দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

শিক্ষাব্যবস্থায় ধস: সিন্ডিকেট ও বাণিজ্যের করাল গ্রাসে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম

বাংলাদেশের সংবিধানের ১৭ নম্বর অনুচ্ছেদে শিক্ষাকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি এবং একটি মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেই অধিকার আজ ‘সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসায়’ পরিণত হয়েছে। খাদ্য বা বস্ত্রের মতো শিক্ষাও এখন বাজারে কেনাবেচার পণ্য। সরকারি-বেসরকারি নির্বিশেষে শিক্ষা খাতের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়া দুর্নীতি, ভর্তিবাণিজ্য এবং রাজনৈতিক সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য প্রমাণ করে—একটি মেধাবী জাতি গঠনের পথে আমরা নিজেরাই কাঁটাতারের বেড়া তৈরি করছি। শিক্ষা আজ আর আলো ছড়ানোর মাধ্যম নয়, বরং এটি একটি ‘সার্টিফিকেট বিক্রির কারখানা’ এবং ‘নিয়োগ বাণিজ্যের হাতিয়ারে’ পরিণত হয়েছে।শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিটি স্তরেই অর্থ ও প্রভাবের বিনিময়ে সুযোগ তৈরি করা এখন অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। প্রশাসন থেকে শুরু করে স্থানীয় রাজনৈতিক চক্র—সবাই মিলে গড়ে তুলেছে এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট।ভর্তিবাণিজ্য ও কোচিং সিন্ডিকেট: নামি স্কুল-কলেজে ভর্তির জন্য অভিভাবকদের জিম্মি করা হচ্ছে। ট্র্যান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীর নামকরা স্কুলগুলোতে ভর্তির ক্ষেত্রে লটারির নামেও কারসাজি এবং ডোনেশনের নামে লাখ লাখ টাকার অবৈধ লেনদেন হয়। জরিপমতে, মানসম্মত প্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য প্রায় ৪১% অভিভাবককে কোনো না কোনোভাবে ঘুষ বা নিয়মবহির্ভূত অর্থ দিতে হয়।শিক্ষক নিয়োগে ঘুষের রেট: শিক্ষকতা একসময় মহান পেশা থাকলেও এখন এটি ‘বিনিয়োগের’ খাত। এমপিওভুক্ত স্কুল-কলেজে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সুপারিশ এবং অর্থের লেনদেন ওপেন সিক্রেট। বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী, একজন সহকারী শিক্ষক নিয়োগে ৫ থেকে ১০ লাখ এবং কলেজ পর্যায়ে প্রভাষক নিয়োগে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। মেধার বদলে যখন টাকার বিনিময়ে শিক্ষক নিয়োগ পান, তখন ক্লাসরুমে শিক্ষার মান নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।অশনিসংকেত: একটি অযোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া মানে আগামী ৩০ বছরের জন্য কয়েক হাজার শিক্ষার্থীকে ভুল শিক্ষার হাতে তুলে দেওয়া। বাবা-মায়ের কষ্টার্জিত অর্থে সন্তানরা জিপিএ-৫ পাচ্ছে, স্নাতক ডিগ্রি নিচ্ছে, কিন্তু তাদের জ্ঞানের ঝুলি শূন্য। একে বলা হচ্ছে ‘সনদসর্বস্ব শিক্ষা’। আরও পড়ুন, ঝিনাইদহে ৪ টি আসনে ২৩ প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ, ৪ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র বাতিলশিখন ঘাটতি: বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, বাংলাদেশে একজন শিক্ষার্থী ১১ বছর স্কুলে কাটিয়ে যে জ্ঞান অর্জন করার কথা, বাস্তবে সে অর্জন করছে মাত্র ৬.৫ বছরের সমতুল্য জ্ঞান। অর্থাৎ, শিক্ষাজীবনে তাদের প্রায় সাড়ে ৪ বছরের শিখন ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার গড় মানের চেয়েও এটি নিম্নমুখী।