শীতলক্ষ্যা নদীর তীর ঘেঁষা গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বরমী বাজার একসময় নদীকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। রাজধানীর কাছাকাছি হওয়ায় এই বাজারে নৌপথে পণ্য আনা-নেওয়ার ইতিহাস প্রায় সাড়ে চারশত বছরের পুরোনো। বরমী বাজারের সেই ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে আরেকটি ব্যতিক্রমী পরিচয় হাজার হাজার বানরের অবাধ বিচরণ।
স্থানীয়দের মতে, একসময় বাজারের চারপাশে ঘন জঙ্গল থাকায় বানরদের বসবাসের পরিবেশ ছিল স্বাভাবিক। সময়ের সঙ্গে জনবসতি বাড়লেও বানরগুলো এখান থেকে সরে যায়নি। বরং মানুষের সঙ্গে সহাবস্থানে থেকেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে ছিল বরমীর বানর বসতি। বরমী বাজারের মুদি ব্যবসায়ী শ্রী মাধব চন্দ্র জানান , চার দশকের বেশি সময় ধরে তিনি এ বাজারে ব্যবসা করছেন। শুরু থেকেই বানরদের দৌড়ঝাঁপ, লাফালাফি ও দলবদ্ধ চলাচল দেখে আসছেন তিনি। এখন বানর গুলো খাদ্য সংকটে বিলুপ্তির পথে।
বাজারের হোটেল ব্যবসায়ী বলেন, খাবারের সংকট দেখা দিলে বানররা কখনো কাপড় বা হালকা জিনিস নিয়ে যায়। আবার খাবার দিলে অনেক সময় সেই জিনিস ফিরিয়েও দেয়। তারা মানুষের সঙ্গে অনেকটা অভ্যস্ত। তবে এখন তারা খাবার সংকটে ভুগছে, খাবারের জন্য বাসা বাড়ীতে বিভিন্নভাবে অত্যাচার করে। কৃষকের ধান সহ বিভিন্ন ফসলের জমিতে হামলা করে ফল ফসলাদি নষ্ট করছে। এলাকায় কিছু লতা ও গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ আছে, যেগুলো বানরের প্রাকৃতিক খাদ্য হিসেবে পরিচিত।
কিন্তু নগরায়ণ ও পরিবেশ পরিবর্তনের কারণে এসব খাদ্য উৎস কমে যাওয়ায় বানরদের পুষ্টিহীনতা বাড়ছে এবং বংশবৃদ্ধিও ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয়রা জানান, একসময় বরমী বাজার ও আশপাশের এলাকায় কয়েক হাজার বানর ছিল। পাঁচ বছর আগেও সংখ্যাটি ছিল উল্লেখযোগ্য। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে খাদ্যের অভাব ও অপুষ্টির কারণে অনেক বানর মারা যাচ্ছে। বর্তমানে সঠিক সংখ্যা কেউ নিশ্চিত করতে না পারলেও বানরের সংখ্যা যে দ্রুত কমছে, সে বিষয়ে সবাই একমত। বরমী ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ রতন মিয়া বলেন, বরমী বাজারের বানরগুলো অত্যন্ত সংঘবদ্ধ। বাজার বড় হওয়ায় তারা বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে চলাফেরা করে। নিজেদের মধ্যে বিরোধ হলে এক দলের বানর অন্য দলের এলাকায় যায় না। আবার কোনো বানর মানুষের হামলার শিকার হলে বাজারের সব বানর একসঙ্গে জোট বেঁধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। বেশ কিছু দিন খাদ্য বানর গুলো খাদ্য সংকটে আছে।
আরও পড়ুন, গংগাচড়ায় ১১ দলীয় জোটের উদ্যোগে দাঁড়িপাল্লার পক্ষে নির্বাচনী গণ মিছিল অনুষ্ঠিত
ইতি মধ্যে বানরের খাবারের জন্য উপজেলা একটি আবেদন করেছি। যদি উপজেলা প্রশাসন সরবরাহ করে তাহলে হয়তো বরমী ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষা করা যাবে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, গত কযেক বছর আগে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে কিছু দিন খাদ্য সরবরাহ করে ছিলো। হঠাৎ করে কেন বা কোন কারণে বানরের খাদ্য সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।বন বিভাগ নিয়মিত খোঁজখবর নিলে এবং খাদ্য সহায়তা দেওয়া হলে এই প্রাণীদের দুর্ভোগ অনেকটাই কমানো সম্ভব।সরকারি ভাবে যেন বরমীর বানরদের জন্য নিয়মিত খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা করার দাবি জানান।
এ বিষয়ে ঢাকা বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা( বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ) শারমিন আক্তার বলেন, সরকারীভাবে বানরের খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে। এখানে বানরের প্রকৃত সংখ্যা কতো হবে এর খোঁজ নিয়ে খাবারের ব্যবস্থা করা হবে। স্থানীয়দের দাবি, বরমীর ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষার স্বার্থেই বানরদের টিকিয়ে রাখতে সরকারিভাবে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। নইলে শিগগিরই বরমীর বানর শুধু ইতিহাস,গল্প আর পুরোনো ছবিতেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।

মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৭ জানুয়ারি ২০২৬
শীতলক্ষ্যা নদীর তীর ঘেঁষা গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বরমী বাজার একসময় নদীকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। রাজধানীর কাছাকাছি হওয়ায় এই বাজারে নৌপথে পণ্য আনা-নেওয়ার ইতিহাস প্রায় সাড়ে চারশত বছরের পুরোনো। বরমী বাজারের সেই ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে আরেকটি ব্যতিক্রমী পরিচয় হাজার হাজার বানরের অবাধ বিচরণ।
স্থানীয়দের মতে, একসময় বাজারের চারপাশে ঘন জঙ্গল থাকায় বানরদের বসবাসের পরিবেশ ছিল স্বাভাবিক। সময়ের সঙ্গে জনবসতি বাড়লেও বানরগুলো এখান থেকে সরে যায়নি। বরং মানুষের সঙ্গে সহাবস্থানে থেকেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে ছিল বরমীর বানর বসতি। বরমী বাজারের মুদি ব্যবসায়ী শ্রী মাধব চন্দ্র জানান , চার দশকের বেশি সময় ধরে তিনি এ বাজারে ব্যবসা করছেন। শুরু থেকেই বানরদের দৌড়ঝাঁপ, লাফালাফি ও দলবদ্ধ চলাচল দেখে আসছেন তিনি। এখন বানর গুলো খাদ্য সংকটে বিলুপ্তির পথে।
বাজারের হোটেল ব্যবসায়ী বলেন, খাবারের সংকট দেখা দিলে বানররা কখনো কাপড় বা হালকা জিনিস নিয়ে যায়। আবার খাবার দিলে অনেক সময় সেই জিনিস ফিরিয়েও দেয়। তারা মানুষের সঙ্গে অনেকটা অভ্যস্ত। তবে এখন তারা খাবার সংকটে ভুগছে, খাবারের জন্য বাসা বাড়ীতে বিভিন্নভাবে অত্যাচার করে। কৃষকের ধান সহ বিভিন্ন ফসলের জমিতে হামলা করে ফল ফসলাদি নষ্ট করছে। এলাকায় কিছু লতা ও গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ আছে, যেগুলো বানরের প্রাকৃতিক খাদ্য হিসেবে পরিচিত।
কিন্তু নগরায়ণ ও পরিবেশ পরিবর্তনের কারণে এসব খাদ্য উৎস কমে যাওয়ায় বানরদের পুষ্টিহীনতা বাড়ছে এবং বংশবৃদ্ধিও ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয়রা জানান, একসময় বরমী বাজার ও আশপাশের এলাকায় কয়েক হাজার বানর ছিল। পাঁচ বছর আগেও সংখ্যাটি ছিল উল্লেখযোগ্য। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে খাদ্যের অভাব ও অপুষ্টির কারণে অনেক বানর মারা যাচ্ছে। বর্তমানে সঠিক সংখ্যা কেউ নিশ্চিত করতে না পারলেও বানরের সংখ্যা যে দ্রুত কমছে, সে বিষয়ে সবাই একমত। বরমী ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ রতন মিয়া বলেন, বরমী বাজারের বানরগুলো অত্যন্ত সংঘবদ্ধ। বাজার বড় হওয়ায় তারা বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে চলাফেরা করে। নিজেদের মধ্যে বিরোধ হলে এক দলের বানর অন্য দলের এলাকায় যায় না। আবার কোনো বানর মানুষের হামলার শিকার হলে বাজারের সব বানর একসঙ্গে জোট বেঁধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। বেশ কিছু দিন খাদ্য বানর গুলো খাদ্য সংকটে আছে।
আরও পড়ুন, গংগাচড়ায় ১১ দলীয় জোটের উদ্যোগে দাঁড়িপাল্লার পক্ষে নির্বাচনী গণ মিছিল অনুষ্ঠিত
ইতি মধ্যে বানরের খাবারের জন্য উপজেলা একটি আবেদন করেছি। যদি উপজেলা প্রশাসন সরবরাহ করে তাহলে হয়তো বরমী ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষা করা যাবে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, গত কযেক বছর আগে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে কিছু দিন খাদ্য সরবরাহ করে ছিলো। হঠাৎ করে কেন বা কোন কারণে বানরের খাদ্য সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।বন বিভাগ নিয়মিত খোঁজখবর নিলে এবং খাদ্য সহায়তা দেওয়া হলে এই প্রাণীদের দুর্ভোগ অনেকটাই কমানো সম্ভব।সরকারি ভাবে যেন বরমীর বানরদের জন্য নিয়মিত খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা করার দাবি জানান।
এ বিষয়ে ঢাকা বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা( বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ) শারমিন আক্তার বলেন, সরকারীভাবে বানরের খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে। এখানে বানরের প্রকৃত সংখ্যা কতো হবে এর খোঁজ নিয়ে খাবারের ব্যবস্থা করা হবে। স্থানীয়দের দাবি, বরমীর ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষার স্বার্থেই বানরদের টিকিয়ে রাখতে সরকারিভাবে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। নইলে শিগগিরই বরমীর বানর শুধু ইতিহাস,গল্প আর পুরোনো ছবিতেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।

আপনার মতামত লিখুন