দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

ছিনতাই ঘটনার আড়ালে সাংবাদিককে ঘিরে অপচেষ্টা

রাজধানীর পুরান ঢাকায় প্রাইভেট কার ছিনতাইয়ের একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে দৈনিক সংবাদ দিগন্ত পত্রিকার সাংবাদিক ইসমাইল হোসেনকে পরিকল্পিতভাবে নির্যাতন ও মারধরের অপচেষ্টা চালানোর অভিযোগ উঠেছে। এ সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত আরেক সংবাদকর্মীকেও হয়রানি করার চেষ্টা করেছে দুর্বৃত্তরা বলে জানা গেছে। ঘটনাটি ঘিরে এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে এবং পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে অপপ্রচার চালানোর অভিযোগও উঠেছে।জানা গেছে, গতকাল রাজধানীর গুলিস্তান এলাকার ফুলবাড়িয়া এলাকায় একটি প্রাইভেট কার ছিনতাইয়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ওই সময় কয়েকজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি নিজেদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পরিচয় দিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের নামে নানা ধরনের কার্যকলাপ শুরু করে।আরও পড়ুন, নড়িয়ার আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ঘর নির্মাণের অভিযোগ প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধেএ সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন দৈনিক সংবাদ দিগন্ত পত্রিকার সাংবাদিক ইসমাইল হোসেন। তিনি ঘটনাটি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের জন্য এলাকাটিতে অবস্থান করছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করেই কয়েকজন ব্যক্তি তাকে ঘিরে ধরে এবং তার সঙ্গে উত্তেজনাকর আচরণ শুরু করে। সাংবাদিক ইসমাইল হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, শুরুতে তিনি ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছে তা জানার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পর কয়েকজন ব্যক্তি তাকে লক্ষ্য করে প্রশ্ন করতে থাকে এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। তিনি বলেন, আমি একজন সংবাদকর্মী হিসেবে ঘটনাটি সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কিছু ব্যক্তি আচমকা আমাকে ঘিরে ধরে নানা ধরনের প্রশ্ন করতে থাকে এবং পরিস্থিতি অস্বাভাবিক করে তোলে। এক পর্যায়ে তারা নিজেদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বলে পরিচয় দেয় এবং সাংবাদিকের প্রতি অসৌজন্যমূলক আচরণ করতে থাকে। সাংবাদিকের অভিযোগ, পরিস্থিতি এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে তাকে মানসিকভাবে চাপে ফেলা যায়। তিনি আরও বলেন, “আমি যখন আমার সাংবাদিক পরিচয় দিই এবং বলি যে আমি তথ্য সংগ্রহ করছি, তখন তারা আরও উত্তেজিত হয়ে ওঠে। তাদের আচরণ দেখে মনে হচ্ছিল পুরো বিষয়টি পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হচ্ছে। সাংবাদিকের দাবি, ওই সময় কয়েকজন ব্যক্তি তাকে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে পুরান ঢাকার একটি খাবারের দোকানে নিয়ে যায়। পরে জানা যায় সেটি পুরান ঢাকার সুপরিচিত নান্না বিরানি হাউজ। সেখানে তাকে বসিয়ে রাখা হয় এবং বিভিন্নভাবে জিজ্ঞাসাবাদের নামে চাপ প্রয়োগ করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।এ সময় উপস্থিত একজন ব্যক্তি নিজের নাম জামিল বলে পরিচয় দেন। তিনি সেখানে উপস্থিত অন্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং পুরো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন বলে দাবি করা হলেও সাংবাদিকের মতে, ঘটনাটির পেছনে অন্য উদ্দেশ্য কাজ করছিল। ইসমাইল হোসেনের অভিযোগ, তাকে দীর্ঘ সময় সেখানে বসিয়ে রাখা হয় এবং মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়। তিনি মনে করেন, এটি ছিল একটি পরিকল্পিত অপচেষ্টা। তিনি বলেন, আমাকে সেখানে বসিয়ে রাখা হয়েছিল এবং বিভিন্নভাবে চাপ দেওয়া হচ্ছিল। আমার মনে হয়েছে পুরো বিষয়টি পরিকল্পিতভাবে সাজানো হয়েছে। একই সময়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন আরেক সংবাদকর্মী, যিনি দৈনিক কালবেলা পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত বলে জানা গেছে। তাকেও ঘটনাস্থলে হয়রানি করার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।আরও পড়ুন, নরসিংদীতে হানিফ মোল্লা ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে দোয়া ও গণ ইফতারপ্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ওই সময় পরিস্থিতি কিছুটা উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে স্থানীয় কিছু মানুষ এগিয়ে এসে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন। পরে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন ধরনের তথ্য ছড়িয়ে পড়ে। তবে সাংবাদিক ইসমাইল হোসেনের দাবি, এসব তথ্যের অনেকটাই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং বাস্তবতার সঙ্গে মিল নেই। তিনি বলেন, ঘটনার পর আমি লক্ষ্য করেছি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমার বিরুদ্ধে নানা ধরনের অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমি একজন সাংবাদিক হিসেবে ঘটনাটি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়েছিলাম।সাংবাদিকের অভিযোগ, পূর্বের কিছু ব্যক্তিগত বিরোধ বা শত্রুতার জের ধরে তাকে উদ্দেশ্য করে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে। তিনি মনে করেন, বিষয়টি পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয়েছে যাতে তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা যায়। তিনি বলেন, “আমার ধারণা পূর্বের কিছু বিরোধের কারণেই এই ঘটনা ঘটানো হয়েছে। আমাকে বিব্রত করার জন্য এবং আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানোর জন্য এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে। এদিকে সাংবাদিক মহলের একটি অংশ বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, কোনো ঘটনা কভার করতে গিয়ে যদি সাংবাদিকদের এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে তা উদ্বেগজনক। তবে একজন জ্যেষ্ঠ সংবাদকর্মী বলেন, সাংবাদিকরা মাঠে কাজ করেন এবং বিভিন্ন ঘটনার তথ্য সংগ্রহ করেন। সেখানে যদি কেউ তাদের পরিচয় জানার পরও হয়রানি বা ভয়ভীতি দেখানোর চেষ্টা করে, তাহলে সেটি খুবই দুঃখজনক।স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, পুরান ঢাকার ব্যস্ত এলাকাগুলোতে প্রায়ই নানা ধরনের ঘটনা ঘটে এবং অনেক সময় সেখানে ভিড় ও উত্তেজনার কারণে ভুল বোঝাবুঝির পরিস্থিতিও তৈরি হয়। তবে এ ক্ষেত্রে ঘটনাটি পরিকল্পিত কি না তা তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন অনেকে। এদিকে ঘটনার পর স্থানীয় প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।সাংবাদিক ইসমাইল হোসেন বলেন, তিনি চান ঘটনাটির সঠিক তদন্ত হোক এবং প্রকৃত ঘটনা সামনে আসুক। তিনি বলেন, “আমি চাই বিষয়টি সঠিকভাবে তদন্ত করা হোক। আমি একজন সংবাদকর্মী হিসেবে আমার দায়িত্ব পালন করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমাকে অকারণে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। তিনি আরও বলেন, সত্যটা সামনে আসলে সবকিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে। আমি চাই কেউ যেন মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি না করে। ঘটনাটি নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যেও আলোচনা চলছে। অনেকেই মনে করছেন, প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের জন্য বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।আরও পড়ুন, বাগেরহাটে জমে উঠেছে ঈদের বাজারসাংবাদিক মহলের মতে, সংবাদকর্মীরা সমাজের নানা ঘটনার তথ্য সংগ্রহ করে জনগণের সামনে তুলে ধরেন। তাই তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে যাতে আর না ঘটে সেজন্য সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন বলেও মত দিয়েছেন অনেকেই। সাংবাদিক সংগঠনগুলো বলছে, ঘটনাটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে স্থানীয় সাংবাদিক সংগঠনের নেতারা। তারা বলেন, একজন দায়িত্বশীল সংবাদকর্মী মাঠে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে যদি হয়রানি, নির্যাতন বা মারধরের হুমকির মুখে পড়েন, তবে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য অশনি সংকেত। সংগঠনের নেতারা বলেন, কোনো ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে সাংবাদিকদের এভাবে আটকে রাখা বা মানসিক চাপ সৃষ্টি করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করার আহ্বান জানান এবং ভবিষ্যতে সাংবাদিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানান। একই সঙ্গে তারা অপপ্রচার বন্ধ করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের ওপর জোর দেন।এদিকে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ব্যক্তিকে পরিকল্পিতভাবে ঘিরে ধরে মারধরের চেষ্টা, আটকে রাখা, ভয়ভীতি প্রদর্শন বা মানসিক চাপ সৃষ্টি করা ফৌজদারি অপরাধের আওতায় পড়তে পারে। এ ধরনের ঘটনায় ভুক্তভোগী চাইলে সংশ্লিষ্ট থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) অথবা লিখিত অভিযোগ দাখিল করতে পারেন। অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নিতে পারে। যদি প্রমাণিত হয় যে কেউ জোরপূর্বক আটকে রাখা, মারধরের চেষ্টা বা মানহানিকর অপপ্রচার চালিয়েছে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় মামলা হতে পারে। এ ধরনের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা হলে ভবিষ্যতে এমন অপ্রীতিকর পরিস্থিতি অনেকটাই কমে আসবে।

ছিনতাই ঘটনার আড়ালে সাংবাদিককে ঘিরে অপচেষ্টা