বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বিস্তৃত পার্বত্য চট্টগ্রাম আজ বহু মাত্রিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে জাতীয় নিরাপত্তা, সীমান্ত সুরক্ষা, বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাব, আন্তর্জাতিক প্রভাব এবং রাষ্ট্রবিরোধী সশস্ত্র তৎপরতা মিলেমিশে একটি জটিল এবং দীর্ঘস্থায়ী সংকট সৃষ্টি করেছে, আর এই সংকট মোকাবিলায় শক্তিশালী ও ব্যাপক সেনা উপস্থিতি অপরিহার্য হয়ে উঠেছে; কারণ পার্বত্য চট্টগ্রাম শুধুই একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয় এটি একইসঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্তশাসনের একটি দুর্বল প্রবেশদ্বার, অস্ত্র ও মাদক পাচারের আন্তর্জাতিক করিডোর, ভিন্নমুখী নৃগোষ্ঠী ও রাজনৈতিক মতাদর্শের মিলনস্থল, এবং দক্ষিণ এশীয় ভূরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ একটি কৌশলগত উচ্চভূমি, যেখানে সেনাবাহিনীর শক্ত অবস্থান জাতীয় সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখার অন্যতম শর্ত। নিরাপত্তা বাহিনী প্রত্যাহার ছিল সন্তুলারমার দেশের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ এই অভিযোগ আজ পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়কে অস্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক মহলের কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী, বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তির প্ররোচনায়, নিরাপত্তা বাহিনীকে ধীরে ধীরে দুর্বল করার পরিকল্পনা চালিয়ে আসছে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে “শান্তি” ও “অধিকার” নামের আড়ালে সেনা উপস্থিতি হ্রাসের তীব্র চাপ তৈরি করা হয়েছে, যা বাস্তবে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তাকে আজ চরম ঝুঁকির মুখে দাঁড় করিয়েছে।
আরও পড়ুন, পলাশবাড়ীতে শিক্ষক সমাবেশ ও মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত
নিরাপত্তা বাহিনীর নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে যখন শান্তি ও উন্নয়ন এগিয়ে যাচ্ছিল, তখনই সেনা প্রত্যাহারকে সামনে রেখে বিভিন্ন সশস্ত্র সংগঠন পুনরায় সক্রিয় হয়ে পড়েছে। অস্ত্র পাচার বেড়েছে, অপহরণ-চাঁদাবাজি নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি হুমকির মুখে পড়েছে। সীমান্তবর্তী এ অঞ্চলে ভারত-মিয়ানমারভিত্তিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর চলাফেরা সহজ হয়ে গেছে, যা নিঃসন্দেহে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা।
সন্তুলারমার মতো কিছু বিতর্কিত নেতার বক্তব্য, কার্যকলাপ ও গোপন যোগাযোগের ধরন স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে যে নিরাপত্তা বাহিনী সরানো ছিল একটি বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ, যার উদ্দেশ্য ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামকে দেশের ভৌগোলিক এবং কৌশলগত কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন করার পথ তৈরি করা। আজ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিটি ঘটনায় সেই ষড়যন্ত্রের ছায়া স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। তাই জাতীয় স্বার্থে পাহাড়ে টেকসই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শক্ত অবস্থান গ্রহণের বিকল্প নেই। বাস্তবতা হলো, সেনা উপস্থিতি কমিয়ে দিলে, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে গেলে কিংবা রাষ্ট্রীয় শক্তি দুর্বল দেখাতে শুরু করলে এই পুরো অঞ্চলটি খুব দ্রুত বিচ্ছিন্নতাবাদী রাজনীতির প্রবল চাপে ঢুকে যেতে পারে; কারণ বহু দশক ধরে একটি সংগঠিত এবং আন্তর্জাতিকভাবে প্রভাবিত কিছু গোষ্ঠী পৃথক পরিচয় ও পৃথক রাষ্ট্রের ধারণাকে উস্কানি দিয়ে আসছে, যা সময়ের সাথে সাথে নিরাপত্তা ঝুঁকিকে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছে। তাই আজ প্রশ্ন উঠছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জুম্মল্যান্ড হতে আর কত দূর? কারণ বিচ্ছিন্নতাবাদী ধারণা কখনোই একদিনে জন্মায় না; এটি ধীরে ধীরে, বহু বছরের প্রস্তুতির মাধ্যমে, আন্তর্জাতিক কাঠামোর সাহায্যে এবং স্থানীয়ভাবে বিকাশমান রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বের ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে ওঠে। বর্তমানে পার্বত্য অঞ্চলে যে সশস্ত্র তৎপরতা, গোষ্ঠীগত সংঘাত, আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা, অস্ত্র ব্যবসা, চাঁদাবাজি, অপহরণ, সীমান্ত পেরিয়ে সন্ত্রাসীদের চলাচল এবং বিদেশি স্বার্থান্বেষী মহলের নানামুখী সম্পৃক্ততা দেখা যাচ্ছে তা এই আশঙ্কাকে আরও প্রকট করেছে, এবং এ পরিস্থিতিতে সামান্য অল্পসংখ্যক সেনাবাহিনী দিয়ে এই পুরো অঞ্চলকে নিরাপদ রাখা সত্যিই কঠিন।
আরও পড়ুন, কোয়েলের আপত্তি
বাস্তবতা হলো, রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি এই তিনটি পাহাড়ি জেলা, সঙ্গে কক্সবাজার, ফেনী ও চট্টগ্রামের কিছু অংশ ভূরাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর; সীমান্তবর্তী রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক পরিকল্পনা, মানবাধিকার প্রশ্নে আন্তর্জাতিক চাপ, বহির্বিশ্বে লবিং ও মিডিয়া প্রোপাগান্ডা এসব মিলে এ অঞ্চলকে একটি বহুমাত্রিক সংঘাত সম্ভাব্যতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যেখানে প্রতিটি ভুল পদক্ষেপ রাষ্ট্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন গোষ্ঠী ও আন্তর্জাতিক মহল পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিশেষ স্ট্যাটাস অথবা ভিন্ন প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় আনার চিন্তা প্রকাশ করেছে; দেশে-বিদেশে বিভিন্ন সভা-সেমিনারে ‘স্বশাসন’, ‘স্বায়ত্তশাসন’, আর ‘জাতিগত স্বায়ত্ত্বিক রাষ্ট্র’ নিয়ে আলোচনা হয়েছে; আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার কিছু রিপোর্টেও ভুল ব্যাখ্যা উপস্থাপন করে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের ধারণাকে নরমভাবে প্রচার করা হয়েছে। এগুলো সবই একটি সমন্বিত কৌশলের অংশ বলেই মনে হয়, যা সময়ের সাথে আরও সুসংগঠিত হচ্ছে। বিশেষত পার্বত্য অঞ্চলের কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠীর অস্ত্র জমায়েত, নিজেদের ইউনিফর্ম, পতাকা, শাসন কাঠামো এবং অভ্যন্তরীণ ‘মুক্ত এলাকা’ তৈরি করার চেষ্টা এসব কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরেই চলছে; এগুলো একপ্রকার রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অনুকরণ, যা শেষ পর্যন্ত বিচ্ছিন্নতাবাদী লক্ষ্য পূরণে ব্যবহৃত হতে পারে। সীমান্তবর্তী কিছু দেশের নীতিও এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে; কখনো রাজনৈতিক আশ্রয়, কখনো মানবাধিকার ইস্যুতে আন্তর্জাতিক লবিং, আবার কখনো সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র পাচার এসব মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে; তাছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের প্রভাব বিস্তার, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ, আরাকান ও চিন রাজ্যের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম, মাদক কার্টেল, এবং সীমান্তবর্তী মিলিশিয়া নেটওয়ার্কও পার্বত্য চট্টগ্রামের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। এ অবস্থায় যদি সেনা উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়, ক্যাম্পগুলো প্রত্যাহার করা হয়, অথবা প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয় তাহলে বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে, এবং আন্তর্জাতিক মহলের কাছে জুম্মল্যান্ডের নামে একটি নতুন রাষ্ট্রের দাবি তুলতে পারে; ইতিহাসে বহু উদাহরণ আছে যেখানে জাতিগত কিংবা ভূখণ্ডগত প্রশ্নকে কেন্দ্র করে নতুন রাষ্ট্র গঠনের আন্দোলন হঠাৎই সহিংস রূপ নেয়, এবং রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে সংকটে ফেলে; এশিয়া, আফ্রিকা এবং ইউরোপে এমন বহু উদাহরণ পাওয়া যায়, আর পার্বত্য চট্টগ্রামকে সেই পথে নিয়ে যেতে কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী সচেষ্ট এটা অস্বীকার করা যায় না। এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো বাংলাদেশ কি পর্যাপ্ত প্রস্তুত রয়েছে? সীমান্তে কি যথেষ্ট নজরদারি আছে? নিরাপত্তা বাহিনীর সংখ্যা কি যথেষ্ট? সীমান্ত পাহারা কি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিচালিত হচ্ছে? সেনা ক্যাম্প কমানো বা প্রত্যাহার কি জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্বত্য চুক্তির নামে যে সমস্ত প্রশাসনিক ছাড় দেওয়া হয়েছে, সেগুলো কি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণকে দুর্বল করছে? এসব প্রশ্নের উত্তর আজ রাষ্ট্রকে সুনির্দিষ্টভাবে খুঁজে বের করতে হবে।
আরও পড়ুন, ওসমান হাদীর ওপর সন্ত্রাসী হামলার প্রতিবাদে কুমিল্লায় বিএনপির বিক্ষোভ
কারণ অনেক আকাঙ্ক্ষিত হলেও বাস্তবতা হলো শুধুমাত্র আলোচনায়, প্রশাসনিক উদ্যোগে বা চুক্তির মাধ্যমে পাহাড়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না; এখানে শক্তিশালী সামরিক উপস্থিতি এবং গোয়েন্দা সংস্থার দক্ষ সমন্বয় প্রয়োজন, কারণ সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো কখনোই প্রকাশ্য রাজনীতিতে সন্তুষ্ট থাকে না তারা সুযোগ পেলেই অস্ত্র তুলে নেয় এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাবকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করে। তাই বলা হয় সেনাবাহিনী পাহাড়ে না থাকলে অনেক আগেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেত, এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী দাবিগুলো আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে শক্তি পেয়ে যেত। আজ যখন আবার সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম বাড়ছে, অস্ত্র পাচার চলছে, সীমান্তের ওপারে নিরাপদ আশ্রয় ও প্রশিক্ষণের অভিযোগ শোনা যাচ্ছে, বিদেশি কিছু এনজিও ও ধর্মীয় মিশনারি সংগঠনও বিভিন্নভাবে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছে তখন রাষ্ট্রের উচিত সতর্ক হওয়া এবং প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণ করা। পরিস্থিতি যদি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে একটি সঙ্ঘটিত কাঠামো তৈরি হয়ে যেতে পারে, যা পরবর্তীতে স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবি তুলবে। প্রথমে পার্বত্য এলাকায় নিয়ন্ত্রণ, পরে সমতল অঞ্চলের দিকে আগ্রাসী বিস্তার এটা বিচ্ছিন্নতাবাদী রাজনীতির সাধারণ রূপ, এবং তাই এই সম্ভাবনাকে হালকাভাবে নেওয়া যাবে না। এজন্য পার্বত্য অঞ্চলে সেনা ক্যাম্প সংখ্যা বৃদ্ধি, বর্ডার গার্ড ও সেনাবাহিনীর যৌথ নিরাপত্তা টহল, আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা, পাহাড়ি-সমতলবাসী সকল নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর অর্থনীতি ধ্বংস করা, এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করা এসবই সময়ের দাবি। স্বাধীনতাযুদ্ধের চেতনা আজও আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি; জাতির সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব; মাটি ও মানুষের এই দেশকে রক্ষা করতে হলে পাহাড়কে স্থিতিশীল রাখা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই, আর সেই স্থিতিশীলতার প্রধান অবলম্বন হলো দৃঢ়, সুসংগঠিত, আধুনিক এবং ব্যাপক সেনা উপস্থিতি; কারণ রাষ্ট্র দুর্বল হলে বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়, আর রাষ্ট্র শক্ত হলে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়; তাই আজ এই সংকটময় সময়ে আমাদের অঙ্গীকার হতে হবে মাতৃভূমি রক্ষায় প্রয়োজন হলে আবারও স্বাধীনতার চেতনায় বলিয়ান হয়ে দাঁড়ানোর।
বিষয় : পাহাড় অপরিহার্যতা সেনা

মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বিস্তৃত পার্বত্য চট্টগ্রাম আজ বহু মাত্রিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে জাতীয় নিরাপত্তা, সীমান্ত সুরক্ষা, বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাব, আন্তর্জাতিক প্রভাব এবং রাষ্ট্রবিরোধী সশস্ত্র তৎপরতা মিলেমিশে একটি জটিল এবং দীর্ঘস্থায়ী সংকট সৃষ্টি করেছে, আর এই সংকট মোকাবিলায় শক্তিশালী ও ব্যাপক সেনা উপস্থিতি অপরিহার্য হয়ে উঠেছে; কারণ পার্বত্য চট্টগ্রাম শুধুই একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয় এটি একইসঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্তশাসনের একটি দুর্বল প্রবেশদ্বার, অস্ত্র ও মাদক পাচারের আন্তর্জাতিক করিডোর, ভিন্নমুখী নৃগোষ্ঠী ও রাজনৈতিক মতাদর্শের মিলনস্থল, এবং দক্ষিণ এশীয় ভূরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ একটি কৌশলগত উচ্চভূমি, যেখানে সেনাবাহিনীর শক্ত অবস্থান জাতীয় সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখার অন্যতম শর্ত। নিরাপত্তা বাহিনী প্রত্যাহার ছিল সন্তুলারমার দেশের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ এই অভিযোগ আজ পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়কে অস্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক মহলের কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী, বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তির প্ররোচনায়, নিরাপত্তা বাহিনীকে ধীরে ধীরে দুর্বল করার পরিকল্পনা চালিয়ে আসছে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে “শান্তি” ও “অধিকার” নামের আড়ালে সেনা উপস্থিতি হ্রাসের তীব্র চাপ তৈরি করা হয়েছে, যা বাস্তবে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তাকে আজ চরম ঝুঁকির মুখে দাঁড় করিয়েছে।
আরও পড়ুন, পলাশবাড়ীতে শিক্ষক সমাবেশ ও মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত
নিরাপত্তা বাহিনীর নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে যখন শান্তি ও উন্নয়ন এগিয়ে যাচ্ছিল, তখনই সেনা প্রত্যাহারকে সামনে রেখে বিভিন্ন সশস্ত্র সংগঠন পুনরায় সক্রিয় হয়ে পড়েছে। অস্ত্র পাচার বেড়েছে, অপহরণ-চাঁদাবাজি নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি হুমকির মুখে পড়েছে। সীমান্তবর্তী এ অঞ্চলে ভারত-মিয়ানমারভিত্তিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর চলাফেরা সহজ হয়ে গেছে, যা নিঃসন্দেহে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা।
সন্তুলারমার মতো কিছু বিতর্কিত নেতার বক্তব্য, কার্যকলাপ ও গোপন যোগাযোগের ধরন স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে যে নিরাপত্তা বাহিনী সরানো ছিল একটি বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ, যার উদ্দেশ্য ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামকে দেশের ভৌগোলিক এবং কৌশলগত কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন করার পথ তৈরি করা। আজ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিটি ঘটনায় সেই ষড়যন্ত্রের ছায়া স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। তাই জাতীয় স্বার্থে পাহাড়ে টেকসই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শক্ত অবস্থান গ্রহণের বিকল্প নেই। বাস্তবতা হলো, সেনা উপস্থিতি কমিয়ে দিলে, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে গেলে কিংবা রাষ্ট্রীয় শক্তি দুর্বল দেখাতে শুরু করলে এই পুরো অঞ্চলটি খুব দ্রুত বিচ্ছিন্নতাবাদী রাজনীতির প্রবল চাপে ঢুকে যেতে পারে; কারণ বহু দশক ধরে একটি সংগঠিত এবং আন্তর্জাতিকভাবে প্রভাবিত কিছু গোষ্ঠী পৃথক পরিচয় ও পৃথক রাষ্ট্রের ধারণাকে উস্কানি দিয়ে আসছে, যা সময়ের সাথে সাথে নিরাপত্তা ঝুঁকিকে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছে। তাই আজ প্রশ্ন উঠছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জুম্মল্যান্ড হতে আর কত দূর? কারণ বিচ্ছিন্নতাবাদী ধারণা কখনোই একদিনে জন্মায় না; এটি ধীরে ধীরে, বহু বছরের প্রস্তুতির মাধ্যমে, আন্তর্জাতিক কাঠামোর সাহায্যে এবং স্থানীয়ভাবে বিকাশমান রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বের ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে ওঠে। বর্তমানে পার্বত্য অঞ্চলে যে সশস্ত্র তৎপরতা, গোষ্ঠীগত সংঘাত, আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা, অস্ত্র ব্যবসা, চাঁদাবাজি, অপহরণ, সীমান্ত পেরিয়ে সন্ত্রাসীদের চলাচল এবং বিদেশি স্বার্থান্বেষী মহলের নানামুখী সম্পৃক্ততা দেখা যাচ্ছে তা এই আশঙ্কাকে আরও প্রকট করেছে, এবং এ পরিস্থিতিতে সামান্য অল্পসংখ্যক সেনাবাহিনী দিয়ে এই পুরো অঞ্চলকে নিরাপদ রাখা সত্যিই কঠিন।
আরও পড়ুন, কোয়েলের আপত্তি
বাস্তবতা হলো, রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি এই তিনটি পাহাড়ি জেলা, সঙ্গে কক্সবাজার, ফেনী ও চট্টগ্রামের কিছু অংশ ভূরাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর; সীমান্তবর্তী রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক পরিকল্পনা, মানবাধিকার প্রশ্নে আন্তর্জাতিক চাপ, বহির্বিশ্বে লবিং ও মিডিয়া প্রোপাগান্ডা এসব মিলে এ অঞ্চলকে একটি বহুমাত্রিক সংঘাত সম্ভাব্যতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যেখানে প্রতিটি ভুল পদক্ষেপ রাষ্ট্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন গোষ্ঠী ও আন্তর্জাতিক মহল পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিশেষ স্ট্যাটাস অথবা ভিন্ন প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় আনার চিন্তা প্রকাশ করেছে; দেশে-বিদেশে বিভিন্ন সভা-সেমিনারে ‘স্বশাসন’, ‘স্বায়ত্তশাসন’, আর ‘জাতিগত স্বায়ত্ত্বিক রাষ্ট্র’ নিয়ে আলোচনা হয়েছে; আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার কিছু রিপোর্টেও ভুল ব্যাখ্যা উপস্থাপন করে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের ধারণাকে নরমভাবে প্রচার করা হয়েছে। এগুলো সবই একটি সমন্বিত কৌশলের অংশ বলেই মনে হয়, যা সময়ের সাথে আরও সুসংগঠিত হচ্ছে। বিশেষত পার্বত্য অঞ্চলের কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠীর অস্ত্র জমায়েত, নিজেদের ইউনিফর্ম, পতাকা, শাসন কাঠামো এবং অভ্যন্তরীণ ‘মুক্ত এলাকা’ তৈরি করার চেষ্টা এসব কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরেই চলছে; এগুলো একপ্রকার রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অনুকরণ, যা শেষ পর্যন্ত বিচ্ছিন্নতাবাদী লক্ষ্য পূরণে ব্যবহৃত হতে পারে। সীমান্তবর্তী কিছু দেশের নীতিও এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে; কখনো রাজনৈতিক আশ্রয়, কখনো মানবাধিকার ইস্যুতে আন্তর্জাতিক লবিং, আবার কখনো সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র পাচার এসব মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে; তাছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের প্রভাব বিস্তার, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ, আরাকান ও চিন রাজ্যের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম, মাদক কার্টেল, এবং সীমান্তবর্তী মিলিশিয়া নেটওয়ার্কও পার্বত্য চট্টগ্রামের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। এ অবস্থায় যদি সেনা উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়, ক্যাম্পগুলো প্রত্যাহার করা হয়, অথবা প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয় তাহলে বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে, এবং আন্তর্জাতিক মহলের কাছে জুম্মল্যান্ডের নামে একটি নতুন রাষ্ট্রের দাবি তুলতে পারে; ইতিহাসে বহু উদাহরণ আছে যেখানে জাতিগত কিংবা ভূখণ্ডগত প্রশ্নকে কেন্দ্র করে নতুন রাষ্ট্র গঠনের আন্দোলন হঠাৎই সহিংস রূপ নেয়, এবং রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে সংকটে ফেলে; এশিয়া, আফ্রিকা এবং ইউরোপে এমন বহু উদাহরণ পাওয়া যায়, আর পার্বত্য চট্টগ্রামকে সেই পথে নিয়ে যেতে কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী সচেষ্ট এটা অস্বীকার করা যায় না। এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো বাংলাদেশ কি পর্যাপ্ত প্রস্তুত রয়েছে? সীমান্তে কি যথেষ্ট নজরদারি আছে? নিরাপত্তা বাহিনীর সংখ্যা কি যথেষ্ট? সীমান্ত পাহারা কি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিচালিত হচ্ছে? সেনা ক্যাম্প কমানো বা প্রত্যাহার কি জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্বত্য চুক্তির নামে যে সমস্ত প্রশাসনিক ছাড় দেওয়া হয়েছে, সেগুলো কি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণকে দুর্বল করছে? এসব প্রশ্নের উত্তর আজ রাষ্ট্রকে সুনির্দিষ্টভাবে খুঁজে বের করতে হবে।
আরও পড়ুন, ওসমান হাদীর ওপর সন্ত্রাসী হামলার প্রতিবাদে কুমিল্লায় বিএনপির বিক্ষোভ
কারণ অনেক আকাঙ্ক্ষিত হলেও বাস্তবতা হলো শুধুমাত্র আলোচনায়, প্রশাসনিক উদ্যোগে বা চুক্তির মাধ্যমে পাহাড়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না; এখানে শক্তিশালী সামরিক উপস্থিতি এবং গোয়েন্দা সংস্থার দক্ষ সমন্বয় প্রয়োজন, কারণ সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো কখনোই প্রকাশ্য রাজনীতিতে সন্তুষ্ট থাকে না তারা সুযোগ পেলেই অস্ত্র তুলে নেয় এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাবকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করে। তাই বলা হয় সেনাবাহিনী পাহাড়ে না থাকলে অনেক আগেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেত, এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী দাবিগুলো আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে শক্তি পেয়ে যেত। আজ যখন আবার সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম বাড়ছে, অস্ত্র পাচার চলছে, সীমান্তের ওপারে নিরাপদ আশ্রয় ও প্রশিক্ষণের অভিযোগ শোনা যাচ্ছে, বিদেশি কিছু এনজিও ও ধর্মীয় মিশনারি সংগঠনও বিভিন্নভাবে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছে তখন রাষ্ট্রের উচিত সতর্ক হওয়া এবং প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণ করা। পরিস্থিতি যদি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে একটি সঙ্ঘটিত কাঠামো তৈরি হয়ে যেতে পারে, যা পরবর্তীতে স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবি তুলবে। প্রথমে পার্বত্য এলাকায় নিয়ন্ত্রণ, পরে সমতল অঞ্চলের দিকে আগ্রাসী বিস্তার এটা বিচ্ছিন্নতাবাদী রাজনীতির সাধারণ রূপ, এবং তাই এই সম্ভাবনাকে হালকাভাবে নেওয়া যাবে না। এজন্য পার্বত্য অঞ্চলে সেনা ক্যাম্প সংখ্যা বৃদ্ধি, বর্ডার গার্ড ও সেনাবাহিনীর যৌথ নিরাপত্তা টহল, আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা, পাহাড়ি-সমতলবাসী সকল নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর অর্থনীতি ধ্বংস করা, এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করা এসবই সময়ের দাবি। স্বাধীনতাযুদ্ধের চেতনা আজও আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি; জাতির সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব; মাটি ও মানুষের এই দেশকে রক্ষা করতে হলে পাহাড়কে স্থিতিশীল রাখা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই, আর সেই স্থিতিশীলতার প্রধান অবলম্বন হলো দৃঢ়, সুসংগঠিত, আধুনিক এবং ব্যাপক সেনা উপস্থিতি; কারণ রাষ্ট্র দুর্বল হলে বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়, আর রাষ্ট্র শক্ত হলে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়; তাই আজ এই সংকটময় সময়ে আমাদের অঙ্গীকার হতে হবে মাতৃভূমি রক্ষায় প্রয়োজন হলে আবারও স্বাধীনতার চেতনায় বলিয়ান হয়ে দাঁড়ানোর।

আপনার মতামত লিখুন