বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল একটি ক্ষমতা বদলের আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি রাষ্ট্র সংস্কার এবং নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের এক অগ্নিপরীক্ষা। চব্বিশের ৫ আগস্ট পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই নির্বাচনকে ঘিরে জনমনে যেমন রয়েছে বিপুল আকাঙ্ক্ষা, তেমনি নিরাপত্তার প্রশ্নে দানা বেঁধেছে নানান আশঙ্কা । আট লাখের এক বিশাল নিরাপত্তা বাহিনী, অত্যাধুনিক ‘সুরক্ষা অ্যাপ’ এবং সেনাবাহিনীর আকাশছোঁয়া প্রস্তুতির যে নিশ্ছিদ্র বলয় সরকার ঘোষণা করেছে, তা গাণিতিকভাবে আশাব্যঞ্জক হলেও মাঠপর্যায়ের রূঢ় বাস্তবতায় লুকিয়ে আছে অনেক ‘যদি’ এবং ‘কিন্তু’। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৫৪ এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন থেকে শুরু করে ১৯৭০ এর সাধারণ নির্বাচন কিংবা নব্বই পরবর্তী গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা প্রতিটি বাঁকেই নির্বাচন ছিল জাতির ভাগ্য পরিবর্তনের চাবিকাঠি। কিন্তু বর্তমানের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। একদিকে রাষ্ট্রযন্ত্রের সর্বোচ্চ প্রস্তুতি, অন্যদিকে থানা থেকে লুণ্ঠিত ১,৩৩৩টি অস্ত্রের রহস্যময় নিখোঁজ থাকা এবং পুলিশের মনস্তাত্ত্বিক ট্রমা এই দুইয়ের মধ্যবর্তী রেখায় দাঁড়িয়ে আছে দেশের ভবিষ্যৎ।
একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক স্থায়িত্ব নির্ভর করে তার নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং সেই প্রক্রিয়ায় নাগরিকদের ভীতিহীন অংশগ্রহণের ওপর। বর্তমান সরকার যে বিশাল নিরাপত্তা ছক এঁকেছে, তার মূলে রয়েছে এক লাখ সেনাসদস্যের উপস্থিতি। ১০ জানুয়ারি যেখানে সেনা সংখ্যা ছিল ৩৫ হাজার, সেখানে ২০ জানুয়ারির মধ্যে তা এক লাখে উন্নীত করা এবং নৌ ও বিমান বাহিনীর সমন্বিত টহল মূলত জিরো টলারেন্স নীতির ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু নিরাপত্তার এই বাহ্যিক কাঠামোর ভেতরে যে ক্ষতগুলো রয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের পরিসংখ্যান বলছে, তফসিল ঘোষণার পরবর্তী মাত্র ৩৬ দিনে ১৫ জন রাজনৈতিক কর্মীর প্রাণহানি ঘটেছে। ২০২৫ সাল জুড়েই রাজনৈতিক সহিংসতার যে তাণ্ডব চলেছে, তাতে ১০২ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এই রক্তের দাগ মুছে ফেলে একটি উৎসবমুখর নির্বাচন উপহার দেওয়া কেবল সংখ্যার বিচারে সম্ভব নয়, বরং এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং বাহিনীর পেশাদারিত্ব।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে লুণ্ঠিত অস্ত্র। বিজিবি ও ডিএমপির সাম্প্রতিক " ডেভিল হান্ট ফেজু২ " অপারেশনে বিদেশি পিস্তল, এসএমজি ও বিস্ফোরক উদ্ধার হলেও লুণ্ঠিত অস্ত্রের একটি বড় অংশ এখনও চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের হাতে রয়ে গেছে। এই অবৈধ মারণাস্ত্রগুলো ভোটের দিন সংঘাতের তীব্রতা কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নতুন করে অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ, যা মূলত আগুনের ওপর ঘি ঢালার মতো কাজ করছে বলে অনেক নিরাপত্তা বিশ্লেষক মনে করেন। পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ নুরুল হুদা বর্তমান পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে না বললেও, বর্তমান আইজিপি বাহারুল আলমের বয়ানে ফুটে উঠেছে এক প্রচ্ছন্ন অসহায়ত্ব কিংবা রূঢ় বাস্তবতা। তাঁর মতে, সহিংসতাহীন নির্বাচন এ দেশের জাতির জীবনে কোনোদিন হয়নি। এই মন্তব্যটি কেবল একটি প্রশাসনিক পর্যবেক্ষণ নয়, বরং এটি আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক করুণ প্রতিফলন। নির্বাচনকে আমরা যখন যুদ্ধ হিসেবে দেখি এবং নির্বাচনের প্রতিযোগি কে যখন প্রতিদ্বন্দ্বী বা শত্রু মনে করি, তখন অস্ত্র ই হয়ে ওঠে তর্কের শেষ ভাষা।
