দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

টেকসই পর্যটন ব্যবস্থাপনা: সংকট ও উত্তরণের পথ

টেকসই পর্যটন ব্যবস্থাপনা: সংকট ও উত্তরণের পথ
টেকসই পর্যটন ব্যবস্থাপনা: সংকট ও উত্তরণের পথ

পর্যটন শিল্প আজকের বিশ্বে শুধু একটি বিনোদনমূলক খাত নয়, এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং আন্তর্জাতিক পরিচিতি বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। উন্নত ও উন্নয়নশীল উভয় ধরনের দেশেই পর্যটন খাতকে কৌশলগত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য,   বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি এবং ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের কারণে বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু এই সম্ভাবনাকে পূর্ণাঙ্গ বাস্তবতায় রূপ দিতে গেলে কিছু মৌলিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা অপরিহার্য। 

এই চ্যালেঞ্জগুলোর কেন্দ্রে রয়েছে একটি বহুল ব্যবহৃত কিন্তু গভীর অর্থবহ শব্দ “অপ”। “অপ” বলতে এখানে বোঝানো হচ্ছে এমন সব নেতিবাচক উপাদান, যা পর্যটন শিল্পের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। অপ-সংস্কৃতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, অপ-সাংবাদিকতা, অপরাধমূলক প্রবণতা এবং অপপ্রচার এই প্রতিটি উপাদান পর্যটন খাতের জন্য একটি করে বড় হুমকি। এই হুমকিগুলো দৃশ্যমান এবং অদৃশ্য উভয়ভাবেই কাজ করে, যার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি এবং বহুমাত্রিক। 

প্রথমত, অপ-সংস্কৃতি একটি পর্যটন গন্তব্যের মূল ভিত্তিকে নষ্ট করে দেয়। পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ হলো একটি এলাকার নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, জীবনযাপন এবং সামাজিক বৈচিত্র্য। একজন পর্যটক যখন একটি নতুন স্থানে ভ্রমণ করেন, তখন তিনি সেই স্থানের মৌলিকত্ব বা “অথেনটিসিটি” খুঁজে বেড়ান। কিন্তু যখন স্থানীয় সংস্কৃতির পরিবর্তে কৃত্রিমতা বা বিদেশি সংস্কৃতির আধিক্য দেখা যায়, তখন পর্যটকরা প্রকৃত অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হন। ফলে সেই স্থানের প্রতি তাদের আগ্রহ কমে যায়। বর্তমান সময়ে অনেক পর্যটন এলাকায় স্থানীয় সংস্কৃতিকে গুরুত্ব না দিয়ে বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গিতে কৃত্রিম পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে। এতে স্বল্পমেয়াদে কিছু লাভ হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি পর্যটনের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়। কারণ একটি পর্যটন গন্তব্যের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তার স্বকীয়তা, যা একবার হারিয়ে গেলে তা পুনরুদ্ধার করা কঠিন। 

দ্বিতীয়ত, ক্ষমতার অপব্যবহার পর্যটন খাতে আস্থার সংকট তৈরি করে। পর্যটন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আচরণ একটি দেশের ভাবমূর্তি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু যখন পর্যটকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করা হয়, অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয় কিংবা প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে অনিয়ম দেখা যায়, তখন তা পর্যটকদের মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। একটি খারাপ অভিজ্ঞতা একজন পর্যটকের কাছে শুধু একটি ব্যক্তিগত স্মৃতি নয়, এটি তার মাধ্যমে অন্যদের কাছেও ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমান ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে এই প্রভাব আরও দ্রুত বিস্তার লাভ করে। 

আরও পড়ুন, পুলিশ হত্যা, সংস্কার ও জননিরাপত্তা: সংকট উত্তরণের পথ কোথায়?

