চট্টগ্রাম কাস্টমসে পণ্য খালাসে প্রশাসনিক জটে বাজারে বাড়ছে ব্যয়ের চাপ
দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে গতি ফেরাতে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী পণ্য শুল্কায়ন ও খালাস সর্বোচ্চ চার দিনের মধ্যে সম্পন্ন করার স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই নির্দেশনার পরও বাস্তবে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস ও বন্দরের কার্যক্রমে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি বলে অভিযোগ উঠেছে।ব্যবসায়ীদের দাবি, প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাব, অপ্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই, একই চালানে একাধিকবার পরীক্ষা, স্ক্যানিংয়ের পরও পুনরায় কায়িক তল্লাশি এবং বিভিন্ন অজুহাতে শুল্কায়ন বিলম্বিত হওয়ায় বন্দরে সৃষ্টি হচ্ছে নতুন জট। এর ফলে প্রতিদিনই বাড়ছে ডেমারেজ, স্টোরেজ, কনটেইনার চার্জ ও পরিচালনা ব্যয় যার শেষ প্রভাব গিয়ে পড়ছে দেশের বাজার ও ভোক্তার ওপর।এ পরিস্থিতিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব আহসান হাবিবের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি। চিঠিতে চেম্বার সভাপতি আমিরুল হক অভিযোগ করেন, ব্যবসা সহজীকরণের পরিবর্তে মাঠপর্যায়ে এখনো এমন নানা প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে, যা পণ্য খালাসকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল করে তুলছে।চেম্বারের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি কনটেইনার স্ক্যানিং শেষ হওয়ার পরও অনেক ক্ষেত্রে আবার গোপন সংবাদের কথা বলে কায়িক পরীক্ষা করা হচ্ছে। একই পণ্য বিভিন্ন সংস্থা বারবার পরীক্ষা করছে। দেশে পরীক্ষার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কিছু পণ্য ল্যাব টেস্টের জন্য ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ই-সিও জমা দেওয়ার পরও অতিরিক্ত যাচাইয়ের কারণে দিনের পর দিন ফাইল আটকে থাকছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।আরও অভিযোগ করা হয়েছে, বাধ্যতামূলক নয় এমন পণ্যও বিএসটিআই পরীক্ষার আওতায় পাঠানো হচ্ছে।আরও পড়ুন, চট্টগ্রাম কাস্টমসে পণ্য খালাসে প্রশাসনিক জটে বাজারে বাড়ছে ব্যয়ের চাপ ফলে অর্থমন্ত্রীর নির্ধারিত চার দিনের পরিবর্তে অনেক চালান খালাসে সাত থেকে আট দিন, কখনো তারও বেশি সময় লেগে যাচ্ছে।ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, একই চালান বারবার খুলে পরীক্ষা করার কারণে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে খাদ্য ও সংবেদনশীল পণ্যের ক্ষেত্রে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য। অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত পণ্য বাজারজাত করাও সম্ভব হচ্ছে না।চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, শুল্ক নির্ধারণের ক্ষেত্রেও অনেক সময় বিদ্যমান বিধিমালা অনুসরণ না করে অতিরিক্ত মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হচ্ছে, যা খালাস প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করছে। এতে অতিরিক্ত স্টোরেজ চার্জ, ডেমারেজ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও নথিপত্র সংক্রান্ত ব্যয় যুক্ত হয়ে আমদানিকারকদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়ছে ভোক্তা পর্যায়ের বাজারমূল্যে।চেম্বার মনে করছে, কাস্টমস আইন ২০২৩ অনুযায়ী পেপারলেস কাস্টমস, প্রি-অ্যারাইভাল প্রসেসিং ও রিস্ক-বেইজড এক্সামিনেশনের মতো আধুনিক ব্যবস্থা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে পণ্য খালাসে সময় ও ব্যয় উভয়ই উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।চিঠিতে আন্তর্জাতিক মানসম্মত, স্বচ্ছ ও ব্যবসাবান্ধব কাস্টমস ব্যবস্থা নিশ্চিত করে দ্রুত পণ্য খালাসের পরিবেশ সৃষ্টি এবং অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক জটিলতা দূর করতে জরুরি ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।নীতিগত নির্দেশনা ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার এই ব্যবধান এখন শুধু ব্যবসায়ীদের নয় দেশের সামগ্রিক বাণিজ্য ও অর্থনীতির জন্যও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।