নিরাপত্তার জনবল বিন্যাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, এবারই প্রথম আনসার ও ভিডিপির পাঁচ লাখ ৬০ হাজার সদস্যকে কেন্দ্রীয় ভূমিকা দেওয়া হয়েছে। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় " নির্বাচন সুরক্ষা অ্যাপ " ব্যবহার করে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রকে মোবাইল ট্র্যাকিং ফোর্সের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি আধুনিক পদক্ষেপ। তবে প্রযুক্তির কার্যকারিতা নির্ভর করে মানুষের সততার ওপর। চব্বিশের ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে পুলিশের যে মনস্তাত্ত্বিক ট্রমা তৈরি হয়েছে, তা এখনও পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। নিরাপত্তা ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, পুলিশ যদি তাদের সক্ষমতা ও নিরপেক্ষতা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়, তবে যৌথ বাহিনীর ওপর চাপ বাড়বে অসহনীয় মাত্রায়। রাজধানীর ২,১৩১টি ভোটকেন্দ্রের সুরক্ষায় ২৫ হাজার পুলিশ সদস্যের মোতায়েন কাগজ-কলমে শক্তিশালী মনে হলেও, মাঠপর্যায়ে তাদের কার্যকারিতাই হবে ভোটের দিনের আসল ভাগ্যনিয়ন্তা।
নির্বাচন মানে কেবল ব্যালট বাক্সে রায় দেওয়া নয় এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার প্রয়োগের সবচেয়ে দৃশ্যমান ক্ষেত্র। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলের নির্বাচনের তিক্ত অভিজ্ঞতা অধিকাংশ ভোটারকে কেন্দ্রবিমুখ করেছে। ভয়ভীতি, কেন্দ্র দখল এবং প্রশাসনিক পক্ষপাতের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তা ভাঙাই হবে ত্রয়োদশ নির্বাচনের প্রধান লক্ষ্য। ভোটার উপস্থিতি কেবল উৎসাহের বিষয় নয়, এটি নিরাপত্তার নিশ্চয়তার ফসল। নারী ভোটার, বয়স্ক মানুষ এবং প্রথমবার ভোট দিতে যাওয়া তরুণদের জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে না পারলে এই বিপুল আয়োজন কেবল একটি ব্যয়বহুল আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব এখানে সবচেয়ে বেশি। প্রার্থীরা যদি তাদের কর্মীদের উস্কানি থেকে বিরত না রাখেন এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে ব্যক্তিগত শত্রুতায় রূপান্তর করেন, তবে আট লাখ কেন, আশি লাখ সদস্য দিয়েও শান্তি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভূমিকাও এই নির্বাচনে তলোয়ারের মতো দ্বিমুখী হতে পারে। সঠিক তথ্য দ্রুত পৌঁছলে যেমন গুজব কমে, তেমনি ভুল তথ্যের প্রচার মুহূর্তে দাঙ্গা বাঁধিয়ে দিতে পারে।গুজব ছড়িয়ে বড় ধরনের ভাঙচুর বা সহিংসতার ঝুঁকি রুখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গোয়েন্দা শাখাগুলোকে আরও তৎপর হতে হবে। তথ্যের স্বচ্ছতাই পারে সংঘাতের ঝুঁকি কমাতে।
আরও পড়ুন, কিয়ামতের দিনে আল্লাহর সঙ্গে বিবেচ্য তিনটি গুরুতর অপরাধ
প্রতিটি ভোটকেন্দ্র থেকে" নির্বাচন সুরক্ষা অ্যাপ " এর মাধ্যমে যে তাৎক্ষণিক রিপোর্টিং হবে, তার স্বচ্ছতা যেন সাধারণ মানুষের কাছেও দৃশ্যমান হয়। ২০২৬ সালের এই নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন অধ্যায়ের সম্ভাবনা নিয়ে এসেছে। মানুষ চায় এমন একটি সংসদ, যেখানে কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের দাপট থাকবে না, বরং নাগরিকের আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটবে। সুষ্ঠু ভোটের শান্তি কেবল ভোটের দিনে থেমে থাকে না, এটি নির্বাচনের পরবর্তী রাষ্ট্র পরিচালনার বৈধতা ও স্থিতি নির্ধারণ করে। বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন হলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে, বিনিয়োগ বাড়বে এবং সমাজ থেকে দীর্ঘস্থায়ী বিভাজন কমবে। অন্যদিকে, লুণ্ঠিত অস্ত্রের আস্ফালন আর মনস্তাত্ত্বিক ট্রমায় ভোগা পুলিশের নির্বিকার ভূমিকা যদি বজায় থাকে, তবে জাতির কপালে যে চিন্তার ভাঁজ রয়েছে তা আরও গভীর হবে।
পরিশেষে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল একটি তারিখ নয়, এটি একটি জাতির আত্মশুদ্ধির পরীক্ষা। পুলিশ প্রধানের সেই প্রশ্ন " সহিংসতাহীন বা মৃত্যুহীন নির্বাচন কি আমাদের জাতির জীবনে কখনও হয়েছে?" এই কলঙ্ক তিলক মোছার সুযোগ এসেছে এবার। সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারে এবং রাজনৈতিক দলগুলো যদি সহনশীলতার পরিচয় দেয়, তবেই নতুন বাংলাদেশ এর স্বপ্ন সফল হবে। নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার বলয় যেন কেবল ক্ষমতার চাদর না হয়, বরং তা যেন হয় সাধারণ ভোটারের পরম নির্ভরতার আশ্রয়। সহিংসতা যেন আমাদের নির্বাচনের অমোঘ নিয়তি না হয়ে দাঁড়ায়, বরং ভোটাধিকার প্রয়োগই যেন হয় শান্তির নতুন ভাষা। একটি সুন্দর, স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমেই বাংলাদেশ হাঁটবে তার নতুন গন্তব্য, আমারা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ পাবো একটি নতুন প্রকৃত গনতান্ত্রিক মূল্যবোধের বাংলাদেশে যেখানে আইন তার নিজের গতিতে চলবে, মানুষের সকল মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা পাবে।
বিষয় : নির্বাচন ওয়াসিম ফারুক

মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল একটি ক্ষমতা বদলের আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি রাষ্ট্র সংস্কার এবং নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের এক অগ্নিপরীক্ষা। চব্বিশের ৫ আগস্ট পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই নির্বাচনকে ঘিরে জনমনে যেমন রয়েছে বিপুল আকাঙ্ক্ষা, তেমনি নিরাপত্তার প্রশ্নে দানা বেঁধেছে নানান আশঙ্কা । আট লাখের এক বিশাল নিরাপত্তা বাহিনী, অত্যাধুনিক ‘সুরক্ষা অ্যাপ’ এবং সেনাবাহিনীর আকাশছোঁয়া প্রস্তুতির যে নিশ্ছিদ্র বলয় সরকার ঘোষণা করেছে, তা গাণিতিকভাবে আশাব্যঞ্জক হলেও মাঠপর্যায়ের রূঢ় বাস্তবতায় লুকিয়ে আছে অনেক ‘যদি’ এবং ‘কিন্তু’। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৫৪ এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন থেকে শুরু করে ১৯৭০ এর সাধারণ নির্বাচন কিংবা নব্বই পরবর্তী গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা প্রতিটি বাঁকেই নির্বাচন ছিল জাতির ভাগ্য পরিবর্তনের চাবিকাঠি। কিন্তু বর্তমানের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। একদিকে রাষ্ট্রযন্ত্রের সর্বোচ্চ প্রস্তুতি, অন্যদিকে থানা থেকে লুণ্ঠিত ১,৩৩৩টি অস্ত্রের রহস্যময় নিখোঁজ থাকা এবং পুলিশের মনস্তাত্ত্বিক ট্রমা এই দুইয়ের মধ্যবর্তী রেখায় দাঁড়িয়ে আছে দেশের ভবিষ্যৎ।
একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক স্থায়িত্ব নির্ভর করে তার নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং সেই প্রক্রিয়ায় নাগরিকদের ভীতিহীন অংশগ্রহণের ওপর। বর্তমান সরকার যে বিশাল নিরাপত্তা ছক এঁকেছে, তার মূলে রয়েছে এক লাখ সেনাসদস্যের উপস্থিতি। ১০ জানুয়ারি যেখানে সেনা সংখ্যা ছিল ৩৫ হাজার, সেখানে ২০ জানুয়ারির মধ্যে তা এক লাখে উন্নীত করা এবং নৌ ও বিমান বাহিনীর সমন্বিত টহল মূলত জিরো টলারেন্স নীতির ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু নিরাপত্তার এই বাহ্যিক কাঠামোর ভেতরে যে ক্ষতগুলো রয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের পরিসংখ্যান বলছে, তফসিল ঘোষণার পরবর্তী মাত্র ৩৬ দিনে ১৫ জন রাজনৈতিক কর্মীর প্রাণহানি ঘটেছে। ২০২৫ সাল জুড়েই রাজনৈতিক সহিংসতার যে তাণ্ডব চলেছে, তাতে ১০২ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এই রক্তের দাগ মুছে ফেলে একটি উৎসবমুখর নির্বাচন উপহার দেওয়া কেবল সংখ্যার বিচারে সম্ভব নয়, বরং এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং বাহিনীর পেশাদারিত্ব।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে লুণ্ঠিত অস্ত্র। বিজিবি ও ডিএমপির সাম্প্রতিক " ডেভিল হান্ট ফেজু২ " অপারেশনে বিদেশি পিস্তল, এসএমজি ও বিস্ফোরক উদ্ধার হলেও লুণ্ঠিত অস্ত্রের একটি বড় অংশ এখনও চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের হাতে রয়ে গেছে। এই অবৈধ মারণাস্ত্রগুলো ভোটের দিন সংঘাতের তীব্রতা কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নতুন করে অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ, যা মূলত আগুনের ওপর ঘি ঢালার মতো কাজ করছে বলে অনেক নিরাপত্তা বিশ্লেষক মনে করেন। পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ নুরুল হুদা বর্তমান পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে না বললেও, বর্তমান আইজিপি বাহারুল আলমের বয়ানে ফুটে উঠেছে এক প্রচ্ছন্ন অসহায়ত্ব কিংবা রূঢ় বাস্তবতা। তাঁর মতে, সহিংসতাহীন নির্বাচন এ দেশের জাতির জীবনে কোনোদিন হয়নি। এই মন্তব্যটি কেবল একটি প্রশাসনিক পর্যবেক্ষণ নয়, বরং এটি আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক করুণ প্রতিফলন। নির্বাচনকে আমরা যখন যুদ্ধ হিসেবে দেখি এবং নির্বাচনের প্রতিযোগি কে যখন প্রতিদ্বন্দ্বী বা শত্রু মনে করি, তখন অস্ত্র ই হয়ে ওঠে তর্কের শেষ ভাষা।
নিরাপত্তার জনবল বিন্যাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, এবারই প্রথম আনসার ও ভিডিপির পাঁচ লাখ ৬০ হাজার সদস্যকে কেন্দ্রীয় ভূমিকা দেওয়া হয়েছে। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় " নির্বাচন সুরক্ষা অ্যাপ " ব্যবহার করে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রকে মোবাইল ট্র্যাকিং ফোর্সের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি আধুনিক পদক্ষেপ। তবে প্রযুক্তির কার্যকারিতা নির্ভর করে মানুষের সততার ওপর। চব্বিশের ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে পুলিশের যে মনস্তাত্ত্বিক ট্রমা তৈরি হয়েছে, তা এখনও পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। নিরাপত্তা ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, পুলিশ যদি তাদের সক্ষমতা ও নিরপেক্ষতা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়, তবে যৌথ বাহিনীর ওপর চাপ বাড়বে অসহনীয় মাত্রায়। রাজধানীর ২,১৩১টি ভোটকেন্দ্রের সুরক্ষায় ২৫ হাজার পুলিশ সদস্যের মোতায়েন কাগজ-কলমে শক্তিশালী মনে হলেও, মাঠপর্যায়ে তাদের কার্যকারিতাই হবে ভোটের দিনের আসল ভাগ্যনিয়ন্তা।
নির্বাচন মানে কেবল ব্যালট বাক্সে রায় দেওয়া নয় এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার প্রয়োগের সবচেয়ে দৃশ্যমান ক্ষেত্র। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলের নির্বাচনের তিক্ত অভিজ্ঞতা অধিকাংশ ভোটারকে কেন্দ্রবিমুখ করেছে। ভয়ভীতি, কেন্দ্র দখল এবং প্রশাসনিক পক্ষপাতের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তা ভাঙাই হবে ত্রয়োদশ নির্বাচনের প্রধান লক্ষ্য। ভোটার উপস্থিতি কেবল উৎসাহের বিষয় নয়, এটি নিরাপত্তার নিশ্চয়তার ফসল। নারী ভোটার, বয়স্ক মানুষ এবং প্রথমবার ভোট দিতে যাওয়া তরুণদের জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে না পারলে এই বিপুল আয়োজন কেবল একটি ব্যয়বহুল আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব এখানে সবচেয়ে বেশি। প্রার্থীরা যদি তাদের কর্মীদের উস্কানি থেকে বিরত না রাখেন এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে ব্যক্তিগত শত্রুতায় রূপান্তর করেন, তবে আট লাখ কেন, আশি লাখ সদস্য দিয়েও শান্তি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভূমিকাও এই নির্বাচনে তলোয়ারের মতো দ্বিমুখী হতে পারে। সঠিক তথ্য দ্রুত পৌঁছলে যেমন গুজব কমে, তেমনি ভুল তথ্যের প্রচার মুহূর্তে দাঙ্গা বাঁধিয়ে দিতে পারে।গুজব ছড়িয়ে বড় ধরনের ভাঙচুর বা সহিংসতার ঝুঁকি রুখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গোয়েন্দা শাখাগুলোকে আরও তৎপর হতে হবে। তথ্যের স্বচ্ছতাই পারে সংঘাতের ঝুঁকি কমাতে।
আরও পড়ুন, কিয়ামতের দিনে আল্লাহর সঙ্গে বিবেচ্য তিনটি গুরুতর অপরাধ
প্রতিটি ভোটকেন্দ্র থেকে" নির্বাচন সুরক্ষা অ্যাপ " এর মাধ্যমে যে তাৎক্ষণিক রিপোর্টিং হবে, তার স্বচ্ছতা যেন সাধারণ মানুষের কাছেও দৃশ্যমান হয়। ২০২৬ সালের এই নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন অধ্যায়ের সম্ভাবনা নিয়ে এসেছে। মানুষ চায় এমন একটি সংসদ, যেখানে কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের দাপট থাকবে না, বরং নাগরিকের আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটবে। সুষ্ঠু ভোটের শান্তি কেবল ভোটের দিনে থেমে থাকে না, এটি নির্বাচনের পরবর্তী রাষ্ট্র পরিচালনার বৈধতা ও স্থিতি নির্ধারণ করে। বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন হলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে, বিনিয়োগ বাড়বে এবং সমাজ থেকে দীর্ঘস্থায়ী বিভাজন কমবে। অন্যদিকে, লুণ্ঠিত অস্ত্রের আস্ফালন আর মনস্তাত্ত্বিক ট্রমায় ভোগা পুলিশের নির্বিকার ভূমিকা যদি বজায় থাকে, তবে জাতির কপালে যে চিন্তার ভাঁজ রয়েছে তা আরও গভীর হবে।
পরিশেষে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল একটি তারিখ নয়, এটি একটি জাতির আত্মশুদ্ধির পরীক্ষা। পুলিশ প্রধানের সেই প্রশ্ন " সহিংসতাহীন বা মৃত্যুহীন নির্বাচন কি আমাদের জাতির জীবনে কখনও হয়েছে?" এই কলঙ্ক তিলক মোছার সুযোগ এসেছে এবার। সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারে এবং রাজনৈতিক দলগুলো যদি সহনশীলতার পরিচয় দেয়, তবেই নতুন বাংলাদেশ এর স্বপ্ন সফল হবে। নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার বলয় যেন কেবল ক্ষমতার চাদর না হয়, বরং তা যেন হয় সাধারণ ভোটারের পরম নির্ভরতার আশ্রয়। সহিংসতা যেন আমাদের নির্বাচনের অমোঘ নিয়তি না হয়ে দাঁড়ায়, বরং ভোটাধিকার প্রয়োগই যেন হয় শান্তির নতুন ভাষা। একটি সুন্দর, স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমেই বাংলাদেশ হাঁটবে তার নতুন গন্তব্য, আমারা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ পাবো একটি নতুন প্রকৃত গনতান্ত্রিক মূল্যবোধের বাংলাদেশে যেখানে আইন তার নিজের গতিতে চলবে, মানুষের সকল মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা পাবে।

আপনার মতামত লিখুন