দৈনিক সংবাদ দিগন্ত

জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় চট্টগ্রামে নতুন সমন্বয় কমিটির ১০০ কিলোমিটার খাল সচলের উদ্যোগ

একসময় সামান্য ভারী বর্ষণেই পানিতে ডুবে যেত চট্টগ্রাম নগরীর বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, চকবাজার, মির্জাপুল, বাকলিয়া, আগ্রাবাদ ও হালিশহর। এমন পরিস্থিতিও সৃষ্টি হয়েছিল, যখন বহদ্দারহাটে তৎকালীন মেয়র নিজ বাসা থেকে বের হতে পারেননি। তবে সময় বদলেছে সমন্বিত উদ্যোগ, সেনাবাহিনীর প্রকৌশল সহায়তা এবং খাল পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের ফলে নগরবাসী এখন জলাবদ্ধতার ভয়াবহতা থেকে অনেকটাই স্বস্তি পাচ্ছে বলে দাবি করেছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।আরও পড়ুন, সাভারের সুগন্ধা হাউজিংয়ের বিরুদ্ধে জমি দখলের অভিযোগ, পুলিশের হস্তক্ষেপে সীমানা প্রাচীর নির্মান বন্ধবুধবার (১৩ মে) টাইগারপাসে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত নগরীর খাল ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সচল রাখা এবং জলাবদ্ধতা নিরসনবিষয়ক ১৯ সদস্যের সমন্বয় কমিটির প্রথম সভায় তিনি এসব কথা বলেন। সভায় মেয়র বলেন, গত বছর নগরীতে জলাবদ্ধতা পরিস্থিতির দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করেছে। বহদ্দারহাট, চকবাজার, মির্জাপুল, বাকলিয়া কিংবা আগ্রাবাদের মতো নিচু এলাকাগুলোতে আগের মতো পানি জমেনি। তিনি এর কৃতিত্ব দেন সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত প্রচেষ্টা ও সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং টিমকে।ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ২০২৫ সালে নগরবাসী আগের সেই দুর্ভোগ দেখেনি। আমরা অন্তত ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ জলাবদ্ধতা কমাতে সক্ষম হয়েছি। এবার আমাদের লক্ষ্য ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ জলাবদ্ধতামুক্ত চট্টগ্রাম গড়ে তোলা।” তবে সম্প্রতি প্রবর্তক মোড়ে সৃষ্ট জলাবদ্ধতার ঘটনাকে তিনি ব্যতিক্রমধর্মী দুর্ঘটনা” হিসেবে উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য, বৈশাখ মাসে অস্বাভাবিক ভারী বর্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতেও এ ধরনের অনিয়মিত আবহাওয়ার ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।আরও পড়ুন, গংগাচড়ায় শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কার্যকরী পরিষদ সম্মেলন অনুষ্ঠিতসভায় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. নুরুল করিম নগরীর প্রবর্তক এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ভবন দ্রুত অপসারণের তাগিদ দেন। তিনি বলেন, প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির একটি ভবন এবং ইউএস কর্নার সংলগ্ন আরেকটি স্থাপনা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। সামান্য ভূমিকম্প কিংবা কাঠামোগত দুর্বলতার কারণেও বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে।তিনি আরও বলেন, আংশিক ভেঙে পড়া ভবনের অবশিষ্ট অংশ দ্রুত অপসারণ না করলে জননিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এ বিষয়ে মেয়র চসিকের প্রধান প্রকৌশলীকে আগামী ১০ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, কারিগরি মূল্যায়ন শেষে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অপসারণে দ্রুত অভিযান পরিচালনা করা হবে।আরও পড়ুন, নির্মাণাধীন ভবনে ঝুলছিল মালিকের লাশসভায় সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার ব্রিগেডের ব্রিগেড কমান্ডার বলেন, জলাবদ্ধতা ৮০ শতাংশ কমিয়ে আনতে যা যা প্রয়োজন, তা বাস্তবায়নে সেনাবাহিনী সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে। নগরীর ৩৬টি খাল নিয়ে প্রায় ১০০ কিলোমিটার পানি প্রবাহব্যবস্থাকে কার্যকর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। তিনি বলেন, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এই প্রকল্প তদারকি করা হচ্ছে। তাই সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা সমস্যা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।”চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা খাল পরিষ্কারের পাশাপাশি সেগুলোর নিয়মিত তদারকির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, নাগরিক অসচেতনতা ও খাল-নালায় পুনরায় বর্জ্য ফেলার প্রবণতা জলাবদ্ধতার অন্যতম বড় কারণ। নিজের পূর্ব অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে ডিসি বলেন, নারায়ণগঞ্জে দায়িত্ব পালনকালে খাল পরিষ্কারে বিপুল অর্থ ব্যয় করেও স্থায়ী সুফল পাওয়া যায়নি, কারণ মানুষ অল্প সময়ের মধ্যেই আবার খালে ময়লা ফেলতে শুরু করেছিল।আরও পড়ুন, লক্ষীপুরের বিশিষ্ট সাংবাদিক মাহমুদুর রহমান মঞ্জু চলে গেলেন না ফিরার দেশেতিনি জলাবদ্ধতা নিরসন কার্যক্রম টেকসই করতে একটি বিশেষ মনিটরিং টিম গঠনের প্রস্তাব দেন। তার মতে, কাজ শেষে খালগুলোর নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও সচিত্র প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হলে প্রকৃত পরিস্থিতি মূল্যায়ন সহজ হবে এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, জলাবদ্ধতা নিরসনে শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, নাগরিক সচেতনতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং খাল রক্ষণাবেক্ষণের ধারাবাহিকতাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই সমন্বিত প্রয়াসই এখন চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা মোকাবিলার প্রধান ভরসা হয়ে উঠছে।

জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় চট্টগ্রামে নতুন সমন্বয় কমিটির ১০০ কিলোমিটার খাল সচলের উদ্যোগ