দৈনিক সংবাদ দিগন্ত
প্রকাশ : রোববার, ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

ধানের শীষ দাঁড়িপাল্লার লড়াইয়ে উত্তপ্ত কুষ্টিয়া- ৩

ধানের শীষ দাঁড়িপাল্লার লড়াইয়ে উত্তপ্ত কুষ্টিয়া- ৩
ধানের শীষ দাঁড়িপাল্লার লড়াইয়ে উত্তপ্ত কুষ্টিয়া- ৩

জাতীয় সংসদের ৭৭ নম্বর কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসন বরাবরই জেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত নির্বাচনী এলাকা। জেলার প্রশাসনিক সদর হওয়ায় এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত এই আসনের ফলাফল প্রায়ই জাতীয় রাজনীতিতেও প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় কুষ্টিয়া সদরে এবার জমে উঠেছে ধানের শীষ (বিএনপি) ও দাঁড়িপাল্লা (জামায়াতে ইসলামী) প্রতীকের মধ্যকার সরাসরি লড়াই। ১৯৯১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এ আসনে পর্যায়ক্রমে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জয়ী হয়ে আসছেন। ১৯৯১ ও জুন ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিএনপির আবদুল খালেক চন্টু সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে একই দলের অধ্যক্ষ সোহরাব উদ্দিন জয়ী হয়ে কুষ্টিয়া সদরকে বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত করেন। 

পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের খন্দকার রশিদুজ্জামান দুদু জয়ী হন। এরপর ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪—টানা তিনটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ফলে এক যুগের বেশি সময় ধরে এই আসনে আওয়ামী লীগের আধিপত্য  অতীতে তিনবার টানা জয় পাওয়া স্মৃতি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বিএনপি এবারও আসন পুনরুদ্ধারে মরিয়া। দলটির প্রার্থী প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকার এর আগে উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। স্থানীয় রাজনীতিতে পরিচিত মুখ, সংগঠন ও ইউনিয়নভিত্তিক নেটওয়ার্কে তার প্রভাব রয়েছে বলে মনে করছেন সমর্থকরা।

অন্যদিকে, অতীতে তৃতীয় অবস্থানে থাকা জামায়াতে ইসলামী এবার মুফতি আমির হামজাকে প্রার্থী করে এককভাবে আসন দখলের স্বপ্ন দেখছে। ওয়াজের মঞ্চের পরিচিত বক্তা হলেও সংসদীয় রাজনীতিতে এটি তার প্রথম বড় পরীক্ষা। নতুন মুখ হয়েও মাঠে কড়া প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছেন তিনি, যা বিএনপির জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। এবারের নির্বাচনে নারী ভোটারদের বড় একটি অংশকে টার্গেট করে দুই দলই বিশেষ কৌশল নিয়েছে। জামায়াতের নারী কর্মীরা দলবদ্ধভাবে বাড়ি-বাড়ি গিয়ে নারী ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। একইভাবে বিএনপির নারী নেত্রী-কর্মীরাও ধানের শীষের পক্ষে সমর্থন বাড়াতে মাঠে সক্রিয়।

অনেক ভোটারের মতে, ওয়াজের মাধ্যমে পরিচিত হওয়ায় আমির হামজার প্রতি নারী ভোটার, ভ্যান-রিকশাচালক, কৃষকসহ সাধারণ মানুষের একটি অংশ আকৃষ্ট হয়েছে। তবে তার কিছু বক্তব্য ও বয়সজনিত রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার ঘাটতি নিয়ে প্রশ্নও তুলছেন সচেতন মহল। রাজনৈতিকভাবে সচেতনদের মতে, স্বাধীনতার পর এই আসনে জামায়াত এককভাবে কখনো জয় পায়নি। দলটির একটি স্থায়ী ভোট ব্যাংক থাকলেও তা সাধারণত ৩০ হাজারের আশেপাশে। এবার সেই ভোট কিছুটা বাড়লেও আসন জিততে হলে লক্ষাধিক ভোট প্রয়োজন—এমনটাই মত স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। বিএনপি প্রার্থী জাকির হোসেন সরকারের পক্ষে যুক্তি হিসেবে তার জনপ্রতিনিধি হিসেবে পূর্ব অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের বিষয়টি সামনে আসছে। তবে তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন নেতার আচরণ ও নেতিবাচক প্রচারণা তাকে কিছুটা বিব্রত করছে বলেও আলোচনা রয়েছে।

আরও পড়ুন, ফরিদপুর জেলা পুলিশে এএসপি রোকুনুজ্জামানের যোগদান

বর্তমানে মাঠের চিত্রে দেখা যাচ্ছে, প্রচারণায় কেউ কাউকে ছাড় দিচ্ছে না। জামায়াতের কর্মীরা ফজর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত প্রচার চালাচ্ছেন। বিএনপিও শুরুতে কিছুটা ধীর থাকলেও এখন গতি বাড়িয়েছে। শহরের অলিগলি ব্যানার-ফেস্টুনে ভরে গেছে। আচরণবিধি লঙ্ঘন করে বিদ্যুতের খুঁটিতেও পোস্টার ঝুলতে দেখা গেলেও প্রশাসনের তৎপরতা চোখে পড়ছে না। এদিকে জামায়াত প্রার্থী আমির হামজার ফেসবুক পেজ সরিয়ে নেওয়ার ঘটনায় দলটি ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলেছে। আমির হামজার দাবি, কোনো ষড়যন্ত্র করে দাঁড়িপাল্লার বিজয় ঠেকানো যাবে না, ভোটের দিনই এর জবাব দেবে জনগণ। অন্যদিকে বিএনপি প্রার্থী জাকির হোসেন সরকার বলছেন, বিএনপি উন্নয়নের স্পষ্ট রূপরেখা দিয়েছে, মানুষ সাড়া দিচ্ছে এবং অতীতের মতো এবারও ধানের শীষকে বিজয়ী করবে।

স্থানীয়দের মতে, শেষ পর্যন্ত বড় ভূমিকা রাখতে পারে আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ ভোটারদের অবস্থান। দুই পক্ষই নানাভাবে এই ভোটারদের কাছে টানার চেষ্টা করছে। আওয়ামী লীগপন্থী ভোট যে দল বেশি আদায় করতে পারবে, শেষ পর্যন্ত তাদের পাল্লাই ভারী হতে পারে। সব মিলিয়ে কুষ্টিয়া-৩ সদর আসনে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার লড়াই এখন সমানে-সমানে—এমনটাই মনে করছেন অধিকাংশ ভোটার।

বিষয় : কুষ্টিয়া দাঁড়িপাল্লা

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬


ধানের শীষ দাঁড়িপাল্লার লড়াইয়ে উত্তপ্ত কুষ্টিয়া- ৩

প্রকাশের তারিখ : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

featured Image

জাতীয় সংসদের ৭৭ নম্বর কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসন বরাবরই জেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত নির্বাচনী এলাকা। জেলার প্রশাসনিক সদর হওয়ায় এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত এই আসনের ফলাফল প্রায়ই জাতীয় রাজনীতিতেও প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় কুষ্টিয়া সদরে এবার জমে উঠেছে ধানের শীষ (বিএনপি) ও দাঁড়িপাল্লা (জামায়াতে ইসলামী) প্রতীকের মধ্যকার সরাসরি লড়াই। ১৯৯১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এ আসনে পর্যায়ক্রমে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জয়ী হয়ে আসছেন। ১৯৯১ ও জুন ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিএনপির আবদুল খালেক চন্টু সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে একই দলের অধ্যক্ষ সোহরাব উদ্দিন জয়ী হয়ে কুষ্টিয়া সদরকে বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত করেন। 

পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের খন্দকার রশিদুজ্জামান দুদু জয়ী হন। এরপর ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪—টানা তিনটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ফলে এক যুগের বেশি সময় ধরে এই আসনে আওয়ামী লীগের আধিপত্য  অতীতে তিনবার টানা জয় পাওয়া স্মৃতি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বিএনপি এবারও আসন পুনরুদ্ধারে মরিয়া। দলটির প্রার্থী প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকার এর আগে উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। স্থানীয় রাজনীতিতে পরিচিত মুখ, সংগঠন ও ইউনিয়নভিত্তিক নেটওয়ার্কে তার প্রভাব রয়েছে বলে মনে করছেন সমর্থকরা।

