দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

কচি তাল বিক্রির হিড়িকে কমছে পাকা তাল, বিলুপ্তির পথে গ্রামীণ খাদ্যসংস্কৃতি

এক সময় গ্রামবাংলার অন্যতম পরিচিত ও ঐতিহ্যবাহী ফল ছিল তাল। ভাদ্র মাস এলেই গ্রামাঞ্চলে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ত পাকা তালের মিষ্টি ঘ্রাণ। তালের পিঠা, তালের বড়া, তালের খীর, তালের মিশ্রি ও তালের রস দিয়ে তৈরি নানা খাবার ছিল বাঙালির সংস্কৃতি ও খাদ্য ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু কচি তালের শাঁসের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক চাহিদার কারণে আজ সেই পরিচিত দৃশ্য অনেকটাই হারিয়ে যেতে বসেছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিবছর লাখ লাখ কচি তাল গাছ থেকে সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। ফলে এসব তাল আর পরিপক্ব হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে পাকা তালের উৎপাদনের ওপর। একদিকে যেমন কমে যাচ্ছে পাকা তালের সরবরাহ, অন্যদিকে বিলুপ্তির পথে যাচ্ছে তালের ওপর নির্ভরশীল গ্রামীণ খাদ্যসংস্কৃতি।সরেজমিনে কসবা উপজেলা বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আগে গ্রামাঞ্চলের প্রায় প্রতিটি বাড়িতে ভাদ্র মাসে তালের পিঠা তৈরির আয়োজন থাকলেও বর্তমানে পর্যাপ্ত পাকা তাল না পাওয়ায় সেই চিত্র অনেকটাই বিরল হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবার এখন বাজারে খুঁজেও প্রয়োজনীয় পাকা তাল সংগ্রহ করতে পারছে না।স্থানীয় প্রবীণরা জানান, এক সময় গ্রামের রাস্তা, খালপাড় ও বাড়ির আঙিনায় অসংখ্য তালগাছ দেখা যেত। বর্ষা ও ভাদ্র মাসে পাকা তাল কুড়িয়ে শিশু-কিশোরদের আনন্দের সীমা থাকত না।বর্তমানে কচি অবস্থায় অধিকাংশ তাল বাজারজাত হয়ে যাওয়ায় পাকা তালের দেখা মেলা কঠিন হয়ে পড়েছে।কৃষি ও পরিবেশ বিদদের  মতে, তালগাছ শুধু একটি ফলজ গাছ নয়; এটি গ্রামীণ জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তালগাছের ফল, পাতা ও আশ্রয়ের ওপর নির্ভর করে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, বাদুড় ও ক্ষুদ্র প্রাণী বেঁচে থাকে।আরও পড়ুন, কচি তাল বিক্রির হিড়িকে কমছে পাকা তাল, বিলুপ্তির পথে গ্রামীণ খাদ্যসংস্কৃতি কচি তাল ব্যাপক হারে সংগ্রহের ফলে এসব প্রাণীর খাদ্য সংকট তৈরি হচ্ছে এবং পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।কৃষি বিদ আয়শা আক্তার  বলছেন, একটি তালগাছ ফল ধারণ করতে দীর্ঘ সময় লাগে। কিন্তু অপরিণত অবস্থায় ফল সংগ্রহের কারণে নতুন বীজ উৎপাদনও কমে যাচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে তালগাছের সংখ্যা হ্রাস পাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে দেশের পরিবেশ ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গেও তালের রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক। পাকা তাল থেকে তৈরি বিভিন্ন খাদ্যপণ্য, মিষ্টান্ন ও মৌসুমি ব্যবসার সঙ্গে বহু মানুষের জীবিকা জড়িত। পাকা তালের সংকট দেখা দিলে এসব ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরাও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।সংশ্লিষ্টদের মতে, কচি তালের শাঁস মানুষের কাছে জনপ্রিয় ও পুষ্টিকর খাদ্য হলেও এর বাণিজ্যিক আহরণে একটি সুষম নীতি প্রয়োজন। মোট উৎপাদিত তালের একটি অংশ পরিপক্ব হওয়ার জন্য সংরক্ষণ করা হলে যেমন গ্রামীণ ঐতিহ্য রক্ষা পাবে, তেমনি জীববৈচিত্র্য ও ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও টিকে থাকবে।বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, স্বল্পমেয়াদি লাভের আশায় নির্বিচারে তালের ডাব সংগ্রহ চলতে থাকলে আগামী প্রজন্ম হয়তো শুধু গল্পেই শুনবে ভাদ্র মাসের সেই সুগন্ধি পাকা তাল, তালের পিঠা কিংবা আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে তালের সর নিয়ে যাওয়ার ঐতিহ্যের কথা। তাই এখনই সচেতনতা ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা না হলে হারিয়ে যেতে পারে গ্রামবাংলার শতবর্ষের এক মূল্যবান ঐতিহ্য।

কচি তাল বিক্রির হিড়িকে কমছে পাকা তাল, বিলুপ্তির পথে গ্রামীণ খাদ্যসংস্কৃতি