ইতিহাস কখনো থেমে থাকে না। সময় বদলায়, শাসক বদলায়, বদলে যায় ক্ষমতার কেন্দ্রও। কিন্তু মানুষের সংগ্রাম, আত্মত্যাগ আর পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা থেকে যায় ইতিহাসের পাতায়।রাজধানীর সাবেক গণভবন এখন সেই ইতিহাসেরই এক দৃশ্যমান স্মারক—‘জুলাই জাদুঘর’। একসময় যে ভবন ছিল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অন্যতম কেন্দ্র, সেখানে এখন স্থান পেয়েছে আন্দোলন-সংগ্রাম, রাজনৈতিক ইতিহাস এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণআন্দোলনের নানা স্মৃতি।জাদুঘরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে দেয়ালজুড়ে গ্রাফিতি ও আন্দোলনের নানা স্লোগান। ‘বিকল্প কে—তুমি, আমি, আমরা’, ‘কোটা না মেধা—মেধা, মেধা’, ‘লং মার্চ টু ঢাকা’—এসব স্লোগানের মধ্য দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে সেই সময়ের রাজপথের আবহ।আরও সামনে এগোলেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের নানা অধ্যায় উঠে আসে। মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফা ও ৭ মার্চের ভাষণ থেকে শুরু করে স্বাধীনতার পরের রাজনৈতিক পরিবর্তন, বাকশাল, বহুদলীয় রাজনীতির প্রত্যাবর্তন, জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড, বিএনপির উত্থানসহ বিভিন্ন সময়ের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের খণ্ডচিত্র স্থান পেয়েছে এখানে।জাদুঘরের একটি অংশে রয়েছে প্রতীকী গণকবর। বৃত্তাকার জায়গাজুড়ে সাজানো এসব স্মারক মনে করিয়ে দেয় বিভিন্ন সময়ে প্রাণ হারানো মানুষের আত্মত্যাগের কথা। পাশে থাকা নামফলকে স্থান পেয়েছে নিহতদের নাম। লেখা রয়েছে—‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে, কত প্রাণ হলো বলিদান।’এরপর চোখে পড়ে কাঁধে কফিন বহন করে নিয়ে যাওয়া কয়েকজন সেনা কর্মকর্তার ভাস্কর্য।
আরও পড়ুন, সমঝোতার রাজনীতির পথে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান রাষ্ট্রপতির
এর মধ্য দিয়ে স্মরণ করা হয়েছে ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারির পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে।জাদুঘরের আরেক অংশে রয়েছে বিভিন্ন সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও নিখোঁজের অভিযোগে আলোচিত ঘটনাগুলোর স্মৃতি। রয়েছে ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের ঘটনাপ্রবাহের স্মারকও।জুলাই আন্দোলনে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণও উঠে এসেছে ভাস্কর্য ও বিভিন্ন শিল্পকর্মে। সেখানে রিকশাচালক সুজনের প্রতীকী ভাস্কর্যে দেখা যায়, তিনি রিকশার ওপর দাঁড়িয়ে আন্দোলনকারীদের স্যালুট করছেন। আরেকটি ভাস্কর্যে রয়েছে নিহত ভাইকে কাঁধে নিয়ে আন্দোলনে আসা দুই বোনের প্রতিচ্ছবি।তবে জাদুঘরের সবচেয়ে আলোচিত অংশগুলোর একটি আয়নাঘরের আদলে তৈরি নির্যাতনকেন্দ্র। ছোট ছোট সেলে বন্দিত্বের পরিবেশ তুলে ধরা হয়েছে। অল্প জায়গা, সীমিত আলো-বাতাস এবং দেয়ালে বন্দিদের লেখা চিঠি ও দিন গোনার চিহ্নের মাধ্যমে বন্দিত্বের সেই সময়কে উপস্থাপন করা হয়েছে।এর পাশেই রয়েছে একটি সাউন্ডপ্রুফ কক্ষ। সেখানে নির্যাতনের বিভিন্ন পদ্ধতির প্রতীকী উপস্থাপনা করা হয়েছে। উদ্দেশ্য—নির্যাতন ও গুমের অভিযোগ ঘিরে মানুষের যে ভয় ও অভিজ্ঞতার কথা সামনে এসেছে, তার একটি দৃশ্যমান রূপ তুলে ধরা।
আরও পড়ুন, মানবতাবিরোধী অপরাধে আযাদের আপিল নিয়ে আদেশ হচ্ছে না আজ
