দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে পুলিশের ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা, এমনকি হত্যার মতো নৃশংস ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এর ফলে শুধু পুলিশ বাহিনীর মনোবলই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, বরং সাধারণ জনগণের নিরাপত্তা নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা বাহিনী যদি নিজেই নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, তাহলে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কতটা সম্ভব সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন স্থানে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা ও হত্যার ঘটনা গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। এসব ঘটনায় দেখা গেছে, দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক সময় পুলিশ সদস্যরা সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ, মব সহিংসতা কিংবা পরিকল্পিত হামলার শিকার হচ্ছেন। এটি শুধু বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি বড় সামাজিক ও প্রশাসনিক সংকটের প্রতিফলন।
আরো পড়ুন: আপেল মাহমুদকে ঘিরে সংবাদ নিয়ে প্রশ্ন, ভুয়া তথ্য ও অপপ্রচার
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন যে, ৫ আগস্টের আগে ও পরে সংঘটিত সকল পুলিশ হত্যার বিচার নিশ্চিত করা হবে। এই বক্তব্য নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ, তবে বাস্তবায়নই এখানে মূল বিষয়। অতীতে অনেক ঘটনাই বিচারহীনতার কারণে ধামাচাপা পড়ে গেছে এমন অভিযোগও রয়েছে। ফলে জনগণ এখন শুধু আশ্বাস নয়, দৃশ্যমান বিচার দেখতে চায়।
পুলিশ হত্যার বিচার দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক না হলে এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে। এতে অপরাধীরা উৎসাহিত হবে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আস্থাহীনতা বাড়বে। একই সঙ্গে পুলিশ সদস্যদের মধ্যেও দায়িত্ব পালনে অনীহা তৈরি হতে পারে, যা পুরো ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে তুলতে পারে।
আরো পড়ুন: অসত্য অভিযোগে চ্যালেঞ্জ, কঠোর হুঁশিয়ারি আপেল মাহমুদের
অন্যদিকে, পুলিশের পোশাক নিয়েও সম্প্রতি নানা গুঞ্জন ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কিছু পুলিশ কর্মকর্তা বর্তমান পোশাক নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। তাদের মতে, পোশাক শুধু একটি বাহ্যিক বিষয় নয়, বরং এটি পেশাগত মর্যাদা, পরিচয় এবং নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত। যদি কোনো পোশাক দায়িত্ব পালনে ঝুঁকি বাড়ায় বা জনসাধারণের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি করে, তাহলে তা পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
পুলিশের প্রতি জনগণের দৃষ্টিভঙ্গিও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বহু ক্ষেত্রে অভিযোগ রয়েছে, পুলিশের কিছু সদস্যের আচরণ সাধারণ মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ নয়। আবার উল্টোভাবে, জনগণের একটি অংশ পুলিশের প্রতি আক্রমণাত্মক মনোভাব পোষণ করে। এই পারস্পরিক অবিশ্বাস দূর না হলে একটি সুস্থ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
আরো পড়ুন: স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্বে পুলিশ সংস্কার
একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশ হবে জনগণের বন্ধু এই ধারণাটি বহুবার উচ্চারিত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক কতটা গড়ে উঠেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। পুলিশকে জনগণের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলতে হলে তাদের আচরণ, প্রশিক্ষণ ও সেবার মান উন্নত করতে হবে।
এক্ষেত্রে পুলিশ সংস্কার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। শুধু কাঠামোগত পরিবর্তন নয়, মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও জরুরি। পুলিশ সদস্যদের জন্য আধুনিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তাদের জন্য বিশেষ সুবিধা ও প্রণোদনা চালু করা যেতে পারে, যাতে তারা আরও দায়িত্বশীলভাবে কাজ করতে উৎসাহিত হন।
পুলিশের কাজের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের বাধাও রয়েছে। অনেক সময় রাজনৈতিক চাপ, প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ কিংবা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন না। এটি একটি স্বাধীন দেশের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে যদি স্বাধীনভাবে কাজ করতে না দেওয়া হয়, তাহলে অপরাধ দমন কার্যক্রম কখনোই কার্যকর হবে না।
আরো পড়ুন: নিরাপত্তা সংকটে সাধারণ মানুষ, চাপের মুখে সরকার
সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখেছি, দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে মব তৈরি করে হামলার ঘটনা ঘটেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে মুহূর্তের মধ্যে একটি পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করে তোলা হচ্ছে। এর ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। এই প্রবণতা রোধে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কঠোর আইন প্রয়োগ জরুরি।
মব জাস্টিস বা গণপিটুনি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি আইনের শাসনের পরিপন্থী এবং একটি সভ্য সমাজের জন্য মারাত্মক হুমকি। যারা এ ধরনের ঘটনায় জড়িত, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে জনগণকে বোঝাতে হবে যে, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কোনো সমাধান নয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের দায়িত্ব আরও বেড়ে গেছে। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। এজন্য প্রয়োজন দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ। পুলিশ সংস্কার, বিচারহীনতার অবসান এবং জনগণের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক উন্নয়ন এই তিনটি বিষয়কে সমন্বিতভাবে দেখতে হবে।
আরো পড়ুন: নির্বাচনী অস্থিরতায় দেশ, চ্যালেঞ্জের মুখে আইনশৃঙ্খলা
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, একটি স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন করা যেতে পারে, যা পুলিশের কার্যক্রম তদারকি করবে এবং সংস্কারের সুপারিশ প্রদান করবে। একই সঙ্গে অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তের জন্য একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
পুলিশের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের অধিকার ও নিরাপত্তাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় দেখা যায়, দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তারা আইনি জটিলতায় পড়েন বা যথাযথ সুরক্ষা পান না। এটি দূর করতে হলে আইনগত কাঠামো আরও শক্তিশালী করতে হবে।
পুলিশ সদস্যদের জন্য পর্যাপ্ত বিশ্রাম, ছুটি এবং মানবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। দীর্ঘ সময় কাজের চাপ এবং মানসিক চাপ তাদের কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ফলে তারা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন না।
প্রযুক্তির ব্যবহারও পুলিশের কার্যক্রমে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। সিসিটিভি, বডি ক্যামেরা, ডিজিটাল ডাটাবেজ এবং আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা পুলিশের কাজকে আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর করতে পারে। এতে যেমন অপরাধ দমন সহজ হবে, তেমনি পুলিশের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগও কমবে।
জনগণের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক উন্নয়নে কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। স্থানীয় পর্যায়ে জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বৃদ্ধি পেলে ভুল বোঝাবুঝি কমবে এবং পারস্পরিক আস্থা তৈরি হবে।
আরো পড়ুন: পর্যটন নিরাপত্তায় শীর্ষ পর্যায়ের নজর
শিক্ষা ও সচেতনতার মাধ্যমেও অনেক সমস্যা সমাধান সম্ভব। স্কুল-কলেজ পর্যায়ে আইন ও নাগরিক দায়িত্ব সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আরও সচেতন হবে। এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও উন্নতি ঘটবে।
সবশেষে বলতে হয়, পুলিশ হত্যা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি বড় সংকটের লক্ষণ। এই সংকট থেকে উত্তরণে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। সরকার, পুলিশ প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং সাধারণ জনগণ সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন আনতে।
দ্রুত বিচার, কার্যকর সংস্কার এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে পুলিশকে একটি আধুনিক, দক্ষ ও জনবান্ধব বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। আর সেটিই হবে একটি নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও আইনের শাসনভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার অন্যতম প্রধান শর্ত।

শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ মার্চ ২০২৬
দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে পুলিশের ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা, এমনকি হত্যার মতো নৃশংস ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এর ফলে শুধু পুলিশ বাহিনীর মনোবলই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, বরং সাধারণ জনগণের নিরাপত্তা নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা বাহিনী যদি নিজেই নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, তাহলে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কতটা সম্ভব সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন স্থানে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা ও হত্যার ঘটনা গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। এসব ঘটনায় দেখা গেছে, দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক সময় পুলিশ সদস্যরা সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ, মব সহিংসতা কিংবা পরিকল্পিত হামলার শিকার হচ্ছেন। এটি শুধু বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি বড় সামাজিক ও প্রশাসনিক সংকটের প্রতিফলন।
আরো পড়ুন: আপেল মাহমুদকে ঘিরে সংবাদ নিয়ে প্রশ্ন, ভুয়া তথ্য ও অপপ্রচার
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন যে, ৫ আগস্টের আগে ও পরে সংঘটিত সকল পুলিশ হত্যার বিচার নিশ্চিত করা হবে। এই বক্তব্য নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ, তবে বাস্তবায়নই এখানে মূল বিষয়। অতীতে অনেক ঘটনাই বিচারহীনতার কারণে ধামাচাপা পড়ে গেছে এমন অভিযোগও রয়েছে। ফলে জনগণ এখন শুধু আশ্বাস নয়, দৃশ্যমান বিচার দেখতে চায়।
পুলিশ হত্যার বিচার দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক না হলে এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে। এতে অপরাধীরা উৎসাহিত হবে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আস্থাহীনতা বাড়বে। একই সঙ্গে পুলিশ সদস্যদের মধ্যেও দায়িত্ব পালনে অনীহা তৈরি হতে পারে, যা পুরো ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে তুলতে পারে।
আরো পড়ুন: অসত্য অভিযোগে চ্যালেঞ্জ, কঠোর হুঁশিয়ারি আপেল মাহমুদের
অন্যদিকে, পুলিশের পোশাক নিয়েও সম্প্রতি নানা গুঞ্জন ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কিছু পুলিশ কর্মকর্তা বর্তমান পোশাক নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। তাদের মতে, পোশাক শুধু একটি বাহ্যিক বিষয় নয়, বরং এটি পেশাগত মর্যাদা, পরিচয় এবং নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত। যদি কোনো পোশাক দায়িত্ব পালনে ঝুঁকি বাড়ায় বা জনসাধারণের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি করে, তাহলে তা পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
পুলিশের প্রতি জনগণের দৃষ্টিভঙ্গিও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বহু ক্ষেত্রে অভিযোগ রয়েছে, পুলিশের কিছু সদস্যের আচরণ সাধারণ মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ নয়। আবার উল্টোভাবে, জনগণের একটি অংশ পুলিশের প্রতি আক্রমণাত্মক মনোভাব পোষণ করে। এই পারস্পরিক অবিশ্বাস দূর না হলে একটি সুস্থ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
আরো পড়ুন: স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্বে পুলিশ সংস্কার
একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশ হবে জনগণের বন্ধু এই ধারণাটি বহুবার উচ্চারিত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক কতটা গড়ে উঠেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। পুলিশকে জনগণের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলতে হলে তাদের আচরণ, প্রশিক্ষণ ও সেবার মান উন্নত করতে হবে।
এক্ষেত্রে পুলিশ সংস্কার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। শুধু কাঠামোগত পরিবর্তন নয়, মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও জরুরি। পুলিশ সদস্যদের জন্য আধুনিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তাদের জন্য বিশেষ সুবিধা ও প্রণোদনা চালু করা যেতে পারে, যাতে তারা আরও দায়িত্বশীলভাবে কাজ করতে উৎসাহিত হন।
পুলিশের কাজের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের বাধাও রয়েছে। অনেক সময় রাজনৈতিক চাপ, প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ কিংবা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন না। এটি একটি স্বাধীন দেশের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে যদি স্বাধীনভাবে কাজ করতে না দেওয়া হয়, তাহলে অপরাধ দমন কার্যক্রম কখনোই কার্যকর হবে না।
আরো পড়ুন: নিরাপত্তা সংকটে সাধারণ মানুষ, চাপের মুখে সরকার
সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখেছি, দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে মব তৈরি করে হামলার ঘটনা ঘটেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে মুহূর্তের মধ্যে একটি পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করে তোলা হচ্ছে। এর ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। এই প্রবণতা রোধে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কঠোর আইন প্রয়োগ জরুরি।
মব জাস্টিস বা গণপিটুনি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি আইনের শাসনের পরিপন্থী এবং একটি সভ্য সমাজের জন্য মারাত্মক হুমকি। যারা এ ধরনের ঘটনায় জড়িত, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে জনগণকে বোঝাতে হবে যে, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কোনো সমাধান নয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের দায়িত্ব আরও বেড়ে গেছে। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। এজন্য প্রয়োজন দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ। পুলিশ সংস্কার, বিচারহীনতার অবসান এবং জনগণের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক উন্নয়ন এই তিনটি বিষয়কে সমন্বিতভাবে দেখতে হবে।
আরো পড়ুন: নির্বাচনী অস্থিরতায় দেশ, চ্যালেঞ্জের মুখে আইনশৃঙ্খলা
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, একটি স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন করা যেতে পারে, যা পুলিশের কার্যক্রম তদারকি করবে এবং সংস্কারের সুপারিশ প্রদান করবে। একই সঙ্গে অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তের জন্য একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
পুলিশের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের অধিকার ও নিরাপত্তাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় দেখা যায়, দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তারা আইনি জটিলতায় পড়েন বা যথাযথ সুরক্ষা পান না। এটি দূর করতে হলে আইনগত কাঠামো আরও শক্তিশালী করতে হবে।
পুলিশ সদস্যদের জন্য পর্যাপ্ত বিশ্রাম, ছুটি এবং মানবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। দীর্ঘ সময় কাজের চাপ এবং মানসিক চাপ তাদের কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ফলে তারা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন না।
প্রযুক্তির ব্যবহারও পুলিশের কার্যক্রমে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। সিসিটিভি, বডি ক্যামেরা, ডিজিটাল ডাটাবেজ এবং আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা পুলিশের কাজকে আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর করতে পারে। এতে যেমন অপরাধ দমন সহজ হবে, তেমনি পুলিশের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগও কমবে।
জনগণের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক উন্নয়নে কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। স্থানীয় পর্যায়ে জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বৃদ্ধি পেলে ভুল বোঝাবুঝি কমবে এবং পারস্পরিক আস্থা তৈরি হবে।
আরো পড়ুন: পর্যটন নিরাপত্তায় শীর্ষ পর্যায়ের নজর
শিক্ষা ও সচেতনতার মাধ্যমেও অনেক সমস্যা সমাধান সম্ভব। স্কুল-কলেজ পর্যায়ে আইন ও নাগরিক দায়িত্ব সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আরও সচেতন হবে। এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও উন্নতি ঘটবে।
সবশেষে বলতে হয়, পুলিশ হত্যা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি বড় সংকটের লক্ষণ। এই সংকট থেকে উত্তরণে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। সরকার, পুলিশ প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং সাধারণ জনগণ সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন আনতে।
দ্রুত বিচার, কার্যকর সংস্কার এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে পুলিশকে একটি আধুনিক, দক্ষ ও জনবান্ধব বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। আর সেটিই হবে একটি নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও আইনের শাসনভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার অন্যতম প্রধান শর্ত।

আপনার মতামত লিখুন