দৈনিক সংবাদ দিগন্ত
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫

আজ মহান বিজয় দিবস

আজ মহান বিজয় দিবস
আজ মহান বিজয় দিবস

  1. অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদই দেশপ্রেম
  2. মহান বিজয় দিবসের তাৎপর্য ও শিক্ষা
  3. মহান বিজয় দিবস আমাদের শেখায়
  4. স্বাধীনতা রক্ষা করতে হয় প্রতিদিন
  5. ঐক্যই জাতির সবচেয়ে বড় শক্তি
  6. ইতিহাস বিকৃতি সবচেয়ে বড় শত্রু

আজ ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস। বাঙালি জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবময়, সবচেয়ে আবেগঘন ও সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিন। এই দিনটি শুধু একটি রাষ্ট্রের জন্মদিন নয়, এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়, আত্মমর্যাদা ও স্বাধীন সত্তার চূড়ান্ত ঘোষণা।  

দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের এই দিনে বিশ্বের বুকে আত্মপ্রকাশ করে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ। মহান বিজয় দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় স্বাধীনতা কখনো উপহার হিসেবে আসে না। এটি অর্জন করতে হয় রক্ত, ত্যাগ, অশ্রু ও সীমাহীন আত্মবিসর্জনের মাধ্যমে। লাখো শহীদের প্রাণ, অসংখ্য মা-বোনের সম্ভ্রম, কোটি মানুষের উদ্বাস্তু জীবন এবং অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বের বিনিময়ে অর্জিত এই বিজয় বাঙালি জাতির চিরন্তন অহংকার। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির মাধ্যমে জন্ম নেয় পাকিস্তান। পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান দুটি অংশের মাঝে ছিল হাজার মাইলের ভৌগোলিক দূরত্ব, কিন্তু তার চেয়েও বড় ছিল রাজনৈতিক ও মানসিক ব্যবধান। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী হওয়া সত্ত্বেও পূর্ব বাংলার মানুষকে শুরু থেকেই পরিকল্পিতভাবে বঞ্চিত করা হয়।

আরও পড়ুন, দেশের নির্বাচন পর্যবেক্ষণে আন্তর্জাতিক নজরদারির নতুন রেকর্ড

রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা, অর্থনৈতিক সম্পদের সিংহভাগ পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যয়, প্রশাসন ও সেনাবাহিনীতে বাঙালিদের অবমূল্যায়ন সব মিলিয়ে পূর্ব বাংলার মানুষ ধীরে ধীরে বুঝতে পারে, এই রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে তাদের ন্যায্য অধিকার পাওয়া অসম্ভব। এই শোষণের বিরুদ্ধে প্রথম সংগঠিত প্রতিবাদ আসে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ ভাষা শহীদদের রক্তে লেখা হয় বাঙালির অধিকার আন্দোলনের প্রথম অধ্যায়। এরপর আসে ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান—যার প্রতিটি ধাপই স্বাধীনতার পথকে আরও সুস্পষ্ট করে তোলে।

১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। গণতান্ত্রিক নিয়ম অনুযায়ী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তরের কথা থাকলেও পাকিস্তানি সামরিক জান্তা তা মানতে অস্বীকৃতি জানায়। এই বিশ্বাসঘাতকতার মধ্য দিয়েই চূড়ান্ত সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণ করে পাকিস্তানি বাহিনী গোপনে প্রস্তুতি নিতে থাকে এক ভয়াবহ গণহত্যার। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াল রাত। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে ঢাকাসহ সারাদেশে নির্বিচারে গণহত্যা শুরু করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো, ইপিআর ব্যারাক, রাজারবাগ পুলিশ লাইন সবখানে চলে হত্যাযজ্ঞ।

নিরস্ত্র মানুষ, ছাত্র, শিক্ষক, পুলিশ, সাধারণ নাগরিক কেউই রেহাই পায়নি। এটি কোনো পেশাদার সেনাবাহিনীর যুদ্ধ ছিল না এটি ছিল সাধারণ মানুষের যুদ্ধ। কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, শিক্ষক, নারী-পুরুষ সবাই যার যার অবস্থান থেকে যুদ্ধে অংশ নেয়। মুক্তিযোদ্ধারা সংগঠিত হন বিভিন্ন অঞ্চলে। পরে মুজিবনগরে গঠিত হয় প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার। দেশকে ১১ টি সেক্টরে ভাগ করে পরিচালিত হয় মুক্তিযুদ্ধ। সীমিত অস্ত্র, অপ্রতুল প্রশিক্ষণ আর অসীম সাহস নিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যান। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস ছিল বাঙালি জাতির জন্য এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের সময়। পাকিস্তানি বাহিনী পরিকল্পিতভাবে গ্রাম পোড়ায়, মানুষ হত্যা করে, নারীদের ওপর চালায় পাশবিক নির্যাতন।

আরও পড়ুন, বিজয় দিবস উপলক্ষে সড়ক চলাচলে নির্দেশনা জারি এমপি

প্রায় ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হন, দুই লক্ষাধিক নারী নির্যাতনের শিকার হন, এবং এক কোটির বেশি মানুষ ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। ইতিহাসের পাতায় এটি একটি নির্মম গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত। মুক্তিযুদ্ধ ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচিত হতে থাকে। বিশ্বের বিবেকবান মানুষ বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন জানায়। শরণার্থীর ঢল সামলাতে গিয়ে ভারতও সরাসরি সংকটের মুখে পড়ে। ডিসেম্বরের শুরুতে পাকিস্তান ভারতের ওপর আক্রমণ চালালে যুদ্ধ আন্তর্জাতিক রূপ নেয়। ভারতীয় মিত্রবাহিনী সরাসরি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। যৌথ বাহিনীর আক্রমণে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী দ্রুত পর্যুদস্ত হতে থাকে। পরাজয় নিশ্চিত জেনে পাকিস্তানি বাহিনী ১৪ ডিসেম্বর দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হত্যা করে। শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাহিত্যিক যারা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনে নেতৃত্ব দিতে পারতেন, তাদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এই বুদ্ধিজীবী হত্যা ছিল একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র—স্বাধীন বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করে দেওয়ার অপচেষ্টা। কিন্তু ইতিহাস প্রমাণ করেছে, এই ষড়যন্ত্রও ব্যর্থ হয়েছে।

আরও পড়ুন, নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান প্রেস সচিবের

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রায় ৯৩ হাজার সদস্য যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। এটি ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় সামরিক আত্মসমর্পণ। লাল সবুজের পতাকা উড়ে স্বাধীন বাংলাদেশের আকাশে। বাঙালি জাতি পায় তাদের বহু কাঙ্ক্ষিত বিজয়। এই দিনটি আমাদের আত্মবিশ্লেষণেরও সুযোগ দেয় আমরা কি শহীদদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে পেরেছি? প্রতি বছর মহান বিজয় দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে উদযাপিত হয়। জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন, কুচকাওয়াজ, আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সব মিলিয়ে দিনটি হয়ে ওঠে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যম পালন করে বিশেষ কর্মসূচি। নতুন প্রজন্মকে ইতিহাস জানানো হয়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করা হয়। গণমাধ্যম বিজয় দিবসের ইতিহাস সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রতিবেদন, স্মৃতিচারণ, অনুসন্ধানী লেখা ও বিশেষ আয়োজন ইতিহাস বিকৃতি রোধে সহায়ক। সাংবাদিকদের দায়িত্ব—মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রাখা এবং অপশক্তির বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকা। যারা যুদ্ধ দেখেনি, তারাই ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়বে।  মহান বিজয় দিবস কেবল অতীতের স্মৃতি নয় এটি ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা। এই বিজয় আমাদের সাহস দেয়, শক্তি দেয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রেরণা দেয়। আজ ১৬ ডিসেম্বর, লাল সবুজের পতাকার দিকে তাকিয়ে আমাদের শপথ হওয়া উচিত শহীদদের রক্ত বৃথা যেতে দেব না। একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়াই হবে মহান বিজয় দিবসের প্রকৃত শ্রদ্ধা।

বিষয় : বিজয় বাঙালি তাৎপর্যপূর্ণ

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬


আজ মহান বিজয় দিবস

প্রকাশের তারিখ : ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫

featured Image

  1. অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদই দেশপ্রেম
  2. মহান বিজয় দিবসের তাৎপর্য ও শিক্ষা
  3. মহান বিজয় দিবস আমাদের শেখায়
  4. স্বাধীনতা রক্ষা করতে হয় প্রতিদিন
  5. ঐক্যই জাতির সবচেয়ে বড় শক্তি
  6. ইতিহাস বিকৃতি সবচেয়ে বড় শত্রু

আজ ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস। বাঙালি জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবময়, সবচেয়ে আবেগঘন ও সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিন। এই দিনটি শুধু একটি রাষ্ট্রের জন্মদিন নয়, এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়, আত্মমর্যাদা ও স্বাধীন সত্তার চূড়ান্ত ঘোষণা।  

দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের এই দিনে বিশ্বের বুকে আত্মপ্রকাশ করে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ। মহান বিজয় দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় স্বাধীনতা কখনো উপহার হিসেবে আসে না। এটি অর্জন করতে হয় রক্ত, ত্যাগ, অশ্রু ও সীমাহীন আত্মবিসর্জনের মাধ্যমে। লাখো শহীদের প্রাণ, অসংখ্য মা-বোনের সম্ভ্রম, কোটি মানুষের উদ্বাস্তু জীবন এবং অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বের বিনিময়ে অর্জিত এই বিজয় বাঙালি জাতির চিরন্তন অহংকার। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির মাধ্যমে জন্ম নেয় পাকিস্তান। পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান দুটি অংশের মাঝে ছিল হাজার মাইলের ভৌগোলিক দূরত্ব, কিন্তু তার চেয়েও বড় ছিল রাজনৈতিক ও মানসিক ব্যবধান। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী হওয়া সত্ত্বেও পূর্ব বাংলার মানুষকে শুরু থেকেই পরিকল্পিতভাবে বঞ্চিত করা হয়।

আরও পড়ুন, দেশের নির্বাচন পর্যবেক্ষণে আন্তর্জাতিক নজরদারির নতুন রেকর্ড

রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা, অর্থনৈতিক সম্পদের সিংহভাগ পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যয়, প্রশাসন ও সেনাবাহিনীতে বাঙালিদের অবমূল্যায়ন সব মিলিয়ে পূর্ব বাংলার মানুষ ধীরে ধীরে বুঝতে পারে, এই রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে তাদের ন্যায্য অধিকার পাওয়া অসম্ভব। এই শোষণের বিরুদ্ধে প্রথম সংগঠিত প্রতিবাদ আসে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ ভাষা শহীদদের রক্তে লেখা হয় বাঙালির অধিকার আন্দোলনের প্রথম অধ্যায়। এরপর আসে ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান—যার প্রতিটি ধাপই স্বাধীনতার পথকে আরও সুস্পষ্ট করে তোলে।

১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। গণতান্ত্রিক নিয়ম অনুযায়ী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তরের কথা থাকলেও পাকিস্তানি সামরিক জান্তা তা মানতে অস্বীকৃতি জানায়। এই বিশ্বাসঘাতকতার মধ্য দিয়েই চূড়ান্ত সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণ করে পাকিস্তানি বাহিনী গোপনে প্রস্তুতি নিতে থাকে এক ভয়াবহ গণহত্যার। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াল রাত। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে ঢাকাসহ সারাদেশে নির্বিচারে গণহত্যা শুরু করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো, ইপিআর ব্যারাক, রাজারবাগ পুলিশ লাইন সবখানে চলে হত্যাযজ্ঞ।

নিরস্ত্র মানুষ, ছাত্র, শিক্ষক, পুলিশ, সাধারণ নাগরিক কেউই রেহাই পায়নি। এটি কোনো পেশাদার সেনাবাহিনীর যুদ্ধ ছিল না এটি ছিল সাধারণ মানুষের যুদ্ধ। কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, শিক্ষক, নারী-পুরুষ সবাই যার যার অবস্থান থেকে যুদ্ধে অংশ নেয়। মুক্তিযোদ্ধারা সংগঠিত হন বিভিন্ন অঞ্চলে। পরে মুজিবনগরে গঠিত হয় প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার। দেশকে ১১ টি সেক্টরে ভাগ করে পরিচালিত হয় মুক্তিযুদ্ধ। সীমিত অস্ত্র, অপ্রতুল প্রশিক্ষণ আর অসীম সাহস নিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যান। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস ছিল বাঙালি জাতির জন্য এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের সময়। পাকিস্তানি বাহিনী পরিকল্পিতভাবে গ্রাম পোড়ায়, মানুষ হত্যা করে, নারীদের ওপর চালায় পাশবিক নির্যাতন।

আরও পড়ুন, বিজয় দিবস উপলক্ষে সড়ক চলাচলে নির্দেশনা জারি এমপি

প্রায় ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হন, দুই লক্ষাধিক নারী নির্যাতনের শিকার হন, এবং এক কোটির বেশি মানুষ ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। ইতিহাসের পাতায় এটি একটি নির্মম গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত। মুক্তিযুদ্ধ ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচিত হতে থাকে। বিশ্বের বিবেকবান মানুষ বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন জানায়। শরণার্থীর ঢল সামলাতে গিয়ে ভারতও সরাসরি সংকটের মুখে পড়ে। ডিসেম্বরের শুরুতে পাকিস্তান ভারতের ওপর আক্রমণ চালালে যুদ্ধ আন্তর্জাতিক রূপ নেয়। ভারতীয় মিত্রবাহিনী সরাসরি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। যৌথ বাহিনীর আক্রমণে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী দ্রুত পর্যুদস্ত হতে থাকে। পরাজয় নিশ্চিত জেনে পাকিস্তানি বাহিনী ১৪ ডিসেম্বর দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হত্যা করে। শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাহিত্যিক যারা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনে নেতৃত্ব দিতে পারতেন, তাদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এই বুদ্ধিজীবী হত্যা ছিল একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র—স্বাধীন বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করে দেওয়ার অপচেষ্টা। কিন্তু ইতিহাস প্রমাণ করেছে, এই ষড়যন্ত্রও ব্যর্থ হয়েছে।

আরও পড়ুন, নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান প্রেস সচিবের

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রায় ৯৩ হাজার সদস্য যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। এটি ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় সামরিক আত্মসমর্পণ। লাল সবুজের পতাকা উড়ে স্বাধীন বাংলাদেশের আকাশে। বাঙালি জাতি পায় তাদের বহু কাঙ্ক্ষিত বিজয়। এই দিনটি আমাদের আত্মবিশ্লেষণেরও সুযোগ দেয় আমরা কি শহীদদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে পেরেছি? প্রতি বছর মহান বিজয় দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে উদযাপিত হয়। জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন, কুচকাওয়াজ, আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সব মিলিয়ে দিনটি হয়ে ওঠে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যম পালন করে বিশেষ কর্মসূচি। নতুন প্রজন্মকে ইতিহাস জানানো হয়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করা হয়। গণমাধ্যম বিজয় দিবসের ইতিহাস সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রতিবেদন, স্মৃতিচারণ, অনুসন্ধানী লেখা ও বিশেষ আয়োজন ইতিহাস বিকৃতি রোধে সহায়ক। সাংবাদিকদের দায়িত্ব—মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রাখা এবং অপশক্তির বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকা। যারা যুদ্ধ দেখেনি, তারাই ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়বে।  মহান বিজয় দিবস কেবল অতীতের স্মৃতি নয় এটি ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা। এই বিজয় আমাদের সাহস দেয়, শক্তি দেয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রেরণা দেয়। আজ ১৬ ডিসেম্বর, লাল সবুজের পতাকার দিকে তাকিয়ে আমাদের শপথ হওয়া উচিত শহীদদের রক্ত বৃথা যেতে দেব না। একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়াই হবে মহান বিজয় দিবসের প্রকৃত শ্রদ্ধা।


দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

সম্পাদক ও প্রকাশক: এ বি এম মনিরুজ্জামান 
নির্বাহী সম্পাদক: রিপন রুদ্র
যুগ্ম সম্পাদক: জাকিয়া সুলতানা (লাভলী)

কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক সংবাদ দিগন্ত । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত