দৈনিক সংবাদ দিগন্ত
প্রকাশ : শনিবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫

জামায়াত,ছাড় দিতে রাজি নয় ইসলামী আন্দোলন

নরসিংদী-৫ আওয়ামী দুর্গ দখল নিতে মরিয়া বিএনপি

নরসিংদী-৫ আওয়ামী দুর্গ দখল নিতে মরিয়া বিএনপি
আওয়ামী দুর্গ দখল নিতে মরিয়া বিএনপি

মেঘনা, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, আড়িয়াল খাঁ ও কাঁকন নদী বিধৌত বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তর উপজেলা হিসেবে পরিচিত নরসিংদী জেলার রায়পুরা উপজেলা। ২৪ টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়েই গঠিত হয়েছে নরসিংদী-৫ আসন। বৃহত্তর এ আসনটির ভেতর রয়েছে ছয়টি রেল স্টেশন। বিগত দিনগুলোতে নরসিংদী জেলার পাঁচটি আসনের মধ্যে এ আসনটি বরাবরই আওয়ামী লীগের দখলে থাকলেও সংসদ সদস্যের চেয়ারটি একবার ছিলো জাতীয় পার্টি ও দুইবার ছিলো বিএনপির হাতে। নরসিংদী-৫ (রায়পুরা) আসনটিতে ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টি থেকে মাঈন উদ্দিন ভূঁইয়া এমপি নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিএনপির মনোনীত আবদুল আলী মৃধা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর থেকে টানা ৭ম বার আওয়ামী লীগ থেকে এমপি নির্বাচিত হন রাজি উদ্দিন আহমেদ রাজু। ফলে হাসিনা সরকারে পতনের আগ পর্যন্ত এ আসনটি আওয়ামী লীগের দখলে ছিলো।

নরসিংদী -৫ (রায়পুরা) আসনে বিএনপি'র মনোনীত প্রার্থী কেন্দ্রীয় বিএনপি'র বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সহ-সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার আশরাফ উদ্দিন বকুল এর নাম ঘোষণার পর বদলে গেছে দৃশ্যপট। দলীয় প্রার্থীকে বিজয়ী করতে পুরোদমে মাঠে নেমে পড়েছেন তৃণমূল নেতাকর্মীরা। এদিকে,আগে থেকেই প্রার্থী ঘোষণা করায় গণসংযোগে এগিয়ে আছেন জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা মো: জাহাঙ্গীর আলম ও  ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর এমপি পদপ্রার্থী মাওলানা মুহাম্মদ বদরুজ্জামান। এছাড়াও এনসিপিসহ অন্যান্য দলের নেতারা মাঠে উপস্থিতি জানান দিলেও কর্মী শোডাউনে তেমন একটা সুবিধা করতে পারেননি এখনো। অন্যদিকে,জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী আসনটিতে আওয়ামী লীগের সাবেক ৭ বারে সংসদ সদস্য রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজুসহ সব ডাকসাইটে নেতা পলাতক থাকায় এবং আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার আওয়ামী লীগের দুর্গটি দখলে নিতে মরিয়া বিএনপি-জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। সরেজমিন ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্বাচন ঘিরে আসনটিতে ইতোমধ্যে নানা হিসাব-নিকাশ করতে শুরু করেছেন ভোটাররা। দীর্ঘদিন ভোট না দেওয়ায় আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে তাদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ- উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের যারা এখনো ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি,তারা ভোট দিতে মুখিয়ে আছেন। এদিকে নির্বাচন ঘিরে ভোটারদের কণ্ঠেও এবার শোনা যাচ্ছে পরিবর্তনের বার্তা। দীর্ঘ আওয়ামী দুঃশাসনের অবসানের পর এবার ভোট নিয়ে বেশ সচেতন সাধারণ মানুষ। পাশাপাশি নির্বাচনের সময় সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত ও সংঘাত এড়াতে প্রশাসন এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে আন্তরিক হওয়ার আহ্বান তাদের। ঐতিহাসিকভাবে রায়পুরা আসনটি আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ১৯৯১ সালে এরশাদের পতনের পর একবার ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে বিএনপি নেতা আব্দুল আলী মৃধা এখান থেকে এমপি নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০৮ সালে আসনটি থেকে নৌকা প্রতীক নিয়ে এমপি হন রাজিউদ্দিন আহমেদ বাজু। এর পরে ২০১৪ থেকে ২০২৪-এর তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনে এমপি হন তিনি। আগামী নির্বাচনে বিএনপির মনোনীত হেভিওয়েট প্রার্থী কেন্দ্রীয় বিএনপি'র বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সহ-সম্পাদক এবং আমরা  বিএনপি পরিবারের উপদেষ্টা ইঞ্জিনিয়ার আশরাফ উদ্দিন বকুল প্রাথমিক প্রার্থী ঘোষণার পর থেকে তিনি নিজের মতো করে গুছিয়ে নিচ্ছেন এলাকা।

