দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

সাভার গেন্ডায় ঢাকা ইন গেস্ট হাউজে জুলহাসের অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও মাদক সিন্ডিকেট

ঢাকার সাভার থানাধীন গেন্ডা এলাকায় আবাসিক হোটেল ও গেস্ট হাউজকে ঘিরে অনৈতিক কর্মকাণ্ড, মাদক বেচাকেনা এবং অপরাধী চক্রের তৎপরতার অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, গেন্ডা এলাকার ‘ঢাকা ইন গেস্ট হাউজ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে জড়িত জুলহাস নামের এক ব্যক্তিকে ঘিরে মানব পাচারসহ বিভিন্ন অভিযোগও রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে দাবি করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে পূর্ণাঙ্গ যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া জরুরি। অভিযোগের সত্যতা নিরূপণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।সরেজমিন অনুসন্ধান ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গেন্ডা এলাকায় আবাসিক হোটেল ও গেস্ট হাউজের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কিছু কিছু ক্ষেত্রে বৈধ অনুমোদন, ব্যবসায়িক লাইসেন্স, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, অতিথিদের তথ্য সংরক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন রয়েছে কি না—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিত নজরদারি ও যথাযথ যাচাই না থাকায় কিছু প্রতিষ্ঠান অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে।আরও  পড়ুন : বনানীতে গেস্ট হাউজ-স্পা, ওসির ভূমিকা নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্নস্থানীয়দের একটি অংশের দাবি, ঢাকা ইন গেস্ট হাউজের সঙ্গে জুলহাস নামের এক ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। তাকে ঘিরে মানব পাচার ও বিভিন্ন স্থানে গেস্ট হাউজ, আবাসিক হোটেল এবং কথিত অনৈতিক ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের ব্যবসার সঙ্গে তিনি যুক্ত বলে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে। তবে জুলহাসের বিরুদ্ধে উত্থাপিত এসব অভিযোগের পক্ষে আদালতের রায় বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিশ্চিত তথ্য পাওয়া না গেলেও তাকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে উল্লেখ করেছেন স্থানীয়রা। ঢাকা ইন গেস্ট হাউজকে ঘিরে মাদক বেচাকেনা ও সরবরাহের অভিযোগও তুলেছেন স্থানীয় কয়েকজন। তাদের দাবি, বিভিন্ন বয়সী তরুণদের আনাগোনা এবং রাতের বেলায় সন্দেহজনক ব্যক্তিদের চলাচল নিয়ে এলাকায় উদ্বেগ রয়েছে। গেস্ট হাউজের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো যদি যথাযথভাবে তদারকি না করা হয়, তাহলে সেখানে মাদক ব্যবসায়ী বা অপরাধী চক্রের সদস্যরা সহজেই অবস্থান নেওয়ার সুযোগ পেতে পারে। বিশেষ করে তরুণদের মাদকাসক্তির ঝুঁকি বাড়লে তার প্রভাব পড়ে পরিবার ও সামাজিক পরিবেশের ওপর। প্রতিষ্ঠানের মালিক জুলহাসের দালাল চক্র খদ্দের যোগানের তাগিদে বিভিন্ন সোসাল মিডিয়াতে সুন্দরী নারীদের ছবি দিয়ে প্রচার করে থাকে এবং ওইসব খদ্দেররা তাদেও হাতে ব্ল্যাক মেইলের শিকার হয় বলে জানা গেছে।আরও  পড়ুন :পুলিশে একের পর এক রদবদল, অপরাধ দমনে নতুন পরীক্ষাসাভার এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও বিভিন্ন সময়ে তৎপরতা চালিয়েছে। চলতি বছর ঢাকা জেলার পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকেও মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদারের কথা জানানো হয়েছে।গেন্ডা এলাকায় কিশোর ও তরুণদের একটি অংশকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের মতে, মাদক, আড্ডা, অপরাধপ্রবণ পরিবেশ এবং অপরাধীদের আনাগোনা কিশোরদের একটি অংশকে বিপথে ঠেলে দিতে পারে। কোনো এলাকায় মাদক বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিস্তার ঘটলে সেখানে কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বাড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মারামারি, মাদক পরিবহনসহ নানা অপরাধ। তবে গেন্ডা এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে ঢাকা ইন গেস্ট হাউজের সরাসরি সাংগঠনিক সম্পর্ক রয়েছে—এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া না গেলেও আলোচনায় এসেছে।  আরও  পড়ুন:গুলশানে গেস্ট হাউজ-স্পা, পেছনে মিরাজের অজানা সাম্রাজ্য?একটি আবাসিক হোটেল বা গেস্ট হাউজ পরিচালনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন, ব্যবসায়িক লাইসেন্স, অগ্নিনিরাপত্তা এবং অতিথিদের তথ্য সংরক্ষণসহ বিভিন্ন বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। কোনো প্রতিষ্ঠান এসব নিয়ম না মেনে পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা প্রশাসনের নিয়মিত পরিদর্শনের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। সাভার ও আশুলিয়া এলাকায় গেস্ট হাউজকে কেন্দ্র করে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ নিয়ে এর আগেও সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। ২০২৬ সালের একটি প্রতিবেদনে গেন্ডাসহ সাভারের বিভিন্ন এলাকায় গেস্ট হাউজ ও আবাসিক হোটেলকে ঘিরে এমন অভিযোগের কথা উঠে আসে। বাংলাদেশ পুলিশও মানব পাচারসংক্রান্ত অভিযোগ গ্রহণ ও ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট ব্যবস্থা রেখেছে। পুলিশ সদর দপ্তরের সেবা সংক্রান্ত তথ্যে মানব পাচার অপরাধের অভিযোগ গ্রহণের কথা উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে, গেস্ট হাউজ বা আবাসিক প্রতিষ্ঠানের আড়ালে অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে কি না, তা যাচাইয়ে পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট অনুমোদনকারী সংস্থার সমন্বিত নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল।ঢাকা ইন গেস্ট হাউজের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ এবং জুলহাসের সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে তার বক্তব্য জানার চেষ্টা করলে তাকে পাওয়া যায়নি। প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃপক্ষ বা জুলহাসের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তি প্রতিবেদনে যথাযথভাবে সংযোজন করা হবে।অভিযোগের সত্যতা থাকলে দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সেটিও তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হবে। কারণ কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগের কারণে পুরো ব্যবসায়ী বা আবাসিক হোটেল খাতকে প্রশ্নবিদ্ধ না করে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়াই হতে পারে কার্যকর সমাধান। গেন্ডার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অপরাধ, মাদক ও মানব পাচারের মতো অভিযোগকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত না করে নিরপেক্ষ অনুসন্ধান ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করাও জরুরি।আর ও পড়ুন :তৃণমূলের কাণ্ডারী বকুল: ফরিদপুর বিএনপিতে ফের নেতৃত্বের আশাবাদএবিষয়ে সাভার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বলেন, গেন্ডা এলাকায় কোনো গেস্ট হাউজ বা আবাসিক প্রতিষ্ঠানের আড়ালে মাদক, মানব পাচার কিংবা কোনো ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে—এমন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা তথ্য পাওয়া গেলে তা আইনের আওতায় আনা হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান পরিচালনা করছে। কোনো প্রতিষ্ঠান বৈধ অনুমোদন ছাড়া পরিচালিত হচ্ছে কি না, সেটিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে যাচাই করা হবে। তিনি বলেন, অপরাধের সঙ্গে কারও সম্পৃক্ততা তদন্তে প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

সাভার গেন্ডায় ঢাকা ইন গেস্ট হাউজে জুলহাসের অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও মাদক সিন্ডিকেট