একসময় গ্রামবাংলার মানুষের নিত্যদিনের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল মাটির তৈরি হাঁড়ি, পাতিল, কলস, সরা, পেয়ালা, খালা, বাটি ও মাটির চুলা। রান্না, খাবার পরিবেশন, পানি সংরক্ষণ থেকে শুরু করে ঘর সাজানো—সব ক্ষেত্রেই মাটির তৈজসপত্রের ছিল ব্যাপক ব্যবহার। বিয়ে, সামাজিক অনুষ্ঠান ও ধর্মীয় আয়োজনেও মাটির তৈরি নানা সামগ্রীর ব্যবহার ছিল চোখে পড়ার মতো।কালের বিবর্তনে আধুনিক জীবনযাত্রার সঙ্গে প্লাস্টিক, স্টিল, অ্যালুমিনিয়াম, মেলামাইন ও সিরামিকের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় গঙ্গাচড়ায় ঐতিহ্যবাহী মাটির তৈজসপত্রের চাহিদা এখন অনেকটাই কমে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে মৃৎশিল্পের সঙ্গে জড়িত কারিগরদের জীবন-জীবিকায়।শনিবার দুপুরে গঙ্গাচড়া উপজেলার বড়বিল ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ পানা পুকুর (কুমারপাড়া) এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কুমার সম্প্রদায়ের কয়েকটি পরিবার এখনো বাপ-দাদার ঐতিহ্য ধরে রাখতে মাটির তৈজসপত্র তৈরিতে ব্যস্ত। নিলা রানী পাল (৭০), জোৎল্লা রানী পাল (৭২), আরতি রানী পাল (৬৫), ভারতী রানী পাল (৬৫), কয়েকজন কারিগর নিয়মিত মাটির তৈজসপত্র তৈরি করেন।স্থানীয় কারিগররা জানান, একসময় কুমারপাড়ায় মাটির হাঁড়ি, পাতিল, কলস, সরা, পেয়ালা, বাটি, মাটির ব্যাংক, পুতুল ও চুলাসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য তৈরি হতো। কুমাররা এসব পণ্য কাঁধে কিংবা মাথায় ঝুড়ি নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বিক্রি করতেন। অনেক সময় নগদ টাকার পাশাপাশি ধান, গম ও মৌসুমি ফসলের বিনিময়েও এসব পণ্য কেনাবেচা হতো।
আরও পড়ুন, নাটোরে বাস-ভ্যানের মুখোমুখি সংঘর্ষ, প্রাণ গেল দুইজনের
তবে আধুনিকতার ছোঁয়ায় সেই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। প্লাস্টিক, স্টিল, অ্যালুমিনিয়াম ও সিরামিকের পণ্য সহজলভ্য হওয়ায় মানুষ ধীরে ধীরে মাটির তৈজসপত্র থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। ফলে কমেছে মাটির পণ্যের চাহিদা, পাশাপাশি কমেছে উৎপাদন ও আয়।মৃৎশিল্পীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মাটির তৈজসপত্র তৈরির জন্য উপযুক্ত মাটি সংগ্রহ থেকে শুরু করে মাটি প্রস্তুত, পণ্য তৈরি, শুকানো, নকশা করা, পোড়ানো ও বাজারজাত—প্রতিটি ধাপেই শ্রম ও খরচ বেড়েছে। কিন্তু সে তুলনায় পণ্যের দাম ও বিক্রি বাড়েনি। ফলে এ পেশায় টিকে থাকা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।শুধু বাজারে চাহিদা কমে যাওয়াই নয়, নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহও মৃৎশিল্পের জন্য বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিশ্রমের তুলনায় আয় কম হওয়ায় অনেক কারিগর জীবিকার তাগিদে অন্য পেশায় চলে গেছেন। ফলে কমছে অভিজ্ঞ কারিগরের সংখ্যা। নতুন প্রজন্ম এ পেশায় না আসায় ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে পড়ছে ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প।স্থানীয়দের দাবি, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সহজ শর্তে ঋণ, কারিগরদের প্রশিক্ষণ, কাঁচামাল সংগ্রহে সহায়তা এবং মাটির তৈরি পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ করা হলে এ শিল্পকে আবারও ঘুরে দাঁড় করানো সম্ভব। পরিবেশবান্ধব মাটির পণ্যের ব্যবহার বাড়াতে জনসচেতনতাও প্রয়োজন।সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে প্লাস্টিক-স্টিলের দাপটে গঙ্গাচড়ার কুমারপাড়ার চাকা একদিন থেমে যেতে পারে। হারিয়ে যেতে পারে গ্রামবাংলার প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প।

শনিবার, ২২ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২২ আগস্ট ২০২৬
একসময় গ্রামবাংলার মানুষের নিত্যদিনের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল মাটির তৈরি হাঁড়ি, পাতিল, কলস, সরা, পেয়ালা, খালা, বাটি ও মাটির চুলা। রান্না, খাবার পরিবেশন, পানি সংরক্ষণ থেকে শুরু করে ঘর সাজানো—সব ক্ষেত্রেই মাটির তৈজসপত্রের ছিল ব্যাপক ব্যবহার। বিয়ে, সামাজিক অনুষ্ঠান ও ধর্মীয় আয়োজনেও মাটির তৈরি নানা সামগ্রীর ব্যবহার ছিল চোখে পড়ার মতো।কালের বিবর্তনে আধুনিক জীবনযাত্রার সঙ্গে প্লাস্টিক, স্টিল, অ্যালুমিনিয়াম, মেলামাইন ও সিরামিকের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় গঙ্গাচড়ায় ঐতিহ্যবাহী মাটির তৈজসপত্রের চাহিদা এখন অনেকটাই কমে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে মৃৎশিল্পের সঙ্গে জড়িত কারিগরদের জীবন-জীবিকায়।শনিবার দুপুরে গঙ্গাচড়া উপজেলার বড়বিল ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ পানা পুকুর (কুমারপাড়া) এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কুমার সম্প্রদায়ের কয়েকটি পরিবার এখনো বাপ-দাদার ঐতিহ্য ধরে রাখতে মাটির তৈজসপত্র তৈরিতে ব্যস্ত। নিলা রানী পাল (৭০), জোৎল্লা রানী পাল (৭২), আরতি রানী পাল (৬৫), ভারতী রানী পাল (৬৫), কয়েকজন কারিগর নিয়মিত মাটির তৈজসপত্র তৈরি করেন।স্থানীয় কারিগররা জানান, একসময় কুমারপাড়ায় মাটির হাঁড়ি, পাতিল, কলস, সরা, পেয়ালা, বাটি, মাটির ব্যাংক, পুতুল ও চুলাসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য তৈরি হতো। কুমাররা এসব পণ্য কাঁধে কিংবা মাথায় ঝুড়ি নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বিক্রি করতেন। অনেক সময় নগদ টাকার পাশাপাশি ধান, গম ও মৌসুমি ফসলের বিনিময়েও এসব পণ্য কেনাবেচা হতো।
আরও পড়ুন, নাটোরে বাস-ভ্যানের মুখোমুখি সংঘর্ষ, প্রাণ গেল দুইজনের
তবে আধুনিকতার ছোঁয়ায় সেই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। প্লাস্টিক, স্টিল, অ্যালুমিনিয়াম ও সিরামিকের পণ্য সহজলভ্য হওয়ায় মানুষ ধীরে ধীরে মাটির তৈজসপত্র থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। ফলে কমেছে মাটির পণ্যের চাহিদা, পাশাপাশি কমেছে উৎপাদন ও আয়।মৃৎশিল্পীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মাটির তৈজসপত্র তৈরির জন্য উপযুক্ত মাটি সংগ্রহ থেকে শুরু করে মাটি প্রস্তুত, পণ্য তৈরি, শুকানো, নকশা করা, পোড়ানো ও বাজারজাত—প্রতিটি ধাপেই শ্রম ও খরচ বেড়েছে। কিন্তু সে তুলনায় পণ্যের দাম ও বিক্রি বাড়েনি। ফলে এ পেশায় টিকে থাকা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।শুধু বাজারে চাহিদা কমে যাওয়াই নয়, নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহও মৃৎশিল্পের জন্য বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিশ্রমের তুলনায় আয় কম হওয়ায় অনেক কারিগর জীবিকার তাগিদে অন্য পেশায় চলে গেছেন। ফলে কমছে অভিজ্ঞ কারিগরের সংখ্যা। নতুন প্রজন্ম এ পেশায় না আসায় ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে পড়ছে ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প।স্থানীয়দের দাবি, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সহজ শর্তে ঋণ, কারিগরদের প্রশিক্ষণ, কাঁচামাল সংগ্রহে সহায়তা এবং মাটির তৈরি পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ করা হলে এ শিল্পকে আবারও ঘুরে দাঁড় করানো সম্ভব। পরিবেশবান্ধব মাটির পণ্যের ব্যবহার বাড়াতে জনসচেতনতাও প্রয়োজন।সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে প্লাস্টিক-স্টিলের দাপটে গঙ্গাচড়ার কুমারপাড়ার চাকা একদিন থেমে যেতে পারে। হারিয়ে যেতে পারে গ্রামবাংলার প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প।

আপনার মতামত লিখুন