এদিকে জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী নিশ্চিত করায় প্রচারে কিছুটা এগিয়ে আছেন মাওলানা মো: জাহাঙ্গীর আলম। এছাড়া এই আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে মনোনীত প্রার্থী মাওলানা মুহাম্মদ বদরুজ্জামান রয়েছেন। রায়পুরাতে আরো কয়েকটি রাজনৈতিক দল আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থী দিতে পারে বলে জানা গেছে, যেখানে রয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), গণঅধিকার পরিষদসহ কয়েকটি দল। বিগত ১৬ বছর সরকারবিরোধী আন্দোলনে অনন্য ভূমিকা পালন করে বিএনপির রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচনায় ছিলেন  কেন্দ্রীয় বিএনপি'র বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সহ-সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার আশরাফ উদ্দিন বকুল। অন্যান্য নেতা যেখানে কর্মীদের মাঠে নামিয়ে দিয়ে পেছন থেকে আন্দোলন পরিচালনা করতেন, সেখানে বকুল নিজে আন্দোলনের সময় মাঠে থেকে সাধারণ একজন কর্মীর মতো পিকেটিংয়ে অংশ নিতেন, কর্মীদের মনোবল চাঙা রাখতেন। আন্দোলন-সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করায় বিভিন্ন সময় হামলা ও মামলার শিকার ভোগ করতে হয়েছে এই নেতাকে। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে রায়পুরা থেকে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচনে লড়েছিলেন বকুল। সরকার পতনের আন্দোলনে রাজপথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি।

আরও পড়ুন, নেত্রকোনায় সুস্বাস্থ্যের জন্য ফলিত পুষ্টি বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালা

স্থানীয় নেতাকর্মীরা বলছেন, আগামী নির্বাচনে রায়পুরাতে বিএনপির ধানের শীষের বিজয় হবে ইতিহাস সৃষ্টি করা, যার নেতৃত্বে থাকবেন ইঞ্জিনিয়ার আশরাফ উদ্দিন বকুল। এলাকায় তার জনপ্রিয়তা ও বিগত আন্দোলন-সংগ্রামেও তার অবদান মূল্যায়ন করে দল তাকে মনোনয়ন দিয়েছে। আর এর মর্যাদা তাকে এলাকার নেতাকর্মীরা দিতে প্রস্তুত। ইঞ্জিনিয়ার আশরাফ উদ্দিন বকুল বলেন,রায়পুরায় হচ্ছে বিএনপি'র দুর্গ, যদিও এখানে আওয়ামী লীগ প্রার্থী একাধিক বার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু প্রত্যেক বার তারা ভোট মেরে পাশ করেছেন। যেহেতু এবার সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে তাই প্রত্যক্ষ জনগণের ভোটের মাধ্যমে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমি রায়পুরা থেকে দেশনায়ক তারেক রহমানকে একটি অবিস্মরণীয় বিজয় উপহার দিতে চাই। ফেয়ার ইলেকশন হলে জনগণের ভোট বিপ্লবের মাধ্যমে ধানের শীর্ষ শতভাগ বিজয় লাভ করবে ইনশাআল্লাহ যা রায়পুরাতে ইতিহাস হয় থাকে বলে আমি মনে করি। জনগণ ধানের শীর্ষে ভোট দিবে এই কারণে যে, বিএনপি একটা পরীক্ষিত দল,বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনা তে ভালো মন্দ সব অভিজ্ঞতা আছে। কিন্তু অন্য দলের যে প্রার্থীগুলো আছে তাদের কিন্তু সেটা নেই। তাদের কিন্তু আছে কিছু শাখা প্রশাখা,বিএনপির কিন্তু সেখানে একটি বটবৃক্ষ। সুতরাং জনগণ বটবৃক্ষ কি ভেছে নিবে কোন শাখা প্রশাখাকে নয়। দ্বিতীয় তো সৎ ক্রিম ইমেজ একজন ইঞ্জিনিয়ারকে রায়পুরার জনগণ ভেছে নিবে,যা অন্য সব প্রার্থী থেকে টোটালি আলাদা। সবকিছু যাচাই বাছাই করে রায়পুরার মানুষ মনে করবে যে ধানের শীষের বিকল্প কোন কিছু হতে পারে না। এবার রায়পুরাতে ভোট বিপ্লব হবে। বিগত আন্দোলন- সংগ্রামে আমার যে অবদান এবং এলাকার জনগণের যে ভালোবাসা সব মিলিয়ে দলকে আমি দারুণ বিজয় দিতে পারব বলে আশাবাদী। আসনটিতে ইতোমধ্যে প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে জামায়াতে ইসলামী। রায়পুরা উপজেলা (সদর) এর জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা মো: জাহাঙ্গীর আলম আসনটি থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। নিয়মিত সভা-সমাবেশ ও প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। এলাকায় তার ব্যাপক জনপ্রিয়তাও রয়েছে। জাহাঙ্গীর আলম জানান, যেখানে যাচ্ছি সেখানেই জনগণের কাছে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। মানুষ আমাদের দেখে উৎসাহবোধ করছে,কথা বলছে। কারন বিগত ৫৪ বছরে এদেশের মানুষ অনেক দলকে দেখা হয়েছে। যেমন আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টিকে দেখেছেন । তারা দেশকে সন্ত্রাস,চাঁদাবাজ, দুর্নীতি থেকে মুক্ত করতে পারে নাই । এই কষ্ট থেকে মুক্ত পেতে এদেশের জনগণ এবার পরিবর্তন চাই এবং দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিতে চাই। কারন দাঁড়িপাল্লা হচ্ছে ইনসাবের প্রতীক,ন্যায়ের প্রতীক। সেখানে সকল মানুষের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত পাবে,দুর্নীতি থেকে মুক্ত হবে এবং সুন্দর একটি সমাজ পাবে এটা আমাদের আত্মবিশ্বাস এবং জনগণের কাছে এই মূল্যবোধ  জেগেছে তাই তারা দাঁড়িপাল্লাতে ভোট দিবে। আগামী নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে আমি আশাবাদী।

