘ফ্যাসিস্ট’ শাসনের সময় হিসেবেও অভিহিত করেন। এই শাসনামলে অনুষ্ঠিত তিনটি জাতীয় নির্বাচনসহ স্থানীয় সরকারের প্রায় প্রতিটি নির্বাচনই ছিল কলঙ্কিত ও বিতর্কিত। ২০১৪ সালের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় কার্যত বিনা ভোটে ও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। ২০১৮ সালের নির্বাচন পরিচিতি পায় ‘রাতের ভোট’ নামে, যেখানে ভোটগ্রহণের আগেই ফল নির্ধারিত হয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। আর ২০২৪ সালের নির্বাচনকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে ‘আমি-ডামি’ ভোট বলে আখ্যা দেন সমালোচকেরা।

প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের কলঙ্কিত রায় ও ফ্যাসিস্টের উত্থান

এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় ২০১১ সালের ১০ মে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের নেতৃত্বে সাত সদস্যের আপিল বিভাগ চার–তিন সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের মাধ্যমে। দেশের সাধারণ মানুষ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের কাছে এই রায় পরিচিত হয়ে ওঠে টানা দেড় দশক গণতান্ত্রিক ধারা বাধাগ্রস্ত করার একটি ‘কলঙ্কিত রায়’ হিসেবে। এই রায়কে ভিত্তি করেই সে বছর আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধান থেকে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে ও সংসদে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করে। শুরু হয় ফ্যাসিবাদ কায়েমের বন্দোবস্ত। 

এই ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল আরও আগে, ১৯৯৯ সালে। সে সময় সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এম সলিমউল্লাহসহ কয়েকজন একটি রিট আবেদন করেন। চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০০৪ সালের ৪ আগস্ট হাইকোর্টের একটি বিশেষ বেঞ্চ রায়ে ত্রয়োদশ সংশোধনী তথা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে বৈধ ঘোষণা করেন। তবে এই রায়ের বিরুদ্ধে ২০০৫ সালে আপিল করা হয়।

এর ছয় বছর পর, ২০১১ সালে, সেই আপিলের শুনানিতে আপিল বিভাগ অ্যামিকাস কিউরি (আদালতের আইনি সহায়তাকারী) গঠন করে। আটজন বিশিষ্ট আইনজীবীকে নিয়ে গঠিত এই অ্যামিকাস কিউরির মধ্যে একমাত্র সিনিয়র আইনজীবী আজমালুল হক কিউসি ত্রয়োদশ সংশোধনী ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পক্ষে মত দেন। উল্লেখযোগ্যভাবে, রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্যে তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বৈধতার পক্ষেই যুক্তি উপস্থাপন করেন।তারপরও সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে দেওয়া ওই রায়ের মাধ্যমেই দেশে নির্বাচনব্যবস্থার এক গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই রায়ের পরই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে শুরু করে এবং গণতন্ত্র ধীরে ধীরে একটি সংকটময় পথে প্রবেশ করে।

‘বিনা ভোট’, ‘রাতের ভোট’ ও ‘আমি-ডামি ভোট’

২০১১ সালে খায়রুল হকের সেই ‘কলঙ্কিত রায়’ প্রণীত হওয়ার তিন বছর পর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দেশে অনুষ্ঠিত হয় দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচন পরিচিতি পায় ‘ভোটারবিহীন’ বা ‘বিনা ভোটের’ নামে, কারণ তৎকালীন প্রধান বিরোধীদল বিএনপি ও তাদের নেতৃত্বাধীন জোট ভোট বর্জন করে। অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ মোট ১৭টি দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। দেশের মোট ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১৫৩টি আসনে এবং পরে এক আসনে উপনির্বাচনের মাধ্যমে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ফলাফল ঘোষণা করা হয়।

