টানা বর্ষণে কটিয়াদী সরকারি পাইলট বালক উচ্চ বিদ্যালয় জলাবদ্ধ শ্রেণিকক্ষ শিক্ষক-শিক্ষার্থী
টানা তিন-চারদিনের দিনের ভারী বর্ষণে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। উপজেলার বিভিন্ন সড়ক, বাজার ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হলেও সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে শতবর্ষী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কটিয়াদী সরকারি পাইলট বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে। বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ, শ্রেণিকক্ষের সামনের অংশ, শিক্ষক কক্ষ, মিলনায়তন, চলাচলের পথ এবং বিভিন্ন স্থানে হাঁটুসমান পানি জমে থাকায় স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে ব্যাহত হয়েছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় চলমান অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।সরেজমিনে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, পুরো ক্যাম্পাস যেন ছোট একটি জলাশয়ে পরিণত হয়েছে। মাঠের পানি বিভিন্ন শ্রেণিকক্ষের সামনে পর্যন্ত চলে এসেছে। শিক্ষার্থীরা জুতা হাতে নিয়ে খালি পায়ে নোংরা পানি মাড়িয়ে বিদ্যালয়ে প্রবেশ করছে। অনেক অভিভাবক ছোট শিশুদের কোলে করে বা হাত ধরে শ্রেণিকক্ষে পৌঁছে দিচ্ছেন। শিক্ষক-কর্মচারীরাও একই দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে বিদ্যালয়ে প্রবেশ করছেন।বিদ্যালয়ের পাশের মসজিদে মুসল্লিদের যাতায়াতও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পানি জমে থাকায় বয়স্ক মানুষ ও শিশুদের চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এলাকাবাসী জানান, সামান্য বৃষ্টিতেই বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে পানি জমে যায়। তবে এবারের টানা বর্ষণে পরিস্থিতি অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিদ্যালয়ে কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় বৃষ্টির পানি দ্রুত বের হতে পারে না। ফলে প্রতিবার বর্ষা মৌসুমে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়। দীর্ঘদিন পানি জমে থাকায় পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর হয়ে ওঠে। মশার বংশবিস্তার বৃদ্ধি পাওয়ায় ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া এবং বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ছে বলে অভিভাবকরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।এদিকে টানা বর্ষণের কারণে উপজেলার আরও কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও নির্ধারিত পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় সড়কের ওপর পানি জমে থাকায় শিক্ষার্থী, শিক্ষক, চাকরিজীবী ও সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষ ও দিনমজুরদের স্বাভাবিক কর্মজীবন ব্যাহত হয়েছে।সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক ও সাংবাদিক হামিদ হাসান বলেন, "সকালে সন্তানকে পরীক্ষা দিতে নিয়ে এসেছিলাম।আরও পড়ুন, রমেক হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতির দায়িত্বে আসাদুল হাবিব দুলু কিন্তু বিদ্যালয়ের চারদিকে পানি জমে থাকায় খুবই কষ্ট করতে হয়েছে। শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হচ্ছে। এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হওয়া জরুরি।"কয়েকজন পরীক্ষার্থী জানায়, দীর্ঘদিন প্রস্তুতি নেওয়ার পর পরীক্ষার দিন বিদ্যালয়ে এসে জানতে হয়েছে পরীক্ষা স্থগিত। এতে তারা মানসিকভাবে হতাশ হয়ে পড়েছে। অনেক শিক্ষার্থী দূর-দূরান্ত থেকে ভিজে কাপড়ে বিদ্যালয়ে এলেও পরীক্ষা দিতে পারেনি।স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, বছরের পর বছর ধরে বিদ্যালয়টিতে জলাবদ্ধতার সমস্যা থাকলেও কোনো স্থায়ী উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি বিদ্যালয়ের ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন না হওয়া দুঃখজনক। তারা দ্রুত পানি নিষ্কাশনের আধুনিক ব্যবস্থা নির্মাণ, মাঠ ভরাট এবং স্থায়ী জলাবদ্ধতা নিরসনের দাবি জানান।বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বদিউল আলম মাহফুজ বলেন, "টানা বৃষ্টিতে শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষক কক্ষ ও মাঠে পানি জমে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ পুরোপুরি বিঘ্নিত হয়েছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে চলমান অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছি। বিষয়টি ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। দ্রুত ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়ন ও প্রয়োজনীয় সংস্কার করা না হলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের সমস্যা দেখা দেবে।"এ বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।শিক্ষাবিদদের মতে, একটি বিদ্যালয়ে নিয়মিত জলাবদ্ধতা শুধু শিক্ষা কার্যক্রমই ব্যাহত করে না, বরং শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি, উপস্থিতি এবং শিক্ষার মানের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই বিষয়টিকে জরুরি ভিত্তিতে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।স্থানীয় অভিভাবক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সচেতন নাগরিকদের দাবি, কটিয়াদী সরকারি পাইলট বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের জলাবদ্ধতা নিরসনে জরুরি ভিত্তিতে আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা নির্মাণ, মাঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, পানি নিষ্কাশনের স্থায়ী ব্যবস্থা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় প্রতি বর্ষা মৌসুমেই শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।