অন্যদিকে এই আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে মনোনীত প্রার্থী হাতপাখা প্রতীকে মাঠে নেমেছেন কলরব এর নির্বাহী পরিচালক মাওলানা মোহাম্মদ বদরুজ্জামান। তিনি বলেন, আমার দলের নিজস্ব একটা ভোটব্যাংক আছে। এছাড়াও রায়পুরার সবাই আমাকে ভালোভাবে চেনে-জানে। অবৈধ কোনো কাজের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। এলাকার মানুষ তাই আমাকে ভালোভাবেই গ্রহণ করছে। রায়পুরা ২৪ টি ইউনিয়নে আমি গিয়েছি অনেক মানুষের সাথে কথা বলেছি এবং মানুষের সাড়া পাচ্ছি। অভ্যুত্থানের পরিবর্তে সময়ে মানুষ এখন আর পুরনো কালচার দেখতে চাচ্ছে না। মানুষ এখন কল্যাণের রাজনীতি চাই,উন্নয়নের রাজনীতি চাই, শোষণমুক্ত রাজনীতি চাই এবং সম্প্রীতির রাজনীতি চাই। ইতিপূর্বে এখানে যে রাজনীতি হয়েছে ভেদাভেটের রাজনীতি ও মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরি রাজনীতি। আমরা রায়পুরাতে বিভেদ মুক্ত সম্প্রীতির রাজনীতি কায়েমের চেষ্টা করছি, জনগণ আমাদের ডাকে সাড়া দিচ্ছে তাই বলতে পারি এখানে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে হাতপাখা ইতিহাস ভেদে করা জয়লাভ করবে ইনশাআল্লাহ। আমিও তাই আগামী নির্বাচনে জয়ী হয়ে এলাকার উন্নয়নে কাজ করে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনে ভোট গ্রহণ করা হবে আগামী বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে গণভোটও হবে এ দিন। গত ১১ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী নরসিংদী -৫ আসনে মোট ভোটার চার লাখ ৯৩ হাজার ৫৯০ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার দুই লাখ ৫৪ হাজার ৫৯৭ এবং পুরুষ ভোটার দুই লাখ ৩৮ হাজার ৯৭৮ জন। এর তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছে ১৫ জন।

বিষয় : বিএনপি আন্দোলন নরসিংদী বিএনপি আন্দোলন

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬


নরসিংদী-৫ আওয়ামী দুর্গ দখল নিতে মরিয়া বিএনপি

প্রকাশের তারিখ : ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫

featured Image

মেঘনা, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, আড়িয়াল খাঁ ও কাঁকন নদী বিধৌত বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তর উপজেলা হিসেবে পরিচিত নরসিংদী জেলার রায়পুরা উপজেলা। ২৪ টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়েই গঠিত হয়েছে নরসিংদী-৫ আসন। বৃহত্তর এ আসনটির ভেতর রয়েছে ছয়টি রেল স্টেশন। বিগত দিনগুলোতে নরসিংদী জেলার পাঁচটি আসনের মধ্যে এ আসনটি বরাবরই আওয়ামী লীগের দখলে থাকলেও সংসদ সদস্যের চেয়ারটি একবার ছিলো জাতীয় পার্টি ও দুইবার ছিলো বিএনপির হাতে। নরসিংদী-৫ (রায়পুরা) আসনটিতে ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টি থেকে মাঈন উদ্দিন ভূঁইয়া এমপি নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিএনপির মনোনীত আবদুল আলী মৃধা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর থেকে টানা ৭ম বার আওয়ামী লীগ থেকে এমপি নির্বাচিত হন রাজি উদ্দিন আহমেদ রাজু। ফলে হাসিনা সরকারে পতনের আগ পর্যন্ত এ আসনটি আওয়ামী লীগের দখলে ছিলো।

নরসিংদী -৫ (রায়পুরা) আসনে বিএনপি'র মনোনীত প্রার্থী কেন্দ্রীয় বিএনপি'র বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সহ-সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার আশরাফ উদ্দিন বকুল এর নাম ঘোষণার পর বদলে গেছে দৃশ্যপট। দলীয় প্রার্থীকে বিজয়ী করতে পুরোদমে মাঠে নেমে পড়েছেন তৃণমূল নেতাকর্মীরা। এদিকে,আগে থেকেই প্রার্থী ঘোষণা করায় গণসংযোগে এগিয়ে আছেন জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা মো: জাহাঙ্গীর আলম ও  ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর এমপি পদপ্রার্থী মাওলানা মুহাম্মদ বদরুজ্জামান। এছাড়াও এনসিপিসহ অন্যান্য দলের নেতারা মাঠে উপস্থিতি জানান দিলেও কর্মী শোডাউনে তেমন একটা সুবিধা করতে পারেননি এখনো। অন্যদিকে,জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী আসনটিতে আওয়ামী লীগের সাবেক ৭ বারে সংসদ সদস্য রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজুসহ সব ডাকসাইটে নেতা পলাতক থাকায় এবং আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার আওয়ামী লীগের দুর্গটি দখলে নিতে মরিয়া বিএনপি-জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। সরেজমিন ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্বাচন ঘিরে আসনটিতে ইতোমধ্যে নানা হিসাব-নিকাশ করতে শুরু করেছেন ভোটাররা। দীর্ঘদিন ভোট না দেওয়ায় আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে তাদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ- উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের যারা এখনো ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি,তারা ভোট দিতে মুখিয়ে আছেন। এদিকে নির্বাচন ঘিরে ভোটারদের কণ্ঠেও এবার শোনা যাচ্ছে পরিবর্তনের বার্তা। দীর্ঘ আওয়ামী দুঃশাসনের অবসানের পর এবার ভোট নিয়ে বেশ সচেতন সাধারণ মানুষ। পাশাপাশি নির্বাচনের সময় সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত ও সংঘাত এড়াতে প্রশাসন এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে আন্তরিক হওয়ার আহ্বান তাদের। ঐতিহাসিকভাবে রায়পুরা আসনটি আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ১৯৯১ সালে এরশাদের পতনের পর একবার ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে বিএনপি নেতা আব্দুল আলী মৃধা এখান থেকে এমপি নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০৮ সালে আসনটি থেকে নৌকা প্রতীক নিয়ে এমপি হন রাজিউদ্দিন আহমেদ বাজু। এর পরে ২০১৪ থেকে ২০২৪-এর তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনে এমপি হন তিনি। আগামী নির্বাচনে বিএনপির মনোনীত হেভিওয়েট প্রার্থী কেন্দ্রীয় বিএনপি'র বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সহ-সম্পাদক এবং আমরা  বিএনপি পরিবারের উপদেষ্টা ইঞ্জিনিয়ার আশরাফ উদ্দিন বকুল প্রাথমিক প্রার্থী ঘোষণার পর থেকে তিনি নিজের মতো করে গুছিয়ে নিচ্ছেন এলাকা।