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর। দেশের নির্বাচনের ইতিহাসে আরেকটি কলঙ্কজনক দিন হিসেবে এটি চিহ্নিত। ২০০৮ সালের পর ভিন্ন প্রেক্ষাপটে এই নির্বাচনে দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করে। একাদশ জাতীয় নির্বাচনে সেসময় বিএনপি এবং তাদের নেতৃত্বাধীন জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টও ভোটে অংশ নেয়। তবে অভিযোগ রয়েছে সারা দেশে ভোটকেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে, নির্বাচন কমিশনের এমন প্রতিশ্রুতি থাকলেও ভোটের আগের রাতেই প্রায় ১৫০টিরও বেশি আসনে ব্যালটে সিল মেরে বাক্স ভরে ফেলা হয়। ফলে নির্বাচনের দিন কেন্দ্রে আসা অধিকাংশ ভোটারই হেনস্থার শিকার হন। আওয়ামী লীগ আমলের এই নির্বাচন ‘নিশিরাতের ভোট’ নামেই বেশি পরিচিতি পায়।

সর্বশেষ ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে বিএনপিসহ দেশের অধিকাংশ দল বর্জনের ঘোষণা দিলে, স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা ঠেকানোর জন্য ভিন্ন পথ অবলম্বন করে। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ শুধু দলীয় মনোনীত প্রার্থীদের নয়, বরং দলীয় ‘বিদ্রোহী’ বা ‘ডামি’ প্রার্থীদেরও অংশ নেওয়ার সুযোগ দেয়। ফলস্বরূপ, এই নির্বাচন কুখ্যাতি লাভ করে ‘আমি-ডামি ভোট’ নামে। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা যা বলছেন

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০১৪, ২০১৮, ২০২৪ সালের এ তিনটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট ব্যবস্থাকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এমন মাত্রায় পৌঁছায় যে, সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়ে। এই দীর্ঘ রাজনৈতিক দমবন্ধ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটেই চব্বিশের অভ্যুত্থান ও ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে অনেকেই গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ হিসেবে দেখছেন। তারা মনে করেন, ২০২৬ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে দেশ পুনরায় গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে আসবে। ফলাফল যা-ই হোক না কেন, তা মেনে নিয়ে আগামীতে এই গণতান্ত্রিক ধারাকে অব্যাহত রাখাটাই রাজনৈতিক দলগুলোর মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।

আরও পড়ুন, ভোট কেনাবেচা রুখতে ইসির কঠোর হুঁশিয়ারি

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, এই নির্বাচন নিঃসন্দেহে গণতন্ত্রে ফেরার প্রথম পদক্ষেপ। আমি আশা করি, ভোটগ্রহণ একটি উৎসব ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হবে। আগামীতে গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে এই নির্বাচনের বিকল্প ছিল না।তিনি আরও বলেন, সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক বা নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে উচ্চ আদালতের সম্প্রতি একটি রায় রয়েছে। এর ফলে হয়তো ত্রয়োদশ সংশোধনীর মতো হুবহু তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফেরানো সম্ভব হবে না। তবে একটি নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা থাকা অবশ্যই প্রয়োজন। আমাদের মতো দেশে নিকট ভবিষ্যতে দলীয় সরকারের অধীনে যেখানে নিরপেক্ষ নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা নেই, সেখানে নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থার বিকল্প অন্য কিছু নেই। আর সেই পরিস্থিতিতে পৌঁছানোর জন্য এই নির্বাচন প্রথম এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, দীর্ঘদিন পর একটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যেখানে হয়তো ভোটাররা নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারবে। কিন্তু তারপরও আমরা এই নির্বাচনকে ভালো নির্বাচন বলতে পারছি না। প্রার্থী মনোনয়ন থেকে শুরু করে নির্বাচনের নানা পর্যায়ে অনিয়ম পরিলক্ষিত হচ্ছে। যদিও এটি নির্দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, তবুও নির্বাচনে সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, এই নির্বাচনের পর হয়তো সংবিধানে আবারও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। কিন্তু সেই সরকার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও সরকার গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে দলগুলোর মধ্যে দ্বিমত ও জটিলতা রয়েছে। বিএনপি, দেশের একটি বড় ও প্রধান দল হিসেবে, সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অন্তর্ভুক্তি চাইছে; এতে ভবিষ্যতে সেই সরকারেরও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। আপাতত, সবার কাছে এই নির্বাচন গণতন্ত্রের ধারায় ফেরার হিসেবে মনে হলেও, গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে পরবর্তী সরকারের কর্মকাণ্ড ও আচরণের ওপর।

বিষয় : গণতন্ত্র নির্বাচন

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬


প্রবীণ ও নবীন ভোটারদের কণ্ঠে ফিরে আসা গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা

প্রকাশের তারিখ : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

featured Image

ভোটাধিকার হারানোর দীর্ঘ একটি যুগের হতাশা আর অপেক্ষার শেষে আবারও ভোটকেন্দ্রমুখী হচ্ছে মানুষ। টানা একতরফা নির্বাচনের ভেতর দিয়ে যাওয়া একটি দেশে এবার ভোট মানে শুধু ব্যালট নয়, গণতন্ত্রে ফেরার আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ। সেই আকাঙ্ক্ষা যেমন শোনা যাচ্ছে জীবনের শেষ ভোট দেওয়ার অপেক্ষায় থাকা প্রবীণদের কণ্ঠে, তেমনি প্রতিফলিত হচ্ছে জীবনের প্রথম ভোট দিতে শত কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়া নবীন ভোটারদের চোখে। 

ঢাকা-১৫ আসনে এমনই দুই প্রজন্মের ভোটারের সঙ্গে কথা হলে, তাদের কথায় উঠে এসেছে হারানো ভোটাধিকার ফিরে পাওয়ার প্রত্যাশা, ভয় কাটিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ়তা এবং গণতন্ত্রে ফেরার স্বপ্ন। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শরিয়ত হুসাইন। বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) মোহাম্মাদীয়া হাউজিং সোসাইটিতে একটি দলের নির্বাচনী ক্যাম্পে নিজের জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে হাজির হন তিনি। উদ্দেশ্য, ভোটকেন্দ্র সম্পর্কিত তথ্য জানা। তিনি বলেন, আমাদের বয়সী প্রজন্ম এখন দেশের প্রবীণদের কাতারে। আমরা জীবনে দুবার স্বৈরাচার সরকারের পতনের পর দেশে গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে আসার নির্বাচন দেখছি। কিন্তু টানা তিনটি একতরফা নির্বাচনের কারণে আমাদের প্রজন্মের অনেকেই ভেবেছিল, জীবদ্দশায় আর ভোট দেওয়ার সুযোগ পাওয়া যাবে না। 

শরিয়ত হুসাইন বলেন, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর ১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারিতে যে নির্বাচন হয়েছিল, সেটিও ছিল গণতন্ত্রে ফেরার নির্বাচন। এবারও দেশ আবার সেই পথেই ফিরছে। তাই এটিকে জীবনের শেষ ভোট মনে করেই কেন্দ্রে যাব। গত তিনবারের মতো এবার আর কেউ বাধা দিতে পারবে না। অন্যদিকে মো. তপু ইসলাম একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জুনিয়র প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত। ভোটার হওয়ার পরও গত দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে পারেননি এই নবীন ভোটার। এবার জীবনের প্রথম ভোট দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কর্মস্থল ঢাকা থেকে খুলনার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন তিনি।

তপু ইসলাম বলেন, নতুন প্রজন্মের ভোটার হিসেবে জীবনের প্রথম ভোট দেওয়ার অনুভূতিটাই আলাদা। দীর্ঘদিন পর দেশে এমন একটি নির্বাচন হতে যাচ্ছে, যেখান থেকে আবার গণতন্ত্রে ফেরার আশা তৈরি হয়েছে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটবে বলেই আমরা বিশ্বাস করি। আজ বৃহস্পতিবার ১২ ফেব্রুয়ারি। স্বাধীনতার ৫৫ বছরে দাঁড়িয়ে দেশ সাক্ষী হতে যাচ্ছে এক ঐতিহাসিক দিনের। দীর্ঘ দেড় দশক পর বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এমন একটি জাতীয় নির্বাচন, যেটিকে সাধারণ মানুষ ও বুদ্ধিজীবী সমাজ স্পষ্টভাবেই গণতন্ত্রে ফেরার নির্বাচন হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, ফলাফল যে দলের পক্ষেই যাক না কেন, এই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করে গণতান্ত্রিক ধারাকে অব্যাহত রাখাই হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য।

নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান এবং ২৭ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের প্রেক্ষাপট টানলে বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে একটি স্পষ্ট সাদৃশ্য চোখে পড়ে। ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি দেশে অনুষ্ঠিত হয় পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এটি ছিল স্বৈরাচার এরশাদের পতনের পর প্রথম জাতীয় নির্বাচন এবং ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নির্দলীয় অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে ভোট আয়োজন করা হয়। সেই সরকারের প্রধান ছিলেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ, যাকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। সেই নির্বাচনই বাংলাদেশকে আবার গণতান্ত্রিক ধারায় ফেরার পথ দেখিয়েছিল। ১৯৯১ সালের আগে দেশের ইতিহাসে কোনো স্থানীয় বা জাতীয় নির্বাচন কিংবা গণভোটই নির্দলীয় সরকারব্যবস্থার অধীনে অনুষ্ঠিত হয়নি। সে কারণে অনেকের কাছেই সে বছর ২৭ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনটি ছিল একেবারেই ব্যতিক্রমী। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি ছিল সবচেয়ে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনগুলোর একটি। সে সময় সরকার ও প্রশাসনের ভূমিকা ছিল তুলনামূলকভাবে নিরপেক্ষ, যা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনে।

স্বৈরাচার এরশাদ আমলে দেশের বিচারব্যবস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রশাসন, ব্যাংক ও ব্যবসা-বাণিজ্যসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই ভাঙন ধরে। দলীয়করণের নগ্ন হস্তক্ষেপ থেকে বাদ পড়েনি নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও। এর ফলে নির্বাচন কমিশন ও পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই আস্থাহীনতার প্রেক্ষাপটেই নির্দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি জোরালো হয়ে ওঠে। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম মূল দাবি ছিল নির্বাচনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা। সেই আন্দোলনের প্রত্যক্ষ ফসল হিসেবেই অনুষ্ঠিত হয় ২৭ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন, যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আছে।

চব্বিশে অভ্যুত্থান ও ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের প্রেক্ষাপট

চব্বিশের অভ্যুত্থান ও ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের প্রেক্ষাপট বুঝতে হলে ২০১১ সালের রাজনৈতিক মোড় ঘোরানো ঘটনাগুলোর দিকে তাকাতে হয়। ১৯৯৬ সালে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল বিএনপি বিরোধী জোট আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর দাবি এবং ধারাবাহিক আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু ২০১১ সালে আপিল বিভাগের একটি রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভারসাম্য ভেঙে পড়ে। পরবর্তী এক যুগেরও বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগ, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে, রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকে কার্যত একদলীয় স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা কায়েম করে বলে অভিযোগ ওঠে।

এই সময়কালকে সমালোচকেরা ‘ফ্যাসিস্ট’ শাসনের সময় হিসেবেও অভিহিত করেন। এই শাসনামলে অনুষ্ঠিত তিনটি জাতীয় নির্বাচনসহ স্থানীয় সরকারের প্রায় প্রতিটি নির্বাচনই ছিল কলঙ্কিত ও বিতর্কিত। ২০১৪ সালের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় কার্যত বিনা ভোটে ও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। ২০১৮ সালের নির্বাচন পরিচিতি পায় ‘রাতের ভোট’ নামে, যেখানে ভোটগ্রহণের আগেই ফল নির্ধারিত হয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। আর ২০২৪ সালের নির্বাচনকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে ‘আমি-ডামি’ ভোট বলে আখ্যা দেন সমালোচকেরা।

প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের কলঙ্কিত রায় ও ফ্যাসিস্টের উত্থান

এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় ২০১১ সালের ১০ মে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের নেতৃত্বে সাত সদস্যের আপিল বিভাগ চার–তিন সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের মাধ্যমে। দেশের সাধারণ মানুষ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের কাছে এই রায় পরিচিত হয়ে ওঠে টানা দেড় দশক গণতান্ত্রিক ধারা বাধাগ্রস্ত করার একটি ‘কলঙ্কিত রায়’ হিসেবে। এই রায়কে ভিত্তি করেই সে বছর আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধান থেকে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে ও সংসদে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করে। শুরু হয় ফ্যাসিবাদ কায়েমের বন্দোবস্ত। 

এই ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল আরও আগে, ১৯৯৯ সালে। সে সময় সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এম সলিমউল্লাহসহ কয়েকজন একটি রিট আবেদন করেন। চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০০৪ সালের ৪ আগস্ট হাইকোর্টের একটি বিশেষ বেঞ্চ রায়ে ত্রয়োদশ সংশোধনী তথা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে বৈধ ঘোষণা করেন। তবে এই রায়ের বিরুদ্ধে ২০০৫ সালে আপিল করা হয়।

এর ছয় বছর পর, ২০১১ সালে, সেই আপিলের শুনানিতে আপিল বিভাগ অ্যামিকাস কিউরি (আদালতের আইনি সহায়তাকারী) গঠন করে। আটজন বিশিষ্ট আইনজীবীকে নিয়ে গঠিত এই অ্যামিকাস কিউরির মধ্যে একমাত্র সিনিয়র আইনজীবী আজমালুল হক কিউসি ত্রয়োদশ সংশোধনী ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পক্ষে মত দেন। উল্লেখযোগ্যভাবে, রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্যে তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বৈধতার পক্ষেই যুক্তি উপস্থাপন করেন।তারপরও সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে দেওয়া ওই রায়ের মাধ্যমেই দেশে নির্বাচনব্যবস্থার এক গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই রায়ের পরই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে শুরু করে এবং গণতন্ত্র ধীরে ধীরে একটি সংকটময় পথে প্রবেশ করে।

‘বিনা ভোট’, ‘রাতের ভোট’ ও ‘আমি-ডামি ভোট’

২০১১ সালে খায়রুল হকের সেই ‘কলঙ্কিত রায়’ প্রণীত হওয়ার তিন বছর পর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দেশে অনুষ্ঠিত হয় দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচন পরিচিতি পায় ‘ভোটারবিহীন’ বা ‘বিনা ভোটের’ নামে, কারণ তৎকালীন প্রধান বিরোধীদল বিএনপি ও তাদের নেতৃত্বাধীন জোট ভোট বর্জন করে। অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ মোট ১৭টি দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। দেশের মোট ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১৫৩টি আসনে এবং পরে এক আসনে উপনির্বাচনের মাধ্যমে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ফলাফল ঘোষণা করা হয়।

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর। দেশের নির্বাচনের ইতিহাসে আরেকটি কলঙ্কজনক দিন হিসেবে এটি চিহ্নিত। ২০০৮ সালের পর ভিন্ন প্রেক্ষাপটে এই নির্বাচনে দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করে। একাদশ জাতীয় নির্বাচনে সেসময় বিএনপি এবং তাদের নেতৃত্বাধীন জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টও ভোটে অংশ নেয়। তবে অভিযোগ রয়েছে সারা দেশে ভোটকেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে, নির্বাচন কমিশনের এমন প্রতিশ্রুতি থাকলেও ভোটের আগের রাতেই প্রায় ১৫০টিরও বেশি আসনে ব্যালটে সিল মেরে বাক্স ভরে ফেলা হয়। ফলে নির্বাচনের দিন কেন্দ্রে আসা অধিকাংশ ভোটারই হেনস্থার শিকার হন। আওয়ামী লীগ আমলের এই নির্বাচন ‘নিশিরাতের ভোট’ নামেই বেশি পরিচিতি পায়।

সর্বশেষ ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে বিএনপিসহ দেশের অধিকাংশ দল বর্জনের ঘোষণা দিলে, স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা ঠেকানোর জন্য ভিন্ন পথ অবলম্বন করে। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ শুধু দলীয় মনোনীত প্রার্থীদের নয়, বরং দলীয় ‘বিদ্রোহী’ বা ‘ডামি’ প্রার্থীদেরও অংশ নেওয়ার সুযোগ দেয়। ফলস্বরূপ, এই নির্বাচন কুখ্যাতি লাভ করে ‘আমি-ডামি ভোট’ নামে। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা যা বলছেন

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০১৪, ২০১৮, ২০২৪ সালের এ তিনটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট ব্যবস্থাকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এমন মাত্রায় পৌঁছায় যে, সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়ে। এই দীর্ঘ রাজনৈতিক দমবন্ধ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটেই চব্বিশের অভ্যুত্থান ও ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে অনেকেই গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ হিসেবে দেখছেন। তারা মনে করেন, ২০২৬ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে দেশ পুনরায় গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে আসবে। ফলাফল যা-ই হোক না কেন, তা মেনে নিয়ে আগামীতে এই গণতান্ত্রিক ধারাকে অব্যাহত রাখাটাই রাজনৈতিক দলগুলোর মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।

আরও পড়ুন, ভোট কেনাবেচা রুখতে ইসির কঠোর হুঁশিয়ারি

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, এই নির্বাচন নিঃসন্দেহে গণতন্ত্রে ফেরার প্রথম পদক্ষেপ। আমি আশা করি, ভোটগ্রহণ একটি উৎসব ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হবে। আগামীতে গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে এই নির্বাচনের বিকল্প ছিল না।তিনি আরও বলেন, সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক বা নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে উচ্চ আদালতের সম্প্রতি একটি রায় রয়েছে। এর ফলে হয়তো ত্রয়োদশ সংশোধনীর মতো হুবহু তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফেরানো সম্ভব হবে না। তবে একটি নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা থাকা অবশ্যই প্রয়োজন। আমাদের মতো দেশে নিকট ভবিষ্যতে দলীয় সরকারের অধীনে যেখানে নিরপেক্ষ নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা নেই, সেখানে নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থার বিকল্প অন্য কিছু নেই। আর সেই পরিস্থিতিতে পৌঁছানোর জন্য এই নির্বাচন প্রথম এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, দীর্ঘদিন পর একটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যেখানে হয়তো ভোটাররা নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারবে। কিন্তু তারপরও আমরা এই নির্বাচনকে ভালো নির্বাচন বলতে পারছি না। প্রার্থী মনোনয়ন থেকে শুরু করে নির্বাচনের নানা পর্যায়ে অনিয়ম পরিলক্ষিত হচ্ছে। যদিও এটি নির্দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, তবুও নির্বাচনে সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, এই নির্বাচনের পর হয়তো সংবিধানে আবারও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। কিন্তু সেই সরকার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও সরকার গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে দলগুলোর মধ্যে দ্বিমত ও জটিলতা রয়েছে। বিএনপি, দেশের একটি বড় ও প্রধান দল হিসেবে, সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অন্তর্ভুক্তি চাইছে; এতে ভবিষ্যতে সেই সরকারেরও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। আপাতত, সবার কাছে এই নির্বাচন গণতন্ত্রের ধারায় ফেরার হিসেবে মনে হলেও, গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে পরবর্তী সরকারের কর্মকাণ্ড ও আচরণের ওপর।


দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

সম্পাদক ও প্রকাশক: এ বি এম মনিরুজ্জামান 
নির্বাহী সম্পাদক: রিপন রুদ্র
যুগ্ম সম্পাদক: জাকিয়া সুলতানা (লাভলী)

কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক সংবাদ দিগন্ত । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত