ভারত উপমহাদেশ ও আরব বিশ্বে প্রশংসিত তিন আরবি গ্রন্থ: মুফতি আব্দুর রহমান নাঈম কাসেমী হাদিসশাস্ত্র, ইতিহাস ও আরবি সাহিত্য—তিন অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে দেশ-বিদেশে প্রশংসিত ও আলোচিত। তারই কিছু উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হলো :
১. মুজামু আলামিল মুহাদ্দিসীন ওয়া মুসান্নাফাতিহিম ফিল হাদিস: এটি একটি বিশ্বকোষমূলক রচনা। এতে দ্বিতীয় হিজরি শতাব্দী থেকে পনের শতাব্দী পর্যন্ত মুহাদ্দিসদের নাম, জন্ম-মৃত্যু, বাসস্থান, সংক্ষিপ্ত জীবনচিত্র ও গ্রন্থসমূহ অত্যন্ত সুচারুরূপে বিন্যস্ত হয়েছে। লেখক প্রায় ২০ মাস ধরে এ সংকলনকে পূর্ণতা দেন, যা পরবর্তী সময়ে শায়খ নূরুল হাসান রাশেদ কান্ধলবী (ভারত উপমহাদেশের অন্যতম মুসলিম ইতিহাসবিদ ও বিশিষ্ট আলেম)-এর উৎসাহে বই আকারে প্রকাশিত হয়।
উস্তাযগণ গ্রন্থটির ভূয়সী প্রশংসা করেন। শায়খ নূরুল হাসান রাশেদ কান্ধলবী একে ‘এই বিষয়ে সর্বোত্তম গ্রন্থ’ আখ্যা দিয়ে বলেন— ‘এতে চিন্তাশীলদের জন্য বহু উপকারী ফায়দা রয়েছে।’ (পৃ. ১২)। প্রকাশক শায়খ ফয়জুল হাসান আজমী জানান, ‘এই পদ্ধতিতে এমন রচনা এই যুগে আর দেখা যায় না’ (পৃ. ৭)। দারুল উলুম দেওবন্দের উস্তায মুফতি আবদুল্লাহ মারুফী বলেন, ‘এটি এমন একটি ফায়দাসমৃদ্ধ কিতাব, যাতে অন্যান্য গ্রন্থে ছড়িয়ে থাকা তথ্য একত্র করা হয়েছে।’
গ্রন্থটি প্রকাশের পর লেখক দেশ-বিদেশের বহু স্বনামধন্য উলামায়ে কেরামের খেদমতে এটি প্রেরণ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন দেশের প্রথিতযশা মুহাদ্দিস ও গবেষকগণ এ কিতাব সম্পর্কে তাদের মূল্যবান প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তাদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—
শায়খ ড. মুহাম্মাদ আনওয়ার আল-বায়ুমী, উস্তাযুল হাদীস, আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়, মিসর— কিতাবটিকে ‘আধুনিক যুগের হাদিস শিক্ষার্থীদের জন্য এক অনুপম সংকলন’ বলে অভিহিত করেন।
মুফতি মুহাম্মদ মুআবিয়া সাদী মাজাহেরী, মুশরিফ, উলূমুল হাদিস বিভাগ, মাজাহিরুল উলূম সাহারানপুর, ভারত— ‘এই সংকলন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য হাদিস শিক্ষার একটি দিকদর্শন হয়ে থাকবে।’
আল্লামা শায়খ আব্দুর রশিদ নদভী ও ড. উবায়দুর রহমান নদভী, উস্তায, নদওয়াতুল উলামা, লক্ষ্ণৌ, ভারত—‘বর্তমান সময়ের জন্য এমন একটি পরিপাটি ও নির্ভরযোগ্য বই সত্যিই প্রয়োজন ছিল।’
ড. মুহাম্মাদ আব্দুর রহমান আত-তাওলাবাহ্, উস্তাযুল হাদীস, ইয়ারমুক বিশ্ববিদ্যালয়, জর্ডান— কিতাবটির গঠন ও তথ্য বিন্যাসের গভীরতা দেখে মুগ্ধতা প্রকাশ করেন।
ড. মুহাম্মাদ হুসাম আল-হিমায়াদাহ্ ও শায়খ জালালুদ্দিন আল-হিমসী (জর্ডান ও লেবানন)— কিতাবটিকে ‘আন্তর্জাতিক পাঠ্যতালিকায় যুক্ত হওয়ার উপযোগী এক মূল্যবান সংযোজন’ বলেন।
শায়খ ড. আবু সুহাইব সাফা আদ-দায়ী আহমদ আল-আদয়ী (বুখারি শরিফের ব্যাখ্যাকার ও বিশিষ্ট আলেম, মিসর) বলেন— ‘একজন তরুণ আলেমের কলমে এমন গভীরতা ও অনুভব সত্যিই অনন্য।’
এ সকল আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া কেবল লেখকের ব্যক্তিগত ইলমি যোগ্যতার স্বীকৃতি নয়, বরং বাংলাদেশের ইলমি জগতের প্রতি একটি আন্তর্জাতিক আস্থার বহিঃপ্রকাশও বটে। এই গ্রন্থের মাধ্যমে আব্দুর রহমান নাঈম কাসেমী একদিকে যেমন ইতিহাস ও হাদিসশাস্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ দলিল সংরক্ষণ করেছেন, তেমনি দেশকে উপহার দিয়েছেন এক গর্বিত ইলমি পরিচিতি।
২. আস্-সায়রুল হাসিস ফি তারীখি উলূমিল হাদিস: হাদিসশাস্ত্রের ইতিহাস নিয়ে আরবি ভাষায় রচিত একটি গবেষণাধর্মী গ্রন্থ। এতে হাদিসশাস্ত্রের উদ্ভব, বিকাশ, সংরক্ষণ পদ্ধতি, বিভিন্ন যুগের হাদিসি আন্দোলন ও মেহনতের ধারাবাহিক ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।
৩. তুহফাতুল আবরার লি হিফ্যিল আহাদীসি ওয়াল আছার: এটি হাদিস স্মরণ ও মুখস্থ করার এক ব্যতিক্রমধর্মী গ্রন্থ। হাদিসের আলোকে জীবন গড়তে আগ্রহী শিক্ষার্থী ও পাঠকদের জন্য এ সংক্ষিপ্ত কিন্তু সুচারুরূপে সাজানো সংকলনটি একটি মূল্যবান সহায়ক। এতে ইমাম বুখারি (রহ.) রচিত ‘আল আদাবুল মুফরাদ’ গ্রন্থের নির্বাচিত হাদিসসমূহ সহজ ও ছন্দবদ্ধভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি: মুফতি আব্দুর রহমান নাঈম কাসেমী একজন প্রাজ্ঞ আলেম ও গবেষক, যিনি ১৯৯২ সালে গফরগাঁও উপজেলার লামকাইন গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত ও ধর্মপরায়ণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আলহাজ রফিকুল ইসলাম একজন শিক্ষানুরাগী ও মাদরাসা-মসজিদপ্রেমিক মানুষ, যিনি দীর্ঘকাল মহির খারুয়া রা.নি. মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মাতা মোছা. আয়েশা আক্তার একজন গৃহিণী। তাঁর দাদা মরহুম হাজী মুতালেব ছিলেন ওই এলাকার সুপরিচিত ইমাম ও সমাজসেবক, যিনি আজীবন মসজিদের খেদমতে নিয়োজিত ছিলেন এবং সবার প্রিয় ছিলেন।
তিনি গ্রামের মক্তব ও মাদরাসায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পড়াশোনা শেষ করেন। এরপর জামিয়া হুসাইনিয়া আজাদাবাদ, মিরপুর-১, ঢাকা থেকে ২০১২-১৩ সনে দাওরায়ে হাদিস এবং ২০১৪ সনে উচ্চতর ইসলামি আইন গবেষণা ও ফাতওয়া কোর্স সম্পন্ন করেন। উচ্চতর আরবি ভাষা সাহিত্য কোর্স সম্পন্ন করেন ঢাকার জামিয়াতুন নূর থেকে। এরপর উচ্চতর দীনি শিক্ষা গ্রহণের লক্ষ্যে ভারতের ঐতিহাসিক দীনি শিক্ষাকেন্দ্র দারুল উলূম দেওবন্দে ভর্তি হন। সেখানে তিনি হাদিস, ফিকাহ, তাফসিরসহ ইসলামি জ্ঞানের নানা শাখায় সুগভীরতা অর্জন করেন। তাঁর উস্তাদদের মধ্যে অনেক বরেণ্য ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বুজুর্গ আলেম ও মুহাদ্দিস রয়েছেন।
২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে উচ্চতর পড়াশোনা সম্পন্ন করে স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের পর তিনি কুরআন, হাদিস, ফিকাহ, তাফসির, আকিদা এবং দাওয়াহসহ দ্বীনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খেদমতে আত্মনিয়োগ করেন।
বর্তমানে তিনি রাজধানী ঢাকার সুপ্রাচীন দ্বীনি বিদ্যাপীঠ দারুল উলূম ঢাকা, মিরপুর-১৩ -এর স্বনামধন্য মুহাদ্দিস ও উচ্চতর হাদিস গবেষণা বিভাগের উস্তায হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী গাউছিয়া জামে মসজিদ, মিরপুর-২, ঢাকার ইমাম ও খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একই সঙ্গে তিনি বেশ কিছু মাদরাসার পৃষ্ঠপোষকতা ও সেবামূলক সংস্থার উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন।
তিনি লেখালেখি ও অন্যান্য মাধ্যমে ইসলামি দাওয়াতি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষত সামাজিক ও চিন্তাশীল প্রেক্ষাপটে তরুণ সমাজ তাঁর লেখনি, বয়ান ও দিকনির্দেশনা থেকে দ্বীনি জ্ঞানে উপকৃত হচ্ছে এবং প্রেরণা পাচ্ছে। বিভিন্ন শ্রেণির পাঠক ও শ্রোতা তাঁর মাধ্যমে কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক বিশুদ্ধ দ্বীন বুঝতে ও চর্চা করতে উৎসাহিত হচ্ছে।
সুলুক ও তাসাউফের জগতে মুফতি আব্দুর রহমান নাঈম কাসেমী বিশ্বের দুই বিশিষ্ট শায়েখ থেকে খেলাফত বা আধ্যাত্মিক অনুমতি লাভ করেছেন। তাঁদের একজন দারুল উলুম দেওবন্দের নামকরা মুহাদ্দিস মুফতি আব্দুল্লাহ মারুফী এবং অপরজন মসজিদে নববীর প্রাক্তন শিক্ষক আল্লামা ড. আব্দুর রহমান কাউসার মাদানী (সাহেবযাদা, আল্লামা আশেক এলাহী বুলন্দশহরী রহ.)। উভয়ের তত্ত্বাবধানে আত্মশুদ্ধি ও রূহানিয়াতের প্রশিক্ষণ নিয়ে, খিলাফত লাভের পর থেকে তিনি এ কাজের সঙ্গে নিয়মিত সম্পৃক্ত রয়েছেন।
আপনার মতামত লিখুন