এদিকে জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী নিশ্চিত করায় প্রচারে কিছুটা এগিয়ে আছেন মাওলানা মো: জাহাঙ্গীর আলম। এছাড়া এই আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে মনোনীত প্রার্থী মাওলানা মুহাম্মদ বদরুজ্জামান রয়েছেন। রায়পুরাতে আরো কয়েকটি রাজনৈতিক দল আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থী দিতে পারে বলে জানা গেছে, যেখানে রয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), গণঅধিকার পরিষদসহ কয়েকটি দল। বিগত ১৬ বছর সরকারবিরোধী আন্দোলনে অনন্য ভূমিকা পালন করে বিএনপির রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচনায় ছিলেন  কেন্দ্রীয় বিএনপি'র বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সহ-সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার আশরাফ উদ্দিন বকুল। অন্যান্য নেতা যেখানে কর্মীদের মাঠে নামিয়ে দিয়ে পেছন থেকে আন্দোলন পরিচালনা করতেন, সেখানে বকুল নিজে আন্দোলনের সময় মাঠে থেকে সাধারণ একজন কর্মীর মতো পিকেটিংয়ে অংশ নিতেন, কর্মীদের মনোবল চাঙা রাখতেন। আন্দোলন-সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করায় বিভিন্ন সময় হামলা ও মামলার শিকার ভোগ করতে হয়েছে এই নেতাকে। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে রায়পুরা থেকে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচনে লড়েছিলেন বকুল। সরকার পতনের আন্দোলনে রাজপথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি।

আরও পড়ুন, নেত্রকোনায় সুস্বাস্থ্যের জন্য ফলিত পুষ্টি বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালা

স্থানীয় নেতাকর্মীরা বলছেন, আগামী নির্বাচনে রায়পুরাতে বিএনপির ধানের শীষের বিজয় হবে ইতিহাস সৃষ্টি করা, যার নেতৃত্বে থাকবেন ইঞ্জিনিয়ার আশরাফ উদ্দিন বকুল। এলাকায় তার জনপ্রিয়তা ও বিগত আন্দোলন-সংগ্রামেও তার অবদান মূল্যায়ন করে দল তাকে মনোনয়ন দিয়েছে। আর এর মর্যাদা তাকে এলাকার নেতাকর্মীরা দিতে প্রস্তুত। ইঞ্জিনিয়ার আশরাফ উদ্দিন বকুল বলেন,রায়পুরায় হচ্ছে বিএনপি'র দুর্গ, যদিও এখানে আওয়ামী লীগ প্রার্থী একাধিক বার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু প্রত্যেক বার তারা ভোট মেরে পাশ করেছেন। যেহেতু এবার সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে তাই প্রত্যক্ষ জনগণের ভোটের মাধ্যমে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমি রায়পুরা থেকে দেশনায়ক তারেক রহমানকে একটি অবিস্মরণীয় বিজয় উপহার দিতে চাই। ফেয়ার ইলেকশন হলে জনগণের ভোট বিপ্লবের মাধ্যমে ধানের শীর্ষ শতভাগ বিজয় লাভ করবে ইনশাআল্লাহ যা রায়পুরাতে ইতিহাস হয় থাকে বলে আমি মনে করি। জনগণ ধানের শীর্ষে ভোট দিবে এই কারণে যে, বিএনপি একটা পরীক্ষিত দল,বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনা তে ভালো মন্দ সব অভিজ্ঞতা আছে। কিন্তু অন্য দলের যে প্রার্থীগুলো আছে তাদের কিন্তু সেটা নেই। তাদের কিন্তু আছে কিছু শাখা প্রশাখা,বিএনপির কিন্তু সেখানে একটি বটবৃক্ষ। সুতরাং জনগণ বটবৃক্ষ কি ভেছে নিবে কোন শাখা প্রশাখাকে নয়। দ্বিতীয় তো সৎ ক্রিম ইমেজ একজন ইঞ্জিনিয়ারকে রায়পুরার জনগণ ভেছে নিবে,যা অন্য সব প্রার্থী থেকে টোটালি আলাদা। সবকিছু যাচাই বাছাই করে রায়পুরার মানুষ মনে করবে যে ধানের শীষের বিকল্প কোন কিছু হতে পারে না। এবার রায়পুরাতে ভোট বিপ্লব হবে। বিগত আন্দোলন- সংগ্রামে আমার যে অবদান এবং এলাকার জনগণের যে ভালোবাসা সব মিলিয়ে দলকে আমি দারুণ বিজয় দিতে পারব বলে আশাবাদী। আসনটিতে ইতোমধ্যে প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে জামায়াতে ইসলামী। রায়পুরা উপজেলা (সদর) এর জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা মো: জাহাঙ্গীর আলম আসনটি থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। নিয়মিত সভা-সমাবেশ ও প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। এলাকায় তার ব্যাপক জনপ্রিয়তাও রয়েছে। জাহাঙ্গীর আলম জানান, যেখানে যাচ্ছি সেখানেই জনগণের কাছে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। মানুষ আমাদের দেখে উৎসাহবোধ করছে,কথা বলছে। কারন বিগত ৫৪ বছরে এদেশের মানুষ অনেক দলকে দেখা হয়েছে। যেমন আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টিকে দেখেছেন । তারা দেশকে সন্ত্রাস,চাঁদাবাজ, দুর্নীতি থেকে মুক্ত করতে পারে নাই । এই কষ্ট থেকে মুক্ত পেতে এদেশের জনগণ এবার পরিবর্তন চাই এবং দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিতে চাই। কারন দাঁড়িপাল্লা হচ্ছে ইনসাবের প্রতীক,ন্যায়ের প্রতীক। সেখানে সকল মানুষের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত পাবে,দুর্নীতি থেকে মুক্ত হবে এবং সুন্দর একটি সমাজ পাবে এটা আমাদের আত্মবিশ্বাস এবং জনগণের কাছে এই মূল্যবোধ  জেগেছে তাই তারা দাঁড়িপাল্লাতে ভোট দিবে। আগামী নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে আমি আশাবাদী।

