যাকাত গরিবের অধিকার, করুণার দান নয়
ইসলাম ধর্মে যাকাত একটি নির্ধারিত ফরজ ইবাদত। যাকাত কোনো দয়া বা করুণার দান নয়; বরং এটি গরিব ও অসচ্ছল মানুষের ন্যায্য অধিকার। ধর্মীয় আলেমরা বলেন, যাকাত যথাযথভাবে আদায় করা হলে সমাজ, দেশ, জাতি এমনকি বিশ্ব থেকেও দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, যাতে তোমাদের বিত্তবানদের মাঝেই শুধু সম্পদ আবর্তন না করে।” (সুরা হাশর, আয়াত: ৭) এই আয়াতের মাধ্যমে সমাজে সম্পদের সুষম বণ্টনের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। যাকাত দারিদ্র্য বিমোচনের পাশাপাশি অর্থনীতিতে সম্পদের প্রবাহ সৃষ্টি করে।আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআন মজিদে যাকাত ব্যয়ের জন্য নির্দিষ্ট আটটি খাত নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এই খাতগুলোতেই সদকাতুল ফিতর, ওয়াজিব সদকা, ফিদিয়া, কাফফারা ও মান্নতের অর্থ ব্যয় করা যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, মূলত সদকা হলো ফকির, মিসকিন, যাকাত আদায়কারী কর্মচারী, যাদের মন ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করা প্রয়োজন, দাসদাসী মুক্তির জন্য, ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে এবং অসহায় মুসাফিরদের জন্য। এটি আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত বিধান। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, পরম কৌশলী।” (সুরা তওবা, আয়াত: ৬০)এই আটটি খাতের মধ্য থেকে সময়ের প্রয়োজন ও বাস্তব ফলাফল বিবেচনায় নিকটাত্মীয়, প্রতিবেশী ও সমাজের বেশি অসহায় ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আলেমরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, দরিদ্র তালেবে এলেম বা আলেমকে যাকাত প্রদান করলে তিনি একদিকে দরিদ্র ব্যক্তি হিসেবে উপকৃত হন, অন্যদিকে দ্বীনি ইলমের প্রসারে ভূমিকা রাখেন। ফলে এতে সাধারণ দানের পাশাপাশি অতিরিক্ত সওয়াব অর্জিত হয়। ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী যাদের যাকাত, সদকাতুল ফিতর, ফিদিয়া, কাফফারা ও মান্নত দেওয়া যাবে না, তারা হলেন:- মাুবাবা, দাদাুদাদি, নানাুনানি, ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনি, স্ত্রী, সায়্যিদ (রাসুলুল্লাহ ﷺ এর বংশধর), নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক ধনী ব্যক্তি এবং অমুসলিম।আপন ভাই-বোন, ভাগনে-ভাগনি, ভাতিজা-ভাতিজি, চাচা-ফুফু, মামা-খালা এবং অন্যান্য নিকটাত্মীয় যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক না হন, তবে তাদের জাকাত দেওয়া যাবে এবং তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া উত্তম। হাদিস শরিফে এসেছে, নিকটাত্মীয়কে সদকা দিলে তাতে দ্বিগুণ সওয়াব রয়েছে—একটি সদকার সওয়াব, অপরটি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার সওয়াব।” (তিরমিজি) পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, এমন অভাবী লোক রয়েছে, যারা আল্লাহর পথে নিজেদের নিয়োজিত রাখার কারণে দুনিয়াবি উপার্জনের জন্য ঘুরে বেড়াতে পারে না। সম্ভ্রমের কারণে অজ্ঞ লোকেরা তাদের সচ্ছল মনে করে। তুমি তাদের চেহারা দেখে চিনতে পারবে। তারা মানুষের কাছে নির্লজ্জভাবে ভিক্ষা করে না।”(সুরা বাকারা, আয়াত: ২৭৩) এই আয়াতে আত্মমর্যাদাসম্পন্ন দরিদ্রদের প্রতি বিশেষভাবে দৃষ্টি দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।যাকাত ও ফিতরা দেওয়ার আগে নিশ্চিত হতে হবে, প্রাপক প্রকৃত হকদার কি না। দানের সময় তাকে যাকাত” বলা জরুরি নয়, বিশেষ করে আত্মীয় বা সম্মানিত ব্যক্তি হলে তা উল্লেখ না করাই উত্তম। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন, সম্মান আল্লাহর জন্য, সম্মান রাসুলের জন্য এবং সম্মান মুমিনদের জন্য।” (সুরা মুনাফিকুন, আয়াত: ৮) অকারণে কাউকে অপমান বা লজ্জিত করা গুনাহের কাজ বলে আলেমরা উল্লেখ করেন। যাকাত, ফিতরা, ফিদিয়া, কাফফারা ও মান্নতের সদকা নগদ অর্থে অথবা খাদ্যদ্রব্য, পোশাক-পরিচ্ছদ ও ঈদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনে দিয়েও আদায় করা যায়। ধর্মীয় বিশেষজ্ঞদের মতে, যাকাত শুধু ব্যক্তিগত ইবাদত নয়, এটি একটি শক্তিশালী সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। সঠিকভাবে ও যথাস্থানে যাকাত প্রদান করা হলে সমাজে দারিদ্র্য হ্রাস পাবে, সম্পদের ভারসাম্য তৈরি হবে এবং মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত হবে।