দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন মাদক মুক্ত বাংলাদেশ গড়তে: সিএমপি কমিশনার

মাদক শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয় এটি পরিবার, শিক্ষা, সামাজিক মূল্যবোধ ও রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের জন্য এক গভীর সংকট। তাই মাদক প্রতিরোধে কেবল অভিযান, গ্রেপ্তার বা আইনি ব্যবস্থার ওপর নির্ভর না করে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্রকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী।রোববার চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ অডিটোরিয়ামে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম মেট্রো দক্ষিণ কার্যালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত ‘মাদকাসক্তিমুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণে তরুণদের করণীয় ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।সিএমপি কমিশনার বলেন, মাদকাসক্তি প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর জায়গা হলো পরিবার। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, কীভাবে সময় কাটাচ্ছে এসব বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন থাকতে হবে। শুধু শাসন নয়, সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলে তাদের মানসিক অবস্থা বুঝতে হবে। পরিবারে নৈতিক শিক্ষা, দায়িত্ববোধ, মানবিকতা ও শৃঙ্খলার চর্চা থাকলে তরুণরা সহজে মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ে না। মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু পুলিশের একার দায়িত্ব নয়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা মাদক কারবারি ও অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে কাজ করবে, কিন্তু মাদক গ্রহণের প্রবণতা কমাতে হলে সামাজিক ও নৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। পরিবার, শিক্ষক, সহপাঠী, প্রতিবেশী, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃত্ব সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব নিতে হবে।আরও  পড়ুন, বগুড়া আদমদীঘিতে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সাকিব গ্রেফতারসেমিনারে বক্তারা বলেন, বর্তমান সময়ে মাদক তরুণ সমাজের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৌতূহল, খারাপ সঙ্গ, হতাশা, বেকারত্ব, পারিবারিক দূরত্ব এবং সামাজিক নজরদারির অভাব অনেক সময় তরুণদের বিপথে ঠেলে দেয়। তাই শুধু ‘মাদক খারাপ’ বললেই হবে না তরুণদের জন্য সুস্থ বিনোদন, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, স্বেচ্ছাসেবা এবং দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ বাড়াতে হবে।সিএমপি কমিশনার আরও বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো মাদকবিরোধী সচেতনতা তৈরির অন্যতম শক্তিশালী ক্ষেত্র। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত কাউন্সেলিং, মাদকবিরোধী আলোচনা, বিতর্ক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও খেলাধুলায় সম্পৃক্ত করা গেলে তারা ইতিবাচক পথে এগোবে। তিনি তরুণদের উদ্দেশে বলেন, নিজের জীবন, পরিবার ও দেশের ভবিষ্যতের প্রতি দায়িত্বশীল হতে হবে। সাময়িক আনন্দের নামে মাদক একটি জীবনকে ধ্বংস করে দিতে পারে।আয়োজনে বক্তারা মাদকাসক্তিকে ব্যক্তি পর্যায়ের দুর্বলতা হিসেবে না দেখে সামাজিক ব্যাধি হিসেবে বিবেচনার ওপর গুরুত্ব দেন। তারা বলেন, একজন তরুণ মাদকাসক্ত হলে শুধু তার নিজের জীবনই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না পরিবারে অশান্তি তৈরি হয়, শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয়, কর্মক্ষমতা নষ্ট হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে অপরাধপ্রবণতা বাড়ে। ফলে মাদক প্রতিরোধ জাতীয় উন্নয়ন ও সামাজিক নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজের অধ্যক্ষ আবু ছালেহ মোহাম্মদ নঈম উদ্দীনের সভাপতিত্বে সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক মো. জাহিদ হোসেন মোল্লা এবং সরকারি সিটি কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক জসিম উদ্দিন আহমেদ। আলোচক ছিলেন রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমগীর।আরও পড়ুন, ওসি হারুনের অভিযানে চাপে ছিনতাইকারী ও মাদক কারবারিরা, এলাকায় আতঙ্ক সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম মেট্রো দক্ষিণ কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মানজুরুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে সিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার দক্ষিণ মো. হাবিবুর রহমানসহ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা, সরকারি সিটি কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।মূল প্রবন্ধে মাদকাসক্তিমুক্ত বাংলাদেশ গঠনে তরুণদের ভূমিকা, সামাজিক সচেতনতার প্রয়োজনীয়তা, মাদকের কুফল এবং প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমের ওপর আলোকপাত করা হয়। বক্তারা বলেন, তরুণদের মধ্যে নেতৃত্বগুণ, আত্মনিয়ন্ত্রণ, দেশপ্রেম ও সামাজিক দায়িত্ববোধ তৈরি করা গেলে মাদকের বিস্তার রোধে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব।অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলা হয়, মাদক থেকে দূরে থাকার প্রথম শর্ত হলো সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়া। বন্ধুবান্ধবের চাপ, কৌতূহল বা মানসিক হতাশা থেকে কেউ যেন মাদকের দিকে না যায়, সে বিষয়ে নিজেকে দৃঢ় রাখতে হবে। একই সঙ্গে কোনো সহপাঠী বা পরিচিত ব্যক্তি মাদকের ঝুঁকিতে থাকলে তাকে অবহেলা না করে পরিবার, শিক্ষক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।বক্তারা আরও বলেন, মাদকবিরোধী আন্দোলনকে শুধু সভা-সেমিনারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। শিক্ষাঙ্গন, পাড়া-মহল্লা, পরিবার ও সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে নিয়মিত প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে। তরুণদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ, সুস্থ বিনোদন এবং ইতিবাচক জীবনদর্শন নিশ্চিত করা গেলে মাদকের বিরুদ্ধে স্থায়ী প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব।সেমিনার শেষে আয়োজকরা মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গঠনে সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন জোরদার করার আহ্বান জানান। তারা বলেন, আইন প্রয়োগ, সামাজিক সচেতনতা, পারিবারিক নজরদারি এবং নৈতিক মূল্যবোধ এই চারটি স্তম্ভকে শক্তিশালী করতে পারলেই মাদকের ভয়াবহতা থেকে তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করা যাবে।

সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন মাদক মুক্ত বাংলাদেশ গড়তে: সিএমপি কমিশনার