অন্যদিকে এই আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে মনোনীত প্রার্থী হাতপাখা প্রতীকে মাঠে নেমেছেন কলরব এর নির্বাহী পরিচালক মাওলানা মোহাম্মদ বদরুজ্জামান। তিনি বলেন, আমার দলের নিজস্ব একটা ভোটব্যাংক আছে। এছাড়াও রায়পুরার সবাই আমাকে ভালোভাবে চেনে-জানে। অবৈধ কোনো কাজের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। এলাকার মানুষ তাই আমাকে ভালোভাবেই গ্রহণ করছে। রায়পুরা ২৪ টি ইউনিয়নে আমি গিয়েছি অনেক মানুষের সাথে কথা বলেছি এবং মানুষের সাড়া পাচ্ছি। অভ্যুত্থানের পরিবর্তে সময়ে মানুষ এখন আর পুরনো কালচার দেখতে চাচ্ছে না। মানুষ এখন কল্যাণের রাজনীতি চাই,উন্নয়নের রাজনীতি চাই, শোষণমুক্ত রাজনীতি চাই এবং সম্প্রীতির রাজনীতি চাই। ইতিপূর্বে এখানে যে রাজনীতি হয়েছে ভেদাভেটের রাজনীতি ও মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরি রাজনীতি। আমরা রায়পুরাতে বিভেদ মুক্ত সম্প্রীতির রাজনীতি কায়েমের চেষ্টা করছি, জনগণ আমাদের ডাকে সাড়া দিচ্ছে তাই বলতে পারি এখানে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে হাতপাখা ইতিহাস ভেদে করা জয়লাভ করবে ইনশাআল্লাহ। আমিও তাই আগামী নির্বাচনে জয়ী হয়ে এলাকার উন্নয়নে কাজ করে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনে ভোট গ্রহণ করা হবে আগামী বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে গণভোটও হবে এ দিন। গত ১১ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী নরসিংদী -৫ আসনে মোট ভোটার চার লাখ ৯৩ হাজার ৫৯০ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার দুই লাখ ৫৪ হাজার ৫৯৭ এবং পুরুষ ভোটার দুই লাখ ৩৮ হাজার ৯৭৮ জন। এর তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছে ১৫ জন।


দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

সম্পাদক ও প্রকাশক: এ বি এম মনিরুজ্জামান 
নির্বাহী সম্পাদক: রিপন রুদ্র
যুগ্ম সম্পাদক: জাকিয়া সুলতানা (লাভলী)

কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক সংবাদ দিগন্ত । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত