অপরাধ দমনে নতুন ছকে ডিএমপি
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সবসময়ই জাতীয় গুরুত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রাণকেন্দ্র হিসেবে ঢাকা মহানগরীতে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং জনগণের আস্থা অর্জন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এমন বাস্তবতায় নবনিযুক্ত ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ বিপিএম-সেবা দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই অপরাধ দমনে “জিরো টলারেন্স” নীতির ঘোষণা দিয়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন। তার এই দৃঢ় অবস্থান ইতোমধ্যেই সাধারণ মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে এবং পুলিশ বাহিনীর মধ্যেও নতুন উদ্যমে কাজ করার পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।আরও পড়ুন: দৃষ্টান্তমূলক সেবায় আইজি ব্যাজ পেলেন ওসি হাফিজুর রহমানরাজধানীতে দীর্ঘদিন ধরেই ছিনতাই, মাদক কারবার, কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজি, সাইবার অপরাধ, অবৈধ ব্যবসা এবং সংঘবদ্ধ অপরাধ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে রাতের ঢাকা, বিভিন্ন আবাসিক হোটেলকে কেন্দ্র করে অনৈতিক কর্মকাণ্ড, মাদক সিন্ডিকেট এবং ছদ্মবেশী অপরাধী চক্রের দৌরাত্ম্য নিয়ে নাগরিকদের মধ্যে ছিল আতঙ্ক। এমন পরিস্থিতিতে নতুন কমিশনারের কঠোর বার্তা সাধারণ জনগণের কাছে স্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, অপরাধী যেই হোক না কেন, কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। রাজনৈতিক পরিচয়, প্রভাব কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার করে কেউ অপরাধ করে পার পাবে না। এই বক্তব্য শুধু প্রশাসনিক নির্দেশনা নয়, বরং মাঠপর্যায়ে কর্মরত পুলিশ কর্মকর্তাদের জন্যও একটি শক্ত বার্তা হিসেবে কাজ করছে।বিশ্লেষকরা বলছেন, ডিএমপির মতো বিশাল বাহিনীকে কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে হলে নেতৃত্বের দৃঢ়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন কমিশনারের নির্দেশনা মাঠপর্যায়ের ডিসি, অতিরিক্ত ডিসি, এসি এবং থানার ওসিদের কর্মকাণ্ডে সরাসরি প্রভাব ফেলে। নতুন কমিশনার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন থানা এলাকায় টহল জোরদার, ওয়ারেন্ট তামিল, মাদকবিরোধী অভিযান এবং গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।বিশেষ করে থানার ওসিদের ভূমিকা এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ সাধারণ মানুষের সঙ্গে পুলিশের প্রথম যোগাযোগ হয় থানাকেন্দ্রিক সেবার মাধ্যমে। অতীতে অনেক ক্ষেত্রে থানায় গিয়ে ভোগান্তির অভিযোগ উঠলেও নতুন কমিশনারের নির্দেশনায় জনগণবান্ধব পুলিশিং কার্যক্রম আরও জোরদার হবে বলে প্রত্যাশা করছেন সচেতন মহল।রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ী, পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং সাধারণ নাগরিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা চান পুলিশের কঠোর অবস্থান শুধু ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবেও কার্যকর হোক। অনেকেই মনে করেন, যদি নিয়মিত অভিযান, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোরতা এবং অপরাধীদের রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাব উপেক্ষা করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়, তাহলে ঢাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসতে পারে।আরও পড়ুন: ১ জুলাই থেকে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন, ঘোষণা অর্থমন্ত্রীরনতুন কমিশনারের নেতৃত্বে ডিএমপির বিভিন্ন ইউনিটের মধ্যেও সমন্বয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। গোয়েন্দা বিভাগ, কাউন্টার টেররিজম ইউনিট, ট্রাফিক বিভাগ এবং থানা পুলিশের মধ্যে সমন্বিত কার্যক্রম অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ দমনে আধুনিক মনিটরিং ব্যবস্থা এবং সাইবার নজরদারির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।এছাড়া রাজধানীতে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় কিশোরদের ছোট ছোট গ্রুপ ভয়ঙ্কর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। ছিনতাই, মাদক বহন, মারামারি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক গ্যাং কালচার সমাজে অস্থিরতা তৈরি করছে। নতুন কমিশনার এ বিষয়ে বিশেষ নজরদারি বাড়াতে পারেন বলে মনে করছেন অভিজ্ঞ পুলিশ কর্মকর্তারা।আরও পড়ুন: মাঠে মব, কোণঠাসা পুলিশ বাহিনীডিএমপির সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তার মতে, অপরাধ দমনে সফল হতে হলে শুধু অভিযান চালালেই হবে না, তথ্যভিত্তিক গোয়েন্দা কার্যক্রম বাড়াতে হবে। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সেই সঙ্গে থানাভিত্তিক বিট পুলিশিং কার্যক্রম আরও সক্রিয় করতে হবে, যাতে জনগণের সঙ্গে পুলিশের দূরত্ব কমে আসে।জনসাধারণের আস্থা অর্জনের বিষয়টিও এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে পুলিশের বিরুদ্ধে ঘুষ, হয়রানি কিংবা রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন সময়ে। তবে নতুন কমিশনার যদি অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর অবস্থান নেন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখান, তাহলে পুরো বাহিনীর ভাবমূর্তি ইতিবাচকভাবে পরিবর্তিত হতে পারে। পুলিশের অভ্যন্তরেও নতুন নেতৃত্বকে ঘিরে ইতিবাচক আলোচনা রয়েছে বলে জানা গেছে। মাঠপর্যায়ের অনেক কর্মকর্তা মনে করছেন, স্পষ্ট নির্দেশনা ও কঠোর মনিটরিং থাকলে কাজের গতি বাড়ে। অনেক সময় রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চাপের কারণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বাধা তৈরি হলেও শক্ত অবস্থানের নেতৃত্ব মাঠপর্যায়ে সাহস যোগায়।রাজধানীতে মাদক নিয়ন্ত্রণ এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। ইয়াবা, আইস, গাঁজা এবং বিভিন্ন ধরনের মাদক সহজলভ্য হয়ে পড়ার কারণে তরুণ সমাজ বিপথে যাচ্ছে। নতুন কমিশনারের অধীনে যদি নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালিত হয় এবং মাদকের বড় সিন্ডিকেটগুলোকে আইনের আওতায় আনা যায়, তাহলে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। একই সঙ্গে আবাসিক হোটেল, স্পা সেন্টার এবং ক্লাবকেন্দ্রিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণেও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছেন নাগরিকরা। অভিযোগ রয়েছে, রাজধানীর কিছু এলাকায় অবৈধ কর্মকাণ্ডের আড়ালে গড়ে উঠেছে সংঘবদ্ধ চক্র। এসব চক্রের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান অভিযান জনগণের আস্থা বাড়াতে সহায়ক হবে।আরও পড়ুন: মিরপুরে আলোচিত ওসি হাফিজুর রহমানট্রাফিক ব্যবস্থাপনাও ডিএমপির বড় একটি চ্যালেঞ্জ। রাজধানীর যানজট, সড়কে বিশৃঙ্খলা এবং দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা অনেকদিন ধরেই আলোচিত। নতুন কমিশনার এই খাতেও নতুন উদ্যোগ নেবেন বলে আশা করছেন নগরবাসী।এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক গুজব, প্রতারণা এবং সাইবার অপরাধও দ্রুত বাড়ছে। অনলাইন জুয়া, বিকাশ প্রতারণা, ফেক আইডি ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইল এবং ডিজিটাল প্রতারণা নিয়ন্ত্রণে বিশেষায়িত ইউনিটগুলোর কার্যক্রম আরও জোরদার করা জরুরি হয়ে পড়েছে। সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, শুধু কঠোরতা নয়, মানবিক পুলিশিংও গুরুত্বপূর্ণ। একজন সাধারণ নাগরিক থানায় গিয়ে যদি সম্মানজনক আচরণ পান, অভিযোগ দায়ের করতে হয়রানির শিকার না হন এবং দ্রুত প্রতিকার পান, তাহলে পুলিশের প্রতি আস্থা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা বড় কোনো জাতীয় ইস্যুতে ঢাকার নিরাপত্তা পরিস্থিতি সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাই গোয়েন্দা নজরদারি, জননিরাপত্তা এবং কৌশলগত নিরাপত্তা পরিকল্পনায় দক্ষ নেতৃত্ব অত্যন্ত জরুরি। নতুন কমিশনারের অভিজ্ঞতা এবং প্রশাসনিক দক্ষতা এসব ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।আরও পড়ুন: উত্তরায় পুলিশের নাকের ডগায় গ্রান্ড প্লাজায় সোহেলের অসামাজিক কার্যক্রমএদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নতুন কমিশনারের বিভিন্ন বক্তব্য এবং কার্যক্রম নিয়ে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। অনেকেই মনে করছেন, অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ করা গেলে জনগণের আস্থা দ্রুত ফিরে আসবে।বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন শুধু পুলিশের একার দায়িত্ব নয়। এর সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন, সিটি কর্পোরেশন, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ জনগণেরও সম্পৃক্ততা প্রয়োজন। তবে পুরো ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে নেতৃত্বের দৃঢ়তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বর্তমানে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় কর্মরত ডিসি ও ওসিদের ওপরও বাড়তি দায়িত্ব এসেছে। নতুন কমিশনারের নির্দেশনা বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ে তাদের আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। অপরাধপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে নিয়মিত অভিযান, সোর্স ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি করতে হবে।আরও পড়ুন: পুলিশের দায়িত্ব পালনে বাধা মব কালচারঅভিজ্ঞ মহল মনে করছে, যদি ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ তার ঘোষিত জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নে ধারাবাহিকভাবে সফল হন, তাহলে রাজধানীতে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন সম্ভব হবে। একই সঙ্গে পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তিও ইতিবাচকভাবে বদলে যেতে পারে। সব মিলিয়ে বলা যায়, নবনিযুক্ত ডিএমপি কমিশনারের কঠোর বার্তা এবং নতুন উদ্যমে কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ রাজধানীবাসীর মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। এখন দেখার বিষয়, মাঠপর্যায়ে সেই নির্দেশনা কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়। জনগণের প্রত্যাশা— নিরাপদ ঢাকা, জবাবদিহিমূলক পুলিশিং এবং অপরাধমুক্ত নগরজীবন। আর সেই প্রত্যাশা পূরণে নতুন কমিশনারের নেতৃত্ব কতটা সফল হয়, সেটিই এখন সময়ের বড় প্রশ্ন।