জাদুঘরের আরেক অংশে সংরক্ষণ করা হয়েছে ৫ আগস্টের পরের বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্ন। কাঁচের বাক্সে রাখা বিভিন্ন সামগ্রী এবং বড় পর্দায় প্রদর্শিত ভিডিওচিত্রে তুলে ধরা হয়েছে সেই সময়ের ঘটনাপ্রবাহ ও মানুষের প্রতিক্রিয়া।পিলখানা হত্যাকাণ্ডের জন্যও রয়েছে আলাদা প্রদর্শনী। সেখানে রয়েছে সেদিনের ঘটনাকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া বিভিন্ন আলোকচিত্র, সামরিক পোশাক, ব্যক্তিগত সামগ্রী এবং পরিবারের স্মৃতি।জুলাই আন্দোলনে নারীদের ভূমিকার চিত্রও বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। পুলিশের গাড়ি থেকে স্বজনকে উদ্ধার, বৃষ্টির মধ্যেও মিছিল-স্লোগান, পুরুষদের সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া—বিভিন্ন আলোকচিত্র ও শিল্পকর্মে ফুটে উঠেছে নারীদের অংশগ্রহণ।কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার পঙ্ক্তি—‘কোনকালে একা হয়নিকো জয়ী পুরুষের তরবারী’—নারীর সেই ভূমিকার প্রতীক হয়ে উঠে এসেছে জাদুঘরের প্রদর্শনীতে। রয়েছে নারীদের লেখা নানা স্লোগান ও প্ল্যাকার্ডও।সবশেষে রয়েছে জুলাই শহীদদের ব্যক্তিগত স্মৃতিচিহ্নের সংগ্রহ। ঘড়ি, জুতা, শার্ট, টাই, খেলনা, জায়নামাজ, স্কুলের সামগ্রী—প্রতিটি বস্তু যেন বহন করছে একটি পরিবারের গল্প।কোথাও পুলিশের গুলি থেকে বাঁচতে রাস্তার ব্যারিকেডের আড়ালে আশ্রয় নেওয়া শিক্ষার্থীদের স্মৃতি, কোথাও নিহত শিশুর খেলনা, কোথাও চিকিৎসকের সরঞ্জাম। রয়েছে সাংবাদিকের ক্যামেরা ও পরিচয়পত্রও।আর একটি রক্তমাখা শার্ট এবং আন্দোলনে যাওয়ার আগে বাবা-মাকে লেখা শেষ চিঠি এসে দর্শনার্থীদের সামনে তুলে ধরে এক পরিবারের শোকের গল্প।
বিষয় : আন্দোলন জুলাই জাদুঘর রক্তাক্ত ইতিহাস

সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইতিহাস কখনো থেমে থাকে না। সময় বদলায়, শাসক বদলায়, বদলে যায় ক্ষমতার কেন্দ্রও। কিন্তু মানুষের সংগ্রাম, আত্মত্যাগ আর পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা থেকে যায় ইতিহাসের পাতায়।রাজধানীর সাবেক গণভবন এখন সেই ইতিহাসেরই এক দৃশ্যমান স্মারক—‘জুলাই জাদুঘর’। একসময় যে ভবন ছিল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অন্যতম কেন্দ্র, সেখানে এখন স্থান পেয়েছে আন্দোলন-সংগ্রাম, রাজনৈতিক ইতিহাস এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণআন্দোলনের নানা স্মৃতি।জাদুঘরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে দেয়ালজুড়ে গ্রাফিতি ও আন্দোলনের নানা স্লোগান। ‘বিকল্প কে—তুমি, আমি, আমরা’, ‘কোটা না মেধা—মেধা, মেধা’, ‘লং মার্চ টু ঢাকা’—এসব স্লোগানের মধ্য দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে সেই সময়ের রাজপথের আবহ।আরও সামনে এগোলেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের নানা অধ্যায় উঠে আসে। মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফা ও ৭ মার্চের ভাষণ থেকে শুরু করে স্বাধীনতার পরের রাজনৈতিক পরিবর্তন, বাকশাল, বহুদলীয় রাজনীতির প্রত্যাবর্তন, জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড, বিএনপির উত্থানসহ বিভিন্ন সময়ের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের খণ্ডচিত্র স্থান পেয়েছে এখানে।জাদুঘরের একটি অংশে রয়েছে প্রতীকী গণকবর। বৃত্তাকার জায়গাজুড়ে সাজানো এসব স্মারক মনে করিয়ে দেয় বিভিন্ন সময়ে প্রাণ হারানো মানুষের আত্মত্যাগের কথা। পাশে থাকা নামফলকে স্থান পেয়েছে নিহতদের নাম। লেখা রয়েছে—‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে, কত প্রাণ হলো বলিদান।’এরপর চোখে পড়ে কাঁধে কফিন বহন করে নিয়ে যাওয়া কয়েকজন সেনা কর্মকর্তার ভাস্কর্য।
আরও পড়ুন, সমঝোতার রাজনীতির পথে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান রাষ্ট্রপতির
এর মধ্য দিয়ে স্মরণ করা হয়েছে ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারির পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে।জাদুঘরের আরেক অংশে রয়েছে বিভিন্ন সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও নিখোঁজের অভিযোগে আলোচিত ঘটনাগুলোর স্মৃতি। রয়েছে ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের ঘটনাপ্রবাহের স্মারকও।জুলাই আন্দোলনে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণও উঠে এসেছে ভাস্কর্য ও বিভিন্ন শিল্পকর্মে। সেখানে রিকশাচালক সুজনের প্রতীকী ভাস্কর্যে দেখা যায়, তিনি রিকশার ওপর দাঁড়িয়ে আন্দোলনকারীদের স্যালুট করছেন। আরেকটি ভাস্কর্যে রয়েছে নিহত ভাইকে কাঁধে নিয়ে আন্দোলনে আসা দুই বোনের প্রতিচ্ছবি।তবে জাদুঘরের সবচেয়ে আলোচিত অংশগুলোর একটি আয়নাঘরের আদলে তৈরি নির্যাতনকেন্দ্র। ছোট ছোট সেলে বন্দিত্বের পরিবেশ তুলে ধরা হয়েছে। অল্প জায়গা, সীমিত আলো-বাতাস এবং দেয়ালে বন্দিদের লেখা চিঠি ও দিন গোনার চিহ্নের মাধ্যমে বন্দিত্বের সেই সময়কে উপস্থাপন করা হয়েছে।এর পাশেই রয়েছে একটি সাউন্ডপ্রুফ কক্ষ। সেখানে নির্যাতনের বিভিন্ন পদ্ধতির প্রতীকী উপস্থাপনা করা হয়েছে। উদ্দেশ্য—নির্যাতন ও গুমের অভিযোগ ঘিরে মানুষের যে ভয় ও অভিজ্ঞতার কথা সামনে এসেছে, তার একটি দৃশ্যমান রূপ তুলে ধরা।
আরও পড়ুন, মানবতাবিরোধী অপরাধে আযাদের আপিল নিয়ে আদেশ হচ্ছে না আজ
জাদুঘরের আরেক অংশে সংরক্ষণ করা হয়েছে ৫ আগস্টের পরের বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্ন। কাঁচের বাক্সে রাখা বিভিন্ন সামগ্রী এবং বড় পর্দায় প্রদর্শিত ভিডিওচিত্রে তুলে ধরা হয়েছে সেই সময়ের ঘটনাপ্রবাহ ও মানুষের প্রতিক্রিয়া।পিলখানা হত্যাকাণ্ডের জন্যও রয়েছে আলাদা প্রদর্শনী। সেখানে রয়েছে সেদিনের ঘটনাকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া বিভিন্ন আলোকচিত্র, সামরিক পোশাক, ব্যক্তিগত সামগ্রী এবং পরিবারের স্মৃতি।জুলাই আন্দোলনে নারীদের ভূমিকার চিত্রও বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। পুলিশের গাড়ি থেকে স্বজনকে উদ্ধার, বৃষ্টির মধ্যেও মিছিল-স্লোগান, পুরুষদের সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া—বিভিন্ন আলোকচিত্র ও শিল্পকর্মে ফুটে উঠেছে নারীদের অংশগ্রহণ।কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার পঙ্ক্তি—‘কোনকালে একা হয়নিকো জয়ী পুরুষের তরবারী’—নারীর সেই ভূমিকার প্রতীক হয়ে উঠে এসেছে জাদুঘরের প্রদর্শনীতে। রয়েছে নারীদের লেখা নানা স্লোগান ও প্ল্যাকার্ডও।সবশেষে রয়েছে জুলাই শহীদদের ব্যক্তিগত স্মৃতিচিহ্নের সংগ্রহ। ঘড়ি, জুতা, শার্ট, টাই, খেলনা, জায়নামাজ, স্কুলের সামগ্রী—প্রতিটি বস্তু যেন বহন করছে একটি পরিবারের গল্প।কোথাও পুলিশের গুলি থেকে বাঁচতে রাস্তার ব্যারিকেডের আড়ালে আশ্রয় নেওয়া শিক্ষার্থীদের স্মৃতি, কোথাও নিহত শিশুর খেলনা, কোথাও চিকিৎসকের সরঞ্জাম। রয়েছে সাংবাদিকের ক্যামেরা ও পরিচয়পত্রও।আর একটি রক্তমাখা শার্ট এবং আন্দোলনে যাওয়ার আগে বাবা-মাকে লেখা শেষ চিঠি এসে দর্শনার্থীদের সামনে তুলে ধরে এক পরিবারের শোকের গল্প।

আপনার মতামত লিখুন