অন্যদিকে, অতীতে তৃতীয় অবস্থানে থাকা জামায়াতে ইসলামী এবার মুফতি আমির হামজাকে প্রার্থী করে এককভাবে আসন দখলের স্বপ্ন দেখছে। ওয়াজের মঞ্চের পরিচিত বক্তা হলেও সংসদীয় রাজনীতিতে এটি তার প্রথম বড় পরীক্ষা। নতুন মুখ হয়েও মাঠে কড়া প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছেন তিনি, যা বিএনপির জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। এবারের নির্বাচনে নারী ভোটারদের বড় একটি অংশকে টার্গেট করে দুই দলই বিশেষ কৌশল নিয়েছে। জামায়াতের নারী কর্মীরা দলবদ্ধভাবে বাড়ি-বাড়ি গিয়ে নারী ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। একইভাবে বিএনপির নারী নেত্রী-কর্মীরাও ধানের শীষের পক্ষে সমর্থন বাড়াতে মাঠে সক্রিয়।

অনেক ভোটারের মতে, ওয়াজের মাধ্যমে পরিচিত হওয়ায় আমির হামজার প্রতি নারী ভোটার, ভ্যান-রিকশাচালক, কৃষকসহ সাধারণ মানুষের একটি অংশ আকৃষ্ট হয়েছে। তবে তার কিছু বক্তব্য ও বয়সজনিত রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার ঘাটতি নিয়ে প্রশ্নও তুলছেন সচেতন মহল। রাজনৈতিকভাবে সচেতনদের মতে, স্বাধীনতার পর এই আসনে জামায়াত এককভাবে কখনো জয় পায়নি। দলটির একটি স্থায়ী ভোট ব্যাংক থাকলেও তা সাধারণত ৩০ হাজারের আশেপাশে। এবার সেই ভোট কিছুটা বাড়লেও আসন জিততে হলে লক্ষাধিক ভোট প্রয়োজন—এমনটাই মত স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। বিএনপি প্রার্থী জাকির হোসেন সরকারের পক্ষে যুক্তি হিসেবে তার জনপ্রতিনিধি হিসেবে পূর্ব অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের বিষয়টি সামনে আসছে। তবে তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন নেতার আচরণ ও নেতিবাচক প্রচারণা তাকে কিছুটা বিব্রত করছে বলেও আলোচনা রয়েছে।

আরও পড়ুন, ফরিদপুর জেলা পুলিশে এএসপি রোকুনুজ্জামানের যোগদান

বর্তমানে মাঠের চিত্রে দেখা যাচ্ছে, প্রচারণায় কেউ কাউকে ছাড় দিচ্ছে না। জামায়াতের কর্মীরা ফজর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত প্রচার চালাচ্ছেন। বিএনপিও শুরুতে কিছুটা ধীর থাকলেও এখন গতি বাড়িয়েছে। শহরের অলিগলি ব্যানার-ফেস্টুনে ভরে গেছে। আচরণবিধি লঙ্ঘন করে বিদ্যুতের খুঁটিতেও পোস্টার ঝুলতে দেখা গেলেও প্রশাসনের তৎপরতা চোখে পড়ছে না। এদিকে জামায়াত প্রার্থী আমির হামজার ফেসবুক পেজ সরিয়ে নেওয়ার ঘটনায় দলটি ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলেছে। আমির হামজার দাবি, কোনো ষড়যন্ত্র করে দাঁড়িপাল্লার বিজয় ঠেকানো যাবে না, ভোটের দিনই এর জবাব দেবে জনগণ। অন্যদিকে বিএনপি প্রার্থী জাকির হোসেন সরকার বলছেন, বিএনপি উন্নয়নের স্পষ্ট রূপরেখা দিয়েছে, মানুষ সাড়া দিচ্ছে এবং অতীতের মতো এবারও ধানের শীষকে বিজয়ী করবে।

স্থানীয়দের মতে, শেষ পর্যন্ত বড় ভূমিকা রাখতে পারে আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ ভোটারদের অবস্থান। দুই পক্ষই নানাভাবে এই ভোটারদের কাছে টানার চেষ্টা করছে। আওয়ামী লীগপন্থী ভোট যে দল বেশি আদায় করতে পারবে, শেষ পর্যন্ত তাদের পাল্লাই ভারী হতে পারে। সব মিলিয়ে কুষ্টিয়া-৩ সদর আসনে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার লড়াই এখন সমানে-সমানে—এমনটাই মনে করছেন অধিকাংশ ভোটার।


দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

সম্পাদক ও প্রকাশক: এ বি এম মনিরুজ্জামান 
নির্বাহী সম্পাদক: রিপন রুদ্র
যুগ্ম সম্পাদক: জাকিয়া সুলতানা (লাভলী)

কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক সংবাদ দিগন্ত । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত