লামায় শান্তিনিকেতনে ভুল রিপোর্টে আতঙ্ক, দায় এড়ালেন মালিক
বান্দরবানের লামা উপজেলার স্বাস্থ্যসেবাকে ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে শান্তিনিকেতন ডক্টরস এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার। রোগ নির্ণয়ের নামে ভুল তথ্য প্রদান, অদক্ষ জনবল দিয়ে পরীক্ষা পরিচালনা, পুরনো ও ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্রপাতি ব্যবহার এবং রোগীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটি এখন স্থানীয়ভাবে তীব্র সমালোচনার মুখে। সাম্প্রতিক একাধিক ঘটনার প্রেক্ষিতে বিষয়টি এখন শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সীমাবদ্ধতায় আটকে নেই, বরং এটি হয়ে উঠেছে গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থার জবাবদিহিতা ও মান নিয়ন্ত্রণের বড় প্রশ্ন।ঘটনার সূত্রপাত সাদিয়া (ছদ্মনাম) নামের এক রোগীর চিকিৎসা পরীক্ষাকে ঘিরে। পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২৯ মার্চ ২০২৬ তারিখে সাদিয়ার ‘Lower Abdomen’ আল্ট্রাসনোগ্রাম করা হয় উক্ত ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয় তার বাম পাশে ৪.১০ × ২.৪৭ × ২.৪০ সেন্টিমিটার আকারের একটি ‘Complex Cyst রয়েছে। রিপোর্টে ওই সিস্টকে কেন্দ্র করে চিকিৎসার পরামর্শ দেওয়া হয় এবং প্রায় ১২ হাজার টাকার ওষুধ গ্রহণ করতে বলা হয়।পরিবার জানায়, রিপোর্টটি হাতে পাওয়ার পর তারা চরম উদ্বেগে পড়ে যান। চিকিৎসকের পরামর্শে দ্রুত ওষুধ সংগ্রহ করা হয় এবং চিকিৎসা শুরু হয়। কিন্তু সন্দেহের বশে মাত্র ৫ দিন পর, ৩ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে সাদিয়ার পুনরায় আল্ট্রাসনোগ্রাম করানো হয় কক্সবাজারের চকরিয়ায় অবস্থিত এ কে এস ডায়াগনস্টিক সেন্টার-এ।সেখানে Whole Abdomen আল্ট্রাসনোগ্রাম রিপোর্টে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র উঠে আসে। রিপোর্টে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় “Normal Studz”। অর্থাৎ, আগের রিপোর্টে যে ‘Complex Cyst’-এর কথা বলা হয়েছিল, তার কোনো অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি। মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে একটি জটিল সিস্ট সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার ঘটনা চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাধারণ ব্যাখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছেপ্রথম রিপোর্টটি কি ভুল ছিল, নাকি পরবর্তী রিপোর্টে কোনো ত্রুটি?স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি ‘Complex Cyst ’ সাধারণত কয়েক দিনের মধ্যে নিজে থেকে সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে যায় না। এ ধরনের ক্ষেত্রে রিপোর্টের যথার্থতা যাচাই করা জরুরি।” ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা জানান, ভুল রিপোর্টের কারণে তারা চরম মানসিক চাপের মধ্যে পড়েন। একটি গুরুতর রোগের আশঙ্কা তাদের আতঙ্কিত করে তোলে। পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ এবং ব্যয়বহুল ওষুধ কেনার ফলে আর্থিক ক্ষতিও হয়েছে।একটি রিপোর্ট আমাদের পুরো পরিবারকে আতঙ্কে ফেলে দিয়েছিল। আমরা ভাবছিলাম বড় ধরনের সমস্যা হয়েছে। পরে অন্য জায়গায় পরীক্ষা করে দেখি কিছুই নেই। তাহলে এই ভয়, এই খরচ এসবের দায় কে নেবে?স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এটি কোনো একক ঘটনা নয়। একই ধরনের অভিযোগ করেছেন রুহুল কবির নামের আরেক রোগী। তিনি জানান, তার পরীক্ষার রিপোর্টেও গুরুতর অসঙ্গতি ছিল, যা পরে অন্য একটি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা করে ধরা পড়ে।আরো পড়ুন: সমাজসেবা অধিদপ্তরের নাম ব্যবহার করে প্রতারণাতার ভাষায়, আমি চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা করাতে গিয়েছিলাম। কিন্তু যে রিপোর্ট দেওয়া হয়, তা সম্পূর্ণ ভুল ছিল। এতে আমার সময়, অর্থ সবকিছুই নষ্ট হয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, এমন অন্তত ৩০ থেকে ৪০টি রিপোর্টে ভুল পাওয়া গেছে, যা বিষয়টিকে আরও গুরুতর করে তুলেছে। এছাড়া অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ডায়াগনস্টিক সেন্টারটিতে রয়েছে নানা ধরনের অনিয়ম। একজন অভ্যন্তরীণ সূত্র জানান, দ্রুত রিপোর্ট সরবরাহের চাপের কারণে অনেক সময় যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই রিপোর্ট তৈরি করা হয়।অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানের এক কর্মী আমতুল হাফিজ বলেন, কিছু ক্ষেত্রে ভুল হয়েছে, তবে তা ইচ্ছাকৃত নয়। আমরা বিষয়টি সংশোধনের চেষ্টা করি এবং প্রয়োজনে টাকা ফেরতের কথাও বলা হয়। তবে ভুক্তভোগীদের মতে, শুধুমাত্র টাকা ফেরত দিলেই দায় শেষ হয় না। কারণ ভুল রিপোর্ট রোগীর চিকিৎসা প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।আরো পড়ুন: বনানীতে মার্ভেল ইন হোটেল ঘিরে মিজান ও পায়েলের বিরুদ্ধে অভিযোগপ্রতিষ্ঠানটির মালিক বিকাশ কলি সেনের বিরুদ্ধে রয়েছে আরও গুরুতর অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, তার কোনো স্বীকৃত চিকিৎসা ডিগ্রি বা ডিপ্লোমা না থাকলেও তিনি রোগীদের প্রেসক্রিপশন দেন এবং ওষুধ বিক্রির সঙ্গে যুক্ত। এছাড়া সাংবাদিকদের সঙ্গে অসহযোগিতামূলক আচরণ এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। একাধিক সাংবাদিক জানান, তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে তারা বাধার সম্মুখীন হয়েছেন।স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডায়াগনস্টিক রিপোর্ট চিকিৎসার মূল ভিত্তি। এখানে ভুল হলে পুরো চিকিৎসা প্রক্রিয়া বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। আল্ট্রাসনোগ্রাম একটি অপারেটর-নির্ভর পরীক্ষা। যিনি এটি পরিচালনা করেন, তার দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অদক্ষ ব্যক্তি দ্বারা পরিচালিত হলে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। এ ঘটনায় স্থানীয় জনগণের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। তারা বলছেন, এ ধরনের ঘটনার কারণে সাধারণ মানুষ চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারাচ্ছে।আরো পড়ুন: ভুল রিপোর্টে লামায় তোলপাড়, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ঘিরে বিতর্কস্থানীয়দের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি আগে থেকেই জানলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের অনিয়ম চলতে পেরেছে। যদিও একটি সূত্র জানিয়েছে, বিষয়টি তদন্তের জন্য একটি টিম গঠনের প্রক্রিয়া চলছে, তবে এখনো পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। লামার শান্তিনিকেতন ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সীমাবদ্ধতা নয়, বরং এটি দেশের গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতার প্রতিফলন। ভুল রিপোর্ট, অদক্ষ জনবল এবং তদারকির অভাব এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে মিলেই জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কত দ্রুত তদন্ত করে সত্য উদঘাটন করতে পারে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে। কারণ, চিকিৎসা সেবায় একটি ভুল রিপোর্ট মানে শুধু একটি ভুল তথ্য নয় এটি একটি পরিবারের আতঙ্ক, একটি রোগীর ঝুঁকি এবং পুরো সমাজের আস্থার সংকট।আরো পুড়ন: সুন্দরবনে পর্যটক নিরাপত্তায় বড় অভিযান, ডাকাতির চেষ্টায় দুই দুষ্কৃতিকারী গ্রেপ্তারলামায় অবস্থিত শান্তিনিকেতন ডক্টরস এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার-কে ঘিরে ওঠা অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানটির মালিক বিকাশ কলি সেন নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন, ডাক্তাররা যদি ভুল রিপোর্ট দেন, তাহলে আমার করণীয় কী? এসব ভুলের দায়ভার ডাক্তারদেরই নিতে হবে। তিনি আরও দাবি করেন, দীর্ঘদিন ধরে তিনি লামা এলাকায় সুনামের সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন এবং প্রতিষ্ঠানটি ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো ধরনের ভুল বা অনিয়ম করে না। প্রয়োজনে ব্যবসা বন্ধ করে দিব। আমি আছি বলেই আমার এখানে সেবা নিতে পারেন। আরো পড়ুন: পুলিশের দায়িত্ব পালনে বাধা মব কালচারঅন্যদিকে, বিষয়টি নিয়ে জানতে ডা. মোহাম্মদ শাহী হোসাইন চৌধুরী-এর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। ফলে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা প্রশাসন ইতোমধ্যে অভিযোগটি আমলে নিয়েছে এবং এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অভিযোগগুলো সত্য হলে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে বিবেচিত হবে এবং তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।