তৃতীয়ত, অপ-সাংবাদিকতা পর্যটন শিল্পের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল বিষয়। গণমাধ্যম একটি দেশের পর্যটন খাতকে আন্তর্জাতিকভাবে তুলে ধরার একটি শক্তিশালী মাধ্যম। কিন্তু যখন এই মাধ্যমটি দায়িত্বশীলতার পরিবর্তে জনপ্রিয়তা বা ভিউ বাড়ানোর লক্ষ্যে কাজ করে, তখন তা বিপরীত ফল বয়ে আনে। গুজব, অতিরঞ্জন কিংবা যাচাই-বাছাইহীন তথ্য প্রচার পর্যটকদের মধ্যে অযথা ভয় ও সংশয় সৃষ্টি করে। ফলে একটি সম্ভাবনাময় পর্যটন গন্তব্যও ধীরে ধীরে মানুষের আগ্রহের বাইরে চলে যায়। এর পাশাপাশি অপরাধমূলক প্রবণতা পর্যটন খাতের জন্য সরাসরি একটি বড় বাধা। কোনো পর্যটন এলাকায় যদি চুরি, ছিনতাই, হয়রানি বা প্রতারণার ঘটনা ঘটে, তাহলে সেই এলাকার প্রতি পর্যটকদের আস্থা দ্রুত কমে যায়। নিরাপত্তা একটি পর্যটকের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি। একটি অনিরাপদ পরিবেশ কোনোভাবেই পর্যটনবান্ধব হতে পারে না। তাই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পর্যটন উন্নয়নের একটি অপরিহার্য শর্ত। অপপ্রচার বা গুজবও পর্যটন শিল্পের জন্য একটি মারাত্মক হুমকি। বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে একটি ভুল তথ্য খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং মানুষের মনে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে। একটি পর্যটন গন্তব্য সম্পর্কে ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়লে তা দীর্ঘমেয়াদে সেই স্থানের সুনাম নষ্ট করতে পারে। এই ধরনের অপপ্রচার শুধু পর্যটকদেরই নিরুৎসাহিত করে না, বরং বিনিয়োগকারীদের আগ্রহও কমিয়ে দেয়। 

অন্যদিকে, পর্যটন উন্নয়নের জন্য কিছু মৌলিক তাত্ত্বিক কাঠামো রয়েছে, যা সঠিকভাবে প্রয়োগ করা হলে একটি গন্তব্যকে টেকসইভাবে উন্নত করা সম্ভব। এর মধ্যে “ঝ থিওরি” প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মূল উপাদান হিসেবে বিবেচিত। সমুদ্র, আকাশ এবং বালিয়াড়ি এই তিনটি উপাদান একটি সমুদ্রভিত্তিক পর্যটনের প্রাণ। কিন্তু যখন বালিয়াড়ি বা সৈকতের উপর অবৈধ স্থাপনা তৈরি করা হয়, তখন এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায়। এতে পর্যটকদের অভিজ্ঞতা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সেই স্থানের প্রতি তাদের আগ্রহ কমে যায়। 

আরও পড়ুন, হজ ব্যবস্থাপনা তদারকির জন্য গঠিত হলো ২৫ সদস্যের কমিটি

একইভাবে “চ থিওরি” পর্যটনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশ করে। একটি পর্যটন গন্তব্যের সেবা ও মান উন্নত এবং ব্যয় সাশ্রয়ী হলেও, যদি সেই গন্তব্য সম্পর্কে ইতিবাচক প্রচারণা না থাকে, তাহলে পর্যটকদের আগ্রহ তৈরি হয় না। বর্তমান বিশ্বে মানুষ সিদ্ধান্ত নেয় মূলত তথ্য এবং ধারণার উপর ভিত্তি করে। তাই ইতিবাচক প্রচারণা একটি পর্যটন গন্তব্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া “অ থিওরি” পর্যটন অবকাঠামোর ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। সহজ যাতায়াত, প্রয়োজনীয় সহায়ক সেবা এবং মানসম্মত থাকার ব্যবস্থা এই তিনটি উপাদান একটি পর্যটন গন্তব্যকে আকর্ষণীয় করে তোলে। এর মধ্যে কোনো একটি উপাদানের ঘাটতি পুরো ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিতে পারে। বিশেষ করে আবাসন সুবিধার অভাব পর্যটকদের অবস্থানকাল কমিয়ে দেয় এবং তাদের পুনরায় আসার আগ্রহ কমিয়ে দেয়। 

সবশেষে, “ঈ থিওরি” অর্থাৎ যোগাযোগ ব্যবস্থা পর্যটনের প্রাণ হিসেবে বিবেচিত। একটি পর্যটন গন্তব্য যতই আকর্ষণীয় হোক না কেন, যদি সেখানে পৌঁছানো কঠিন হয় বা যাতায়াত ব্যবস্থা দুর্বল হয়, তাহলে পর্যটকদের অভিজ্ঞতা নেতিবাচক হয়ে ওঠে। যানজট, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা পর্যটকদের বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সবকিছু বিবেচনা করে বলা যায়, পর্যটন শিল্প একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনা নির্ভর খাত, যেখানে প্রাকৃতিক সম্পদ, মানবিক আচরণ, তথ্যপ্রবাহ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন একে অপরের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। “অপ” এর নেতিবাচক প্রভাবগুলো নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে উন্নয়নের সব তত্ত্বই ব্যর্থ হয়ে যাবে। 

আরও পড়ুন, টেকসই পর্যটনে ‘অপ’-এর ছায়া: সংকট পেরিয়ে উত্তরণের পথ

অতএব, একটি টেকসই ও উন্নত পর্যটন শিল্প গড়ে তুলতে হলে প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা, দায়িত্বশীল আচরণ, সঠিক তথ্য প্রচার এবং কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা। সরকার, বেসরকারি খাত, গণমাধ্যম এবং স্থানীয় জনগণ সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। পরিশেষে বলা যায় পর্যটন শুধু ভ্রমণ নয়, এটি একটি দেশের সম্মান, সুনাম ও সম্ভাবনার প্রতিফলন। অপ নয়, ইতিবাচক উদ্যোগের মাধ্যমেই গড়ে উঠতে পারে একটি নিরাপদ, আকর্ষণীয় এবং টেকসই পর্যটন শিল্প। আজকের আলোচনার মূল কথা হচ্ছে পরিবেশ বান্ধব পর্যটন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। সকল প্রকার হয়রানি মুক্ত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। অপপ্রচার গুজব বন্ধ করতে হবে পর্যটন ব্যবস্থাপনাকে সকল প্রকার সিন্ডিকেট মুক্ত রাখতে হবে। স্থানীয় সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে হবে। বিদেশি পর্যটকদের কে আকর্ষণ করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। আধুনিকতার সাথে সমন্বয় সাধন করে পর্যটকদের চাহিদার সাথে  সেবা  সরবরাহের সাধন করতে হবে। আর যেই বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা হল নিরাপত্তা। পর্যটকদের কে নিরাপত্তা প্রদান করার ক্ষেত্রে কোন ধরনের সিন্ডিকেট, দুষ্কৃতীকারী ও অপ-সাংবাদিকতা বা অপ-প্রচারকারীদের নিকট আপোষ করা যাবে না। তাহলে আমরা টেকসই পর্যটন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারব।

বিষয় : অন্যতম পর্যটন শিল্প চালিকাশক্তি বিনোদনমূলক খাত

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬


টেকসই পর্যটন ব্যবস্থাপনা: সংকট ও উত্তরণের পথ

প্রকাশের তারিখ : ৩০ মার্চ ২০২৬

featured Image

পর্যটন শিল্প আজকের বিশ্বে শুধু একটি বিনোদনমূলক খাত নয়, এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং আন্তর্জাতিক পরিচিতি বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। উন্নত ও উন্নয়নশীল উভয় ধরনের দেশেই পর্যটন খাতকে কৌশলগত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য,   বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি এবং ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের কারণে বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু এই সম্ভাবনাকে পূর্ণাঙ্গ বাস্তবতায় রূপ দিতে গেলে কিছু মৌলিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা অপরিহার্য। 

এই চ্যালেঞ্জগুলোর কেন্দ্রে রয়েছে একটি বহুল ব্যবহৃত কিন্তু গভীর অর্থবহ শব্দ “অপ”। “অপ” বলতে এখানে বোঝানো হচ্ছে এমন সব নেতিবাচক উপাদান, যা পর্যটন শিল্পের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। অপ-সংস্কৃতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, অপ-সাংবাদিকতা, অপরাধমূলক প্রবণতা এবং অপপ্রচার এই প্রতিটি উপাদান পর্যটন খাতের জন্য একটি করে বড় হুমকি। এই হুমকিগুলো দৃশ্যমান এবং অদৃশ্য উভয়ভাবেই কাজ করে, যার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি এবং বহুমাত্রিক। 

প্রথমত, অপ-সংস্কৃতি একটি পর্যটন গন্তব্যের মূল ভিত্তিকে নষ্ট করে দেয়। পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ হলো একটি এলাকার নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, জীবনযাপন এবং সামাজিক বৈচিত্র্য। একজন পর্যটক যখন একটি নতুন স্থানে ভ্রমণ করেন, তখন তিনি সেই স্থানের মৌলিকত্ব বা “অথেনটিসিটি” খুঁজে বেড়ান। কিন্তু যখন স্থানীয় সংস্কৃতির পরিবর্তে কৃত্রিমতা বা বিদেশি সংস্কৃতির আধিক্য দেখা যায়, তখন পর্যটকরা প্রকৃত অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হন। ফলে সেই স্থানের প্রতি তাদের আগ্রহ কমে যায়। বর্তমান সময়ে অনেক পর্যটন এলাকায় স্থানীয় সংস্কৃতিকে গুরুত্ব না দিয়ে বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গিতে কৃত্রিম পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে। এতে স্বল্পমেয়াদে কিছু লাভ হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি পর্যটনের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়। কারণ একটি পর্যটন গন্তব্যের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তার স্বকীয়তা, যা একবার হারিয়ে গেলে তা পুনরুদ্ধার করা কঠিন। 

দ্বিতীয়ত, ক্ষমতার অপব্যবহার পর্যটন খাতে আস্থার সংকট তৈরি করে। পর্যটন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আচরণ একটি দেশের ভাবমূর্তি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু যখন পর্যটকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করা হয়, অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয় কিংবা প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে অনিয়ম দেখা যায়, তখন তা পর্যটকদের মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। একটি খারাপ অভিজ্ঞতা একজন পর্যটকের কাছে শুধু একটি ব্যক্তিগত স্মৃতি নয়, এটি তার মাধ্যমে অন্যদের কাছেও ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমান ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে এই প্রভাব আরও দ্রুত বিস্তার লাভ করে। 

আরও পড়ুন, পুলিশ হত্যা, সংস্কার ও জননিরাপত্তা: সংকট উত্তরণের পথ কোথায়?

তৃতীয়ত, অপ-সাংবাদিকতা পর্যটন শিল্পের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল বিষয়। গণমাধ্যম একটি দেশের পর্যটন খাতকে আন্তর্জাতিকভাবে তুলে ধরার একটি শক্তিশালী মাধ্যম। কিন্তু যখন এই মাধ্যমটি দায়িত্বশীলতার পরিবর্তে জনপ্রিয়তা বা ভিউ বাড়ানোর লক্ষ্যে কাজ করে, তখন তা বিপরীত ফল বয়ে আনে। গুজব, অতিরঞ্জন কিংবা যাচাই-বাছাইহীন তথ্য প্রচার পর্যটকদের মধ্যে অযথা ভয় ও সংশয় সৃষ্টি করে। ফলে একটি সম্ভাবনাময় পর্যটন গন্তব্যও ধীরে ধীরে মানুষের আগ্রহের বাইরে চলে যায়। এর পাশাপাশি অপরাধমূলক প্রবণতা পর্যটন খাতের জন্য সরাসরি একটি বড় বাধা। কোনো পর্যটন এলাকায় যদি চুরি, ছিনতাই, হয়রানি বা প্রতারণার ঘটনা ঘটে, তাহলে সেই এলাকার প্রতি পর্যটকদের আস্থা দ্রুত কমে যায়। নিরাপত্তা একটি পর্যটকের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি। একটি অনিরাপদ পরিবেশ কোনোভাবেই পর্যটনবান্ধব হতে পারে না। তাই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পর্যটন উন্নয়নের একটি অপরিহার্য শর্ত। অপপ্রচার বা গুজবও পর্যটন শিল্পের জন্য একটি মারাত্মক হুমকি। বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে একটি ভুল তথ্য খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং মানুষের মনে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে। একটি পর্যটন গন্তব্য সম্পর্কে ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়লে তা দীর্ঘমেয়াদে সেই স্থানের সুনাম নষ্ট করতে পারে। এই ধরনের অপপ্রচার শুধু পর্যটকদেরই নিরুৎসাহিত করে না, বরং বিনিয়োগকারীদের আগ্রহও কমিয়ে দেয়। 

অন্যদিকে, পর্যটন উন্নয়নের জন্য কিছু মৌলিক তাত্ত্বিক কাঠামো রয়েছে, যা সঠিকভাবে প্রয়োগ করা হলে একটি গন্তব্যকে টেকসইভাবে উন্নত করা সম্ভব। এর মধ্যে “ঝ থিওরি” প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মূল উপাদান হিসেবে বিবেচিত। সমুদ্র, আকাশ এবং বালিয়াড়ি এই তিনটি উপাদান একটি সমুদ্রভিত্তিক পর্যটনের প্রাণ। কিন্তু যখন বালিয়াড়ি বা সৈকতের উপর অবৈধ স্থাপনা তৈরি করা হয়, তখন এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায়। এতে পর্যটকদের অভিজ্ঞতা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সেই স্থানের প্রতি তাদের আগ্রহ কমে যায়। 

আরও পড়ুন, হজ ব্যবস্থাপনা তদারকির জন্য গঠিত হলো ২৫ সদস্যের কমিটি

একইভাবে “চ থিওরি” পর্যটনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশ করে। একটি পর্যটন গন্তব্যের সেবা ও মান উন্নত এবং ব্যয় সাশ্রয়ী হলেও, যদি সেই গন্তব্য সম্পর্কে ইতিবাচক প্রচারণা না থাকে, তাহলে পর্যটকদের আগ্রহ তৈরি হয় না। বর্তমান বিশ্বে মানুষ সিদ্ধান্ত নেয় মূলত তথ্য এবং ধারণার উপর ভিত্তি করে। তাই ইতিবাচক প্রচারণা একটি পর্যটন গন্তব্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া “অ থিওরি” পর্যটন অবকাঠামোর ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। সহজ যাতায়াত, প্রয়োজনীয় সহায়ক সেবা এবং মানসম্মত থাকার ব্যবস্থা এই তিনটি উপাদান একটি পর্যটন গন্তব্যকে আকর্ষণীয় করে তোলে। এর মধ্যে কোনো একটি উপাদানের ঘাটতি পুরো ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিতে পারে। বিশেষ করে আবাসন সুবিধার অভাব পর্যটকদের অবস্থানকাল কমিয়ে দেয় এবং তাদের পুনরায় আসার আগ্রহ কমিয়ে দেয়। 

সবশেষে, “ঈ থিওরি” অর্থাৎ যোগাযোগ ব্যবস্থা পর্যটনের প্রাণ হিসেবে বিবেচিত। একটি পর্যটন গন্তব্য যতই আকর্ষণীয় হোক না কেন, যদি সেখানে পৌঁছানো কঠিন হয় বা যাতায়াত ব্যবস্থা দুর্বল হয়, তাহলে পর্যটকদের অভিজ্ঞতা নেতিবাচক হয়ে ওঠে। যানজট, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা পর্যটকদের বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সবকিছু বিবেচনা করে বলা যায়, পর্যটন শিল্প একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনা নির্ভর খাত, যেখানে প্রাকৃতিক সম্পদ, মানবিক আচরণ, তথ্যপ্রবাহ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন একে অপরের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। “অপ” এর নেতিবাচক প্রভাবগুলো নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে উন্নয়নের সব তত্ত্বই ব্যর্থ হয়ে যাবে। 

আরও পড়ুন, টেকসই পর্যটনে ‘অপ’-এর ছায়া: সংকট পেরিয়ে উত্তরণের পথ

অতএব, একটি টেকসই ও উন্নত পর্যটন শিল্প গড়ে তুলতে হলে প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা, দায়িত্বশীল আচরণ, সঠিক তথ্য প্রচার এবং কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা। সরকার, বেসরকারি খাত, গণমাধ্যম এবং স্থানীয় জনগণ সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। পরিশেষে বলা যায় পর্যটন শুধু ভ্রমণ নয়, এটি একটি দেশের সম্মান, সুনাম ও সম্ভাবনার প্রতিফলন। অপ নয়, ইতিবাচক উদ্যোগের মাধ্যমেই গড়ে উঠতে পারে একটি নিরাপদ, আকর্ষণীয় এবং টেকসই পর্যটন শিল্প। আজকের আলোচনার মূল কথা হচ্ছে পরিবেশ বান্ধব পর্যটন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। সকল প্রকার হয়রানি মুক্ত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। অপপ্রচার গুজব বন্ধ করতে হবে পর্যটন ব্যবস্থাপনাকে সকল প্রকার সিন্ডিকেট মুক্ত রাখতে হবে। স্থানীয় সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে হবে। বিদেশি পর্যটকদের কে আকর্ষণ করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। আধুনিকতার সাথে সমন্বয় সাধন করে পর্যটকদের চাহিদার সাথে  সেবা  সরবরাহের সাধন করতে হবে। আর যেই বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা হল নিরাপত্তা। পর্যটকদের কে নিরাপত্তা প্রদান করার ক্ষেত্রে কোন ধরনের সিন্ডিকেট, দুষ্কৃতীকারী ও অপ-সাংবাদিকতা বা অপ-প্রচারকারীদের নিকট আপোষ করা যাবে না। তাহলে আমরা টেকসই পর্যটন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারব।


দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

সম্পাদক ও প্রকাশক: এ বি এম মনিরুজ্জামান 
নির্বাহী সম্পাদক: রিপন রুদ্র
যুগ্ম সম্পাদক: জাকিয়া সুলতানা (লাভলী)

কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক সংবাদ দিগন্ত । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত