দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

চাঁদাবাজ-ছিনতাইকারীদের লাগাম টানলেন ট্যুরিস্ট পুলিশের আপেল মাহমুদ

চাঁদাবাজ-ছিনতাইকারীদের লাগাম টানলেন ট্যুরিস্ট পুলিশের আপেল মাহমুদ
কক্সবাজারে অপরাধ দমনে ট্যুরিস্ট পুলিশ

বাংলাদেশের পর্যটন রাজধানী কক্সবাজার বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতের জন্য পরিচিত এই শহর শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই নয়, দেশের অর্থনীতি ও পর্যটন শিল্পের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবছর দেশ-বিদেশ থেকে লাখো পর্যটক কক্সবাজারে ভিড় করেন। তবে দীর্ঘদিন ধরে এই পর্যটন নগরী অপরাধ, চাঁদাবাজি, পর্যটক হয়রানি, অবৈধ দখল ও ছিনতাইয়ের অভিযোগে আলোচিত ছিল। পর্যটনের বিকাশ যেখানে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার ওপর নির্ভরশীল, সেখানে এসব অনিয়ম কক্সবাজারের ভাবমূর্তিকে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

সম্প্রতি এই চিত্রে দৃশ্যমান পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কক্সবাজারে ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর আপেল মাহমুদের নেতৃত্বে অপরাধ দমনে নেওয়া কঠোর অবস্থান ইতোমধ্যে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে পর্যটন সংশ্লিষ্ট মহল সবখানেই আলোচিত হচ্ছে তার কার্যকর ভূমিকা।

ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদ দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই কক্সবাজারের পর্যটন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সরেজমিনে পর্যালোচনা করেন। তিনি শুধু দপ্তরে বসে নির্দেশনা দেননি, বরং সমুদ্র সৈকত, হোটেল-মোটেল এলাকা, কলাতলী, লাবণী পয়েন্ট, ইনানী, হিমছড়ি, মেরিন ড্রাইভসহ গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন স্পটগুলোতে সরাসরি পরিদর্শনে যান।

পর্যটন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে তিনি প্রথমেই চিহ্নিত করেন প্রধান সমস্যাগুলো (১) পর্যটকদের ওপর প্রকাশ্য চাঁদাবাজি (২) হোটেল ও রেস্টুরেন্টে অতিরিক্ত বিল আদায় (৩) অবৈধ দোকান ও স্থাপনা দখল (৪) রাতের বেলায় ছিনতাই ও মাদক কারবার (৫) ট্যুর গাইড ও সেবাদানকারীদের নামে প্রতারণা (৬) স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী চক্রের দৌরাত্ম্য। এসব সমস্যার বিরুদ্ধে তিনি “জিরো টলারেন্স” নীতি ঘোষণা করেন, যা এর আগে ট্যুরিস্ট পুলিশের ক্ষেত্রে খুব একটা কার্যকরভাবে দেখা যায়নি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দীর্ঘদিন ধরে কক্সবাজারে পর্যটকদের জন্য সবচেয়ে বড় আতঙ্ক ছিল চাঁদাবাজি ও ছিনতাই। সমুদ্র সৈকতে ঘোড়া চালানো, বিচ বেড, ছবি তোলা, খাবার কেনা—প্রায় সব ক্ষেত্রেই পর্যটকদের অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ ছিল নিয়মিত। অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদের নির্দেশে ট্যুরিস্ট পুলিশ এই অনিয়মের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান শুরু করে। প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি ও হয়রানির অভিযোগে একাধিক ব্যক্তিকে আটক ও জরিমানা করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক শাস্তিও নিশ্চিত করা হয়।

কক্সবাজারের পর্যটন এলাকার আরেকটি বড় সমস্যা ছিল অবৈধ দখল। সৈকতের আশপাশে ফুটপাত, বালিয়াড়ি ও সরকারি জমিতে অবৈধ দোকান ও স্থাপনা গড়ে উঠেছিল। এতে একদিকে পরিবেশ নষ্ট হচ্ছিল, অন্যদিকে পর্যটকদের চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছিল। আপেল মাহমুদের নেতৃত্বে ট্যুরিস্ট পুলিশ স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে অবৈধ দখল উচ্ছেদে কঠোর ভূমিকা নেয়। একাধিক অভিযান চালিয়ে সৈকত এলাকা থেকে অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে ফেলা হয়। এতে শুরুতে কিছু প্রতিক্রিয়া দেখা দিলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি পর্যটকদের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনে। এর আগে কক্সবাজারে পর্যটক হয়রানির অভিযোগ নতুন কিছু ছিল না। অনেক ক্ষেত্রে ট্যুরিস্ট পুলিশের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগও উঠেছে অতীতে। তবে আপেল মাহমুদের সময়ে এই চিত্রে পরিবর্তন এসেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদের বিভিন্ন অভিযানের ছবি ও ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। কখনো তাকে দেখা গেছে সৈকতে হেঁটে হেঁটে পর্যটকদের সঙ্গে কথা বলতে, কখনো আবার অভিযানে নেতৃত্ব দিতে। পর্যটন সংশ্লিষ্ট অনেকের মতে, এর আগে কক্সবাজারে ট্যুরিস্ট পুলিশের ভূমিকা তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল। দায়িত্ব থাকলেও কার্যকর নজরদারি ও অপরাধ দমনে দৃশ্যমান উপস্থিতি খুব একটা চোখে পড়েনি। আপেল মাহমুদের নেতৃত্বে ট্যুরিস্ট পুলিশ এখন শুধু একটি নামমাত্র বাহিনী নয়, বরং মাঠপর্যায়ে সক্রিয় একটি শক্তিশালী ইউনিট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে পর্যটন শিল্পে। হোটেল মালিক, রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী ও ট্যুর অপারেটররা বলছেন, পর্যটকদের আস্থা বাড়ছে। পরিবার নিয়ে নির্ভয়ে ভ্রমণে আসছেন অনেকে। পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে কক্সবাজার আন্তর্জাতিক পর্যটন নগরী হিসেবে আরও এগিয়ে যেতে পারবে। সব ইতিবাচক পরিবর্তনের পরও চ্যালেঞ্জ পুরোপুরি শেষ হয়নি। মৌসুমে পর্যটকের চাপ, মাদক কারবার, কিছু প্রভাবশালী চক্রের তৎপরতা—এসব মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আপেল মাহমুদের মতো কঠোর ও মাঠমুখী নেতৃত্ব থাকলে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব।

কক্সবাজারের পর্যটন নিরাপত্তায় অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদের ভূমিকা একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। চাঁদাবাজি, ছিনতাই, অবৈধ দখল ও পর্যটক হয়রানির বিরুদ্ধে তার কঠোর অবস্থান শুধু আইনশৃঙ্খলাই নয়, কক্সবাজারের ভাবমূর্তিও রক্ষা করছে। পর্যটন শিল্পের টেকসই উন্নয়নের জন্য এমন নেতৃত্ব অপরিহার্য—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল। এখন দেখার বিষয়, এই ধারাবাহিকতা কতটা বজায় রাখা যায় এবং কক্সবাজার কত দ্রুত একটি নিরাপদ আন্তর্জাতিক পর্যটন নগরীতে পরিণত হয়।

এদিকে কক্সবাজারে বেড়াতে আসা এক পর্যটক বলেন, আমি পরিবার নিয়ে আগেও কক্সবাজারে এসেছি। তখন সমুদ্র সৈকতে হাঁটলেই নানা ধরনের হয়রানির মুখে পড়তে হতো। ছবি তোলা, বিচ বেড বা ঘোড়া চালানো—সব ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত টাকা চাইত। এবার এসে পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে গেছে। ট্যুরিস্ট পুলিশের সদস্যদের আগের চেয়ে বেশি সক্রিয় দেখা যাচ্ছে। কোথাও কোনো সমস্যা হলে দ্রুত তারা উপস্থিত হচ্ছেন। এতে পর্যটক হিসেবে নিরাপত্তার অনুভূতি বেড়েছে।

স্থানীয় আবুল হোসেন নামের এক হোটেল ব্যবসায়ী বলেন, আগে কিছু চাঁদাবাজ চক্র পর্যটকদের ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করত। এতে আমাদের ব্যবসার সুনাম নষ্ট হচ্ছিল। অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদের দায়িত্ব নেওয়ার পর এসবের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অবৈধ দোকান উচ্ছেদ হওয়ায় পরিবেশও পরিষ্কার হয়েছে। পর্যটকরা এখন আগের তুলনায় স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন।

আরও পড়ুন, জাতীয় পার্টির প্রার্থী ব্যারিস্টার মঞ্জুম আলী রংপুর ১ আসনে মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা

স্থানীয় আরেক বাসিন্দা বলেন, ট্যুরিস্ট পুলিশের ভূমিকা আগের মতো নিষ্ক্রিয় থাকলে কক্সবাজারের অবস্থা আরও খারাপ হতো। এখন অন্তত অপরাধীরা পুলিশের উপস্থিতি টের পাচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষও স্বস্তি পাচ্ছে। তারা আরও বলেন, এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে কক্সবাজার সত্যিকার অর্থেই একটি নিরাপদ ও আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন নগরী হয়ে উঠবে।

এদিকে ট্যুরিস্ট পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের মো: মাইনুল হাসান, পিপিএম, এনডিসি অতিরিক্ত আইজি বলেন, পর্যটন শিল্পের টেকসই উন্নয়নের জন্য পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ট্যুরিস্ট পুলিশ শুরু থেকেই এই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। কক্সবাজারসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন এলাকাগুলোতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে আমরা জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করছি। তিনি বলেন, কক্সবাজারে অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদের নেতৃত্বে ট্যুরিস্ট পুলিশ মাঠপর্যায়ে আরও সক্রিয় ও কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। চাঁদাবাজি, ছিনতাই, পর্যটক হয়রানি এবং পর্যটন এলাকায় অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এর ফলে পর্যটকদের মধ্যে নিরাপত্তা ও আস্থার অনুভূতি বেড়েছে। ডিআইজি রুহুল আমিন আরও বলেন, “ট্যুরিস্ট পুলিশ শুধু আইন প্রয়োগকারী বাহিনী নয়, এটি একটি সেবা প্রদানকারী ইউনিট। তাই পর্যটকদের সঙ্গে পেশাদার ও সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ নিশ্চিত করতে আমরা সদস্যদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অনিয়ম বা হয়রানির অভিযোগ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে দেশি ও বিদেশি পর্যটকদের জন্য বাংলাদেশকে একটি নিরাপদ ও বন্ধুবান্ধব পর্যটন গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলা। এই লক্ষ্যে ট্যুরিস্ট পুলিশ আগামীতেও কঠোর ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে।

বিষয় : চাঁদাবাজ ছিনতাইকারী আপেল মাহমুদ

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬


চাঁদাবাজ-ছিনতাইকারীদের লাগাম টানলেন ট্যুরিস্ট পুলিশের আপেল মাহমুদ

প্রকাশের তারিখ : ১৭ জানুয়ারি ২০২৬

featured Image

বাংলাদেশের পর্যটন রাজধানী কক্সবাজার বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতের জন্য পরিচিত এই শহর শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই নয়, দেশের অর্থনীতি ও পর্যটন শিল্পের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবছর দেশ-বিদেশ থেকে লাখো পর্যটক কক্সবাজারে ভিড় করেন। তবে দীর্ঘদিন ধরে এই পর্যটন নগরী অপরাধ, চাঁদাবাজি, পর্যটক হয়রানি, অবৈধ দখল ও ছিনতাইয়ের অভিযোগে আলোচিত ছিল। পর্যটনের বিকাশ যেখানে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার ওপর নির্ভরশীল, সেখানে এসব অনিয়ম কক্সবাজারের ভাবমূর্তিকে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

সম্প্রতি এই চিত্রে দৃশ্যমান পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কক্সবাজারে ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর আপেল মাহমুদের নেতৃত্বে অপরাধ দমনে নেওয়া কঠোর অবস্থান ইতোমধ্যে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে পর্যটন সংশ্লিষ্ট মহল সবখানেই আলোচিত হচ্ছে তার কার্যকর ভূমিকা।

ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদ দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই কক্সবাজারের পর্যটন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সরেজমিনে পর্যালোচনা করেন। তিনি শুধু দপ্তরে বসে নির্দেশনা দেননি, বরং সমুদ্র সৈকত, হোটেল-মোটেল এলাকা, কলাতলী, লাবণী পয়েন্ট, ইনানী, হিমছড়ি, মেরিন ড্রাইভসহ গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন স্পটগুলোতে সরাসরি পরিদর্শনে যান।

পর্যটন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে তিনি প্রথমেই চিহ্নিত করেন প্রধান সমস্যাগুলো (১) পর্যটকদের ওপর প্রকাশ্য চাঁদাবাজি (২) হোটেল ও রেস্টুরেন্টে অতিরিক্ত বিল আদায় (৩) অবৈধ দোকান ও স্থাপনা দখল (৪) রাতের বেলায় ছিনতাই ও মাদক কারবার (৫) ট্যুর গাইড ও সেবাদানকারীদের নামে প্রতারণা (৬) স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী চক্রের দৌরাত্ম্য। এসব সমস্যার বিরুদ্ধে তিনি “জিরো টলারেন্স” নীতি ঘোষণা করেন, যা এর আগে ট্যুরিস্ট পুলিশের ক্ষেত্রে খুব একটা কার্যকরভাবে দেখা যায়নি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দীর্ঘদিন ধরে কক্সবাজারে পর্যটকদের জন্য সবচেয়ে বড় আতঙ্ক ছিল চাঁদাবাজি ও ছিনতাই। সমুদ্র সৈকতে ঘোড়া চালানো, বিচ বেড, ছবি তোলা, খাবার কেনা—প্রায় সব ক্ষেত্রেই পর্যটকদের অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ ছিল নিয়মিত। অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদের নির্দেশে ট্যুরিস্ট পুলিশ এই অনিয়মের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান শুরু করে। প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি ও হয়রানির অভিযোগে একাধিক ব্যক্তিকে আটক ও জরিমানা করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক শাস্তিও নিশ্চিত করা হয়।

কক্সবাজারের পর্যটন এলাকার আরেকটি বড় সমস্যা ছিল অবৈধ দখল। সৈকতের আশপাশে ফুটপাত, বালিয়াড়ি ও সরকারি জমিতে অবৈধ দোকান ও স্থাপনা গড়ে উঠেছিল। এতে একদিকে পরিবেশ নষ্ট হচ্ছিল, অন্যদিকে পর্যটকদের চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছিল। আপেল মাহমুদের নেতৃত্বে ট্যুরিস্ট পুলিশ স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে অবৈধ দখল উচ্ছেদে কঠোর ভূমিকা নেয়। একাধিক অভিযান চালিয়ে সৈকত এলাকা থেকে অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে ফেলা হয়। এতে শুরুতে কিছু প্রতিক্রিয়া দেখা দিলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি পর্যটকদের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনে। এর আগে কক্সবাজারে পর্যটক হয়রানির অভিযোগ নতুন কিছু ছিল না। অনেক ক্ষেত্রে ট্যুরিস্ট পুলিশের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগও উঠেছে অতীতে। তবে আপেল মাহমুদের সময়ে এই চিত্রে পরিবর্তন এসেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদের বিভিন্ন অভিযানের ছবি ও ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। কখনো তাকে দেখা গেছে সৈকতে হেঁটে হেঁটে পর্যটকদের সঙ্গে কথা বলতে, কখনো আবার অভিযানে নেতৃত্ব দিতে। পর্যটন সংশ্লিষ্ট অনেকের মতে, এর আগে কক্সবাজারে ট্যুরিস্ট পুলিশের ভূমিকা তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল। দায়িত্ব থাকলেও কার্যকর নজরদারি ও অপরাধ দমনে দৃশ্যমান উপস্থিতি খুব একটা চোখে পড়েনি। আপেল মাহমুদের নেতৃত্বে ট্যুরিস্ট পুলিশ এখন শুধু একটি নামমাত্র বাহিনী নয়, বরং মাঠপর্যায়ে সক্রিয় একটি শক্তিশালী ইউনিট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে পর্যটন শিল্পে। হোটেল মালিক, রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী ও ট্যুর অপারেটররা বলছেন, পর্যটকদের আস্থা বাড়ছে। পরিবার নিয়ে নির্ভয়ে ভ্রমণে আসছেন অনেকে। পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে কক্সবাজার আন্তর্জাতিক পর্যটন নগরী হিসেবে আরও এগিয়ে যেতে পারবে। সব ইতিবাচক পরিবর্তনের পরও চ্যালেঞ্জ পুরোপুরি শেষ হয়নি। মৌসুমে পর্যটকের চাপ, মাদক কারবার, কিছু প্রভাবশালী চক্রের তৎপরতা—এসব মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আপেল মাহমুদের মতো কঠোর ও মাঠমুখী নেতৃত্ব থাকলে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব।

কক্সবাজারের পর্যটন নিরাপত্তায় অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদের ভূমিকা একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। চাঁদাবাজি, ছিনতাই, অবৈধ দখল ও পর্যটক হয়রানির বিরুদ্ধে তার কঠোর অবস্থান শুধু আইনশৃঙ্খলাই নয়, কক্সবাজারের ভাবমূর্তিও রক্ষা করছে। পর্যটন শিল্পের টেকসই উন্নয়নের জন্য এমন নেতৃত্ব অপরিহার্য—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল। এখন দেখার বিষয়, এই ধারাবাহিকতা কতটা বজায় রাখা যায় এবং কক্সবাজার কত দ্রুত একটি নিরাপদ আন্তর্জাতিক পর্যটন নগরীতে পরিণত হয়।

এদিকে কক্সবাজারে বেড়াতে আসা এক পর্যটক বলেন, আমি পরিবার নিয়ে আগেও কক্সবাজারে এসেছি। তখন সমুদ্র সৈকতে হাঁটলেই নানা ধরনের হয়রানির মুখে পড়তে হতো। ছবি তোলা, বিচ বেড বা ঘোড়া চালানো—সব ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত টাকা চাইত। এবার এসে পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে গেছে। ট্যুরিস্ট পুলিশের সদস্যদের আগের চেয়ে বেশি সক্রিয় দেখা যাচ্ছে। কোথাও কোনো সমস্যা হলে দ্রুত তারা উপস্থিত হচ্ছেন। এতে পর্যটক হিসেবে নিরাপত্তার অনুভূতি বেড়েছে।

স্থানীয় আবুল হোসেন নামের এক হোটেল ব্যবসায়ী বলেন, আগে কিছু চাঁদাবাজ চক্র পর্যটকদের ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করত। এতে আমাদের ব্যবসার সুনাম নষ্ট হচ্ছিল। অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদের দায়িত্ব নেওয়ার পর এসবের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অবৈধ দোকান উচ্ছেদ হওয়ায় পরিবেশও পরিষ্কার হয়েছে। পর্যটকরা এখন আগের তুলনায় স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন।

আরও পড়ুন, জাতীয় পার্টির প্রার্থী ব্যারিস্টার মঞ্জুম আলী রংপুর ১ আসনে মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা

স্থানীয় আরেক বাসিন্দা বলেন, ট্যুরিস্ট পুলিশের ভূমিকা আগের মতো নিষ্ক্রিয় থাকলে কক্সবাজারের অবস্থা আরও খারাপ হতো। এখন অন্তত অপরাধীরা পুলিশের উপস্থিতি টের পাচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষও স্বস্তি পাচ্ছে। তারা আরও বলেন, এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে কক্সবাজার সত্যিকার অর্থেই একটি নিরাপদ ও আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন নগরী হয়ে উঠবে।

এদিকে ট্যুরিস্ট পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের মো: মাইনুল হাসান, পিপিএম, এনডিসি অতিরিক্ত আইজি বলেন, পর্যটন শিল্পের টেকসই উন্নয়নের জন্য পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ট্যুরিস্ট পুলিশ শুরু থেকেই এই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। কক্সবাজারসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন এলাকাগুলোতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে আমরা জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করছি। তিনি বলেন, কক্সবাজারে অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদের নেতৃত্বে ট্যুরিস্ট পুলিশ মাঠপর্যায়ে আরও সক্রিয় ও কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। চাঁদাবাজি, ছিনতাই, পর্যটক হয়রানি এবং পর্যটন এলাকায় অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এর ফলে পর্যটকদের মধ্যে নিরাপত্তা ও আস্থার অনুভূতি বেড়েছে। ডিআইজি রুহুল আমিন আরও বলেন, “ট্যুরিস্ট পুলিশ শুধু আইন প্রয়োগকারী বাহিনী নয়, এটি একটি সেবা প্রদানকারী ইউনিট। তাই পর্যটকদের সঙ্গে পেশাদার ও সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ নিশ্চিত করতে আমরা সদস্যদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অনিয়ম বা হয়রানির অভিযোগ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে দেশি ও বিদেশি পর্যটকদের জন্য বাংলাদেশকে একটি নিরাপদ ও বন্ধুবান্ধব পর্যটন গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলা। এই লক্ষ্যে ট্যুরিস্ট পুলিশ আগামীতেও কঠোর ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে।


দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

সম্পাদক ও প্রকাশক: এ বি এম মনিরুজ্জামান 
নির্বাহী সম্পাদক: রিপন রুদ্র
যুগ্ম সম্পাদক: জাকিয়া সুলতানা (লাভলী)

কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক সংবাদ দিগন্ত । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত