দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

লামায় স্বাস্থ্যসেবার নামে প্রতারণা, নেই প্রশাসনিক অভিযান

বান্দরবানের লামা উপজেলায় স্বাস্থ্যসেবার আড়ালে কি চলছে ভয়ংকর প্রতারণা? একের পর এক ভুল রিপোর্ট, অদক্ষ জনবল, পুরনো মেশিনে পরীক্ষা, রোগীদের আতঙ্কিত করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠলেও রহস্যজনকভাবে নীরব প্রশাসন| ধারাবাহিক সংবাদ প্রকাশের পরও এখনো পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো অভিযান, তদন্ত কিংবা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ায় জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে| অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে শান্তিনিকেতন ডক্টরস এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার| স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটি ভুল রিপোর্ট দিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে| অথচ অভিযোগের পাহাড় জমলেও সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য বিভাগ ও প্রশাসনের রহস্যজনক নীরবতায় প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে কি কোনো অদৃশ্য শক্তির ছত্রছায়ায় চলছে এসব অনিয়ম?আরও পড়ুন: লামায় শান্তিনিকেতনে ভুল রিপোর্টে আতঙ্ক, দায় এড়ালেন মালিকঘটনার সূত্রপাত সাদিয়া নামের এক রোগীকে ঘিরে| গত ২৯ মার্চ ২০২৬ তারিখে উক্ত ডায়াগনস্টিক সেন্টারে তার Lower Abdomen আল্ট্রাসনোগ্রাম করা হয়| রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়—তার শরীরে ৪.১০ × ২.৪৭ × ২.৪০ সেন্টিমিটার আকারের একটি ‘Complex Cyst’ রয়েছে| ওই রিপোর্ট দেখিয়ে রোগী পরিবারকে আতঙ্কিত করা হয় এবং প্রায় ১২ হাজার টাকার ওষুধ গ্রহণ করানো হয়| কিন্তু মাত্র পাঁচ দিন পর, কক্সবাজারের চকরিয়ায় অবস্থিত এ কে এস ডায়াগনস্টিক সেন্টার-এ পুনরায় পরীক্ষা করালে রিপোর্ট আসে Normal Studz| অর্থাৎ, আগের রিপোর্টে যে সিস্ট দেখানো হয়েছিল, তার কোনো অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি| এ ঘটনায় রোগীর পরিবারে সৃষ্টি হয় তীব্র ক্ষোভ| স্থানীয়দের প্রশ্ন একটি Complex Cyst কি পাঁচ দিনে উধাও হয়ে যায়, নাকি রোগীদের ভয় দেখিয়ে চিকিৎসার নামে চলছে ব্যবসা?আরও পড়ুন: মিরপুরে আলোচিত ওসি হাফিজুর রহমানভুক্তভোগী পরিবার বলছে, ভুল রিপোর্টের কারণে তারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন| অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা, ওষুধ এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার পেছনে গুনতে হয়েছে মোটা অঙ্কের টাকা| একটি রিপোর্ট পুরো পরিবারকে আতঙ্কে ফেলে দেয়| আমরা ভাবছিলাম বড় ধরনের রোগ হয়েছে| পরে অন্য জায়গায় পরীক্ষা করে দেখি সব স্বাভাবিক| তাহলে আমাদের সাথে এটা কী হলো?স্থানীয়দের অভিযোগ, এমন ঘটনা একদিনের নয়| প্রায় ৩০ থেকে ৪০টি ভুল রিপোর্টের অভিযোগ রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে| কেউ ভুল রোগ নির্ণয়ের শিকার হয়েছেন, কেউ আবার অপ্রয়োজনীয় ওষুধ খেয়ে শারীরিক জটিলতায় পড়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে|আরও পড়ুন: রাজধানীতে আক্তারের আবাসিক হোটেল সিন্ডিকেট বিস্তারঅনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে আরও ভয়ংকর তথ্য| অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটিতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত টেকনোলজিস্ট ও নার্সের ঘাটতি রয়েছে| এমনকি কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের দিয়েও এক্স রে ও রিপোর্ট ˆতরির কাজ করানো হয়| এখানে দ্রুত রিপোর্ট দেওয়ার প্রতিযোগিতা চলে| রোগী বেশি, কিন্তু দক্ষ লোক কম| ফলে অনেক সময় সঠিকভাবে পরীক্ষা ছাড়াই রিপোর্ট দেওয়া হয়|এছাড়া যিনি আল্ট্রাসনোগ্রাফি পরিচালনা করছেন, তার স্বীকৃত প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে| ব্যবহৃত কয়েকটি মেশিন পুরনো এবং অনেকগুলোর ˆবধ কাগজপত্র নেই বলেও অভিযোগ রয়েছে|অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির মালিক বিকাশ কলি সেন বলেন, ডাক্তাররা যদি ভুল রিপোর্ট দেন তাহলে আমার করণীয় কী? এসব ভুলের দায় ডাক্তারদের নিতে হবে| আমি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করে আসছি| তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, এছাড়াও বিকাশ কলি সেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি স্বৈরাচারী আ.লীগের সময় ও  বেশ দাপটের সাথে চালিয়ে আসছিলেন তার ব্যবসা| কিন্তু তার অপরাধের তথ্য কেউ তুলে ধরতে সাহস পায়নি|আরও পড়ুন: হঠাৎ বৃষ্টিতে রাজধানী ডুবল পানিতে , ভোগান্তিতে নগরবাসীকিন্তু সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে| ধারাবাহিক সংবাদ প্রকাশ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় এবং একাধিক ভুক্তভোগীর অভিযোগ সামনে এলেও এখনো পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেয়নি চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর| অন্যদিকে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে কোনো অভিযান বা তদন্তের খবর পাওয়া যায়নি| অথচ সংবাদ প্রকাশ হলো, অভিযোগ উঠলো, মানুষ প্রতিবাদ করলো কিন্তু প্রশাসনের কোনো নড়াচড়া নেই| তাহলে কি সাধারণ মানুষের জীবনের কোনো মূল্য নেই? তবে কি রাজনৈতিক প্রভাব ও অদৃশ্য শক্তির কারণে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সাহস পাচ্ছে না সংশ্লিষ্টরা|একজন স্থানীয় সমাজকর্মী বলেন, যদি অভিযোগ মিথ্যা হয় তাহলে তদন্ত করে ক্লিনিককে ক্লিন সার্টিফিকেট দেওয়া হোক| আর যদি সত্য হয় তাহলে বন্ধ করা হোক| কিন্তু প্রশাসনের এই নীরবতা মানুষের সন্দেহ আরও বাড়াচ্ছে| আরও পড়ুন: মাদক-চাঁদাবাজের গডফাদারদের তালিকা প্রভাবশালীদের দিকেই যাচ্ছে : এডিসি জুয়েলস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি ভুল রিপোর্ট মানে শুধু একটি ভুল তথ্য নয় এটি একজন রোগীর জীবনের ঝুঁকি| ভুল রিপোর্টের কারণে কেউ অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে পারেন, আবার প্রকৃত রোগ থাকলেও তা ধরা না পড়তে পারে| এরকম একাধিক ভূল  রিপোর্ট বাণিজ্য চালিয়ে আসছে উক্ত প্রতিষ্ঠানের বিকাশ কলি সেন|  তাদের মতে, প্রান্তিক এলাকায় গড়ে ওঠা অনেক ডায়াগনস্টিক সেন্টার যথাযথ অনুমোদন, দক্ষ জনবল ও প্রযুক্তিগত মান ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে| ফলে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন| ¯^াস্থ্যসেবা কোনো ব্যবসার খেলনা নয়| এখানে মানুষের জীবন জড়িত| ভুল রিপোর্ট দিয়ে মানুষের জীবন নিয়ে খেলা বন্ধ করতে হবে| এখন দেখার বিষয় অভিযোগ, ক্ষোভ এবং ধারাবাহিক সংবাদ প্রকাশের পরও প্রশাসন কতদিন নীরব থাকে| নাকি শেষ পর্যন্ত তদন্তের মুখোমুখি হবে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানটি| আরও পড়ুন: রাজধানীজুড়ে খোঁড়াখুঁড়ির , দুর্ভোগ উন্নয়নের নামে জনভোগান্তি চরমে

লামায় স্বাস্থ্যসেবার নামে প্রতারণা, নেই প্রশাসনিক অভিযান