জিপিএ-৫ স্ফীতি বনাম বাস্তবতা: প্রতি বছর লক্ষাধিক শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেলেও বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় ন্যূনতম পাস নম্বর তুলতে ব্যর্থ হয় অধিকাংশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় পাস করার হার প্রায়ই ১০-১৫ শতাংশের মধ্যে আটকে থাকে, যা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার অন্তঃসারশূন্যতা প্রমাণ করে।তবে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো কি দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করছে, নাকি শিক্ষিত বেকার তৈরি করছে? পরিসংখ্যান বলছে পরিস্থিতি ভয়াবহ। স্নাতক বেকারের উচ্চ হার: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্যমতে, এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যে বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকারের হার সর্বোচ্চ পর্যায়ের একটি। দেশে বর্তমানে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী বেকারের হার প্রায় ১২ থেকে ১৫ শতাংশ। করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো অভিযোগ করে, তারা দেশি গ্রাজুয়েটদের মধ্যে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ দক্ষতা, ইংরেজি ভাষা জ্ঞান এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা পান না। ফলে বাধ্য হয়ে তারা বিদেশিদের নিয়োগ দেন। আরও পড়ুন, বান্দরবানে রান্নার গ্যাস সিলিন্ডারের তীব্র সংকট, বাড়তি দামে বিক্রির অভিযোগঅর্থনৈতিক ক্ষতি: বাংলাদেশে কাজ করা বিদেশি কর্মীরা প্রতি বছর প্রায় ৫-৬ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স হিসেবে তাদের দেশে নিয়ে যাচ্ছে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে পারলে এই বিশাল অংকের বৈদেশিক মুদ্রা দেশেই রাখা সম্ভব হতো। এদিকে বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থান অত্যন্ত নাজুক। দেশের ১৭০টিরও বেশি সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও টাইমস হায়ার এডুকেশন বা কিউএস ওয়ার্ল্ড র‌্যাংকিং-এ শীর্ষ ৫০০-র মধ্যে বাংলাদেশের কোনো প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী অবস্থান নেই। এর প্রধান কারণ গবেষণায় বরাদ্দহীনতা। জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে যে বরাদ্দ দেওয়া হয় (জিডিপির প্রায় ২% বা তার কম), তা ইউনেস্কোর সুপারিশকৃত (জিডিপির ৪-৬%) তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বাজেটের সিংহভাগ ব্যয় হয় বেতন-ভাতা ও অবকাঠামো উন্নয়নে, গবেষণায় বরাদ্দ থাকে ১-২ শতাংশের মতো, যা লজ্জাজনক।প্রতি বছর বিনামূল্যে বই বিতরণেও চলে সিন্ডিকেটের কারসাজি। নিম্নমানের কাগজ ব্যবহার এবং বই ছাপানোর টেন্ডারে দুর্নীতি নিয়মিত ঘটনা। এছাড়া ‘ভুতুড়ে স্কুল’ (বাস্তবে অস্তিত্ব নেই কিন্তু কাগজে-কলমে আছে) দেখিয়ে এমপিওভুক্তি ও বই বরাদ্দ নিয়ে সরকারি কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হচ্ছে। উন্নয়ন প্রকল্পে অপচয়: শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রকল্পে কেনাকাটায় বালিশ বা পর্দার মতো অস্বাভাবিক মূল্যের দুর্নীতির খবর বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে এসেছে। আইসিটি ল্যাব তৈরির নামে নিম্নমানের ল্যাপটপ সরবরাহ করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের কোনো কাজেই আসছে না। শিক্ষাব্যবস্থায় এই নৈরাজ্য কেবল দুর্নীতির প্রশ্ন নয়, এটি একটি জাতীয় দুর্যোগ। সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য, প্রশ্নফাঁস, এবং মানহীন শিক্ষা আমাদের জনমিতিক লভ্যাংশকে জনমিতিক বোঝায় পরিণত করছে।

শিক্ষাব্যবস্থায় ধস: সিন্ডিকেট ও বাণিজ্যের করাল গ্রাসে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম